ঝরে পড়া শৈশব

টঙ্গীর ভিতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে হাজারো বস্তি। সেদিন বিকেল বেলা আমি হঠাত্ কাজ শেষে ঐদিক থেকেই হেঁটে আসছিলাম। হঠাত্ই আমার চোখ আটকে গেলো এক জোড়া নিষ্পাপ চোখে। নিজের অজান্তেই থমকে দাঁড়ালাম। দেখলাম কি যেন খুঁজছে অনেক গুলো ময়লা-আবর্জনার মাঝে। কি করছে ঐ বাচ্চাটা? খুব আগ্রহ ভরে সামনে এগিয়ে যেয়ে জানতে চাইলাম-

: এই যে বাবু, তোমার নাম কী?
: রবি। (তখনও বাচ্চাটা তার কাজেই ডুবে আছে)
: তোমার বয়স কত?
: আম্মা জানে।
(দেখে মনে হলো বয়স এর বেশি হবে না)
: আচ্ছা রবি, তুমি এই ময়লা গুলোর মাঝে কী খুঁজছো?
: আধো আধো করে বললো, বোতল খুঁজি। আপনের হাতের বোতলটা দিবেন আফা? (আগ্রহ ভরা চোখে)
: আমি খানিকটা অবাকই হলাম, এই বোতলটার জন্য ওর আগ্রহ!
: আচ্ছা, নাও কিন্তু, এই বোতলটা দিয়ে করবে টা কী?
: মালিকের ওহানে নিয়া যামু। মালিক টেহা দিব।
: ও… কত টাকা পাও?
: পঞ্চাশ টাকা বেশি দিতে পারলে; কোনোদিন অনেক কম ও পাই।
: আচ্ছা, কোন ক্লাসে পড়?
: পড়ি নাতো আফা। কয়দিন গেছিলাম ওহন আর যাই না। বই, খাতার টেহা মেলা! কই পামু?
: একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওর হাতে দুইশত টাকা গুজে দিয়ে বললাম, কিছু কিনে খেও।

ঐ বলতে বলতেই দ্রুত প্রস্থান করলাম। অনেকটা যেন চোরের মতই পালিয়ে আসা; কারণ ঐ মুহূর্তে বাচ্চাটাকে কোনোভাবে শান্তনা দেবার ভাষা আমার ছিল না!
আচ্ছা, এই ছোট্ট, নিষ্পাপ শিশুটার কি এখনই এইসব বাস্তবতার আড়ালে নিজেকে ডুবিয়ে দেবার কথা?
ঐ বয়সটুকু আদৌ ওর হয়েছে?
না, হয় নি। আমারতো মনে হয় এইটুকুন বয়সে ওর এসব বেড়াজালের গিঁট সম্পর্কে ধারণা থাকা তো দূর; বরং এসব দেখে বিস্মিত হয়ে যাবার কথা। কিন্তু, দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এখন তার উল্টোটাই হচ্ছে! যেখানে ওর এসব সাত-পাঁচ না বুঝে বিষ্মিত হবার কথা সেখানে, ওকে দেখি আজ আমি বিস্মিত। কারণ এখানে আজ ওর থাকার কথাতো ছিল না; ওরতো এখন এপাড়া থেকে সেপাড়া চষে বেড়ানোর কথা, হাসি ঠাট্টায় মেতে থাকার কথা, বিষয় সে যাইহোক সবকিছুকেই সহজ সাবলীলতার সাথে গ্রহণ করার কথা। কিন্তু, রবি কি এখন সেটা পারবে? ওর দ্বারা কি সম্ভব এই সমাজটাকে পজিটিভলি চিন্তা করা?
কথায় বলে ” পেটে টান পড়লে নাকি মানুষ বিচার বিবেচনাহীন হয়ে পরে”। যখন ও দেখবে ওর ঘরে খাবার নেই, ফ্যামিলির কেউ অসুস্থ কিন্তু, টাকার অভাবে বিনাচিকিত্সায় কাতরাচ্ছেন; তখনও কি ওর নিজেকে ধরে রাখাটা সম্ভবপর হবে?? ঐ সময় প্রিয়মুখগুলোর দিকে চেয়ে, পেটের তাগিদে ও নিজেকে বিকিয়ে দেয়? চুরি, ছিনতাইসহ আরো অনান্য অপরাধমূলক কাজে নিজেকে জড়িয়ে ফেলাটাও কি খুব বড় অন্যায় হয়ে যাবে??? আমরা ঐ অবস্থায় থাকলে কি করতাম? পারতাম নিজেকে সংযত রাখতে?
আমারতো অন্তত মনে হয় না। বাস্তবিকঅর্থে আমাদের সমাজই আমাদের অনেক সময় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নানা অপরাধজগতের দিকে ঠেলে দেয়!
এ তো ছিল আমার চোখে ধরা পড়া একটা রবির ঘটনা। কিন্তু, এই রবির মতো অগণিত কত রবিরা বেড়ে উঠছে এভাবে অযত্নে-অবহেলায়; কত শৈশব হারাচ্ছে অতলে; কত রবিরা বাধ্য হয়ে বেছে নিচ্ছে অন্যায়ের পথ!


আমাদের উৎসাহিত করুনঃ




সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এই লেখাটি কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয় ।

লেখক সম্পর্কেঃ

বুনন সম্পর্কিত তথ্যঃ