বন্ধু যখন বড় শত্রু

সকাল থেকে মমতা কলনি একদম স্তম্ভিত হয়ে আছে।।  চারদিকে শুধুই নিরবতা।  ঠিক তখন পুলিশের গাড়ি সাইরেন দিয়ে এসেছে।। রাতে নাকি প্রমি খুন হয়েছে।। কিন্তু কোনো গুলির আওয়াজ শুনা যায় নাই। অথচ প্রমির গায়ে গুলি করা হয়েছিল।। তার সাথে থাকত নিশি।। সে নাকি রাতে বাসায় ছিল না। আর দারোয়ান নাকি দুটো ছেলেকে ৩ টার দিকে যেতে দেখেছিল।। কে ছিল তা দেখে নি মুখে মাস্ক পরা ছিল। বিষয়টা কেমন জানি ঘোলাটে মনে হল পুলিশের।।  কলনিতে খোজ নিয়ে জানা গেল প্রমির খুবই নীরিহ ছিল।। কারো সাতে পাচে ছিল না।। কারো সাথে কোনো ভেজাল ও ছিল না।।  তাহলে ওকে খুন করিয়ে কার লাভ হতে পারে।।  পুলিশ শুধু ঘোল খাচ্ছিল।। ত কি করা বাধ্য হয়ে দায়িত্ব  দেওয়া হল সম্রাট কে।। ডিটেকটিভ হিসেবে খ্যাত সে।। তবে শুধু পুলিশ এর সমস্যা নিয়ে কাজ করে।দেখতে হেংলা পাতলা হলেও তুখড় বুদ্ধি তার।। এসে ও প্রথম শুরু করল জিজ্ঞাসাবাদ দারোয়ান কে।। দারোয়ানের ভাস্য মতে রাতে কোনো গুলির আওয়াজ শুনা যাই নি তবে ও দুজন লোককে কলনি থেকে বের হতে দেখেছিল।

যেখানে প্রমি খুন হয়েছিল সে কক্ষের পুরো তল্লাসি করে কিছু সুরাগ পাওয়া গেল না। কিন্তু সম্রাট হাল ছাড়ল না।। মাথা চুলকো তে চুলকোতে সম্রাট যখন মমতা কলনি থেকে তখন হঠাৎ কিসের উপর যেন পা পড়ল।। নিচে তাকিয়ে দেখল সাইলেন্সসর।।  তখন সে ইন্সপেক্টরকে ডেকে বলল এটা দেখুন।। ইন্সপেক্টর দেখে ত অবাক।।  সম্রাট বলল এটাই আওয়াজ না হওয়ার রহস্য।। তারপর সে যে রাস্তায় সাইলেন্সসর পেয়েছিল সে রাস্তা ধরে এগিয়ে গেল সামনে একটি চা দোকান দেখল কিন্তু ওরা কিছুই জানে না।। একটা সুরাগ পেয়েছিল তা ও হলো না কিছু।। কি করা আবার কলনী তে এল।। পুলিশের কর্মকর্তাকে প্রমির ব্যাংক হিসাব আর নম্বার রেকর্ড সব সংগ্রহ করতে বলে সম্রাট বাড়ির দিকে গেল।। সারারাত তার ঘুম হল না।। হাতে কোনো ক্লু নেই।। কি করবে ভাবতে ভাবতে কল দিল ওসি কে বলল প্রমির ৬ মাসের ব্যাংক লেনদেন এর হিসাব লাগবে ওর।। আর অপরদিকে নিশিকে পুলিশ জিজ্ঞাসা করছে।। ওর ভাস্য সে নাকি ওই রাতে বাসায় ছিল না।সম্রাট নিশির ও কল রেকর্ড বের করতে বলল।। সম্রাট ভাবল খুনি কে ও খুজে বের করবেই।।

