উদ্বাস্তু প্রেম

আট বছর ধরে চট্টগ্রাম শহরে আছি। আত্মীয়তা গড়ে উঠেছে পরিচিত-অপরিচিত অনেকের সাথে। বন্ধুত্বও। এই শহরের একটা ট্রেডিশন হলো – নিন্ম নিন্মবিত্ত, নিন্ম মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত, নিন্ম উচ্চবিত্ত, উচ্চবিত্ত, উচ্চ উচ্চবিত্ত, শিল্পবিত্ত (শিল্পপতির পরিবারবর্গ)……. এবং আরো অনেকে বিবাহ অনুষ্ঠান করে থাকেন কমিউনিটি সেন্টারে। তাই পুরো শহরে চোখ বুলালে নানা রঙের, নানা ঢঙের, নানা মানের, নানা মনের, নানা মূল্যের কমিউনিটি হল দেখতে পাবেন।

এখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিশ্চান, এরা সবার নানা অনুষ্ঠান এসব কমিউনিটি হলে করে থাকেন, বিবাহ অনুষ্ঠান তত্মধ্যে সবচে’ বেশি উল্লেখ যোগ্য।

এখানে বিয়ে অনুষ্ঠানে একেকে ধর্মের অনুসারীরা অন্য ধর্মের অনুসারীদের সন্মানের সাথে আলাদা খাবারের আয়োজন করে থাকে। কিছু মুসলমানরা (সব্বাই নয়) বিয়ের সময় কমিউনিটি হলে পর্দা দিয়ে নারী পুরুষদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করেন, তবে এমনটা সবাই করেন না।

কিছুদিন আগে আমি একটা বিয়ে অনুষ্ঠানে ইনভাইটেড ছিলাম, বন্ধুর ভাইয়ের বিয়ে। আমি আবার নন বীফ্ টেকার, সেজন্য আমাকে আলাদা দিল। মেয়েরা যেখানে খেতে বসল তার কাছাকাছি টেবিলে। টেবিলে বসে আছি, আমার বন্ধু একজনের সাথে পরিচয় করায় দিল যে আমার খাবারের ব্যবস্থা করে দিবে। বলে রাখা ভালো, এখানে আপনার বিয়েতে আপনি নিজে চাইলেও পাঁচক আপনাকে কোন খাবার দিবে না, আপনার পক্ষ থেকে যাকে খাবার-দাবারের দায়িত্ব দিয়ে পাঁচকের সাথে পরিচয় করায় দিছেন তার অনুমতি লাগবে, তবেই এক-দুইটা একস্ট্রা খাবার আপনি পেতে পারেন। অনুষ্ঠান শেষে বেচে যাওয়া অতিরিক্ত সব খাবার আপনি (মালিক) পাবেন।

টেবিলে বসে আছি তো আছি, কোন খাবার নেই, যাকে আমার সাথে খাবার দেয়ার জন্য পরিচয় করায় দেয়া হলো তাকেও কোথাও দেখছি না। খেতে বসে এমন অট সিসুয়েশনে্ আর কখনো পড়িনি। চুপ করে বসে আছি। একটু পরে মাথা তুলে পিছনে হেলান দিলাম।

একজন বালিকা হাত নেড়েনেড়ে বেশ কথা বলছে, বালিকাদের কণ্ঠস্বর তীক্ষ্ণ হয়। সদ্য বয়োঃসন্ধিকাল বিদায় হওয়া বালিকাদের ক্ষেত্রে তো কোন কথায় নেই। এদের কখনো দেবী মনে হয় আবার কখনো মনে হয় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ঝঞ্জাট। এদের কথায় থাকে নাটকীয়তা, চোখে থাকে ঝলঝল চাহনি আর চোখের কোণায় এ সমগ্র পৃথিবীর উদ্বাস্তু কৌতুহল।

বালিকার কথা শুনতে চেষ্টা করলাম, কিছু কিছু কথা হালকা শুনলাম কিন্তু বুঝলাম না কিছুই। চোখের পলক পেলে আবার তাকাল, বেশ মিষ্টি বালিকা।
এতক্ষণে বন্ধুর পরিচয় করায়ে দেয়া লোক এসে বললো-

“ভাই, একটু অপেক্ষা করুন, আমি নিয়ে আসছি।”

অল্পক্ষণ আমি পেটের বার্তা ভুলেই গেছিলাম, মানুষটা এসে বলাতে আবার মনে পড়লো, আমি খাবার জন্য বসে আছি।

আমার টেবিলে খাবার পৌঁছতে পৌঁছতে বালিকার টেবিলে খাবার প্রায় শেষ, এরমধ্যে কয়েকবার চোখাচোখি হল। বালিকাদের চোখ এতটাই সংবাদ বহন করে যে- ওদের মুখের চেয়ে চোখের ভাষা কঠিন। বালিকারা নার্ভাস হলে মুখের চেয়ে চোখে কথা বেশি বলে। আর আমি লেখক পরিচয়ে যেসব অনুষ্ঠানে গিয়েছি, প্রায়ই অনুষ্ঠানে বেশি খাতির পেতে গিয়ে বেকায়দায় পড়েছি। সাধারণদের সাথে না দিয়ে অসাধারন ভেবে, আমার পেটের বারোটা বাজার পরেই টেবিলে খাবার আসলো, অথচ নন-বীফ টেকার অনেকেই আছেন। আলাদা টেবিলের সন্মানে পেটের আলাদাভাবে ঘন্টা বাজলো।

