ঈর্ষাগাছ ও অন্যান্য

তীরন্দাজ সেজে প্রিয় তীরটা একটু পেছনে টেনে নিই। প্রিয় তীর বলছি এ কারণে যে এই তীরটা আমি সবসময়ই জীবনের ভোরবেলার দিকে ছুঁড়তে পছন্দ করি। সেই ছেলেবেলায় গ্রামে আমি ও আমার বন্ধুদের নানান অর্থহীন কাজের মধ্যে একটা আনন্দের কাজ ছিল ডেমো ওয়াজ- মাহফিলের আয়োজন করা। শীতকালে- রোজার মাসের আশেপাশে আমাদের গ্রামে ওয়াজ- মাহফিলের বন্যা বইতো। পকেটে করে আটানা- চারানার বুট- বাদাম নিয়ে বসে যেতাম ঠিক মওলানার চেয়ারের সামনে। যেন একজন একাগ্র নিবিষ্ট শ্রোতা। ইম্পরট্যান্ট গ্যাপে ছোট্টগলায় যতটুকু পারা যায় তাকবীরও মারতাম

মওলানার সাথে।  পবিত্র ভাবাবেগে কেদেঁও দিতাম জায়গায় জায়গায়। প্রতিবার ওয়াজ শেষে দু-এক ওয়াক্ত নামাজ পড়তাম মসজিদে গিয়ে। ব্যস্ তারপর শেষ। আর হুজুরের ওয়াজরত সৌম্য চেহারায় সাহাবীদের কাল্পনিক অবয়ব ভেসে উঠত। ওয়াজ শুরুর দিকের যে দোয়াটুকুন ওনারা করতেন সেটা সবার আগে আমাদের  মু্খস্ত করা ছিল।

এই মুখস্ত প্রারম্ভিক দোয়াটুকু দিয়েই আমরা বয়ান শুরু করতাম। ঐ দুঅাটুকু কে কত সুললিত কন্ঠে আর মায়াবী ঢংয়ে শুরু করতে পারে সেটাই মুখ্য ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মুল বাড়ির ঢালুতে ক্ষেতের মত খানিকটা জায়গা পরিস্কার করে নিতাম। সমানে শুকনো খড় বিছানো হতো। মা- চাচী দের প্রায়-পরিত্যাক্ত শাড়ী টারি ছিল আচ্ছাদন হিসেবে।  বাশেঁর শক্ত কন্চি দিয়ে মাইকস্ট্যান্ড বানিয়ে তাতে শুকনো ধুন্দল লাগিয়ে মাইক্রোফোনের কাজ দিব্যি চালিয়ে নেওয়া যেত। মাথায় টুপি থাকত আমাদের, গোল গলার সাদা ছোট পান্জাবী তো মক্তবের জন্য বানানো ছিলই। ব্যস। অন্যদিকে শ্রোতাদের লিস্টটা মোটামুটি ছোট ছিলনা।  সবাই এটাকে অনেকটা আমাদের প্যারোডি কর্মকান্ড হিসেবেই নিত। ভাই বেরাদার, সমবয়সীদের পাশাপাশি যোগ দিত চাচী-দাদীরা সহ অন্যান্য বড় আপুমনিরা।[nextpage title=”পাতা ২”]

আমার কন্ঠ নাকি সুমিষ্ট ছিল, আম্মা আর আপুরা তাই বলত। পক্ষপাত কি না জানি না। এক দাদী তো আমার ওয়াজের সদাভক্তই  ছিল। তার মতে যুক্তিবাদী- মাধবপুরীদের মতই নাকি ওয়াজের টান আমার সুশ্রাব্য ছিল । তখন আমাদের সরাইলসহ পুরো বি.বাড়িয়ায় যুক্তিবাদী আর আমিনীরা হিট। মাথার আচঁল টেনে এনে দুই ঠোঁটের ভেতর দাঁতে চেপে আমাদের ছোট্ট প্যান্ডেলে খুটিঁ ধরে দাড়িয়ে থাকত ঔ দাদী। কি শরমিন্দা ছিল তার চাহনী!

