রাতের পথ | তাছনীম বিন আহসান

একদম ভুল জায়গায় এসে পরেছি। কেননা এখানে একটা বিরাট বট গাছ থাকার কথা ছিলো। কিন্তু নেই। যদিও গাছটা কাটা পরতেই পারে। তবে পাশের ভাঙা মন্দিরটা নিশ্চই কেউ তুলে নিয়ে যায়নি। আমি নিশ্চই ভুল জায়গাতেই এসেছি। কিন্তু কি করে ভুল করলাম। এইতো গত বছরেই এসেছিলাম। যদিও দিনেরবেলায় এসেছিলাম।

আমি সাজ্জাদ। একটি সারভে কোম্পানিতে সুপারভাইজার এর দায়িত্ব পালন করি। কাজের সুত্রেই রেজার সাথে পরিচয় আমার। সেখান থেকে বন্ধুত্ব। গতবছর শীতের সময় রেজার অনুরোধ রক্ষা করতেই ওদের বাড়িতে কয়েকদিন বেড়িয়ে গিয়েছিলাম। এবার ওর বোনের বিয়েতে নিমন্ত্রণ করেছে ও। অনেক অনুরোধ করেছে আসতে। তাই এসেছি।

কিন্তু মুশকিলটা হচ্ছে যে, আমি এখন রাস্তা হারিয়ে ফেলেছি মনে হচ্ছে। ট্রেনটা লেট করেই যত গণ্ডগোল হয়েছে। ট্রেন পৌছানোর কথা ছিলো সন্ধ্যা সাতটায়, সে ট্রেন পৌছালো রাত এগারো টায়। স্টেশন চত্তরে কোন রিক্সাই পেলামনা। এমনকি কোন দোকানও খোলা ছিলোনা। স্টেশন মাস্টার কে জিজ্ঞেস করায় বললেন

“বৈশাখের রাত, কখন ঝর বৃষ্টি শুরু হয় তার ঠিক নেই, আর রাতেও কোন ট্রেন নেই, তাই এখন রিক্সা পাবার সম্ভাবনাও নেই, তা কোথায় যাবেন আপনি?”

আমি ঠিকানা বললাম, তখন উনি বললেন

“বেশি পথতো নয়, ২ কিলোমিটারের মত, হেটেই চলে যান, ২০মিনিটের বেশি লাগার কথা নয়”

তখন আমারও মনে পরলো, গতবার রিক্সায় গিয়েছিলাম, ২ কিলোমিটারের বেশি পথ নয়। দের কিলোমিটার মত পরে বড় বট গাছটা পরবে সাথে ভাঙা মন্দির তার পাশ দিয়ে কিছুটা গেলেই রেজাদের বাড়ির উঠোন। কিন্তু কোথায় সেই বট গাছ আর মন্দির। ২ কিলোমিটারের বেশিই হেটেছি। ইশ, এমন কপাল মোবাইলের চার্জ শেষ, বন্ধ হয়ে গেছে। ধ্যাত, সব ঐ ট্রেনটার জন্য। আচ্ছা আমি ভুল পথে আসিনিতো? কিন্তু তা তো সম্ভব না, স্টেশনের পাশেই যে দুটি রাস্তা তার পুব দিকেরটা দিয়েইতো এসেছি, গতবারেও তাই করেছিলাম, আর এবার স্টেশন মাস্টারওতো পুব দিকেরটা দিয়েই আসতে বলেছিলেন। বট গাছটার কথাও তিনি বলে দিয়েছিলেন। ভাবছি আর হাটছি। বৈশাখের রাত। কিশোরী চাঁদ তার উঠতি যৌবনের যতটা সম্ভব প্রকাশ করছে। ঠান্ডা বাতাসটা খুবই আরামদায়ক লাগছে। হাটছি আর ভাবছি এখন কি করা যায়, আশপাশে যদি কোন বাড়ি ঘর থাকতো তাও ডেকে জিজ্ঞেস করা যেত। কিন্তু যে দিকেই তাকাচ্ছি ধান ক্ষেত আর মাঝে মাঝে দু-একটা গাছ। হঠাৎ নজরে পরলো কিছুটা দূরে ধান ক্ষেতের মাঝখানে আলো জলছে। মনটা খুশি খুশি হয়ে উঠলো। কিছুটা দূরে একটা মধ্যম আকারের কি যেন গাছ, তার পাশ দিয়ে রাস্তাটা চলে গেছে। আমি দ্রুত পা চালালাম, গাছটার কাছে আসতেই চমকে উঠলাম। আমি ভিতু এই অপবাদ আমার শত্রুও আমাকে দিতে পারবেনা। কিন্তু এমন রাত বিরাতে ফাকা জায়গায় গাছতলায় কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে বুকের ভেতরটা এমনিতেই ধরাস করে উঠে। সেও আমাকে দেখতে পেয়েছে, সে গাছের ছায়া থেকে বেরিয়ে এগিয়ে আসতেই ভালো করে দেখতে পেয়ে আরো অবাক হয়ে গেলাম। একটা মেয়ে। সাধারন গ্রাম্য মেয়ে যেমন হয়, তেমনি। সে আমার কাছাকাছি এসে কাঁদোকাঁদো গলায় বললো

