“ছায়া”

এস_এস_সি_পরীক্ষার্থী_দের_উপলক্ষ্যে
১…সারাটা পাড়া জুড়ে কান্নার রোল পরে আছে!
এলাকার সবচেয়ে মেধাবী ছেলেটা আর নেই!
আরে না মেধাবী ছেলে না তো,ফেল করা ছেলে!
ছেলেটা বোধহয় আত্নহত্যা করেছে…!!
না,না,আত্নহত্যা বললে ভুল হবে।ছেলেটাকে মেরে ফেলা হয়েছে.!
হ্যা,সত্যিই ছেলেটাকে মেরে ফেলা হয়েছে….!!
ছেলেটাকে আত্নহত্যা করতে বাধ্য করা হয়েছে।
আচ্ছা,হত্যা করা আর কাউকে আত্নহত্যা করতে বাধ্য করা তো একি কথা!
তাই না….?
২…ছেলেটার নাম অবরু,পড়ালেখায় সে সব সময়ই প্রথম ছিলো,
JSC তে A+,এবং শুধুই A+ ছিলোনা…!!
পুরো জেলায় প্রথম হয়েছিলো! যার কারনে পরিবারের সাথে সাথে গ্রামের সবাই অবরুকে অনেক আদর করে।
আর কিছুদিন বাদে SSC রেজাল্ট দিবে।
পরিবারের সবার সাথে সাথে এলাকার সবার ই বিশ্বাস, এবারও অবরু ভালো রেজাল্ট করবে।
আর অবরু?
সেও খুশি,কারন সে জানে সে এবারো ভালো ফলাফল করবে,কারন তার প্রত্যেকটা পরীক্ষাই যে অনেক ভালো হয়েছে।
তার বিশ্বাস এবারো সে তার কাক্ষিত সাফল্য লাভ করতে পারবে।
সময় অতিবাহিত হয় তার আপন গতিতে। আস্তে আস্তে সেই কাঙ্ক্ষিত দিনও চলে আসে,
৩…সকালের সময়টা ভালো ভাবে কাটলেও এখন অবরুর কিছুটা নার্ভাস নার্ভাস লাগছে কারন রেজাল্ট দিতে আর কিছু সময় বাকি।
পরীক্ষার ফলাফল পাবলিশ হয়ে গিয়েছে, অবরু মোবাইল নিয়ে রেজাল্ট বের করার ব্যস্ত,ইন্টারনেট এ রেজাল্ট দিয়ে দেওয়া হয়েছে,একে একে অবরুর সব বন্ধুদের রেজাল্ট চলে এসেছে কিন্তু অবরুর রেজাল্ট এখনো আসছে না। অবরু চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কিন্তু বার বার ই নেটওয়্যার্ক সমস্যা দেখাচ্ছে!
অবরু’র সমস্ত শরীর দিয়ে ঘাম ঝরছে। অবরু’র খুব টেনশন হচ্ছে। টেনশনে অবরু’র হাত কাপছে। পিছন থেকে অবরুর বন্ধু আকাশ তাঁকে ডাকছে,
>কিরে এত ঘামছিস কেন.?
>আরে, আমার রেজাল্ট টা আসছে না!{অবরু}
>আর তাতে কি হয়েছে?
নেটে সমস্যা দিচ্ছে মনে হয়। কলেজ যা,কলেজে রেজাল্ট দিয়ে দিয়েছে।
আমি ওখান থেকে’ই আসলাম।
> দিয়ে দিয়েছে!
তোর রেজাল্ট কি আসছে..?{অবরু}
>আসছে মোটামুট A গ্রেড। আমি তো আর তোর মতো ব্রিলিয়েন্ট না,
চিন্তা করিস না, এবারো তুই প্রথম হবি…
অবরু আর দাড়ালো না,দৌড়াতে দৌড়াতে কলেজ পৈাছালো,
ভীড় ঠেলে, সবার প্রথম রোলটার দিকে তাকালো কিন্তু না তার প্রথম স্থানে নেই! প্রথম স্থানে অন্য আরেক জনের রোল!
অবরু বিস্ময় নিয়ে নিচে নামতে থাকে কিন্তু না,
তার নাম নেই…!!
অবরু’র এবার প্রচন্ড ভঁয় হতে থাকে! সে যত নিচে নামছে তার ভঁয় তত বাড়ছে!
একে একে সবগুলো রোল দেখলো কিন্তু কোথাও তার নাম নেই! অবরুর দু’চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় অশ্রু ঝরছে। ভেজা চোখ নিয়ে অবরু আরো কয়েকবার রেজাল্ট সিট টা দেখলো কিন্তু কোথাও তার নাম নেই…!!
অবরু’র কাছে পৃথিবীটা সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে মনে হচ্ছে!
৪…বাসায় অবরু’র মা-বাবা, গ্রামবাসী সবাই অবরু’র রেজাল্ট এর অপেক্ষায় অধীর আগ্রহে বসে আছে। অবরু অনেক কষ্টে নিজের কান্না থামিয়ে বাসায় আসে। বাসায় আসার সাথে সাথে অবরু’র মুখে সবাই মিষ্টি দিতে আসে।
অবরু সবাইকে থামিয়ে দেয়,আকাশ ফাটানো এক চিৎকার দেয়! তার চিৎকার এর বিকট আওয়াজে মনে হচ্ছে আকশ ক্রন্দন করছে! পরিবেশে বিরাজ করছে নিস্তব্ধতা! সবাই বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকে অবরু’র দিকে, অবর’র বিধ্বস্ত চেহারা,উস্কখুস্ক চুল অনেক কিছু বলে দিচ্ছে!
