স্বামী নামক অমানুষ

মনীষা হিসাব বিজ্ঞান অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্রী।দেখতে শুনতে মন্দ না। বডি ফিটনেস ভালো। মায়াবী চেহারা, পলাশ রাঙ্গা ঠোঁট, কাজল কালো ভ্রু,টানা টানা চোখ,এক কথায় বলা চলে খুব সুন্দরী। শুধু তাই নয় খুব মেধাবীও বটে।সুন্দরী মেয়েদের ক্ষেত্রে যা হয় আর কি,ইয়্যং ছেলেদের চোখ থাকে সব সব… ।
তাছাড়া বর্তমানে মেয়েরা যে হারে সাজু-গুজু….।
আর ফ্যাশন ডিজাইনারেরা পোশাক বানানোর ক্ষেত্রে কোন কৃষ্টিকালচার্ড ভাবেন না,যেমন সামাজিক,কোরান ও সুন্নাহ….।
টাকা কামানো তাদের মূল উদ্দেশ্য। মাঝে মাঝে এমন আনকালচার্ড পোশাক বানান যা পরলে মেয়েদের সৌন্দর্য নষ্ট হয়,পাছে ইভটিজিং’র শিকার হয়। আর তাদের আমল নামায় লেখা হয় কবীরা গুনা। যা কখনো ক্ষমার যোগ্য নয়। অর্থাৎ পরকালে যার স্থান হবে জাহান্নামের সর্বোচ্চ স্থানে। আল্লাহ পাক কোরানে কঠিন ভাষায় উল্লেখ করেছেন মানুষ তার কর্মের ফল যথাযত ভাবে পাবে। অর্থাৎ যে ভালো কাজের সুপারিশ করবে তার আমল নামায় নেক লেখা হবে, যে খারাপ কাজের সুপারিশ করবে তার আমল নামায় পাপ লেখা হবে। মানে পোশাক ডিজাইনারেরা যে সব নোংরা পোশাক বানিয়ে মার্কেটে ছেড়ে দিয়েছেন, তা পরলে মেয়েরা যতটুকু পাপের অংশীদার হবে, তার চেয়ে বেশি পাপি হবেন সেই পোশাক ডিজাইনারা। যা আল্লাহ পাক কখনো ক্ষমা করবেন না। যাক সেই প্রসঙ্গ, আমরা এবার মনীষার প্রসঙ্গে আসি। মনীষার পরনে কোন নোংরা পোশাক ছিলো না। তার শরীর বোরকায় ঢাকা ছিলো। মাথায় স্ক্যাপ,শুধু মুখটা খোলা ছিলো।সে কলেজ থেকে বের হয়ে ষ্টেশনে এসে দাঁড়ালো, গাড়ির জন্য অপেক্ষা……।
প্রায় আধ ঘন্টা পার হলো, গাড়ি ষ্টেশনে এসে থমকে দাঁড়ালো মনীষা উঠে সিটে বসলো। কয়েক মিনিটের মধ্যে গাড়ি হর্ণ বাজিয়ে ষ্টার্ট দিলো। গাড়ি চলছে তো চলছে। মনীষা আশ পাশ না তাকিয়ে আপন মনে বসে আছে। কিন্তু ইয়্যং ছেলেদের চোখ তো আর থেমে থাকে না। সুন্দরী মেয়ে দেখলে তাকায় আর তাকায়…।
ঠিক মনীষার চোখে চোখ পড়লো আপেলের মত চেহারার মানুষ ব্যাংকার রিপনের। তার পলক যেন পড়ছে না।কিভাবে মনীষার সঙ্গে কথা বলবে এই চিন্তাই মগ্ন। মনীষা ব্যাপারটা বুঝতে পেরে মাথা নিচু করে নিলো। গাড়ি চলছে তো চলছে।মাঝের ষ্টেশনে এসে গাড়ি ব্রেক করলো। চোখের পলকে মনীষা নেমে পড়লো। রিপনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে কখন মনীষা নেমে পড়লে তা সে টের পেলো না। রিপন আপন মনে বলে উঁহু অসহ্য লোকজনের এত যে ঠাসাঠাসি, যেখানে যায় মানুষ আর মানুষ, গাড়ি বলো বাড়ি বলো। গভঃমেন্ট গলা ফাটিয়ে, কড়া আইন প্রয়োগ করে জন্ম নিয়ন্ত্রন ও বাল্য বিবাহ রোধের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা।বাল্য বিবাহের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলেছে। আর এই বাল্য বিবাহ হলো জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রধান কারন। গভঃমেন্ট যতই চেষ্টা করুক জনগন সচেতন না হলে এই বাল্য বিবাহ রোধ করা কিছুতেই সম্ভব না। সরকারের পাশাপাশি জনগনকে এগিয়ে আসতে হবে এবং বাল্য বিবাহ রোধ করতে হবে। তবে দেশ ও জাতির উন্নতি হবে।
যেখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব সেখানে সমস্যা। আজও অনুরুপ তাই হলো। গাড়ি ষ্টেশনে জন সংখ্যার এত ভিড় ছিলো যে, কেউ উঠছে, কেউ নামছে, যার কারনে রিপন আঁছ করতে পারলো না মনীষা নেমে কোন দিকে গেল। যা রিপনের মাথায় একমাত্র টেনশনের কারন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাসায় গিয়ে সে চিন্তা ভাবনায় মগ্ন। কিভাবে মনীষার সঙ্গে দেখা….।
এদিকে মনীষা ইজি চেয়ারে বসে বসে এই অপরিচিত লোকটাকে নিয়ে ভাবনার রাজ্যে….।
এমন সময় মা এসে বলে,
মনীষা বসে বসে কি ভাবছিস, খেতে আয়।
মায়ের ডাকে সাড়া দিলো মনীষা। খেতে বসলো ডাইনিং টেবিলে। কিন্তু কেন জানি আনমনা। প্লেটে হাত দিয়ে নাড়া ছাড়া…….।
মনে হয় কি সব ভাবছে।দৃশ্যটি মায়ের চোখে পড়লো। মা বুঝে মেয়ের ভাব সাব। তাই জিজ্ঞেস করলো,
মনীষা খেতে বসে কি ভাবছিস?প্লেটের সব খাবার এখনো পড়ে আছে।
মায়ের কথায় তার টনক নড়লো। সে চমকে উঠে, কোন কথার জবাব না দিয়ে তাড়াতাড়ি খেয়ে নিলো।
এদিকে রিপন সারারাত ভেবেছিলো, কিভাবে মনীষার সঙ্গে দেখা করবে, ও তার মনের রাজ্য জয় করবে। সকালে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেস হয়ে নাস্তা করলো, তারপর বেরিয়ে পড়লো। ডিউটি শেষ করে প্রায় আধ ঘন্টা পূর্বে ঐ ষ্টেশনে রেষ্টুরেন্টে এসে বসে পড়লো। তার ধারনা আজও মনীষা এই ষ্টেশনে আসবে। প্রায় ঘন্টা খানেক পরে মনীষা ষ্টেশনে এসে থমকে দাঁড়ালো, গাড়ি আসতে লেট হবে, তাই সেও রেষ্টুরেন্টে গিয়ে বসে পড়লো।কি আশ্চার্য দু’জন মুখোমুখি।রিপন ক’মিনিট তাকিয়ে রইলো। কিভাবে পরিচয় পর্ব শুরু করবে তার ভাব ভঙ্গিমা… ।আড়মোড় খেয়ে রিপন বলে উঠলো,
প্লিজ আপনার পরিচয়টা কি জানতে পারি?
মনীষা আপন মনে বলে, এই লোকটার সঙ্গেতো সেদিন বাসে দেখা হয়েছিলো, যে আমার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো। দেখতে তো ভালোই লাগছে হ্যানসাম। কি জানি কি তার মনে, অবিবাহিত, নাকি বিলেন? মানুষের বাহ্যিক সৌন্দর্যতে তো সব কিছু প্রমান হয়না। ভিতরের সৌন্দর্য হলো আসল সৌন্দর্য। যেমন শিক্ষা, উত্তম চরিত্র, ভদ্র আচরণ, মাধুর্য ও সৌন্দর্য, ধৈর্য সহনশীলতা,ন্যায়পরায়ণতা, সত্যবাদিতা,নামাজী, উদারতা দানশীল ও মনুষ্যত্ব এই সমস্ত গুণাবলী যাদের ভিতরে আছে তারা হলেন সত্যিকারের পুরুষ। আর তারাই বুঝবেন নারীর আত্নমর্যাদা ও সম্মান কতটুকু। যা আল্লাহ পাক পবিত্র কোরানের বহু স্থানে উল্লেখ করেছেন।
মনীষাকে চুপচাপ ভাবতে দেখে রিপন বলল,
কিছু বলছেন না যে, চুপচাপ কি….।আপনার পরিচয়টা তো অন্তত বলবেন?