“ভাইয়া, আল্লাহই আপনাকে পাঠাইছে, আমি মনে মনে খুব দুয়া করেছি, তাই আল্লাহ আপনাকে পাঠাইছে। আমাদের খুব বিপদ।”

মেয়েটা দেখতে গ্রাম্য হলেও একেবারেই শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতেছে, আমি অবাক ভাবটা কাটিয়ে জিজ্ঞেস করলাম

“কিসের বিপদ?”

মেয়েটা সেই কাঁদোকাঁদো গলাতেই বললো

“আমার বাবা খুব অসুস্থ, ঐটা আমাদের বাসা। আমি আর আমার বাবা থাকি। বাবা খুব অসুস্থ। আমি বুঝতে পারছিনা কি করবো। আপনি দয়া করে একটু আসুন।”

একেতো এমন ফাকা একটা জায়গায় বাড়ি। তার উপর বলতেছে বাবা আর মেয়ে ছাড়া কেউ নেই, ব্যাপারটা কেমন খটকা লাগলো।

মেয়েটা আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে আবার বললো

“দয়া করে চলুন, আমার বাবা খুব অসুস্থ, চলুন দয়া করে।”

মানুষের বিপদে সাত-পাচ না ভেবে জড়িয়ে পরার দুর্নাম আমার আগে থেকেই আছে। যা হবার হবে, এই ভেবে বললাম

“আচ্ছা, চলুন।”

মেয়েটা আগে আগে হেটে চললো। আমি পেছনে যেতে যেতে বললাম

“কি হয়েছে আপনার বাবার?”

মেয়েটা বললো

“আমি জানিনা। কিছুই বুঝতে পারছিনা।”

মেয়েটার গলায় হতাশা আক্ষেপ আর ভালোবাসা মিশ্রিত যে ভাবটা ছিল সেটা আমাকেও অনেকটা ছুয়ে গেল। বাড়িটার কাছে পৌছে দেখলাম ছোট্ট একটা উঠোনের পর সাধাসিধে একটা টিনের বাড়ি। প্রথমে প্রশস্ত বারান্দা পেরিয়ে একটা ঘরে ঢুকলাম। একটা হেরিকেন জলছে ঘরটাতে। তেমন আসবাব পত্র নেই ঘরটায়, একটা বিছানা পাতা চৌকি, একটা পড়ার টেবিল আর চেয়ার, একটা আলনা, সেই ঘরের পেছন দিকে আর একটা দরজা দিয়ে পাশের ঘরটায় ঢুকলাম। একই রকম আসবাব এ ঘরেও। শুধু চৌকিটায় এই গরমেও কে যেন চাদর মুরি দিয়ে শুয়ে আছে। বাড়িটায় প্রবেশ করার পর থেকেই একটা প্রচন্ড রকম দুর্গন্ধ পাচ্ছি। ভিষন পচা দুর্গন্ধ। যা হোক আমি বিছানাটার দিকে এগিয়ে গেলাম। মেয়েটা চেয়ারটা এগিয়ে দিয়ে আমায় বসতে বললো। চেয়ারে বসে বিছানায় শুয়ে থাকা লোকটাকে জিজ্ঞেস করলাম

“কি হয়েছে আপনার? কি কষ্ট?”

লোকটা চোখ খুলে তাকালো, সরল চোখের চাহনি, ভিষন শান্ত কিন্তু ফ্যাসফ্যাসে গলায় বললো

“কষ্ট, হুম, কিন্তু সেসব বলে আর কি হবে, তোমাকে দেখে ভালোমানুষ বলে মনে হয়, আমার কিছুটা উপকার করে দিতে পারো?”

