পরীক্ষা ভীতি

প্রথমদিন স্কুল থেকে বাসায় ফেরার সময় সাঈদ তার আম্মুকে জড়িয়ে ধরে চুমো খায়। আনন্দে চিৎকার করে বলে উঠে, “আম্মু, আমি রোজ স্কুলে পড়তে আসবো। কী সুন্দর স্কুল!”

ছেলের মুখ থেকে বের হওয়া কথাগুলো মায়ের কানে মুগ্ধতার পরশ বুলিয়ে দিলো। মা একজন আদর্শ দর্শক-শ্রোতার মতো ছেলের কথাগুলো মনযোগ দিয়ে শুনলেন।
আজ সকালেই ছেলেকে ক্লাশে বসিয়ে দিয়ে বের হবার সময় সাঈদের সে কী কান্না! কোনভাবেই মাকে ছাড়বে না ও। শেষে অনেক বুঝিয়ে-শুনিয়েও যখন কোন কাজের কাজটি হচ্ছিল না। তখন কী আর করা! শ্রেণিশিক্ষকের কথামতো ক্লাশের বাইরে ওর পাশেই দাঁড়িয়ে থাকতে হলো মাকে। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর যখন বুঝতে পারলেন এই মুহূর্তে চলে গেলে আর কোন সমস্যা হবে না। তখন নীরবে সেখান থেকে সরে গেলেন। সেদিকে সাঈদের কোন খেয়ালই ছিল না। ওদের আপু (ম্যাডাম) ওদের মজার মজার গল্প বলতে থাকেন। আর ওরা এরকম হাসির গল্পে মুগ্ধ হয়ে ক্লাশ করতে লাগলো।

ম্যাডামের বাঘের গল্প বলবার সময় ওরা দেয়ালে আঁকা বাঘের ছবির সাথে মিলিয়ে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আবার যখন হাতির   কিংবা শিয়ালের গল্প বলছিলেন তখন ওরা দেয়ালে আঁকা ছবির সাথে সব মিলিয়ে নিচ্ছিলো। মাত্র অল্পসময়ের মধ্যে ম্যাডাম ওদের খুব আপন করে নিলেন। কচিমনে ওরা জগৎ সংসারের সব কিছু ভুলে গিয়ে শুধু ম্যাডামের গল্পের মধ্যে হারিয়ে গেলো।

আসলে শিশুমন এমনই! ওদের যারাই একটু অকৃত্রিমভাবে ভালবাসা দেয় অমনি ওরা তাদের আপনজন ভাবতে শুরু করে। আপন-পরের কোন ব্যবধান খুঁজে না ওদের নিষ্পাপ মন।
এই সব ভাবতে ভাবতে মা উৎস্যুক হয়ে প্রশ্ন করেন,
– আচ্ছা বাবা, স্কুল কী তোমার বেশ পছন্দ হয়েছে?
সাঈদ হাসিমাখা মুখে বলল,
– পছন্দ হয়েছে মানে! খু-উ-ব পছন্দ হয়েছে। জানো মা, আমাদের ম্যাডামটা না, খুব ভালো। আজ আমাদেরকে খুব সুন্দর সুন্দর অনেকগুলো গল্প বলেছেন। তোমার চেয়ে সুন্দর গল্প বলেছেন। তুমি তো প্রতিদিন একই রকম গল্প বলো। জানো, ম্যাডাম বলেছেন, এভাবে প্রতিদিন নতুন নতুন মজার গল্প শোনাবেন।

