অল্প অল্প প্রেমের গল্প

ওয়াহিদার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে প্রায় ছ’মাস, পারিবারিকভাবে কনে দেখা এবং বিয়ের বন্দোবস্ত।ছোটবেলা থেকেই মুখচোরা স্বভাবের বলে কখনোই মেয়েদের সাথে তেমন করে ঘনিষ্ঠ হতে পারিনি। সমবয়সী মেয়েরা ছিল আমার কাছে মূর্তিমান আতঙ্কের মত।ক্বচিৎ কদাচিৎ কারো সাথে দু’একলাইনের কথোপকথন হয়ে গেলে উপলব্ধি করতাম, পরবর্তী মিনিট দশেকের জন্য হার্ট বিট কয়েকগুন বেড়ে গেছে।
(তাহলে পরিচয় দিয়ে নেই,আমি জাকারিয়া মাবাবার একমাত্র সন্তান, পড়াশুনা শেষ করে একটা প্রাইভেট কলেজে সহকারী শিক্ষক হিসেবে নতুন জয়েন করেছি)
একদিন মাবাবার সাথে রাতের খাবার খাচ্ছিলাম,হঠাং মা বলে উঠলেন বাবা তোর জন্য আমরা একটা মেয়ে দেখে রেখেছি,যদি তুই রাজি থাকিস তাহলে আগামীকালই বিয়ে।‘
অবাক হলেও আমি সেটা চেপে গেলাম।কারণ আমি মাবাবার অবাধ্য কখনো হইনি।
মা বললেন,’কন্যা মাশাল্লাহ খুবই সুন্দর।এবছরই ইন্টার পাশ করবে,রেজাল্টের অপেক্ষায় আছে। পরিবার ভালো,সহায় সম্পদ ও আছে বেশ।বড় দুই বোনের বিবাহ হয়ে গেছে,সে তৃতীয়। ছোটআরো দু’জন আছে।‘
মা আমি রাজি কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি কেন(আমি)
তাড়াহুড়োটা হচ্ছে ওদের জন্য।মেয়েকে নাকি পাড়ার কিছু বখাটে ছেলেপেলে উত্যক্ত করে,যন্ত্রনা দেয়।মুখে এসিড মেরে দিবে,রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে যাবে-এসব হুমকি ধামকি দিয়ে চিঠিও এসেছে বাসায়।‘
আমি আর কিছু বলতে পারলাম না।আমাদের বিয়েটা হয়ে গেল। (সরি তাড়াহুড়ার জন্য পাঠকদের দাওয়াত দিতে পারি নি)
বরাবরই শুনে আসছি,বাসর রাতে ফুল দিয়ে সাজানো বিছানায় নতুন বঊ লাজরাঙা হয়ে গুটিসুটি মেরে বসে থাকে,বরের জন্য অপেক্ষা করে। আর এখানে আমার বউ বসে বসে গুন গুন করে গান গাচ্ছিল।
আমি শান্ত ভঙ্গিতে দরজা বন্ধকরে অর পাশে গিয়ে বসলাম।
ওয়াহিদা আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘এত তাড়াহুড়োর বিয়ে হলো,আপনার কি কোন ঝামেলা হয়নি?’
একটু ভ্যাবচ্যাকাখেয়ে বললাম, ‘না,তেমন একটা হয়নি (আমি)
‘কিন্তু আমার হয়েছে।অনেক ঝামেলা হয়েছে।মাত্র দু’দিন আগে যখন জানলাম,পরশু রাতে আমার বিয়ে-তখন আর কিছুই করার নেই।একদিনের মধ্যে কি আর কেনাকাটা করা যায়?গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান হলো,একেবারেই সাদামাটা। আপনার তো বোধহয়,কিছুই হয়নি।তাইনা?’ওকে এসব বাদদিন।
এবার জরুরী কথাটা বলি। আপনি হয়তো শুনেছেন,পাড়ার বখাটে পোলাপানের ঝামেলা থেকে মুক্তিলাভের জন্য আমাকে তাড়াহুড়ো করে আপনার গলায় ঝুলিয়ে দেয়া হচ্ছে (ওয়াহিদা)
-হ্যা বাবা বলেছেন (আমি)
– ঘটনা মিথ্যা। বখাটেরা আমাকে জ্বালানোর সাহস কোনদিনই পায়নি,কারন এ পাড়ার বখাটে দলের লীডার আমার প্রেমিক।
বাবা আমাকে প্রেম থেকে নিষ্কৃত করতেই আপনার গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছেন।‘(ওয়াহিদা)
-ও আচ্ছা (আমি)