আমার কেমন জানি অস্যস্তি লাগছিলো, কেন বুঝতে পারছিলাম না। বললাম

“বলুন, যদি সম্ভব হয় করবো।”

লোকটি চাদরের নিচ থেকে তার হাতটা বের করে আমার হাত জরিয়ে ধরলো, অসম্ভব ঠান্ডা সে হাত, আমার গা শিউরে উঠলো, লোকটি বললো

“আমার বাড়ির পেছনে একটা বকুল গাছ আছে, তার গোরায় আমি পুতে রেখেছি আমার সারা জীবনের সঞ্চয়। খুব ইচ্ছে ছিল আমার মেয়েটাকে একটা ভালো ঘরে বিয়ে দেবো, আর আমার স্কুলটা আরো বড় করবো, তার জন্যেই জমিয়েছিলাম প্রায় ৪ লক্ষ্য টাকা, সব পুতে রাখা আছে ওখানে। তুমি আমার এ ইচ্ছে দুটি পুরন করবে বলো?”

আমি কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না, চেনা নেই জানা নেই আমাকে এমন কথা বলতেছে কেন লোকাটা সেটাই বুঝতে পারছিলাম না। বললাম

“এমন বলছেন কেন, কিচ্ছু হবেনা আপনার, আপনি নিজেই আপনার ইচ্ছে গুলি পুরন করতে পারবেন, সকাল হলেই ডাক্তার আসবে, আপনি ভালো হয়ে যাবেন।”

লোকটার ঠোটের কোনে কেমন অদ্ভুত একটা হাসির রেখা দেখা গেলো, বললো

“তা আসুক, কিন্তু তুমি কথা দাও”

আমি অসহায় বোধ করলাম, বললাম

“আচ্ছা কথা দিচ্ছি, এখন বলুন আপনার কি অসুখ হয়েছে?”

লোকটি বললো

“অসুখ আর কখনোই করবেনা আমার, সে সম্ভাবনা নেই”

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম

“কেন?”

লোকটি তখন বললো

“চাদরটা সরালেই তুমি বুঝতে পারবে, চাদরটা সরাও।”

আমি সন্তর্পণে চাদরটা সরিয়েই চমকে উঠলাম, কি বিভৎস সে দৃশ্য, লোকটা খালি গায়ে, পরনে লুঙ্গি, লোকটার বুক ও পেটে অসংখ্য ক্ষত, কে যেন ভিষন রাগে ধারালো কিছু দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে ক্ষত বিক্ষত করেছে বুক আর পেট। আমি ভয়ে ছিটকে সরে আসলাম বিছানার কাছ থেকে, দরজাটা দিয়ে পাশের ঘরে ঢুকে ভয়ে অন্তর আত্মা কেপে উঠলো আমার, এ ঘড়ে বিছানায় মেয়েটা পরে আছে, পোশাক ছিন্নভিন্ন, আর গলাটা ধারালো কিছু দিয়ে কে যেন দুই ভাগ করে দিয়েছে, আর সেখান দিয়ে স্ববেগে বেরিয়ে আসছে রক্ত। আমি কয়েক মুহুর্ত পাথরের মত তাকিয়ে থাকলাম। তারপর দৌড়ে বেরিয়ে আসলাম বাড়িটা থেকে। দিক্বিদিক ভুলে দৌড়ালাম। কিসে একটা হোচট খেয়ে পরেই জ্ঞান হারালাম।

যখন জ্ঞান ফিরলো, দেখি আমি সেই বট গাছটার নিচে শুয়ে আছি, পাশেই সেই ভাঙা মন্দিরটা। উঠে বসতে গিয়ে বুঝলাম ডান হাতের কুনুইয়ে প্রচন্ড ব্যাথা। যা হোক উঠে কিছুদূর হেটে রেজাদের বাসায় পৌছলাম। রেজা আমাকে দেখে অবাক, অনেক প্রশ্ন করলো, আমি শুধু বললাম

“এখন না, তোকে পরে সব বলবো।”

রেজার বোনের বিয়ে ভালোমতই শেষ হলো। দুদিন পর একদিন বিকেলে হাটতে বেরিয়ে আমি রেজাকে জিজ্ঞেস করলাম

“আচ্ছা তোদের বাড়ি আসতে পথের পাশে কি এমন কোন বাড়ি আছে যেখানে একটা মেয়ে আর তার বাবা থাকে?”

রেজা কেমন অদ্ভুত ভাবে আমার দিকে তাকালো, বললো

“তুই একথা জানতে চাচ্ছিস কেন?”

