মহারানীর ডায়েরী থেকে “রুটিওয়ালা”

সেবার ট্রেনে বাড়ি ফেরার সময় একটা পাগলি আমাকে একটা গল্প বলেছিল। গল্পটা হয়তো তেমন আহামরি কিছুনা। আর আজ-কালকার সমালোচক দের কাছেও হয়তো বিষয় বস্তুটা জঘন্য ও আহেতুক মনে হবে। কিন্তু আমার লিখতে ইচ্ছে করেছে, তাই লিখছি। পাঠক সমালোচকরা যা ইচ্ছে বলতে পারেন।

সেবার শীতের ছুটিতে আমি আর জেরিন পরিকল্পনা করলাম যে আমরা ট্রেনে বাড়ি যাবো। তাই হলো। কিন্তু এই রেল ভ্রমনটা যে এতটা বেদনাদায়ক হবে তা তখনো জানতাম না। মুল ঘটনাটা শুরু করি। সকাল ৮টার ট্রেনে আমি আর জেরিন উঠে পরলাম। টিকেট আগের দিনই কিনে রেখেছিলাম। কয়েকটা স্টেশন যাবার পরেই একটা স্টেশনে আমাদের বগিটায় একটা পাগলি উঠলো। খুব নোংরা কাপড় চোপর। মাথার চুল অনেক কাল না ধোয়ার ফলে খয়েরি হয়ে গেছে। বয়স বোঝার উপায় নেই। অত্যান্ত রুগ্ন দেহ। চোখ কোঠরাগত, কিন্তু ভিষন উজ্জল চাহনি। সাধারণত পাগলদের চাহনি হয় ঘোলাটে। কিন্তু এই পাগলিটার চোখের পরিস্কার উজ্জ্বল চাহনিটাই আমাকে বেশি আকৃষ্ট করলো। আমি জেরিনকে বললাম “পাগলিটাকে দেখেছিস?” জেরিন বললো “পাগলি আবার দেখার কি আছে, জীবনে পাগলি দেখি নাই নাকি। অবশ্য পাগল হলেও একটা কথা ছিল।” বলেই জেরিন হাসতে শুরু করলো। কিন্তু আমার গম্ভির মুখের দিকে তাকিয়ে হাসি থামিয়ে বললো “দেখ, তোর মাথায় কোন উদ্ভট চিন্তা ঘুরতেছেনাতো, প্লিজ এখানে উল্টা পাল্টা কিছু করিসনা। ট্রেন ভর্তি লোক আছে।” জেরিন আমার পাগলামি কাজ কর্ম সম্পর্কএ ভালোই জানে। ও আমার হাত ধরে রাখলো, এমন একটা ভাব যেন আমি পালিয়ে যাচ্ছি। আমি বললাম “হাতটা ছাড়, আমি পাগলিটার সাথে কথা বললো।” জেরিন রাগ রাগ চোখে আমার দিকে তাকিয়ে নাটুকে ভঙ্গীতে বললো “তুইতো নিজেই একটা পাগলি, তোর আর একটা পাগলির সাথে কথা বলার দরকার কি, বরং আমার সাথেই কথা বল, তোর খারাপ মাথাটা ভালো হয়েও যেতে পারে” আমি ওর কথার ধরনেই হেসে ফেলে বললাম “একটু কথা বলেই চলে আসবো। পাগলি হয়ে পাগলির খবর না নিলে ব্যাপারটা ভালো দেখাবেনা।” যা হোক, জেরিনকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে উঠে এসে পাগলিটার সামনে বসলাম। বুঝতে পারছিলাম, কামরাটার বেশিরভাগ মানুষের চোখই তখন আমার উপর। বিস্কিটের প্যাকেট ছিল সাথে, পাগলিটাকে দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম “কোথায় যাবে তুমি?” পাগলিটা উত্তর না দিয়ে আমার দিকে কিছুক্ষন চুপচাপ তাকিয়ে থাকলো। আমিই আবার প্রশ্ন করলাম “বাড়ি কই তোমার?” এবার পাগলিটা আমাকে অবাক করে দিয়ে বললো “আমার সময় শেষ। একটা গল্প বলার ছিল। আজ পর্যন্ত কাউকে বলতে পারিনাই। আপনি শুনিবেন?” পাগলিটার বলার ধরনে আর চোখের দৃষ্টিতে এমন কিছু একটা ছিল যা আমাকে মোহিত করে ফেলেছিল। মুখ দিয়ে কোন কথাই বের হলো না। পাগলিটা বিস্কিটের প্যাকেট টা ছিড়ে বিস্কিট মুখে দিতে দিতে আবার বলতে শুরু করলো “আমি জানি আজকেই আমার শেষ দিন। আল্লাহর কাছে খুব করে বলছিলাম যেন একজনকে পাঠায় দেয় যাকে গল্পটা বলতে পারি, আল্লায় আপনাকে পাঠায় দিছে। গল্পটা মন দিয়ে শুনবেন, ছোট্ট গল্প। আপনার বেশী সময় নষ্ট হবেনা।” পাগলিটা বিস্কিটে একটা করে কামড় দিচ্ছে আর খুব আয়েস করে চিবুতে চিবুতে কথা বলতেছে। আমাকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে এবার সে তার গল্পটা বলা শুরু করলো “আমি পাগল ছাগল মানুষ। কখন কোথায় যাই, কই থাকি কোন ঠিক নাই। যখন কেউ খাইতে দেয় খাই, না হয় না খেয়েই থাকি। একবার এমন একটা জায়গায় গিয়ে পরলাম, সেখানে কয়দিন না খেয়ে ছিলাম জানিনা। কেউ খাইতেও দেয়না। সারাদিন একটা গাছের নিচে বসে থাকি। একদিন হঠাত এক রুটিওয়ালা সেই গাছের নিচ দিয়ে যাচ্ছিলো, আমাকে বললো যদি তার রুটির গাড়িটা আমি সামনের বাজার পর্যন্ত নিয়ে যেতে সাহায্য করি তাহলে আমাকে টাকা দিবে। একা নিয়ে যেতে তার কষ্ট হচ্ছে। আমি তার সাথে গাড়িটা ঠেলা শুরু করলাম। আমি রুটি গুলি দেখছিলাম। কি সুন্দর রুটি। নিশ্চই মাখন, দারুচিনি, দুধ দিয়ে বানানো। কি তাদের রঙ। কি তাদের আকার। কি তাদের ঘ্রান। মৌ মৌ করছে চারিদিক। রুটির উপর দিকে বাদাম, কিসমিস, মোরব্বা, তিল, তিসি ছোড়ানো। পৃথিবীতে এর চেয়ে সুস্বাদু কিছু নাই। আর এই রুটি ছাড়া পুরা পৃথিবীটাই মিথ্যা।

