অনুচর

খুব ব্যাস্ত সরকের ধারে মসজিদ, তার পাশে মাজার, অন্য পাশে স্কুল, আর মসজিদের সামনে কবর স্থান।
রংপুরের ইতিহাসিক স্থান মাহিগঞ্জ। এখন কার মুল রংপুর শহর থেকে ৫/৬ কি.মি. দূরে। মুল রংপুর শহর থেকে সাতমাথা হয়ে মাহিগঞ্জ বাজার যেতে রাস্তার বাম পাশেই আফানুল্লাহ মসজিদ, ভিতরের দিকে “শাহ জালাল বোখারীর” মাজার। খুব শান্তিময় একটা জায়গা, যারা এই মসজিদে বা মাজারে কখনো প্রবেশ করেন নি তাদেরকে ব্যাপারটা বোঝানো কঠিন হবে। এখানে সবসময় অসম্ভব রকম একটা প্রশান্তি সবসময় বিরাজ করে।
যাই হোক, এই মাজার ও মসজিদ নিয়ে অনেক রকম কাহিনী প্রচলিত আছে। এই অবিশ্বাসের যুগে হয়তো অনেকেই সেসব বিশ্বাস করেন না। তবুও “যা কিছু রটে কিছুনা কিছুতো বটে।”