আমি বললাম

“জানতে চাচ্ছি বল।”

তখন রেজা আমাকে যে ঘটনাটা বললো সেটার সারমর্ম এরকম

কয়েক বছর আগে ঐ লোকটা আর ঐ মেয়েটা এ গ্রামে এসে ওখানে বাড়ি করে থাকতে শুরু করে। এবং নিজেদের বাবা মেয়ে বলে পরিচয় দেয়। কোথা থেকে তারা এসেছে সেটা কেউ কোনদিন জানতে পারেনি। লোকটা এই গ্রামে এসে একটা স্কুল প্রতিষ্ঠা করে, গরিব বাচ্চাদের বিনে পয়সায় পড়ায়, মেয়েটাও সে স্কুলে পড়াতো। একদিন সকালে সে বাড়িটায় তাদের লাশ পাওয়া যায়। পুলিশ তদন্তে প্রকাশ পায় কে বা কারা রাতের বেলা ঘুমন্ত অবস্থায় ঐ লোককে ধারালো কিছু দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে আর মেয়েটাকে ধর্ষণ করার পর গলা কেটে মেরে ফেলে।

ঘটনাটা বলার পর রেজাকে জিজ্ঞেস করলাম

“আচ্ছা সে স্কুলটার এখন কি অবস্থা?”

রেজা আফসোস করে বললো

“কি আবার, অর্থাভাবে খুবই করুন দশা, গ্রামের কয়েকজন ভালো মানুষ কোনরকমে চালিয়ে যাচ্ছেন।”

আমি বললাম

“সে স্কুলের আর অর্থাভাব থাকবেনা, ঐ লোকটা স্কুলের জন্য টাকা রেখে গেছেন।”

 

 

 

#তাছনীম

Express Your Reaction
Like
Love
Haha
Wow
Sad
Angry
  • 2
    Shares

পাঠটিকে একটি রেটিং দিনঃ
খুব খারাপ, পাঠটিকে ১ রেটিং দিনখারাপ, পাঠটিকে ২ রেটিং দিনমোটামুটি, পাঠটিকে ৩ রেটিং দিনভাল, পাঠটিকে ৪ রেটিং দিনআসাধারন, পাঠটিকে ৫ রেটিং দিন (টি ভোট, গড়ে: এ ৫.০০)
Loading...

আমাদের উৎসাহিত করুনঃ




সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এই লেখাটি কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয় ।

লেখক সম্পর্কেঃ তাছনীম বিন আহসান

জন্ম ১৯৯৬ সালের এপ্রিল মাসে রংপুর জেলার মাহিগঞ্জ এ ! স্কুল জীবনেই বিভিন্ন শিশু-কিশোর পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হয়, সাহিত্য চর্চার অন্যতম অনুপ্রেরনা বড় বোন ও বড় ভাই ! উত্তর বঙ্গের অন্যতম বিদ্যাপিঠ বড় রংপুর কারামতিয়া আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষা জীবন শুরু , পরবর্তিতে উত্তর বঙ্গের আর এক শ্রেস্ট বিদ্যাপিঠ ধাপ সাতগারা বাইতুল মুকাররম মডেল কামিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল (এস এস সি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ! পরবর্তিতে বড় রংপুর কারামতিয়া আলিয়া মাদ্রাসা থেকে আলিম (এইচ এস সি) পাশ | বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় রসায়নে সম্মান শ্রেনীতে আধ্যায়নরত ! বর্তমানে " মাহিগঞ্জ সাহিত্য সংসদ " এ " পত্রিকা ও সাহিত্য সম্পাদক " এর দায়িত্ব পালনরত !
বুনন সম্পর্কিত তথ্যঃ 2018-01-27 06:31:37 তারিখ নিবন্ধিত হয়েছিলেন, এই পর্যন্ত প্রকাশিত লেখা সংখ্যা 24টি, মোট 71 পয়েন্ট সংগ্রহ করে [mycred_my_ranking user_id=157] অবস্থানে আছেন।
সংগঠন ও গোষ্ঠীঃ মাহিগঞ্জ সাহিত্য সংসদ

আপনার ভাল লাগতে পারে

avatar
  
smilegrinwinkmrgreenneutraltwistedarrowshockunamusedcooleviloopsrazzrollcryeeklolmadsadexclamationquestionideahmmbegwhewchucklesillyenvyshutmouth
Photo and Image Files
 
 
 
Audio and Video Files
 
 
 
Other File Types