‘রুশভেদ'(উৎকোচ)

বাজারের বড় ডুমুর গাছগুলির ছায়া মাটিতে এসে পড়েছে। বাতাসে গাছগুলোর দোলাদুলিতে মনে হচ্ছিল তারা কি যেন বলাবলি করছে। উকিল হাজি নামিক সাহেব তার সামনে রাখা কাগজগুলি যাতে বাতাসে না উড়ে যায়, তাই তার ছোট দোকানের জানালাগুলো ভালো করে লাগিয়ে দিয়ে দরজাটা টেনে দিতে এগিয়ে গেলেন। দরজাটা লাগিয়ে দিতে গিয়ে ঘোড়া সাথে লম্বা দাড়ি ও বেঁটে ধরনের একজন গ্রাম্য কৃষককে তার দোকানের দিকে এগিয়ে আসতে দেখলেন।

-আরে আলি সাহেব যে, আপনি এই সময়ে কি করছেন এখানে, সাপ্তাহিক বাজারের এখনোতো দুইদিন বাকি।

কৃষক তার কালো, ছোট চোখ দুটিকে আরো খানিক ছোট করে,

-আর বলবেন না ভাই। একটা বিপদে পড়েছি। ‘আপনার কাছে একটা মামলার জন্য এসেছি’ বলে মাথাটা ডানে
-বামে বারকয়েক ঝাঁকালেন।
-হুম বুঝলাম। তো বলুন তাহলে শুনি আপনার মামলার কথা। সব কিছু খুলে বলুন আমার কাছে।
-এই রকম সমস্যার কথা আপনাকে ছাড়া আর কাকেইবা বলব বলেন?

ঘোরার দড়িটি পাশেই থাকা খুঁটের সাথে বেধে কৃষক ছোট দোকানটিতে ঢুকলেন। আপ্যায়নের জন্য রাখা বাদামের ছোট টেবিলটির ডানদিকে রাখা চেয়ারটি টেনে বসলেন তিনি। নামিক সাহেবের বাড়িয়ে দেয়া সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটি সিগারেটে আগুণ ধরাতে ধরাতে মামলার কারণটি বলতে শুরু করলেন।

‘আলি সাহেবদের গ্রামের পাশের ‘হাসমি’ গ্রামের ইউনিয়ন পরিষদ মেম্বার ছিলেন ‘হূইসুজ অওলু’। তার জমিতে এক সময় আলি সাহেব একটি বাড়ি বানিয়েছিলেন। এখন জমির মালিক (হুইসুজ অওলু) বাড়িটি অধিগ্রহণ করতে চাচ্ছেন। ‘কিন্তু বাড়ি যার জমিওতো তারি হওয়ার কথা’…

নামিক সাহেব তার চাপ দাঁড়িতে একটু হাত বুলিয়ে, চশমার উপরের ফাকা অংশ দিয়ে তাকিয়ে বললেন,

-আলি সাহেব, আপনিতো এই জমির প্রকৃত হকদার নন।
-না আমিই এটির হকদার। কেন সে বাড়ি বানানোর সময় কিছু বললেন না।
-নামিক সাহেব, আমিই যে এটির প্রকৃত হকদার, তা আমি জানি। তাই আমি মামলা থেকে সরে আসব না।
-মামলাতে কিন্তু আপনি হেরে যাবেন।
-হেরে গেলেও মামলা থেকে সরে আসব না আমি।

নামিক সাহেব এমন মামলার ওকালতি কখনোই করেন না। আলি সাহেবের মামলার উকিল হওয়ার বিষয়টিও তিনি না করে দিতেন। কিন্তু ওই গ্রামের লোকেরা নামিক সাহেবের ত্রিশ বছরের পুরনো গ্রাহক ছিলেন। গাধার পানি পানের যায়গার মত তার দোকানকেও গ্রামের লোকজন এক অপরিহার্য অংশ হিসেবে ধরে নিয়েছেন। সরকারি সকল কাজে তার কাছে আসা এক রকম অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল গ্রামের লোকদের। আর নামিক সাহেবের আয় রোজগারেরও একটা ভালো মাধ্যম ছিল এটি। এজন্যই তিনি…