খাওয়া শেষ করার আগেই বন্ধু পান, এটাওটা, হাবিজাবি একগাদা নিয়ে হাজির।
বালিকা খাওয়া শেষ করে উঠে গেছে, ততক্ষণে আমার অন্বেষণী নয়নদ্বয় বালিকাকে খুঁজছে। বন্ধুকে ইনিয়ে-বিনিয়ে, চর্বিত-চর্বণ করে, সাত-পাঁচ চৌদ্দ বুঝায়ে পাস কাটলাম। উদ্দেশ্য একটাই, বালিকাকে খোঁজা। অবশেষে দোতলায় উঠলাম, চঞ্চল বালিকা এখানেও নেই। ঘুরে ফিরে নেমে যাবার পথে দেখি, বালিকা সিঁড়িতে একা দাঁড়ায় আছে, আমার চোখ পড়তেই থমকে দাঁড়ালাম। আমার মাথায় একটা ম্যাসেজ ছিল, বালিকারা কখনো নিজ থেকে আপনাকে প্রপোজ করবে না, তবে প্রপোজ করার একটা সুযোগ তৈরী করে দিবে। এসব ক্ষেত্রে বালিকারা উদার না হলেও মহৎ হয়। এরা প্রপোজ না করার পিছনে আরো কারণ আছে, যেমন- ওরা নিজেকে মনেমনে দেশের প্রধানমন্ত্রীর মতন যোগ্য মনে করে আর সুন্দরের দিক দিয়ে মনে করে ঐশ্বরিয়া-দীপিকা-উর্বশী-সোনম পরবর্তী নামটা তাদের নিজের নিজের।

যাক, প্রপোজ না হোক দু’একটা কথা তো বলতে পারি। আমার প্রথম কথায় বালিকা নিরুত্তর। হয়ত নার্ভাস। আবার বালিকারা কথা বলতে শুরু করলে আট-দশটা কথাবাজকেও তারা নার্ভাস করে ফেলবে। মাইরি! বলছি, এ মহাগুণ তাদের আছে। আগ বাড়ায়ে আবার কথা বললাম। তাও নিরুত্তর। আবার নিজ থেকে কথা বলার কারণ হিসেবে এটাই আবিষ্কার করলাম যে- বালিকার আমাকে ভালো না লাগলে এতক্ষণে চলে যেতো।

আমি আবারো কথা বললাম, জিজ্ঞেস করলাম নামদাম….।

বালিকার ঠোঁট কাঁপছে। কিছু বলতে চাইছে।
বলুক বলুক।
ওমা!

হঠাৎ করে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কি যে বললো, আমি কিছুই বুঝলাম না । চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা কঠিন, জানতাম। এমন নয়নলোভী বালিকার মুখে তা যে এতোটা বেমানান তা আমি আগে বুঝতে পারিনি। বালিকার চিটাগাঙের আঞ্চলিক কথা শুনে হাওয়া বেরিয়ে যাওয়া বেলুনের মতো আমি টুশ্ করে ফসকে গেলাম। ওমা – এমন সুন্দর অস্পরী বালিকা এ কি বললো? আমি রীতিমতো বোকা বনে গেলাম, আমায় নিরুত্তর দেখে বালিকা সাঁয় সাঁয় করে নিচের দিকে নেমে গেলো।

আমি ট্যাুর এজেন্সিতে চাকরী করেছি, বিভিন্ন বিদেশী নিয়ে দেশের আনাচেকানাচে বহু জায়গায় যেমন- পৃথিবীর বৃহত্তম সমুদ্রসৈকত, ইনানী বিচ, পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত, মেঘলা, রাঙ্গামাটির ঝুলন্তব্রিজ, সাজেক ভ্যালী, কান্তজির মন্দির, রামসাগর, লালন আঁকড়া, ময়নামতি বৌদ্ধবিহার, পাহারপুর, রামুর রাবার বাগান, খুলনার চিংড়ি ঘ্যার, মহেশখালী পানের বরজ, রামু বিশাল বুদ্ধমূর্তি, গাজীপুর ও চকরিয়া সাফারী পার্ক, বাঁশখালীর লবনের মাঠ, সন্দ্বীপের লাল কাঁকড়া, নিঝুম দ্বীপের মায়াবী হরিণ, সমুদ্রের বুক ছিঁড়ে সাঁ সাঁ করে হাতিয়া যাওয়া, মনপুরা দ্বীপ, পটুয়াখালীর কুয়াকাটা, বাগেরহাট-সাতক্ষীরায় পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন…… ঘুরেছি।

যত্তো বিদেশী নিয়ে ঘুরেছি তারমধ্যে মনে হয়েছে মান্দারীন ভাষা সবচে’ কঠিন। আজকে বুঝলাম, চায়নাদের চেয়েও কঠিন ভাষায় কথা বলেন চট্টগ্রামবাসীরা।
বাউরে বাউ! নয়নহরিণী বালিকা এ কোন ভাষায় কথা বললো(?)

চিন্তা করতে করতে আমিও আস্তে আস্তে নিচে নেমে এলাম।

বালিকার সাথে চোখে চোখে কথা বলে আমিও হয়ে গিয়েছিলাম প্রেমিক। ক্ষণিকের আলাপে মনের ভিতর আমারও অজানা অনুভূতি হলো। এ এক মনে উদ্বাস্তু কল্পনার আনাগোনা।

[কোন ভাষা, উপভাষা কিংবা আঞ্চলিক ভাষাকে হীন করে এ গল্প লেখা হয়নি, পৃথিবীর সকল ভাষা আমার শিরোধার্য। গল্পটি উত্তম পুরুষে লেখা হলেও গল্পের নায়কের সাথে লেখকের কোন সম্পর্ক নেই, চরিত্রগুলো সম্পূর্ণ কাল্পনিক।]


আমাদের উৎসাহিত করুনঃ




সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এই লেখাটি কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয় ।

লেখক সম্পর্কেঃ

বুনন সম্পর্কিত তথ্যঃ