মাথা নেড়ে সাঁয় দিল মনীষা,
ঠিক বলেছেন, আমি মনীষা হিসাব বিজ্ঞান অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্রী। আর কিছুই বলার সুযোগ সে পেলো না।গাড়ির হর্ণের আওয়াজ শুনতেই সে ছুটে গেল ষ্টেশনে। দ্রুত পায়ে উঠে বসলো গাড়িতে,গাড়ি দিল দৌড়… ।রিপনও থেমে নেই, পেছনে পেছনে এগিয়ে চলল। কিন্তু কোন গাড়িতে যে মনীষা উঠলো তা সে টের পেলো না। যার অপেক্ষায় আধ ঘন্টা আগে আসা, সে বহু লোকের ভিড়ে হারিয়ে গেল, কোন অজানায়…।
ভাবনার রাজ্যে ডুবে গেল রিপন।
এদিকে মনীষা সবেমাত্র বাসায় ফিরলো।ওয়াস রুমে হাত মুখ ধৌত করছে।এমন সময় মা এসে বলল,
মনীষা ফ্রেস হয়ে তাড়াতাড়ি রেডি হয়েনে।
কেন মা…?
পাত্র পক্ষ তোকে দেখতে আসবে তাই।
মায়ের কথার অবাধ্যতো আর হতে পারবে না, মনীষা রেডি সাজু-গুজু… ।বলতে না বলতে পাত্র পক্ষের ড্রয়িং রুমে প্রবেশ….।
ভিতর মহলে কল পড়লো কনেকে নিয়ে আসার জন্য। ট্রে হাতে ড্রয়িং রুমে কনের প্রবেশ। সালাম দিতে পাত্রের মা বলে উঠলো,
বস মা বস।
বিয়ের পূর্বে বরকে এক পলক দেখার ইচ্ছা সব মেয়ের হয়। মনীষার মনেও তাই হলো। তাছাড়া বরতো সামনে বসে আছে। এক পলক দেখতে দোষ কি? মনীষার লজ্জামাখা মুখখানি একটু তুলে সামনে তাকাতে একি দেখলো! সেই ছেলেটি যার সঙ্গে বার বার দু’বার দেখা হলো। রিপনের মনেও একই ভাবনার উদয় হলো। খুশিতে গদগদ, আপন মনে বলে,আমি তো এই মেয়েটিকে চেয়েছিলাম, যাক ভাগ্য চক্রে তার সঙ্গে আমার বিয়ে… ।দেখা দেখির পর্ব শেষ। এবার বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করার পালা।পাত্রের মা বলল,
ভাইজান আপনার মেয়েকে আমাদের খুব পছন্দ হয়েছে। আমার ছেলের জন্য এমন একটি মেয়ে খুঁজছিলাম। এবার দিন তারিখ…. ।
কনের বাবা মা বলে,
শোকর আলহামদুলিল্লাহ।
দু’পক্ষের পরামর্শ ক্রমে বিয়ের দিন ঠিক করলো। তারপর মহা ধুমধাম করে অনুষ্টানের মাধ্যমে মনীষাকে রিপনের বউ করে নিয়ে গেল। মনীষা এখন তাদের পরিবারের বড় বউ। তার কাঁধে অনেক বড় দায়িত্ব, শ্বশুর শ্বাশুড়ী দেবর ননদ, সবাইকে ম্যানেজ করা। আর পরিবারের লোকজনের ও তার প্রতি কিছু করণীয় আছে।যেমন স্নেহ,ভালোবাসা, আদর যত্ন, আত্নবিশ্বাস,মান সম্মান,মর্যাদা নিজের ফ্যামিলির লোকের মতো আপন করে ভাবা।কারন এই ফ্যামিলির সবাই তার কাছে নতুন সদস্য। তার কাছে এই জগৎটা সম্পূর্ন নতুন, কিভাবে কি করতে হবে তার কিছুই সে জানেনা।এই অজানাকে জানার জন্য ফ্যামিলির সবার হেল্প তার দরকার। তাকে আপন করে পেতে হলে তার স্বামী, শ্বশুর, শ্বাশুড়ী,ননদ দেবর, সবাইকে সব কাজে সহযোগিতা করতে হবে। তা না হলে সে কখনো তার ফ্যামিলির লোকের সাথে ম্যাচিউর হতে পারবে না।