রহস্যময় ঢিবি

এই গ্রামের সব লোক চাষাবাদ করে খায়। সবাই দরিদ্র কৃষক। কেউ কেউ পাহাড়ের কাঠ কেটে জীবন চালায়। এই গ্রামের একজন দরিদ্র কৃষকের নাম দুলাল। গ্রামের একপাশে এক পুরানো বাড়িতে তার বাস।

গতবৎসর অজানা এক রোগে তার স্ত্রী মারা যায়, এর আগের বছর তার দইজন ছেলে একই রোগে মারা যায়। এই পুরানো বাড়িতে দুলাল এখন একাই থাকে। দুলালের বাড়ির পিছনে ছিল গোয়াল ঘর। গোয়ালে পাঁচটা গরু ছিল। একটা গাভী ছিল, গাভীটা দুধ দিত, গাভীটার একটা বাচ্চাও ছিল। বাচ্চা গরুটা সহ মোট পাঁচটা গরু ছিল। বাড়ির উঠোনের ওপারে ছিল একটা কূপ। এ বাড়িতে কবে থেকে দুলালরা বসবাস শুরু করেছে, তা সে জানে না। দেখে মনে হয় বাড়ীটা অনেক প্রাচীন। দেয়ালে কিছু কারুকার্য আছে, পাশে শায়িত অবস্থায় একটা বুদ্ধ মূর্তি আছে। বুদ্ধমূর্তির পায়ের কাছে কয়েকটা কাঁসার থালা। থালাগুলো পাকা করে ফ্লোরের সাথে লাগানো। এ থেকে বুঝা যায় বুদ্ধ ধর্মাবলম্বী কোন লোক এই বাড়ির কর্তা ছিলেন। দেয়ালের কারুকার্যে শেওলা পড়েছে। কতদিন এই বাড়ির কেউ পরিচর্যা করেনি তার ইয়ত্তা নেই।
একদিন দুপুরবেলা দুলাল ক্ষেত থেকে এসে বসল।

গরুর বাচ্চুটা এদিকওদিক লাফায়ে লাফায়ে খেলছে, লাফাতে লাফাতে দৌড়ে গিয়ে ধাক্কা খেল পাকা দেয়ালের সাথে, ধাক্কা খেয়ে সাথে সাথে পড়ে গেল। দুলাল দৌড়ে বাচ্চুটার কাছে গেল। মুহূর্তেই বাচ্চুটা নিঃশ্বাস বন্ধ করে হা করে রইল। দুলাল কান্নাকাটি করলো, ছোট বাচ্চাকাচ্চার মতো। মা গরুটার চোখ দিয়ে গড়ায়ে গড়ায়ে জল পড়তে থাকল।
উঠানের পাশে যে কূপ ছিল, স কূপের পাশে ছিল মাঝারি সাইজের একটা উইয়ের ঢিবি, এই ঢিবি কবেকার তা দুলাল জানেনা। ঢিবি জমে জমে পাকা আস্তরণের মতো হয়ে আছে। প্রায়ই কাজ শেষে এসে দুলাল এ ঢিবির উপর বসে। দুলাল ছাড়া বাড়িতে আর কোন লোক নেই। একে একে সবাই মরে গেছে। দুলাল এই ঢিবি কাছেই সারাক্ষণ মাথায় হাত দিয়ে বসে কি কি যেনো ভাবে। চারটা গরু আছে, গাইটা আর দুধ দেয় না, বাকি তিনটা বলদ গরু, বদল গরু দিয়ে দুলাল নিজের ও অন্যের জমি চায় করে। একদিন দুলাল অসুস্থ হয়ে পড়ল, ঐদিন পাশের গ্রামের মতি জমি চাষ করার জন্য দুলালের কাছে গরু নিতে আসল কারণ মতির কোন গরু ছিল না।

মতির জমি নদীর ওপারে, সেদিন ছিল তীব্র রোদ। দুপুরবেলা গরু দুইটা খুব হাঁপাচ্ছিল, জলের তিরাশ লেগেছে খুব। বেলা গড়াতেও মতি গরু নিয়ে না ফেরায় দুলাল চিন্তিত হয়ে পড়ল, অসুস্থ শরীরে সে আস্তে আস্তে এগুতে থাকল।
মতি গরু নিয়ে আসার সময় নদীর ধারে পৌঁছতেই গরু দুইটা নদীতে নেমে জল পান করতে লাগলো। মতি নদীর ধারে দাঁড়ায় আছে। আকস্মিক কোথা থেকে দুইটা কুমির একসাথে গরু দুইটাকে গলায় ধরে টেনেটুনে গভীর থেকে গভীর জলে নিয়ে যেতে থাকল। নদীর এপাশে দুলাল আর ওপাশে মতি নির্বাক চেয়ে থাকল, একটুক্ষণ পরে দুলাল হাউমাউ করে কান্নাকাটি শুরু করলো।