গ্রীস্মের রাত। প্রচন্ড গরমে অতিষ্ঠ জীবকুল। এশার নামাজ শেষে অনেকেই মসজিদে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, তাই মুয়াজ্জিন সাহেব তার ব্যাক্তিগত কাজে মাহিগঞ্জ বাজারে গেলেন, কেননা তিনি জানেন অনেকেই দীর্ঘ রাত অবধি বিশ্রাম নিয়ে আরো কিছু নফল ইবাদত করে বাসায় যাবেন। মুয়াজ্জিন সাহেব মসজিদ সংলগ্ন একটি ঘরেই থাকেন, তাই তিনি গভীর রাতেও মসজিদে তালা দিতে পারবেন।
সেইদিন আশ্চর্য কোন কারনে সবাই খুব তাড়াতাড়ি চলে গেল মসজিদ ছেড়ে, যেহেতু মুয়াজ্জিন সাহেব নেই তাই মসজিদের বাহিরের দিকের লোহার গেটটি শুধু হুরকো তুলে দিয়ে গিয়েছিল কেউ, তালা দেয়া হয় নি।
মুয়াজ্জিন সাহেব ফিরলেন প্রায় মধ্যরাতে। ফিরে এসে দেখলেন দরজাতে বাইরে থেকে হুরকো দেয়া, তাই তিনি তালা দিতে গেলেন, কিন্তু তার কানে ম্রিদু তিলাওয়াতের ধ্বনি আসছিল। তিনি ভাবলেন কে এত রাতে তিলায়ত করছে দেখা উচিৎ, তাও আবার দরজার বাইরে থেকে হুরকো দিয়ে। দরজা খুলে মুয়াজ্জিন সাহেব ভিতরে গেলেন। মসজীদের চত্তর পেরিয়ে মাজার, আওয়াজ ওদিক থেকেই আসছে। তিনি এগিয়ে গেলেন। একটু পরেই তিনি দেখতে পেলেন সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত একজন মাজারের দিকে ফিরে তেলাওয়াত করছে, তিনি মুখটা দেখতে পাচ্ছেন না, তবে পেছন থেকে ধবধবে সাদা চুল দেখতে পাচ্ছেন। মুয়াজ্জিন সাহেব কিছুক্ষণ চিন্তা করেও পরিচিত কারো সাথে এই দৈহিক গরন মেলাতে পারলেন না।
অনেক ভাবনা তার মাথায় খেলে গেল। কিন্তু তিনি অতটা ভয় পেলেন না, আল্লাহর ঘর মসজিদে সবাই নিরাপদ। তিনি ম্রিদু পায়ে হেটে গেলেন সামনে, অত্যান্ত স্রুতি মুধুর ও শুদ্ধ তেলাওয়াত তাকে বিমোহিত করে ফেলছিলো। তিনি আরো কিছুক্ষন তেলাওয়াত শুনলেন। তারপর আস্তে ডাক দিলেন,
“এইযে শুনছেন?”
কোন উত্তর নেই, একমনে তেলাওয়াত করছে ঐ ব্যাক্তি। মুয়াজ্জিন সাহেব একটু গলা চরিয়ে ডাকলেন
“এইযে চাচা শুনছেন?”
এবার ঐ ব্যাক্তি মাথা ঘুরিয়ে তাকালেন, সৌম্য শ্রধ্যা জাগানো চেহারা, পুর্নিমার আলোয় যেন জলছে। মুয়াজ্জিন সাহেব প্রশ্ন করলেন
“আপনি এত রাতে এইখানে বসে আছেন? আপনার বাড়ি কোথায়? আগেতো কখনো দেখি নাই!”
তিনি উত্তর দিলেন
“বাড়ি আমার অনেক দূরে বেটা, তুমি আমাকে চিনবেনা।”
মুয়াজ্জিন সাহেব একটু অবাক হলেন ওনার কথার ধরনে, তিনি অনুমান করলেন যে এই লোক হয়তো বিহারী। তবে এটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার তার কাছে। তিনি গত ৫ বছর ধরে আফানুল্লাহ মসজিদে মুয়াজ্জিনের দায়িত্য পালন করছেন, অনেক ধরনের লোক আসে এই মাজারে। যদিও রাতে খুব একটা আসেনা কেউ। মুখে বললেন
“এত রাতে এখানে বসে তেলাওয়াত করছেন যে? দিনের বেলাতেওতো আসতে পারেন?”
ব্যাক্তিটি উত্তর দিলো
“দিনের বেলাতে বড্ড কোলাহোল আছে বেটা, তাই রাতে নিভৃতে হুজুরের কবরের শান্তির জন্যে একটু তেলাওয়াত করছি।”
মুয়াজ্জিন সাহেব বললেন
“কিন্তু আমিতো গেটে তালা দিয়ে ঘুমায় যাবো, আপনি কি সারারাত এখানে থাকবেন?”
ব্যাক্তিটি একটু মুচকি হেসে জবাব দিলেন
“যাও বেটা, তুমি দরোজা বন্দ করে ঘুমায় যাও, আমি তেলাওয়াত খতম করে চলে যাবো।”
মুয়াজ্জিন সাহেব বললেন
“কি করে যাবেন? গেটেতো তালা দেয়া থাকবে।”
তিনি আবারো হেসে অভয় দেয়ার সুরে বললেন
“চিন্তা নাই বেটা, আমার পরোয়া নাই, তুমি ঘুমাও।”
মুয়াজ্জিন সাহেব চলে আসলেন ওখান থেকে। গেটে তালা দিতে গিয়ে হঠাত তার মনে হলো লোকটি কেন বললো “আমার পরোয়া নাই”, এই কথার মানে কি? কিছুর কি ইংগিত আছে এতে? মাজার সম্পর্কিত কিছু জনশ্রুত গল্প মনে পরে গেল মুয়াজ্জিন সাহেবের। কিছুটা ভেবে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। তাকে জানতেই হবে কে এই লোক। তিনি আবার ফিরে গেলেন মাজারের কাছে, লোকটি আবার তিলাওয়াত করছে। অত্যান্ত মোহনীয় সে তিলাওয়াত। শুধু শুনতেই মন চায়। মুয়াজ্জিন সাহেব চুপচাপ অনেক্ষন তিলাওয়াত শুনলেন। কতক্ষণ শুনলেন সেটা তিনি নিজেও জানেন না। সুরা আর রহমান শেষ হলো। মুয়াজ্জিন সাহেব ডাকলেন