আমাদের ডেমো ওয়াজ- মাহফিলের এজেন্ডায় থাকত গত দিনগুলোতে এপাড়া ওপাড়ায় হওয়া ওয়াজগুলোর জনপ্রিয় ও আলোচিত বয়ানগুলো। গভীর রাতের স্তব্ধতা চিরে যে সুরেলা বয়ান ভেসে আসত কানে সেগুলোই মগজে গেঁথে যেত আমাদের । পরের দিন বা তার কিছুদিন পর সেই টপিকগুলো নিয়ে আমাদের  ( অনেকটা ডেইলি সোপের ‘ফিরে দেখা’র মত) ওয়াজ জমে যেত। শুরু করতাম আছরের পর থেকে। চলত মাগরিব হয়ে এশা পর্যন্ত। তারপর যেন হঠাৎ করেই রাত গভীর হয়ে যেত। মাগরিবের পরপর রাতের খাবারের জন্য চুপিচুপি ঘরে আসতাম। খাওয়াচলাকালীন ঐ সময়টায় মন অস্থির হয়ে থাকতো। কি জানি কি হচ্ছে আমাদের মাহফিলে এই ভেবে।

সমস্যা সব জায়গায়ই থাকে। ওখানেও ছিল।  আমরা সমবয়সীরাই মুলত ঐ অদ্ভুত আয়োজনের আয়োজক ছিলাম। আর অন্যদিকে বয়সে ছোটরা এটা সেটা আমাদের ফরমায়েশ মোতাবেক জোগাড় জঅন্ত করে বেশ নিবিষ্ট মনে আমাদের কে শুনতে বসে যেত।

কিন্তু গ্যান্জাম বাজত ওয়ায়েজিন ও তাদের জন্য বরাদ্দকৃত সময় ও ক্রম নিয়ে। উদ্বোধনী মওলানা হিসেবে কারো তেমন আগ্রহ না থাকলেও সমাপনী বক্তা হিসেবে সবার আগ্রহ ছিল চরমে। আমরা মুলত তিনজন ওয়ায়েজিন পাড়ায় জনপ্রিয় ছিলাম। আরো দু- একজন ছিল তবে তাদের বাসা মাহ্ফিল স্হল থেকে দুরে হওয়ায় তেমন পাত্তা পেত না। মন চাইলে এক আধটু আমাদের প্রক্সি হিসেবে তাদের সুযোগ দিতাম। ওদের নিয়ে তেমন মাথা ব্যথা আমাদের ছিল না। মুলত এই তিনজনই ছিলাম মুল প্রতিদ্বন্দ্বী।  ঠান্ডা মাথার গুটিবাজ।[nextpage title=”পাতা ৩”]

ছহুল, রেহান আর আমি। ছহুল ওয়াজ করতে আসলে মাথায় সবুজ রংয়ের পাগড়ি বেঁধে আসত। পাগড়ি বেঁধে দিত ওরই ছোট মামা। চোখে কাশেমী হুজুরের মত সুরমাও মাখত সে। যেন পুরোদস্তুর মওলানা। তখন বিখ্যাত সব ওয়ায়েজিনদের নামের শেষে জন্মস্থান- বংশ সম্বলিত বিশেষনধর্মী সুশ্রাব্য টাইটেল থাকত যেমন- সরাইলের সরাইলী, বেলালপুরের বেলালী, সোহাগপুরের সোহাগপুরী ইত্যাদি। ছহুলেরও ঠিক তেমন একটা নাম ছিল – ছহুল হোসাইন কোরাইশী। এই নামটা ও নিয়েছিল মালিহাতা গ্রামে এক মাহফিলে ওয়াজ থেকে। মৌলানা সেদিন মক্কার কোরাইশ বংশের শান বয়ান করেছিলেন দীর্ঘ ওয়াজে। বিমুগ্ধতাবশতঃ পরেরদিনই ছহুল এই নামটি ধারন করে। আমাদেরই নির্ধারণ করা উপস্থাপক আমির মিয়া যখন একদিন ছহুলের নামের সাথে কোরাইশি নামটি যোগ করে নাম ঘোষনা করে তখন আমরা অবাক হয়ে গিয়েছিলাম,  অনেকে মুখ টিপে হেসেও ছিল। আমার রাগও হয়েছিল-  টাইটেল নেয়ায়। কি দামী টাইটেল ! এটা ছহুলের থাকবে কেন? আর ও কি এমন বক্তা হল যে এরকম সত্যি সত্যি মৌলানাদের টাইটেল নিয়ে নেবে! ফলে আমি আর রেহান কিছুদিনের জন্য একজোট হয়ে যাই। নিজ স্বার্থবিরোধী হলে জোট বাধাঁ জরুরি। তাই ছহুলের এমন নাম ধারণে তলে তলে কষ্ট পাই। নিয়মিত শ্রোতারা ছহুলের টাইটেলে চমৎকৃত হয়। মা-চাচি-আপা-আর পোলাপানরা নাম শুনেই বক্তার ভক্ত বনে যায়। আর এদিকে আমাদের হিংসালতা লতিয়ে চরমে ওঠে।