এভাবেই চলে গেল ১ সপ্তাহ।। এর মধ্যেই পুলিশ খোজ নিয়েছে প্রমির ব্যাংক হিসাবের ও পাওয়া গেল নিশির কল রেকর্ড।। সব কিছু নিয়ে দেওয়া হল সম্রাটকে।। ও একটা জিনিস দেখে অবাক হল যে প্রমি ব্যাংক থেকে গত এক বছরে একই ব্যক্তি পাঠিয়েছে ৫ লক্ষ টাকা।। জিনিস টা সত্যিই ভাবার মত।। সম্রাট ওসি কে বলল এই ব্যাংক হিসাবের সব কিছু দিতে।। ওসি যাওয়ার পর সম্রাট প্রমি আর নিশির কল রেকর্ড চেক করতে লাগল এবার যা দেখল তা যেন ওকে আরো ভাবিয়ে তুলল।। ওদের কল লিস্টে একটা নাম্বার কমন।। সম্রাট পকেট থেকে মোবাইল টা বের করে ওসিকে কল দিয়ে বলল আমি একটা নাম্বার পাঠাচ্ছি এই নাম্বারের সব তথ্য পাঠান।। এবার মোবাইল টা টেবিলে রেখে ভাবতে লাগল সে চেয়ারে বসে কে হতে পারে খুনি।। কারো সাথে শত্রুতা ছিল না তার তবে কে মারবে তাকে!! আসলেই ভাবার বিষয়।। ভাবতে নিজের কেবিনেয় ঘুমিয়ে পড়ল সম্রাট।।[nextpage title=”২য় পর্ব”]পরের দিন সকালে সম্রাটের ঘুম ভাংল ওসির ডাক শুনি। উনি দেখা করতে এসেছেন। সম্রাট এসে ওসিকে জিঞ্জাসা করল কোনো নতুন খবর পেয়েছে কিনা।ওসি বলল যে ব্যাংক হিসাব চেক করতে বলেছে তার খোজ পাওয়া গেছে।। বলল ওই ছেলের নাম রমেশ।। সব থেকে মজার সংবাদ হল ওর গ্রামের বাড়ি আর প্রমির গ্রামের বাড়ি একই।। কথাটা শুনে ভ্রু কুচকে গেল তার।। ওর কোনো খোজ পাওয়া গেছে না। তবে অতি তাড়াতাড়ি পাওয়া যাবে।। সম্রাট ওসি সাহেব কে বলল ও নিশির সাথে কথা বলতে চায়।। সাথে সাথে ওসি সম্রাটকে নিয়ে গেল মমতা কলনিতে।। সম্রাট নিশি বলল রমেশ কে??
নিশি বলল রমেশ নাকি প্রমির বন্ধু।। সম্রাট আবার বলল কেমন বন্ধু?? নিশি বলল ওদের নাকি বিয়ের কথাবার্তা চলছে।।
তার মাথা চুলকোতে চুলকোতে উঠে এল ও।। হঠাৎ ওসি সাহের কল এল।। উনি এসে জানাল রমেশ নাকি ওর বাসায় ফিরেছে।। সাথেসাথে সম্রাট আর ওসি গেল রমেশ এর ঘরে।। ওদের দেখে অনেকটা হকচকিয়ে উঠল ও।
রমেশ:আপনারা কে??
ওসি: আমরা প্রমি খুনের ব্যাপারে কথা বলতে এসেছি…..
রমেশ:(কাঁদোকাঁদো চোখে) প্রমি খুন হয়েছে!! কি বলেন??
ওসি : এক সপ্তাহ আগে তাকে খুন করা হয়েছে।।
রমেশ মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল।।আর বলল: আগামী মাসে আমাদের বিয়ে হওয়ার কথা।।
সম্রাট : প্রমির কি কারো সাথে কোনো সমস্যা ছিল??
রমেশ: না ত।।
সম্রাট : আপনার তথ্যর জন্য ধন্যবাদ।।
ওসি ও সম্রাট বেরিয়ে এল।।
ওসি: কি বুঝতেছেন??
সম্রাট :বুঝতেছি অনেক কিছু…
ওসি: কি??
সম্রাট: আপনি আমাকে রমেশ এর ব্যাংক হিসাবের সব তথ্য ব্যবস্থা করে দেন।।
ওসি: ওকে।
সম্রাট বাড়িতে গিয়ে ৫ ঘন্টা মত গান শুনল।।গান শুনলে নাকি তার মাথা খুলে যায় এটা তার ধারণা।। হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠল।। খুলে দেখে ওসি সাহেব এসেছে।।
সম্রাট : আরে ওসি সাহেব যে, আসুন ঘরে আসুন।। নতুন কোনো খবর।।
ওসি ঘরে ডুকতে ডুকতে বলল: আরে রমেশ এর ব্যাংকে অনেক টাকা এসেছে প্রমির কাছ থেকে।। তার উপর রমেশ গত ২০ দিন আগে কার কাছে জানি ২০ লক্ষ টাকা পাঠিয়েছে।।
সম্রাট : হঠাৎ চমকে উঠে তাই নাকি??
ওসি: হুম।
সম্রাট : ওই টাকা কাদের কাছে গেছে তাদের খুজে বের করেন।। বাকিটা একদম সোজা।
ওসি : মানে কি??
সম্রাট : আগে ওদের খুজে আনুন তার পর বলি।।
ওসি: ওকে
ওসি চলে গেল।। কিন্তু সম্রাটের মনে খটকা রয়ে গেছে। রমেশ নাকি প্রমির প্রেমিক আর ওদের নাকি বিয়ে হওয়ার কথা।। তাহলে প্রমিকে খুন করে তার লাভ কি!!
আসলেই ভাবার বিষয়।। যতক্ষণ না ওরা ধরা পরছে ততক্ষণ সম্রাট এর বসে থাকা ছাড়া কোনো উপায় নাই।।
[nextpage title=”শেষ পর্ব”]সম্রাটকে চিন্তিত দেখে ওসি তাকে জীজ্ঞেস করল: কি হয়েছে আপনাকে এত চিন্তিত মনে হচ্ছে কেন!
সম্রাট : চলুন জনির সাথে কথা বলব…
ওসি: কেন!
সম্রাট : কেন গেলেই বুঝতে পারবেন।
ওসি আর সম্রাট গেল জনির সাথে দেখা করতে।
সম্রাট: জনি, তোরে কিছু প্রশ্ন করব সত্য বলবি…..
জনি: বলব স্যার।
ওসি: আর যদি মিথ্যা বলিস…. কি করব ত জানিস।।
সম্রাট : তোরা যখন গুলি করেছিলি প্রমি চিৎকার করেছিল??
জনি: না স্যার, একদম মরার মত পরে ছিল।।
সম্রাট : I got it..
ওসি: তার মানে প্রমি আগেই মারা গিয়েছিল।।
সম্রাট :মারা যায় নি মেরে ফেলা হয়েছে।।
ওসি: কিভাবে বুঝলেন??
সম্রাট: পোস্টমর্টেম রিপর্ট এসেছি কি??
ওসি: আজ আসবে।।
সম্রাট : তাহলে ওই রিপর্ট নিয়ে আমার বাসায় আসুন।।
ওসি: ওকে
তারপর নিজের বাসায় গিয়ে সম্রাট গান শুনতে লাগল।। হঠাৎ তার মনে পরল নিশিকে ভাল করে চেক করা হয় নি।। তারপর নিজের বেশভুশা ঠিক করে নিয়ে বের হয়ে গেল।। সম্রাট গেল মমতা কোলনিতে।। ও দারোয়ান কে ডাকল।