-আচ্ছা ঠিক আছে, আমি আপনার এই বিষয়টি দেখবো। তবে হেরে গেলে আমাকে দোষ দিতে পারবেন না, জানিয়ে দিলেন নামিক সাহেব।
-দোষ দিবনা। কিন্তু হেরে যাব কেন আমরা?
-কারন আপনি জমির প্রকৃত হকদার নন।
-তাহলে বিচারককে যদি কোন দামি উপহার পাঠাই?
-কি!-তখনো কি মামলা জিতেতে পারবোনা নাকি?
-সেই সময় সন্দেহাতীতভাবে হারবে।
-কেন?
-নতুন বিচারক তোমার পরিচিত লোকদের মত নন।
-…

আলি সাহেব, উকিলের কথা পুরপুরি বুঝে উঠতে পারেননি। তাই উকিলের কথা মন দিয়ে শুনতে লাগলেন। উকিল বললেন, ‘এই বিচারক ঘুষের অনেক বড় শত্রু! জিতে যাবে এমন কোন মামলাতেও যদি ঘুষের কোন লেনদেনের কথা তিনি জানতে পারেন, তাহলে সেই মামলার ফল সরাসরি উলটে যায়’।

-আলি সাহেব: ‘আল্লাহ যেন পৃথিবীতে এমন লোকের সংখ্যা আরো বাড়িয়ে দেন’, বলে হাত তুলে দোয়া করলেন।
-নামিক সাহেবও দুইবার আমিন আমিন বললেন।

মামলার খুঁটিনাটি ব্যাপারে আরো এক ঘন্টা কথা বললেন তারা। উকিল তার মামলাটি দেখতে রাজি হলেন। কিন্তু তিনি মামলাতে জেতার ব্যাপারে কোন আশা রাখতে পরলেন না। কাজটি সম্পর্কের খাতিরেই নিলেন শুধু। কারন এই মামলায় অনিয়মগুলো তিনিও স্পষ্ট বুঝতে পারছেন।

……………

দুই সপ্তাহ পরে একই সময়ে আলি সাহেবকে সেই সবুজ রঙের ছোট দোকানের সামনে দেখা গেল। নামিক সাহেব একটি আবেদন পত্র লিখছিলেন। চশমার উপরের ফাঁকা অংশ দিয়ে তাকিয়ে তার গ্রাহককে আসতে দেখে একটু হেসে বললেন..

-স্বাগতম, আমরাতো মামলায় জিতে গেছি।

এমন একটি অন্যায় রায় বিচারক কিভাবে দিতে পারলেন, তা আমি এক সপ্তাহ ধরে চিন্তা করেও কোন কুলকিনারা খুঁজে পেলামনা। আলি সাহেব ছিলেন ‘ঠাণ্ডা মাথার’ মানুষ। তিনি বললেন,

-আমার পাঠানো উৎকোচের কারনেই জিতেছি আমরা।
-কি!… আপনি বিচারককে উৎকোচ পাঠিয়েছেন?
-হ্যাঁ, পাঠিয়েছি।-আপনি এমনটি করারো সাহসো পেলেন…
-আপনি বিচারকের সম্পর্কে ‘উৎকোচের শত্রু, কেউ তাকে উৎকোচ দিলে তিনি তার বিপরীতে চলে যান’ এসব বলেছিলেনতো নাকি?
-হ্যাঁ, বলেছি। তো…
-আমি উৎকোচটি পাঠানোর সময় নিজের নাম দেইনি।
-তাহলে কি করেছেন আপনি?
-উৎকোচটি আমাদের প্রতিপক্ষ ‘হাসিম’ গ্রামের এউনিয়ন পরিষদ মেম্বার ‘হুইসুজ অওলুর’ নাম দিয়ে পাঠিয়েছি।
-!!!
-উকিলের হাতে থাকা কলমটি মাটিতে পড়ে গেল। তিনি তার চেয়ারটি একটু টেনে নিয়ে কিছুটা হেলান দিয়ে বসলেন। আর তার বিপরীতে চকচক করতে থাকা কালো, ছোট চোখ দুটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।

দোকানের পাশে মাঠের বড় ডুমুর গাছগুলো বাতাসে নড়াচড়া করছিল। সেই বাতাসগুলো দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আলি সাহেবকে পাশ কাটিয়ে দেয়ালে লাগানো পুরনো প্রাদেশিক পত্রিকাগুলোকে বার বার নাড়িয়ে দিচ্ছিল…

মূল লেখকঃ ওমার সাইফুদ্দিন (১৮৮৪-১৯২০) ইস্তানবুল।


আমাদের উৎসাহিত করুনঃ




সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এই লেখাটি কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয় ।

লেখক সম্পর্কেঃ

বুনন সম্পর্কিত তথ্যঃ