কিন্তু সমস্যা গাঢ় হয় পরেরদিন যখন রেহানও পল্টি নেয়। তখন ইরাকের সাদ্দাম হোসেন আমাদের মত সব ইসলামপ্রাণ দেশে খুবই আবেগের জায়গায় আছে। হাটে- গন্ঞ্জে ইরাক -পশ্চিমা যুদ্ধের পোস্টার বিক্রি হচ্ছে দেদারসে। পোস্টারের উপরের দিকে জেট প্লেন আর তা থেকে মোনাজাতরত সেনাপোশাকে সাদ্দাম হোসেনের উপর নিক্ষিপ্ত হচ্ছে বোমা রাশি। আহ্ কি আবেগ। আবেগ তখন পথে ঘাটে মসজিদ মাদ্রাসায়- ফেটেফুটে পড়ছে সবখানে। এরকম অস্থির সময়ে রেহান ছহুলের মতই নতুন টাইটেল  ধারণ করে। সময়োপযোগী টাইটেল। রেহানুর রহমান ইরাকি।[nextpage title=”পাতা ৪”]

আমি ত থ। আরে কয় কি! রেহানও পল্টি নিল! আমারে একবারো কইলো না! ঐদিন আমার সমাপনী বক্তব্য দেয়ার কথা ছিল কিন্তু উপস্থাপক কেন জানি কে বা কার অংগুলীহেলনে রেহানের নাম ঘোষনা করে দিল। আমি অবাক এবং ছহুল ও অবাক!  ছহুল ভাবছে ওর দেখাদেখি এ কান্ড করেছে রেহান। আর আমি ভেবেছি – আমিই কেবল টাইটেলবিহীন রয়ে গেলাম! কি হল এটা? কিছুই বুঝলাম না বললামও না। ভেতরে ভেতরে সহ্য করে গেলাম।  কারণ শ্রোতাদের মধ্যে নিজেদের আত্বীয় স্বজন ও ছোটরা ছিল। শুধু শুধু শ্রোতা নষ্ট করে লাভ তো নাই। তাই অবধারিত ভাবে গতকালের বিরোধী পার্টির সাথে এবার এলায়েন্স করলাম। গতকালের শত্রু আজ স্বার্থের নিমিত্তে বন্ধু। আমরা মিলে গেলাম। এদিকে আমার চে রেহানকে ছহুলের বেশি হিংসা। কারন ইরাকী টাইটেল টা জমে গেছে। সব শ্রোতারা মজায় আছে। টাইটেল পেয়ে রেহানের ওয়াজের কারিশমাও বেড়ে গেছে। কারণ কোরাইশি থেকে ইরাকী টাইটেলটা বেশি সাম্প্রতিক ছিল তখন।