খোকার কাছ থেকে ওর ম্যাডামের এমন প্রশংসার কথা শুনে মা মনে মনে হাসেন। আর ভাবেন, আমার ছেলে তার ম্যাডামকে পছন্দ করেছে। এটা একটা ভাল দিক। শ্রেণিশিক্ষককে পছন্দ করলেই ভাল। নইলে পড়াশুনায়   ভালভাবে টিকিয়ে রাখা কষ্টকর হয়ে যায়।
এরপর মা আবার বললেন,
– তোমার আর কী কী ভাল লেগেছে, বাবা?
সাঈদ হাসোউজ্জ্বল হয়ে বলল,
– মা, আমার ক্লাশ রুমটা দেখতে খুব সুন্দর। দেয়ালে আমাদের বইয়ের মতো অনেক সুন্দর সুন্দর ছবি আছে। জানো মা, হাতির ছবিটা দেখে মনে হয়েছে অবিকল একটা হাতি ধরে এনে দেয়ালে বসিয়ে দিয়েছে। সিংহ আর বাঘ দেখে তো আমার খুব ভয় লেগেছে।
সাঈদের মা অবাক হয়ে বললেন,
– কেন? তাতে কী হয়েছে?
সাঈদ কৌতুহলী ভঙ্গিতে বলল,
– আরে শোন, এমনভাবে বাঘ আর সিংহকে দেয়ালে আঁকা হয়েছে। মনে হয় যেকোন মুহূর্তে দেয়াল থেকে বেরিয়ে এসে আমাদেরকে ধরে ফেলবে। ভাগ্য ভাল আমার সিটটা সেখানে পড়েনি। নইলে—–।
মা মিষ্টি হেসে বললেন,
– শোন বোকা, ঐটা তো দেয়ালে আঁকা বাঘ-সিংহের ছবি মাত্র। সেগুলোর পাশে বসলে কিছু হয় না। তারা কারো ক্ষতি করতে পারে না। যেমন তোমাদের বইয়ের ছবি কী কখনও তোমার সাথে কথা বলে?
– না মা, তা তো ঠিক। সাঈদ বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়ে।
শেষে ওর মা বললেন,
– ঠিক আছে বাবা, এখন চল জামা-কাপড় ছেড়ে দিয়ে হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হতে হবে।

এভাবে দিন যায়, সপ্তাহ যায়, মাসও যায়। দিনে দিনে স্কুলে যাবার প্রতি সাঈদের আগ্রহ আরো বাড়তে থাকে। সন্ধ্যায় পড়ার টেবিলে মা ওকে নিয়ে বসেন। আর ওর কার্যকলাপ দেখে মা হাসেন। মা যখন স্কুলের ডায়রি বের করতে বলেন তখন ও মাকে বলে ওঠে,
– ডায়রি লাগবে না। আমি জানি, মুনা ম্যাডাম কী পড়া দিয়েছেন।
– তাহলে বলো ম্যাডাম কী পড়া দিয়েছেন?
– ম্যাডাম বলেছেন, অ থেকে ঈ দেখে দেখে লিখা শিখতে।
মা এই সুযোগে ডায়রিটা চেক করে নিতে নিতে বললেন,
– আর অংক ম্যাডাম কী পড়া দিয়েছেন?
– অংক ম্যাডাম বলেছেন ১ থেকে ১০ পর্যন্ত বলা শিখতে।
মা আবার বললেন,
– তাহলে ইংরেজির ম্যাডাম কী পড়া দিয়েছেন?
সাঈদ কিছুক্ষণ গম্ভীর থাকার পর বলল,
– ইংরেজি ম্যাডাম বলেছেন, সি.ডব্লিউ খাতায় ম্যাডাম যেভাবে অ থেকে ঈ পর্যন্ত লিখে দিয়েছেন তা ভালভাবে শিখে এইচ ড.ডব্লিউ করতে।
ছেলের সবগুলো কথাই ডায়রির সাথে মিলে যায়। মা ওকে কোলে তুলে চুমো খেয়ে আদর করেন।
তারপর বলেন,
– তুই আমার কলিজার টুকরা। আল্লাহ তোকে অনেক বড় করবেন। সাঈদ মায়ের সব কথার মানে বুঝে না। মানে খুঁজেও না। শুধু আনমনে মায়ের মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে হাসে।

এভাবে ঘন্টা খানেকের মধ্যে ওর পরেরদিনের পড়া রেড়ি হয়ে যায়। এদিকে পড়া শেষ হতে না হতেই অফিস থেকে বাসায় ফিরে আসেন সাঈদের বাবা। সারাদিন অফিসে কাজ করার পর বাসায় এসে ঘরে ডান পা-টা রাখতেই সাঈদ দৌড়ে বাবার সামনে এসে গলা জড়িয়ে ধরে একটা, দুইটা এভাবে পাঁচটা চুমো খায়।
এরপর কোমল গলায় বলল,
– আমার জন্য কী এনেছো, বাবা ? আমার আইসক্রিম কোথায়? জুস আনোনি কেন? রঙপেন্সিল আনোনি কেন? তুমি একটা পঁচা বাবা!
এসব বলে অভিমান করে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে রাখে ও। এই সুযোগে বাবা পিছনের হাতটা সামনে এনে সব দেখিয়ে বলেন,
– এই নাও, তোমার আইসক্রিম, জুস। আর এই নাও তোমার রঙপেন্সিল।
সবকিছু পেয়ে সাঈদ আবার বাবার দিকে তাকিয়ে হাসে। বাবার ডান গালে চুমো খেয়ে বলল,
– না, তুমি পঁচা না; সবচেয়ে ভাল বাবা।
ওর কথায় বাবা সুখের হাসি হাসেন। সেই হাসিতে শরীক হলেন মা। তিনি এগিয়ে এসে স্বামীর হাত থেকে বাজারের ব্যাগটা নিয়ে বলতে থাকেন,
– এই জানো, আমাদের সাঈদ না আজ আগামীকালকের সব পড়া শেষ করেছে। এইচ.ডব্লিউ-টাও শেষ করেছে।