-শুধু ও আচ্ছা,আর কিছুনা?(ওয়াহিদা)
-আর কিছু কি?( আমি অবাক হয়ে)
– আসল কথাই তো শুনেননি।আগামী ছ’মাসের মধ্যেই আমি আমার প্রেমিক এর কাছে চলে যাব।কাজেই,এই ছ’মাস আমি আপনার শো পিসস্ত্রী হয়ে থাকতে পারি,যদি চান। আবার,পুরো ঘটনা সবাইকে বলে দিয়ে যদি ডিভোর্সও দিয়ে দেন,তাতেও আমার আপত্তি নেই। বরং লাভ।তবুও অনুরোধ করব, আপাতত ডিভোর্স না দিতে।‘
– হুম (আমি)
সব কথা হু হা আচ্ছা দিয়েই চালিয়ে দেবেন? বাসর রাতে এত মারাত্মক একটা ঘটনা,তাও দশ লাখ টাকা গচ্চা দিয়ে ঘন্টা তিনেক আগে বিয়ে করা নতুন বউয়ের মুখে শুনতে খারাপ লাগছে না?’(ওয়াহিদা)
আমি হাই তুলে বললাম,’না লাগছেনা। আমি জানি,আমার কাছে কিছুই থাকেনা।তুমিও থাকবেনা,এটাই স্বাভাবিক। যাকগে,ঘুমোচ্ছি আমি।‘ বলেই পাশ ফিরে শুয়েপড়লাম।
এভাবেই সমাপ্তি ঘটলো আমার বিয়ের রাতের।
দুএকদিন এর মধ্যেচোখে পড়লো ওয়াহিদার অস্বাভাবিক উচ্ছ্বলতা। বিয়ে পৃথিবীর সব মেয়ের কাছে অদৃশ্য এবং চির বন্দিশালা হলেও ওয়াহিদার কাছে হলোনা। তার আনন্দ চোখের পড়ার মত।আমারও ভালোই লাগল।
আমাকেও কিভাবে জানি দূরে দূরে সরিয়ে রেখেও এক আলগা মায়ায় বেঁধে ফেলল মেয়েটা।আপনি ছেড়ে দিল বেমালুম,কোন রকম সংকোচ ছাড়াই তুমি করে ডাকতে শুরু করল। সবাই ধরেই নিল, অসম্ভব সুখী এক জুটিহয়েছি আমরা।
জিবনের প্রথম কেউ একজনকে জীবনের অংশ ভাবতে ইচ্ছে করছে। সেই কেউ একজনটা বোধহয় ওয়াহিদা, আমার শো পিস স্ত্রী!
বিয়ের কয়েকদিন পর ঢাকায় একটি কলেজে আমার চাকরি হয়ে যায়।
– ওয়াহিদা তুমি ও আমার সাথে চল(আমি)
-তুমি ঢাকায় গিয়ে সব ঠিক ঠাক করো,আমি নাহয় কদিন পরে আসব (ওয়াহিদা)
– তোমার যা ইচ্ছে (আমি)
-তোমাকে চিঠি লিখব।উত্তর দিয়ো।আমি অনেক চমৎকার চিঠি লিখতে পারি,আর চিঠি পাওয়া মাত্রই উত্তর দিবে (ওয়াহিদা)
-ঢাকায় আসার পর অনুভব করলাম, কিছু একটা অসম্ভব রকম ভাবে মনকে নাড়িয়ে যাচ্ছে। বুঝতে পারলাম, ওয়াহিদাকে অনুভব করছি আমি।
ওর সাথে কখনও ফোনে কথা হতো না আমার।
মাসখানেক পরে ওয়াহিদার চিঠি পেলাম।মাস্টার মশাই, কেমন আছ?
মনে পড়ে ওয়াহিদাকে। আমার পড়ে। তোমার বোকাবোকা হাসিটা দেখতে ইচ্ছে করে মাঝে মাঝে।
ইতি,ওয়াহিদা।
আমি উত্তর দিলাম,
‘ভালো আছি। তুমিও ভালো থেকো।খুব দেখতে ইচ্ছে হলে ঢাকায় চলে আসো।
তবে এই তিন লাইনের চিঠির বাইরেও বেশ বড়সড় দীর্ঘ একটা চিঠিও লিখলাম, সেটা গোপন ডায়েরীর ভাঁজে রয়ে গেল।
গত ছ’মাসে ওয়াহিদার ছয়টি চিঠি পেয়েছি,উত্তর পাঠিয়েছি পাঁচটা।
শেষ চিঠিতে ওয়াহিদা জানাল অমুক তারিখ সে ঢাকায় আসছে। স্টেশন থেকে যেন তাকে নিয়ে আসি।
ঠিক টাইমে আমি তাকে স্টেশন থেকে নিয়ে আসি।
– বিকেলে চা খাওয়ার সময় ওয়াহিদা বলল, আমি একসপ্তাহ থাকব এখানে তার পর আমার প্রেমক এর কাছে চলে যাব। তোমার ভয় নেই,তোমাকে সবার কাছে সন্দেহ এবংকলংকমুক্ত করেই যাব’।
-আমাকে নিয়ে ভেবোনা (আমি)
-ওয়াহিদা এখানে এক সপ্তাহ ছিল।তার পর সে চলে যায়।
