রাতের ট্রেনে একদিন

বাড়ি আমি যাবোই। অহেতুক জেদের কারনে জীবনে অনেকবার অনেক ঝামেলায় পরতে হয়েছে। তবুও আক্কেল হয়নি। তেমনি আজকেও বন্ধু ও ছোট আর বড় ভাইদের হাজার অনুরোধ সত্তেও বাড়ি যাবো বলে রেল স্টেশনে এসে বসে আছি।

আমি আকাশ। গাইবান্ধা সরকারি কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র। বাড়ি রংপুর। গাইবান্ধায় মেসে থাকি। পড়া শুনায় যেমনি হইনা কেন দুষ্টামি আর দস্যিপনায় অনন্য। হয়তো একারনেই বন্ধু আর বড় ছোট ভাইদের কাছে খুব প্রিয়।
আজ মেস থেকে বের হবার সময় রুম-মেট ছোট ভাঈটা বলছিলো
: আজকে যাইয়োনা ভাই, কালকেতো শুক্রবার, আমিও সুন্দরগঞ্জ যাবো বোনের বাসায়। একসাথে যাবো এখন।
:না রে, আমার বাড়ি যাইতে মন চাইছে আমি আজকেই যাবো।
পাশের রুম থেকে বড় ভাই এসে বললো
: কিরে, কই যাইস?
: বাড়ি যাবো ভাই।
: হ্যেট, আজকে সারা রাইত কার্ড খেলার ডিসিশন নেয়া হইছে, তুই ছাড়া মজা হবে না, আমার বেস্ট প্লেয়ার তুই। কালকে সকালে বাড়ি যাইস।
: না ভাই, আমার যাইতে মন চাইছে, আমি যাবোই।
মেস থেকে বের হওয়ার সময় গেটে বন্ধুর সাথে দেখা
: কিরে কই যাইস? আমিতো তোর কাছেই আসলাম
: বাড়ি যাবো দোস্ত
: বাড়ি যায়া কি করিস? আমার গার্লফ্রেন্ড কাল সকালে বগুড়া থাকি আসবে। তোর সাথে দেখা করতে চাইছে।
: না দোস্ত, আমি বাড়ি যাবো। পরে কোন একদিন দেখা করবোনে ওর সাথে।
: ক্যান, তুই বাড়ি যায়া কি করবি? কে আছে তোর বাড়িতে? কার জন্যে বাড়ি যাইতে চাইস?
: কেউ নাই এইটা ঠিক, কিন্তু আমার যাইতে ইচ্ছা করতেছে আমি যাবোই।

আমি এমনি জেদি। যেটা একবার বলে ফেলি সেটা করি। পৃথিবীতে আপন বলতে তেমন কেউ নেই আমার। শুধু বড় বোন একটা, সে থাকে সুদুর চট্টগ্রামে। রংপুরে বাড়িটায় ৫টা ফ্লাট। ৪টা ভাড়া দেয়া আছে। আর একটায় আমি থাকি। তাই বাসায় যাওয়ার তেমন কোন টান আমার নেই, তবুও যেতে ইচ্ছে করেছে যেহেতু, আমি যাবোই।

ধুর, ট্রেনটা আসতেছেনা কেন। যদিও যারা ট্রেনে যাতায়াত করে তারা জানবে এটা খুব সাভাবিক ব্যাপার। আমিও জানি, কিন্তু তবুও বিরক্তি লাগতেছে। আরো ২ ঘন্টা আগে ট্রেন আসার কথা ছিল। এখন ৪টা বাজে। অপেক্ষা বড় কঠিন।
হঠাত আকাশ কালো করে ভিষন হম্বি তম্বি ঝড় সহ মুষল ধারে বৃষ্টি শুরু হলো। যাক, ভালোই হলো, বৃষ্টি আর ঝর দেখলেই আমার মনটা কেমন খুশি খুশি হয়ে উঠে। মাথায় একটা কবিতা ঘুরপাক খাওয়া শুরু করলো। ফোন বের করে লেখা শুরু করলাম;
“আমার প্রিয়া ভীষণ রাগী
আর মনে অনেক জল,
আগুন চোখে ভষ্ব করে
বাড়িয়ে দিয়ে আদুরে কপোল।”
নিজের কবিতা পড়ে নিজেরি হাসি পায়। কি যে সব হিজিবিজি লিখি।