“চাচা মিয়া”
ব্যাক্তিটি সপ্রশ্ন দ্রিষ্টিতে ঘুরে তাকালেন।
মুয়াজ্জিন সাহেব বললেন
“আপনার সাথে একটু কথা বলতে চাই, যদি রাগ না করেন।”
তিনি হেসে উত্তর দিলেন
“রাগ করবো কেন বেটা, পুছো তুমি কি জানতে চাও।”
মুয়াজ্জিন সাহেব একটু ইতস্তত করে বললেন
“আমি আপনার পরিচয় জানতে চাই।”
তিনি কিছুক্ষণ মুয়াজ্জিন সাহেবের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন
“তোমাকে সাচ্চা আর সাহসী ছেলে বলেই মনে হয়, তুমি বসো, আমি বলছি আমার পরিচয়।”
মুয়াজ্জিন সাহেব ঐ ব্যাক্তির কিছুটা দূরে বসলেন। লোকটি বললো
“বেটা, আমার কথা না শেষ হওয়া আবধি তুমি কোন প্রশ্ন করবেনা, তাহলে আমি কিছুই বলবো না।”
মুয়াজ্জিন সাহেব বললেন
“জি, ঠিক আছে।”
লোকটি বলতে শুরু করলো
“আমার পিতাজি এই অঞ্চলেরি বাসিন্দা ছিলেন, তখন এই অঞ্চল ছিল ঘন অরন্য। মনুষ্য বসতি ছিল খুব কম। মনুষ্যহীন এই ঘন অরন্যে আমি হেসে খেলে বড় হয়েছি। একদিন এই অরন্য আলো করে এখানে এলেন হুজুর ‘শাহ জালাল বুখারী’। আমার পিতাজির সাথে তাহার সখ্যতা হলো। তাহার কাছে আমি আর কয়েকজন কুরআন পড়া শিখলাম, হাদিস শিখলাম, মাসায়েল শিখলাম। তারপর কত যুগ কেটে গেল। হুজুর চলে গেলেন। মনুষ্য বসতি বারতে লাগলো। আমরাও ছড়িয়ে পরলাম বিভিন্ন জায়গায়। কিন্তু হুজুরকে কি ভুলতে পারি। মাঝে মাঝে হুজুরকে ইয়াদ হলে চলে আসি। হুজুরের কবরের পাশে বসে তেলাওয়াত করি। আল্লাহর দরবারে হুজুরের জন্য দুয়া করি।”
দুরের কোন একটা মসজিদ থেকে ফজরের আজান ভেসে এলো। মুয়াজ্জিন সাহেব অবাক হয়ে শুনছিলেন এক ছাত্রের মুখে তার উস্তাদের কথা। কিন্তু তিনি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন
“আপনি তাহলে কে? শাহ জালাল বুখারি গত হয়েছেন প্রায় পাচ শত বছর আগে। আপনি তার ছাত্র ছিলেন, অথচ এতদিন বেচে আছেন!”
তিনি একটু হাসলেন, তারপর বললেন
“বেটা, তুমি এখনো বুঝতে পারোনি! ঠিক আছে, তুমি যাও, ফজরের আজানের ওয়াক্ত হয়েছে, আজান দাও।”
মুয়াজ্জিন সাহেব একরোখা প্রশ্ন করলেন
“কিন্তু আপনার পরিচয়তো জানা হলোনা, যদি সত্যিই আপনি তার ছাত্র হোন তাহলে আপনি কি করে এত কাল বেচে আছেন?”
তিনি এবার দৃঢ়তার সাথে বললেন
“আমি কখনো ঝুট বলিনা, তুমি যাও আজানের ওয়াক্ত চলে যাচ্ছে আজান দাও। ”
ঠিক তখনি কে যেন মসজিদের গেট থেকে মুয়াজ্জিন সাহেবের নাম ধরে ডাকলেন। মুয়াজ্জিন সাহেব তখন বললেন
“আপনি থাকেন, আমি গিয়ে আজান দেই, আর দেখি কে ডাকছে। ফজরের নামাজের পর বাকি কথা শুনবো।”
মুয়াজ্জিন সাহেবকে অনবরত কেউ ডেকে যাচ্ছেন, তাই তিনি তাড়াতাড়ি মসজিদ চত্তর পেরিয়ে গেটে আসলেন, দেখলেন ইমাম সাহেব গেটে দাঁড়িয়ে। ইমাম সাহেব প্রশ্ন করলেন
“কি ব্যাপার ভীতর থেকে তালা দিয়ে কি করছো তুমি?”
মুয়াজ্জিন সাহেব অনেক চিন্তা করেও মনে করতে পারলেন না যে কখন তিনি তালা দিয়েছেন। মুখে বললেন
“একজন মাজারে আছেন, তার সাথে কথা বলতেছিলাম”
ইমাম সাহেব অনেক অভিজ্ঞতা সম্পুন্ন লোক। তিনি বললেন
“কি বলো এইসব, চলো দেখি কে।”
কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে তারা মাজারে গিয়ে কাউকেই দেখলেন না। অনেক খোজা খুজি করেও কাউকেই পাওয়া গেল না। এবং এই ঘটনার সঠিক ব্যাখ্যাও কেউ দিতে পারলোনা। তবে অনেক বয়স্ক মুরুব্বিরা বললো যে “শাহ জালাল বুখারীর অনেক জ্বীন ছাত্র হয়তো ছিল। তাদের মধ্যেই হয়তো কেউ কেউ এখনো বেচে আছে। এবং মাঝে মাঝেই হয়তো তারা আসে ওস্তাদের কবর যিয়ারত করতে।”