ছেলের এমন সংবাদে খুশি হলেন তিনি। তারপর ফ্রেশ হয়ে ছেলেকে নিয়ে বসে পড়েন টিভি সেটের সামনে। সারাদিনে বাবাকে কাছে পেয়ে সাঈদের সে কী উল্লাস! একবার গালে চুমো খায়। আবার পিঠ দিয়ে উঠে কাঁধে। আবার খাটের উপর লাফিয়ে পড়ে। এ সময় মায়ের কাছে ছুটে না। এরপর বাবা ওকে কোলে নিয়ে বললেন,
– এবার বলো, তোমার স্কুল কেমন লাগে?
সাঈদ দুষ্টুমিতে ব্যস্ত থাকতে থাকতে বলে,
– ভাল।
সাঈদের বাবা আবার বললেন,
– তোমার স্যার-ম্যাডামরা কেমন?
সাঈদ হেসে বলল,
– খুব ভাল। আমাকে খুব আদর করেন। বাংলা ম্যাডাম সবচেয়ে ভাল। পড়া পারলে বেশি আদর করেন। মাঝে মধ্যে আমাদের চকলেট খেতে দেন। মজার মজার গল্পও বলেছেন।
স্কুল আর স্কুলের ম্যাডামদের সম্পর্কে এইটুকু  ছেলের এমন উচ্চ প্রশংসা করতে দেখে বাবা-মায়ের মনে পরিতৃপ্তি জাগে।

এভাবে দিন যায়, সপ্তাহ আসে। সপ্তাহ যায় আবার মাস আসে। ঘনিয়ে আসে ওদের প্রথম সাময়িক পরীক্ষা। একদিন বাংলা বিষয়ের ম্যাডাম বলেন,
– খোকারা, আগামীকাল তোমাদের মৌখিক পরীক্ষা শুরু হবে।

ম্যাডামের পরীক্ষা কথাটা শোনে সাঈদের মনে এক ধরনের আতঙ্কের জন্ম নিলো। সে ভাবতে লাগলো- পরীক্ষা আবার কী? এটা কী করে? খায় নাকি মাথায় দেয়? নাকি কান ধরে উঠ-বস করায়। বোধহয় মারে। ওরে বাপরে! আমি কালকে স্কুলেই আসবো না। ইত্যাদি ভাবতে থাকে ও।
নির্দিষ্ট সময় পর স্কুল ছুটি হয়ে গেলে ও মায়ের সাথে বাসায় ফিরে আসে। প্রতিদিনের মতো সাঈদের মন আজ স্বাভাবিক নেই। ওকে দেখেই মা তা বুঝতে পারেন। এরপর কাছে এসে চুমো খেয়ে বলেন,
– কী ব্যাপার! আজ তোমার কী হয়েছে, বাবা? মন খারাপ কেন?
সাঈদ মায়ের দিকে বিষন্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
– বাংলা ম্যাডাম বলেছেন, আগামীকাল আমাদের মৌখিক পরীক্ষা নেবেন। মা, পরীক্ষা কী?
মা মৃদু হেসে বললেন,
– আরে বাপ, ওসব নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। তুমি পরীক্ষায় ভাল করবে। আমি তোমাকে সব শিখিয়ে দেবো।

মায়ের এমন আশ্বাসে কিছুটা স্বস্তি পায় ওর মন। রাতে পড়তে বসলে মা ওকে একে একে সব পড়া বুঝিয়ে দেন। এবং তার কাছ থেকে মুখে মুখে আদায় করেন। ও সব সুন্দর করে উত্তর করে।