যাহোক, ট্রেন আসলো। ২টার ট্রেন, এখন বাজে বিকেল ৫:২৪। কি আর করা, উঠলাম ট্রেনে। ট্রেন চলা শুরু করলো একটু পর। তখন বুঝিনি যে এমন একটা অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হবে।

নলডাংগা স্টেশন পার হবার কিছুক্ষণ পরেই ট্রেন খুব জোরে ঝাকি খেতে খেতে থামতে শুরু করলো। আমি ফোনে গেম খেলছিলাম, ফোনটা হাত থেকে পরে গেল। ট্রেন থামার পর বাইরে উকি দিয়ে দেখতে চেষ্টা করলাম কি হয়েছে। বাহিরে তখন ঝিরঝিরে বৃষ্টি পরছে। ট্রেন থেকে নেমে এগিয়ে গিয়ে যা জানতে পারলাম তা হলো এইযে; ঝড়ে ৫/৬টা গাছ লাইনের উপর পরেছে, গাছ না সরানো পর্যন্ত ট্রেন এগুবেনা।
ধ্যাত-তেরি। না আসলেই ভালো ছিল। আশেপাশে কোন দোকান পাট নেই। দু-একটা বাড়ি তাও অনেক দূরে। কি আর করি, পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করে একটা সিগারেট ধরিয়ে ট্রেনের পাশ দিয়ে হাটতে লাগলাম। হাটতে হাটতে একেবারে শেষ বগিটার কাছে আসলাম। বগিটায় উঠবো কিনা এক মুহুর্ত ভেবে উঠেই পরলাম। পুরা বগিটাই ফাকা। রাতের ট্রেনে এরকম ফাকা বগিতে থাকা বিপদজনক। কিন্তু আমার আর কি বিপদ হবে, আমিতো নিজেই ভয়ানক এক বিপদ। বগির শেষ মাথায় একটা লাইট জলছে। লাইটের নিচে একটা বেঞ্চে শুয়ে কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনতে লাগালম।
৮:০৯ বাজে। গান শুনতে ভালোই লাগছিলো। কিন্তু ফোনে ব্যাটারি শেষের পথে। লো সিগনাল দিয়েছে দুইবার। ফোন টা পকেটে রেখে আর একটা সিগারেট ধরিয়ে নিজেই গান গাইতে লাগলাম।
সিগারেট টা প্রায় শেষের পথে এমন সময় একটা ছায়া পরলো আমার উপর। চমকে তাকিয়ে দেখি দুইজন মহিলা। আমার সামনের সিটটাতে বসলো ওরা।
ভাবলাম উঠে গিয়ে অন্য সিটে বসি, কিন্তু ততক্ষনে আমি একজনের মুখ দেখে অবাক হয়ে গেছি। মেয়েটার অসম্ভব সুন্দর সরল মুখ, সচ্ছ টানা টানা চোখ, টোল পরা মিষ্টি হাসি দেখে আর উঠে যেতে ইচ্ছে করলনা। আমি মেয়েটার মুখের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে আছি, মেয়েটিও হাসি মাখা মুখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