অবরু’র অক্ষিযুগল দিয়ে শ্রাবণ ধারার ন্যায় নোনা জল বর্ষন হচ্ছে!
ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় অবরু বলতে শুরু করে,
আমার রোল আসে নি! আমি ফেল করেছি!!
অবরু’র কথা শুনে কারো মুখে থেকে কোন কথা বের হয় না। সবাই যেন পাঁথরের মূর্তি তে রূপান্তরিত হয়েছে! সবার কাছ থেকে সরে আসে অবরু। নিজের রুমে এসে দরজা বন্ধ করে দেয়।
চিৎকার করে কান্না করতে থাকে…!!
৫…সারাটা দিন অবরু কান্না করে কাটায়। সমস্ত গ্রাম একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে আছে। গ্রামের কারো মুখে হাসি নেই। সবার মুখে বেদনার ছাপ। পরিবারের সাথে সাথে গ্রামের কেউ অবরু’র সাথে কথা বলে না। অবরু অনেক এর সাথে কথা বলার চেষ্টা করে কিন্তু সবাই তাকে এড়িয়ে চলতে থাকলো। অবরু’র দম বন্ধ হয়ে আসছে। সে আর থাকতে পারছে না এভাবে। সারাদিন সবার অবহেলা, সে আর সহ্য করতে পারছেনা।
সে ঠিক করলো সে আর থাকবেনা এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে,যেখানে তার কোন মূল্য নেই সেখানে বেচে থেকে কি লাভ?
অবরু একটা চিঠি লিখে,{#সুইসাইড_নোট}
প্রিয় বাবা,
জানিনা,কি ভুল করেছি আমি! যার কারনে আল্লাহ আমার সাথে এরকম টা করলো। হয়তো আমার ভাগ্যে এটাই লিখা ছিল। ছোট থেকেই আমি পড়ালেখায় ভালো করে আসছি কিন্তু এবার!
সত্যিই আমি জানিনা!
বিশ্বাস করো বাবা,আমি অনেক ভালো পরীক্ষা দিয়ে ছিলাম কিন্তু?
যাই হোক…
আর আজ যখন আমার রেজাল্ট খারাপ হলো! যখন আমার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিলো আপনাদের তখন ই আপনারা আমাকে দূরে ঠেলে দিলেন! অবহেলা করছেন..!!
তবে কি আমার প্রত ভালবাসা শুধু ই আমার রেজাল্ট ছিল! শুধু ই ভালো রেজাল্ট এর কারন ছিল!
বাবা, আমি আর সহ্য করতে পারছি না!
সত্যিই বাবা আমি আর সহ্য করতে পারছি না ,তাই চলে গেলাম!
আমি কাউকে দোষারোপ করবো না!
কিন্তু বাবা আমি আত্মহত্যা করছি না,আমাকে হত্যা করা হচ্ছে!
এই সমাজ আমাকে বাচতে দেয়নি, আমাকে বাচতে দেয়নি তোমাদের বিষাক্ত ভালবাসা!
আমার ব্যার্থ জলকেলি, রক্ত নদীর স্রোতে আবেগকে ভাসিয়ে দিও!
আমি বাঁচতে চেয়েছিলাম বাবা কিন্তু সমাজ বলেছিলো আমার অধিকার নেই!
আমি ব্যার্থ বাবা! সত্যি আমি ব্যার্থ!
বাবা আমি আত্মহত্যা করছি না, আমাকে হত্যা করা হচ্ছে!
আমাকে হত্যা করা হচ্ছে!
পারলে ক্ষমা করে দিও!
ইতি তোমার ব্যার্থ ছেলে!
চিঠিটা টেবিলের ওপর পরে আছে! হিম শীতল, নিথর দেহটা ঝুলছে উপরে!
লেখক মন্তব্যঃ কেউ চায়না সে রেজল্টা খারাপ করুক। সবায় চায় সে ভালো রেজাল্ট করবে। বাবা-মার মুখে হাসি ফুটাবে কিন্তু সবার আশাতো আর পূরন হয় না!
তাই না..?
তাই সকল পিতা-মাতাদের কাছে আমার বিনীত অনুরোধ,এই দুঃখের সময় আপনার ছেলে-মেয়ের পাশে থাকুন। এই কঠিন পরিস্থিতির মাঝে তাদের সবচেয়ে প্রয়োজন আপনাদের, আপনারাই তো তাদের ছায়া, তাই না?
এতটা বছর তাদের আগলিয়ে রেখে আর মাঝ পথে রাদের হাতটা ছেড়ে দিবেন! যখন আপনাকেই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন!
নয়তো কেউ হারিয়ে যাবে অবরু’র মত কেউ হারিয়ে যাবে অন্ধকারে’র অতল গহ্বরে!

আমাদের উৎসাহিত করুনঃ




সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এই লেখাটি কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয় ।

লেখক সম্পর্কেঃ

বুনন সম্পর্কিত তথ্যঃ