আমি মহা টেনশানে। ছহুল একটু একটু রেহানের দিকে আর একটু একটু আমার পক্ষে।টের পেলাম রেহানের জনপ্রিয়তা ছহুলকে ধীরে ধীরে গ্রাস করছে। আমি বুঝতে পারছিলাম। তাই আমি শ্রোতাদের কাছে একটু একটু জনপ্রিয়তা হারাচ্ছিলাম। সবাই বলাবলি করছিল যেন আমিও জব্বর একটা টাইটেল নিই। কিন্তু আমি খুঁজে পাচ্ছিলাম না অথবা চাচ্ছিলাম না। আমি বরং চেষ্টা করছিলাম যেন বয়ানে ভিন্নতা আনতে পারি। প্রতিদিনকার হাইলাইট ওয়াজ আমার আর ভাললাগছিলনা। আমার মনে হল টাইটেলে বেশি দিন শ্রোতারা আটকে থাকবেনা। আটকাতে পারে কেবল বয়ান বৈচিত্র্যে ও উপস্থাপন ভংগিতে। যেই ভাবা সেই কাজ। বাসায় সকাল বিকাল ভাবতে থাকি। কি করা যায়, কি করা যায়? মাথায় কিছু আসে না।[nextpage title=”পাতা ৫”]

তখন মাথায় একটা প্ল্যান আসে। তখন ঘরে ছিল কিতাব- বিষাদ-সিন্ধু। আম্মার অনুরোধে আব্বা ঢাকা থেকে এনেছিলেন। আমরা কিতাব বলেই জানতাম ঐ ঢাওস বইটাকে। হাদিসের বইকেও আমরা কেতাব বলতাম, তাই আল্লা- রসুল নবী সম্পর্কিত যেকোনো কিছুই মা দাদীরা তখন  কিতাবই বলতো। আমি পড়া শুরু করি। সারা দিনরাত পড়ে মহররম পর্বে  চলে আসি। আহ্ এসেই তো চোখে জল। তখন আমার বয়স আট-নয় হবে হয়তো । রাগ-আবেগ- মায়া-হিংসা সবই জোয়ারের পানির মত নতুন আর ভয়ংকর পরিমাণে মনের মধ্যে মজুদ করা।  যাই হোক- হাহাকার, ক্রোধ আর সৃজনী শক্তি নিয়ে আমি ঐদিন বয়ান করতে নামলাম। রমজান মাস কেবল ঢুকেছিল সেদিন। আমাকে প্রথমে বয়ান করতে বলা হল। আমি বয়ান শুরু করি। মীর মোশাররফ হোসেনের বয়ান আমি আউড়াতে লাগলাম। হুবহু তো নয়ই সাথে আমার মতো করে তৈরি করা আবেগ নিয়ে আমি ঐদিন শ্রোতাদের কানে ঝাপিয়ে পড়ি। বয়ান এগোয় । যেন ফোরাত নদী আমাদের বাড়ির ছোট্ট ভাটির ক্ষেতটাতে এসে ভাসতে থাকে। আমার বয়ান শ্রোতামন্ডলীর সবাইকে রাতের দিকে নিয়ে যায়। আমি টাইটেল ছাড়াই মাহ্ফিল কে এশার তারাবিহ্ সময়ের দিকে নিতে থাকি। ফলে সেদিন আর বিশেষ বা সমাপনী বক্তার কোন সুযোগ বা সময় অবশিষ্ট থাকে না।

ছহুল হুসাইন কোরাইশী আর রেহানুর রহমান ইরাকীরা হয়তো আবার স্বাভাবিকভাবেই আমার বিরুদ্ধে নতুন এলায়েন্স করেছিল সেদিন। যেমন টা আমি আর রেহান করেছিলাম।  আর ভাবছিলাম – আমাদেরই ক্রমাগত বয়ানকৃত নীতিকথাগুলো বুঝি ক্রমশঃ বানোয়াট ও আমাদের আবেগের মারাত্বক অধীন হয়ে থাকে যেখানে নিজেকে জাহিরই শেষ কথা।

পরেরদিন সকালে আমাদের মাসখানেক ধরে হয়ে আসা পিচ্চি ছেলেগুলোর এই ডেমো ছোট্ট মাহ্ফিলের ঘরটি গ্রামবাসী দুমড়ানো মোচড়ানো অবস্থায় আবিষ্কার করে।

 


আমাদের উৎসাহিত করুনঃ




সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এই লেখাটি কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয় ।

লেখক সম্পর্কেঃ

বুনন সম্পর্কিত তথ্যঃ