বাড়ি ফিরে দুলাল উইয়ের ঢিবির পাশে বসল। মুখ খুবই বিষন্ন, চিন্তিত। মা গরুটাও দিনদিন শুকায়ে যাচ্ছে। বাচ্চারর জন্য কান্না করে, গরুটার ওলান ফুলে গেছে। গরুটার খুব কষ্ট হচ্ছে। দুলাল তা বুঝত। কিন্তু অসহায় দুলাল কিছুই করতে পারছে না। মাঝে মাঝে সেও বাচ্চাকাচ্চার মতো হাউমাউ কান্না করে। দুলাল সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আরো অসুস্থ হতে থাকল। মা গরুটা ওলানের যন্ত্রণায় কাতরায়।

দুলাল সারারাত মরার মতো ঘুমাল। ঘুমের মাঝে কেউ একজন এসে তাকে যত্ন করে গেলো, দুলাল বুঝতে পারলো না। শুধু অনুভব করল। সে কে? কে সে? দুলালের সেদিন প্রায় দুপুরবেলা ঘুম ভাঙল। সে ভাবতে থাকল।
আস্তেআস্তে চোখ মুছে সে গোয়াল ঘরের দিকে গেল। দেখে- মা গরুটা মরে চিৎ হয়ে আছে। সে কিছুই বুঝল না। দুলাল ভেঙ্গে পড়ল, তার সাথে কেন এমন হচ্ছে? সে কিভাবে চলবে? চাষবাস কি দিয়ে করবে?
গোয়াল ঘরে আর একটা গরু আছে।

দুলাল ঢিবি উপর একা বসে আছে। হঠাৎ দমকা দমকা বাতাস শুরু হল।
কিছু বুঝে উঠার আগেই গোয়ালঘরের চাল বাতাসে নিয়ে গেছে।
এরকমভাবে দমকা বাতাস সে আগে কখনো দেখেনি। গোয়ালঘরে গরুটা শিং উচায়ে দাঁড়ায় আছে। হুট করে বাতাস থেমে গেল, দুলাল বোকা বনে গেল। কিছু বুঝে উঠার আগে দৈববানী হল— “দুলাল, তুই ঢিবিতে আর বসিস্ না, কারণ ওতে তোর ভাগ্য লিখা আছে।”

দুলাল কাউকে দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু কে এইসব কথা বললো? আর ঢিবিতেই বা এমন কি আছে? এদিকে বিকেল গড়ায়ে সন্ধ্যা আর সন্ধ্যা গড়ায়ে রাত হয়ে গেল। বাড়িতে রান্নার কিছুই নেই। মুড়ি চিবাতে চিবাতে ক্লান্ত শরীরে সে ঘুমায়ে পড়ল। ঘুমের মাঝে জোছনার আলোর মতো ফর্সা সুর্দশন লম্বা এক পুরুষ বললেন— “দুলাল, উইয়ে ঢিবির ভিতরে পুরানা রাজপরিবারের অনেক মণিমুক্তা রয়েছে। এগুলো সংগ্রহ কর, তুই আর দরিদ্র থাকবি না, তোর উন্নতি হবে। আর ওটা উইয়ের ঢিবি নয়, সিন্দুক। যেটার চাবি এতদিন আমার কাছে ছিল, আজ তোকে দিলাম।” সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে বিছানার পাশে একজোড়া নতুন চাবি আর দুলালও সুস্থ হয়ে গেল। সিন্দুক খুলে সে অনেক মণিমুক্তা পেলো। তার আর দুঃখ থাকলো না। সে ধনী হয়ে উঠল।

(সমাপ্ত)
রুদ্র সুশান্ত
উত্তরা, ঢাকা।
০১/০৬/১৭ ইং


আমাদের উৎসাহিত করুনঃ




সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এই লেখাটি কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয় ।

লেখক সম্পর্কেঃ

বুনন সম্পর্কিত তথ্যঃ