কিন্তু চমক ভাংলো পাশের কুতসিত বুড়িটার কথায়। অসম্ভব বাজখাঁই গলায় কুতকুতে চোখের ঝুলে পরা ঠোটের বুড়িটা বললো
“এ ছাওয়া তুই উঠি যায়া অন্যটে বইসেক”
ভিষন রাগ লাগলেও উঠে আসলাম। অন্ধকারে এসে একটা সিটে বসলাম। মাথাটা গরম হয়ে আছে। সিগারেটের প্যাকেটটা বের করলাম, ৯টা সিগারেট আছে, অনেক। একটা ধরিয়ে টানতে লাগলাম আর মেয়েটার মিষ্টি মুখটা ভাবতে লাগলাম । যখন সিগারেট টা শেষ প্রায় তখন অসম্ভব শিতল কিন্তু মায়াবী কন্ঠে চমক ভাংলো
“কি করেন?”
পাশে তাকিয়ে অন্ধকারে মেয়েটার অবয়ব দেখে বুকের ভিতরটা ঢিপঢিপ শুরু করলো। কোন রকমে উত্তর দিলাম
“কিছুনা, এমনেই”
মেয়েটে আরো মায়াবি অনুরোধের সুরে বললো
“আপনার পাশে বসি?”
আমিতো যেন হাতে চাঁদ পেলাম, তাড়াতাড়ি বললাম
“হুম,হুম, বসেন”
মেয়েটে আমার প্রায় শরীর ঘেষে বসলো। মেয়েটার শরীরের মিষ্টি ঘ্রাণ পাচ্ছিলাম আমি। মেয়েটা বললো
“আপনি রংপুর যাইতেছেন?”
আমি কিছুটা অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম
“আপনি কি করে জানলেন? ”
মেয়েটা মৃদু শব্দ করে হেসে বললো
“অনুমান করে বলছি। কি নাম আপনের?”
আমি বললাম
“আমার নাম আকাশ, আপনার নাম?”
মেয়েটা বললো
“সবাই কাকন ডাকে, ভালো নাম শিউলি মালা”
এভাবেই কথার শুরু। অনেক কথা হলো। এই যেমন সাথের বুড়িটা কাকনের দাদি, তারা দুইজন কাকনের চাচার বাড়িতে যাচ্ছে কাকনের বিয়ের জন্য ছেলে পক্ষ কাকনকে দেখতে চাচ্ছে সে জন্য। কিন্তু কাকন বিয়েতে রাজি না। একরকম জোর করেই নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাকে। কাকন আরো বললো তার ভালো লাগার কথা, তার খারাপ লাগার কথা। এতসব কথার মাঝে সে একেবারে আমার গায়ের সাথে গা লাগিয়ে বসেছে, কখন যে আমার হাত জরিয়ে ধরেছে আমি খেয়ালই করিনি। হঠাত সব নষ্ট করে দিল সেই বিশ্রী বুড়িটা, কখন যেন সে উঠে এসেছে। অকথ্য ভাষায় গালাগাল দিয়ে কাকনের হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেল বুড়িটা। মেজাজটা আরো বিগড়ে গেল। কিন্তু আমার কিছু করার নেই। আবার সিগারেটের প্যাকাটটা বের করলাম, আর চারটা সিগারেট আছে। আরো একটা সিগারেট ধরালাম। সিগারেট শেষ করে বসে আছি কিছুক্ষণ। কাকন আবার আসলো।
“দাদি ঘুমায় পরছে, বেশিক্ষণ জাগি থাকতে পারেনা।” বলেই আমার পাশে বসলো কাকন।
আবার আমাদের গল্প শুরু হলো। কাকনের কাউকে বলতে না পারা হাজারো কথা বললো আমাকে। এত কথার মাঝে আমি প্রশ্ন করলাম
“তুমি এত কথা আমাকে কেন বলছো?”
কাকন ওর খোপা করা চুল খুলে চুলের কাটা টা আমার হাতে দিয়ে আমার হাত ভিষন শক্ত করে ধরে বললো
“জানিনা কেন বলতেছি, কিন্তু প্রথম দেখাতেই তোমাকে ক্যান জানি খুব আপন মনে হইছে, হয়তো দুইদিন পরেই বিয়া হবে আমার, অন্যের ঘরে থাকবো,নিজের কিছুই থাকবেনা। কিন্তু তোমাকে কথা গুলা বলে শান্তি পাইলাম অনেক। নিজের মত একটু সময় কাটাইলাম তোমার সাথে…”