সম্রাট: এই প্রমি সব থেকে ভাল বন্ধু কে ছিল?
দারোয়ান : নিশি।
সম্রাট : তুমি কি নিশ্চিত?
দারোয়ান : হুম স্যার।। আর ওরা ত ছোট বেলার বন্ধু।।
সম্রাট : আসলে।। নিশি বলল ওরা নাকি শুধু বন্ধু।।
দারোয়ান : না স্যার।। ওরা ত এক জন আরেক জনকে ছাড়া চলত না।।
সম্রাট: ও। তুমি নিশির ওপর নজর রাখবে।।
সম্রাট আসার সময় দারোয়ান কে ২০০০ টাকা দিয়ে আসল।আবার নিজের বাসায় ফিরে আসল সে।। ফিরে আসার ১ ঘন্টা পর ওসি এল।। তার হাতে পোস্টমর্টেম রিপর্ট। সম্রাট হাত বাড়িয়ে নিল ফাইলটা।।
রিপর্ট পরে যেন স্তম্ভিত সম্রাট।। এটা কি হল।। রিপর্ট এ লেখা ছিল— প্রমির মৃত্যু হয়েছে গলায় ফাস দিয়ে। তার গায়ে কারো হাতের ছাপ নেই। নেই কোনো ধস্তাধস্তির চিহ্ন।। আর তার মৃত্যু হয়েছে রাত ১২ টায়।। কিন্তু গুলি করা হয়েছে রাত ৩ টায়।।
এটা পড়ে সম্রাট ভাবে তাহলে কি এত দিন নকল খুনির পিছনে ছুটছিলাম।। হঠাৎ সম্রাটের নিশির কথা মনে পরল। সম্রাট ওসি কে বলল নিশির নম্বারের কল রেকর্ড ও জিপিএস ট্রেক করে রাখতে ওই রাতের।। এরপর ওসি চলে গেল। তারপর সম্রাট ভাবতে লাগল।।নিজের টেবিলের উপর রাখা সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে।। সিগারেট ধরিয়ে কয়েক টান দিয়ে ফেলে দিল।
পরের দিন সকালে ওসি নিশির জিপিএস ট্রেক করে আনে।
ওসি: ওই রাতে নিশির নম্বার মমতা কলনির মধ্যে ছিল।
সম্রাট : কি বলেন। ও বলেছিল ওই রাতে ও বাসায় ছিল না।