(বি.দ্র. স্থান ও শাহ জালাল বুখারী বাস্তব। কিন্তু গল্পের অন্যান্য চরিত্র সম্পুর্ন কাল্পনিক।)

  • 2
    Shares

পাঠটিকে একটি রেটিং দিনঃ
খুব খারাপ, পাঠটিকে ১ রেটিং দিনখারাপ, পাঠটিকে ২ রেটিং দিনমোটামুটি, পাঠটিকে ৩ রেটিং দিনভাল, পাঠটিকে ৪ রেটিং দিনআসাধারন, পাঠটিকে ৫ রেটিং দিন (টি ভোট, গড়ে: এ ৫.০০)
Loading...

আমাদের উৎসাহিত করুনঃ




সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এই লেখাটি কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয় ।

লেখক সম্পর্কেঃ তাছনীম বিন আহসান

জন্ম ১৯৯৬ সালের এপ্রিল মাসে রংপুর জেলার মাহিগঞ্জ এ ! স্কুল জীবনেই বিভিন্ন শিশু-কিশোর পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হয়, সাহিত্য চর্চার অন্যতম অনুপ্রেরনা বড় বোন ও বড় ভাই ! উত্তর বঙ্গের অন্যতম বিদ্যাপিঠ বড় রংপুর কারামতিয়া আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষা জীবন শুরু , পরবর্তিতে উত্তর বঙ্গের আর এক শ্রেস্ট বিদ্যাপিঠ ধাপ সাতগারা বাইতুল মুকাররম মডেল কামিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল (এস এস সি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ! পরবর্তিতে বড় রংপুর কারামতিয়া আলিয়া মাদ্রাসা থেকে আলিম (এইচ এস সি) পাশ | বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় রসায়নে সম্মান শ্রেনীতে আধ্যায়নরত ! বর্তমানে " মাহিগঞ্জ সাহিত্য সংসদ " এ " পত্রিকা ও সাহিত্য সম্পাদক " এর দায়িত্ব পালনরত !
বুনন সম্পর্কিত তথ্যঃ 2018-01-27 06:31:37 তারিখ নিবন্ধিত হয়েছিলেন, এই পর্যন্ত প্রকাশিত লেখা সংখ্যা 24টি, মোট 33 পয়েন্ট সংগ্রহ করে [mycred_my_ranking user_id=157] অবস্থানে আছেন।
সংগঠন ও গোষ্ঠীঃ মাহিগঞ্জ সাহিত্য সংসদ

আপনার ভাল লাগতে পারে

avatar
  
smilegrinwinkmrgreenneutraltwistedarrowshockunamusedcooleviloopsrazzrollcryeeklolmadsadexclamationquestionideahmmbegwhewchucklesillyenvyshutmouth
Photo and Image Files
 
 
 
Audio and Video Files
 
 
 
Other File Types
 
 
 
1 আলোচনা
0 আলোচনায় উত্তরগুলো
1 অনুসরন করেছেন
 
সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়া
আলোচিত মতামত
1 মতামত প্রদানকারী
Boni সাম্প্রতিক মতামত প্রদানকারী
Boni
অতিথি
Boni
Offline

valoy laglo..