এমন সময় আবার সেই বুড়ি। আগের মতই কাকন কে নিয়ে গেল। আমার মনে হচ্ছিল বুড়িটার গলাটা টিপে ধরি। এদিকে ট্রেন ছাড়ার কোন নাম নেই। বাহিরে হালকা বাতাস আর টিপটিপ বৃষ্টি। আমি আবার একটা সিগারেট ধরালাম। দুজন বাদামওয়ালা উঠলো বগিতে। তারা গিয়ে লাইটের নিচেই বসলো। আর এমন সব বিষয়ে কথা বলা শুরু করলো যে আমার মনে হচ্ছিল কাকনদের ওরা দেখেই নি। কি মনে হলো নিজেও জানিনা। আমি উঠে গেলাম লাইটের নিচে। গিয়েতো আমি অবাক। কাকনরা নেই ওখানে। বাদামওয়ালাদের প্রশ্ন করলাম, ওরা কিছু বলতে পারলো না। আমি বগি থেকে নেমে গেলাম।
একটার পর একটা বগি খুজতে লাগলাম। কিন্তু বৃথাই। কাকনদের আর খুজে পেলাম না। একটা বগির গেটে পা ঝুলিয়ে হতাশ ভাবে বসে সিগারেটের প্যাকাটটা বের করে অবাক হয়ে গেলাম। ৮টা সিগারেট আছে। কিন্তু… ধুর ভুল দেখছিলাম হয়তো তখন। সিগারেট টানতে লাগলাম। সামনে দিয়ে একটা লোক যাচ্ছিলো তাকে প্রশ্ন করলাম
“ভাই, এতক্ষণ থেকে দাঁড়ায় আছি, লাইন থেকে গাছ সরানো কি হয় নাই?”
লোকটা বিরক্ত স্বরে বললো
“কতক্ষণ আর হইলো, কেবল ১৫ মিনীট দাড়াইছেন, আরো একঘণ্টা লাগবে।”
লোকটা কি মজা নিলো নাকি আমার সাথে, মনে মনে ভাবতে ভাবতে মোবাইল টা বের করে ঘড়ি দেখে এবার সত্যি অবাক হলাম আমি, ৮:৩৩ বাজে। এটা কি করে সম্ভব। তাহলে আমি কি স্বপ্ন দেখেছি এতক্ষণ? অনেকটা ঘোরের ভিতর হাজারটা ভাবনা নিয়ে অনেক রাতে রংপুর নামলাম। পরের ৫ দিন ভিষন জ্বরে ভুগলাম। ৫ দিন পর কিছুটা সুস্থ হলে ৩ জন খুব কাছের বন্ধুকে ট্রেনের সব ঘটনা খুলে বললাম। তারা বললো হয় আমি ঘুমিয়ে পরে স্বপ্ন দেখেছি নাহয় জ্বরের ঘোরে হ্যালুসিনেশনে ভুলভাল দেখেছি।
কিন্তু ঘটনা এখানেই শেষ নয়। তার সেই খোপার কাটাটা যে আমার কাছে আছে সেটা আমি আবিষ্কার করলাম পরে আবার গাইবান্ধা যাওয়ার জন্য ব্যাগ গোছাতে গিয়ে। তাই গাইবান্ধা গিয়ে বামন ডাঙা আর নলডাংগার যত পরিচিত মানুষ আছে সবাইকেই কাকনের নাম বললাম, প্রশ্ন করলাম এই নামে কাউকে চেনে কিনা। একজন পার্টটাইম সাংবাদিক বন্ধু বললো নামটা তার চেনা চেনা লাগছে। সে পরে খোজ নিয়ে জানাতে চাইলো। দুই তিন দিন পর সে আমাকে একটা পেপার কাটিং দিলো। পেপার কাটিংয়ে কাকনের ছবি। আমি অবাক হয়ে সংবাদ টুকু পড়তে লাগলাম
“নলডাংগায় ট্রেনে কাটা পরে দুজনের মৃত্যু’
আমাদের নল্ডাংগা প্রতিনিধি জানান, গতকাল রাতে গাইবান্ধা থেকে রংপুর গামি একটি ট্রেনে শিউলি মালা নামের এক যুবতি ও তার দাদি কাটা পরে। পরদিন সকালে এলাকাবাসী তাদের লাশ খুজে পায়। তাদের পারিবারিক সুত্র থেকে জানা যায় রাতের ট্রেনে তারা তাদের কোন আত্বঈয়ের বাড়িতে যাচ্ছিল। কিন্তু কিভাবে তারা ট্রেনের নিচে কাটা পরলো তা জানা যায় নি।'”

অনেক কিন্তু, অনেক প্রশ্ন। তবুও রোজ সেই খোপার কাটাটা হাতে নিয়ে কাকনের মিষ্টি মুখটা মনে করি।

#তাছনীম

বি.দ্র. সমস্ত চরিত্র কাল্পনিক। বাস্তবের সাথে মিল থাকলে সেটা সম্পুর্ন কাকতালীয়।


আমাদের উৎসাহিত করুনঃ




সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এই লেখাটি কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয় ।

লেখক সম্পর্কেঃ

বুনন সম্পর্কিত তথ্যঃ