পরদিন স্কুলে আসে সাঈদ। মায়ের সান্ত্বনার দেবার পরও বুকের ভিতর থেকে পরীক্ষার ভয় শতভাগ উধাও হয়নি এখনও। ঘন্টা বাজার সাথে সাথে ক্লাশে আসেন বাংলা ম্যাডাম। এসেই ম্যাডাম একে একে সবাইকে একান্তে তার কাছে ডাকেন। এবং কিছু প্রশ্ন করেন। এবার সাঈদের পালা। সাঈদ ম্যাডামের সামনে ভীতু ভীতু মনে বসে। ম্যাডাম তাকে কিছু প্রশ্ন করেন। সাঈদ সবগুলো প্রশ্নেরই উত্তর দিতে পারে। শেষে ম্যাডাম সাঈদের তুলতুলে গালে চুমো খেয়ে বলেন,
– ধন্যবাদ, সাঈদ। তুমি এখন গিয়ে তোমার সীটে বস্।

সাঈদ সিটে এসে মন খারাপ করে বসে থাকে। ওর মনে ঘুরেফিরে একটাই প্রশ্ন-কখন পরীক্ষা আসবে। আর হ্যাঁ, পরীক্ষা আসলে কী হবে? আমাদের সবাইকে কি মেরে ফেলবে! বাংলা বিষয়ের ঘন্টা শেষ হলে ক্লাসে আসেন গণিত বিষয়ের ম্যাডাম। এ সময় সাঈদকে বেশ চিন্তিত থাকতে দেখে ম্যাডাম বললেন,
– তোমার কী হয়েছে, সাঈদ?
সাঈদ আমতাআমতা করে বলল,
– না ম্যাডাম, কিছু না।
ম্যাডাম আবার অংক কষতে থাকেন। ক্লাশ শেষে বিরতির ঘন্টা বাজে। সবাই খেলার জন্য মাঠের দিকে চলে যায়। সাঈদ মাঠে নামে না। স্কুলের সিঁড়ির পাশে বসে বসে কী যেন ভাবছে! এদিকে বাংলা বিষয়ের ম্যাডাম তখন সেখান দিয়ে মাঠের দিকে যাচ্ছিলেন। ওকে এভাবে বসে থাকতে দেখে এগিয়ে এসে বললেন,
– কী সাঈদ, এভাবে মন খারাপ করে বসে আছো কেন? সবাই তো মাঠে নেমে গেছে। যাও, মাঠে খেলতে যাও।

সাঈদ ম্যাডামের দিকে তাকিয়ে বলল,
– ম্যাডাম, আমার ভাল লাগছে না, তা-ই।
ম্যাডাম ওর আরো কাছে এসে বললেন,
– না, তুমি আমার কাছ থেকে কিছু লুকাচ্ছো।  তোমাকে কেউ কী বকা দিয়েছেন?
সাঈদ বলল,
– না ম্যাডাম, কেউ আমাকে বকা দেননি।
– তবে এভাবে বসে আছ যে!

এবার সাঈদ ম্যাডামের দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল ,
– ম্যাডাম, পরীক্ষা কখন হবে? আমার খুব ভয় করছে।
ম্যাডাম বললেন,
– কোন পরীক্ষার কথা বলছো?
সাঈদ বলল,
– ম্যাডাম, গতকাল আপনি বললেন না আমাদের আজকে পরীক্ষা হবে।
ম্যাডাম সাঈদের দিকে মিষ্টি হেসে ওকে কোলে তুলে নিয়ে বললেন,
– দূর বোকা, পরীক্ষা তো হয়ে গেছে।
সাঈদ ম্যাডামের দিকে উৎস্যুক হয়ে বলল,
– কখন, ম্যাডাম?
ম্যাডাম হাসিমাখা মুখে বললেন,
– আমি যে তোমাদের এক এক করে আমার কাছে ডেকে প্রশ্ন করেছিলাম সেটাই ছিল তোমাদের মৌখিক পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় তো তুমি-ই সবার চেয়ে বেশি নম্বর পেয়েছো।

ম্যাডামের কথা শোনে সাঈদ লজ্জায় মুখ লুকাতে চেষ্টা করে। ম্যাডাম সাঈদের দিকে তাকিয়ে ওর লজ্জামাখা গালে আবার চুমো খেয়ে আশীর্বাদ করেন।


আমাদের উৎসাহিত করুনঃ




সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এই লেখাটি কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয় ।

লেখক সম্পর্কেঃ

বুনন সম্পর্কিত তথ্যঃ