রুটিওয়ালাটা আমাকে একটা রুটি খেতে দেবেই। আশায় আশায় গাড়ি ঠেলতে থাকলাম। কখন যে গাড়ি বাজারে এসে পরলো বুঝতেই পারলাম না। রুটিওয়ালা আমাকে টাকা দিল। শুধুই টাকা দিলো আমাকে। একটা রুটি দিলোনা। অন্ততপক্ষে অর্ধেকটা রুটি কি দেয়া যেতনা…

আমি টাকা গুলি নিয়ে চলে আসলাম। পথে একটা ডোবায় টাকা গুলি ফেলে দিলাম। টাকা দিয়ে আমি কি করবো। আমার ঐ রুটি চাই। রুটি ছাড়া আর কিছুই চাইনা।

কতবার ঐ রুটিওয়ালার দেখা পেয়েছিলাম। কতবার তার গাড়িটা ঠেলে বাজার পর্যন্ত নিয়ে গেছি। পেয়েছি রুটির ঘ্রান। দেখেছি রুটির সৌন্দর্য। বিনিময়ে শুধু টাকাই পেয়েছি। একটা রুটি পাইনি। একটাওনা।

আজ এত বছর হয়ে গেল। আজ সেই রুটিওয়ালা কোথায় জানিনা। আমি কোথায় তাও জানি। শুধু জানি রুটি আমি খাইতে পারি নাই।”

পাগলিটার দু’গাল বেয়ে পানি পরছে। একটা স্টেশনে গাড়ি থামলো। পাগলিটাও নেমে পরলো। আমি বসেই থাকলাম। জেরিন উঠে এসে আমার হাত ধরে টেনে তুলতে তুলতে জিজ্ঞেস করলো “কি হয়েছে তোর? কাঁদতেছিস কেনো?” আমি অনেকক্ষন কোন কথা বলতে পারলাম না। সিটে গিয়ে বসলাম। পানি খেয়ে তারপর বললাম “পাগলিটা যেন আমার জীবনের গল্পটাই ওর জীবনের ছোট্ট একটা ঘটনা দিয়ে বলে গেল।

চাঁদের জোসনা পেয়ে চাঁদ না পাওয়ার দুঃখ ভোলা যায়, কিন্তু চরম তৃষ্ণার্ত মানুষ যখন পানি দেখেও পানি খেতে না পায় তখন সে কষ্ট অসহ্য অনন্ত।”

=

#তাছনীম


আমাদের উৎসাহিত করুনঃ




সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এই লেখাটি কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয় ।

লেখক সম্পর্কেঃ

বুনন সম্পর্কিত তথ্যঃ