আনন্দময় সময়টুকু বড় দ্রুতই চলে যায়।ওয়াহিদা চলে যাওয়ার দিন কলেজ থেকে তাড়াতাড়ি চলে এলাম ছুটিনিয়ে। স্যুটকেস গোছাতে গোছাতে ওয়াহিদা বলল তুমি আর কি সিলেট যাবেনা।
-হুম সময় ফেলে যাব (আমি)
– ওয়াহিদাকে ট্রেনে তুলে দিয়ে প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে রইলাম।অপেক্ষা করছি,ট্রেন ছাড়ার। খানিক বাদেই হুইসেলের আওয়াজ শুনলাম। ট্রেন ছুটতে শুরু করলো।জানালার পাশে বসেছে ওয়াহিদা, আমার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে হাত নাড়লো। ওর স্নিগ্ধ হাসিমাখা মুখটা শেষবারের মত দেখছি।ভাবতেই বুকের ভেতর কেমন জানি করে উঠলো।মনে মনে বলতে লাগলাম তুমি কোনদিনও জানবেই না,আমি তোমাকে কতোটা ভালোবাসি।
– প্রতিদিনের মত আজও রাত বারটা নাগাদ ডায়েরী খুলে বসলাম।ওয়াহিদা আসার আগে রোজ রাতে কিছু লিখতাম।আসার পরেও অনেকরাতে লিখেছি। সবই ওয়াহিদাকে নিয়ে।
– ডায়েরীটা শুধুই কষ্ট বাড়াবে, যতোবার চোখ পড়বে,বুকে ব্যথা হবে। রাখা উচিৎ হবেনা।
শেষপৃষ্ঠা খুলে থমকে গেলাম।গুটিগুটি করে লেখা কয়েকটা লাইন। ওয়াহিদা লিখেছে।
– মাস্টার মশাই, অনুমতি ব্যতীত তোমার ডায়েরীর প্রথম থেকে শেষ পর্যন্তপড়ে ফেলেছি।যদিও আমার কাছ থেকে লুকানোর জন্য বিশেষএকজায়গায় তুলে রেখেছিলে ডায়েরীটা,সেদিন হুট করেইহাতে পেয়ে গেলাম।
এবার বলতো,এতো ভালোবাসা কেউ লুকিয়ে রাখে? ভালোবাসা কি লুকিয়ে রাখতে হয়?
কেবলমাস্টারমশাইগিরি করে গেলে,কিচ্ছু জানোনা।
শোনো বোকা মাস্টার, তোমার এই বিশেষত্বহীন নির্বিকার সত্বাকেআমি অনেক কাছে থেকে উপলব্ধি করেছি।
-(সিলেট থেকে থেকে যেদিন এলাম),রাত দশটায় যে ট্রেন স্টেশনে পৌছানোর কথা,সেটার জন্য তুমি সন্ধ্যা ছয়টা থেকেই নাকি অপেক্ষা করছিলে। পুরো চার ঘণ্টা ঠায় দাঁড়িয়ে রইলে,তবুও কিভাবে আমার কাছ থেকে অপেক্ষার ক্লান্তিটুকুলুকিয়ে রাখলে?
ডায়েরীটা না পড়লে এই অসম্ভব সুন্দর ব্যাপারটা জানতেও পারতাম না।
– শেষপর্যন্ত বুঝলাম,তোমার চমৎকার সব স্বপ্নই এই নীল চামড়ার ডায়েরীতে আটকা পড়ে আছে। এত বোকা তুমি।
পুনশ্চঃ সপ্তাহখানিকের মধ্যেই সবকিছু গুটিয়ে চিরতরে চলে আসছি তোমার কাছে।
– সেই সাথে,তোমার আরেকটা স্বপ্নও পূরণ হবে শীগগিরই। ঠিক করেছি,তোমার কলেজেই অনার্স পড়ব। তাহলে,ঘরে বাইরে সর্বত্রই তোমাকে মাস্টারমশাই ডাকা হবে!
কলেজ শেষে তোমার হাত ধরে বাড়ি ফিরব যখন,তোমারছাত্র-ছাত্রীরা হেসে কুটিকুটি হবে,আর তুমি যে লজ্জায় কিরকম মুখভঙ্গি করবে,ভাবতেও পারছিনা। (ওয়াহিদা)
.
– ওয়াহিদা আবার ফিরে এসেছিল। একবিকেলে পোঁটলাপুটলি নিয়ে একাই চলে এলো। আমার কলেজেই সে অনার্সে ভর্তি হয়েছে। স্বামী-স্ত্রী একসাথে কলেজে যাওয়া আসাটা ওয়াহিদার কাছে অনেক আনন্দের ছিল।
,
(ভালো থাকুক তাদের দুজনের ভালবাসা,কোনো ভুল হলে প্লিজ ক্ষমা করবেন।


আমাদের উৎসাহিত করুনঃ




সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এই লেখাটি কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয় ।

লেখক সম্পর্কেঃ

বুনন সম্পর্কিত তথ্যঃ