ইতিমধ্যে সম্রাটের মোবাইলে কল আসল দারোয়ান এর।। ও বলল নিশি নাকি কলনী ছেড়ে চলে যাচ্ছে।। সাথেসাথে সম্রাট আর ওসি কলনীতে গিয়ে হাজির।। দেখে নিশি ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ওসি: কই যাচ্ছেন, নিশি??
নিশি:একটু বাড়ি যাব।
ওসি: ও ভাল কথা।।
নিশি: কি হয়েছে?
ওসি: বাড়ি যেতে পাসপোর্ট লাগে নাকি??
নিশি: থতমথ খেয়ে, কি বলছেন এই সব??
ওসি: কালরাতে পাসপোর্ট কেন করিয়েছেন?? তার উপর আপনি ওই রাতে কলনীতে ছিলেন। আপনি আমাদের সাথে চলুন।।ওসি নিশিকে হাজতে নিয়ে গেল।। তার পর শুরু হল জীজ্ঞাসাবাদ।।
ওসি: ওই রাতে কি হয়েছিল বলুন??
নিশি: কোন রাতে!!
ওসি: যে রাতে প্রমির খুন হয়েছিল….
নিশি: আমি ছিলাম না।
ওসি: আপনার জিপিএস বলে আপনি ছিলেন
নিশি চুপ করে ছিল।
ওসি: ভালোই ভালোই বলেন।। না হলে থার্ড ডিগ্রি দিতে বাধ্য হব।।
নিশি চুপ করে ছিল। তারপর ওসি এক মহিলা কন্সটেবলকে ডাকল।। তারপর চলল নিশির উপর থার্ড ডিগ্রি। ৩ ঘন্টা পরে ওসি এল।।
নিশি: স্যার আমি বলতেছি।
ওসি: বলুন।
নিশি: স্যার আমাকে রমেশ বলেছিল সে আমাকে ভালোবাসে।।কিন্তু প্রমি তাকে ওর সাথে রিলেশন করতে বাধ্য করেছে।। এখন ও প্রমিকে ছাড়তে চায়।।ও আমার কাছে এসব বলে কেঁদেছে। আমি ও রমেশকে ভালোবাসতাম।।
ওসি: তারপর।।
নিশি: আমি প্রমিকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নি। তাই একদিন আমি দারোয়ান কে বলি রাতে আসব না। আমি ১২ টা নাগাত পেছনের দরজা দিয়ে চুপিচুপি ঘরে ডুকি।। আমি সাথে বিয়ার এনেছিলাম।। আর প্রমি কে বলাম আমার প্রমোশন হয়েছে তাই পার্টি করব।। তারপর ওকে বেশী করে মদ খাইয়ে নেশাগ্রস্ত করলাম।। ও নেশা করায় আমাকে বলতে শুরু করলাম রমেশ ওকে আর ভালবাসে না।। আমি বললাম ওকে মরার অভিনয় করতে।। তারপর আমি রমেশ কে কল দিব।।তারপর ওর গলায় ফাস দিয়ে ওকে একটা চেয়ার এর উপর দাড় করালাম।। রমেশ কে কল দিব বলে আর চেয়ারটা সরিয়ে দিলাম। তারপর ওর লাশটা বিছানায় শুইয়ে দিলাম।।
ওসি: ওর শরিরে ত করো ফিঙ্গার প্রিন্ট ছিল না!
নিশি: আমি হাতে দস্তানা পরে ছিলাম।।
ওসি: এই আপনার বন্ধুত্ব ছিল।। আপনার বন্ধুর চেয়ে ত শত্রু ভাল।।
সম্রাট ভাবল আজকাল কার বন্ধুত্ব শুধুই নামের।। রমেশ আর নিশির খুন আর ধোকার অভিযোগ এ ১৪ বছরের জেল হয়েছে।।

[বি.দ্র:বন্ধু নির্বাচনে সচেতন হন।।]


আমাদের উৎসাহিত করুনঃ




সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এই লেখাটি কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয় ।

লেখক সম্পর্কেঃ

বুনন সম্পর্কিত তথ্যঃ