এই প্রবণতা আমাদের সমাজে নেই বললে চলে।এই জন্য একান্নবর্তী ফ্যামিলিগুলো আলাদা আলাদা সংসার পাতছে। এর মূল কারন হলো পুরো ফ্যামিলির কাজের দায়িত্ব বউয়ের কাঁধে তুলে দেওয়া হয়। বউকে সব সময় পর ভাবা হয়। কখনো আপন করে নেয়ার চেষ্টা করে না। সে যে বউ এই কথাটা শ্বাশুড়ীরা ভুলে যান। প্রায় শ্বাশুড়ীরা কথায় কথায় বলে, সংসারের কাজের জন্য ছেলেকে বিয়ে করালাম, আর এখন কিনা বউ ছেলেকে নিয়ে শুয়ে শুয়ে গল্প….। একবারও ভেবে দেখেন না, এটা কি বউ,না কাজের মেয়ে। বউকে কাজের মেয়ে, আর কাজের মেয়েকে বউ, কখনো ভাবা যাবে না। আর এটাই হলো বর্তমান শ্বাশুড়ীদের একটা কু’অভ্যাস,যা বর্তমানে কঠিন ব্যধিতে পরিণত হয়েছে। যার কারনে সংসারের সুখ শান্তি,বউ শ্বাশুড়ীর অমিল,সংসার ভাঙ্গার প্রবণতা, বেড়ে গেছে বহু-গুনে। এ সবের মূল কারন হলো শ্বাশুড়ীদের আনকালচার্ড অযুক্তিক প্রসঙ্গ পরিবারের মাঝখানে তুলে ধরা,যা পরিবারের সুখ শান্তি নষ্ট করে।
সব সময় পরের মেয়ের গাড়ে দোষ চাপানো শ্বাশুড়ীদের আর একটা কু’অভ্যাস। মনীষার বেলায়ও তাই হলো, সংসারের সব দায়িত্ব তার হাতে তুলে দিয়ে সবাই ফ্রি। মনে হয় সে পরিবারের একটা কাজের মেয়ে । সকাল হতে না হতে তার কাজ ফ্যামিলির সবার জন্য ব্রেকফাষ্ট রেডি করে ডাইনিং টেবিল সাজানো।নতুন বউ, নতুন পরিবেশ তার উপরে সংসারের কাজ তার গাড়ে একলা… ।একটু হিমশিম তো খাবে, আর লেট হওয়াটা তো স্বাভাবিক। সকাল দশটা শ্বাশুড়ী হাই তুলতে তুলতে উঠে বসলো। এখনও ঘুমের ঘোর যেন কাটছেনা, আর কাটবে বা কেন? স্টার ঝলসার সবগুলো সিরিয়াল দেখে তো শুয়েছেন, তাই শরীর ম্যাজম্যাজ করছে।স্টার ঝলসা এখন বাংলাদেশী নারী পুরুষের মাথায় মগজের মধ্যখানে স্থান করে নিয়েছে। যার একটা পর্ব না দেখলে উইপোকার মত মাথার মগজ-গুলো কিলবিল করতে থাকে। যেমন করে হোক অনলাইন থেকে ডাউনলোড করে দেখে তবে শান্তি। মনীষার শ্বাশুড়ীর ঠিক একই অবস্থা তাই উঠতে লেট। আর নামাজ রোজাতো নেই বললে চলে। তাই সকালে উঠার প্রয়োজন হয় না। কোরানের বিধি বিধান প্রায় ভুলতে বসেছে বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা। এখন মডেলিং হচ্ছে নিউ যুগের নিউ ফ্যাশন। মডেলিং না করে কেউ যদি বোরকা পরে গ্রাম থেকে শহরে আসে, তাকে গ্রামের গেঁয়ো ভূত বলে অপমান করা হয়।এ হলো বর্তমান আধুনিক যুগের কৃষ্টিকালচার্ড।
এদিকে মনীষা একা মানুষ ব্রেকফাষ্ট রেডি করতে একটু লেট হলো। ডাইনিং টেবিল এখনও সাজানো হয়নি। শাশুড়ীর তো মাথা গরম, এখনও ডাইনিং টেবিলে নাস্তা নেই কেন?তিনি উচ্চস্বরে ডাক দিলেন,
মনীষা সকাল দশটা এখনও নাস্তা রেডি হয়নি কেন?এত সময় ধরে কি কাজ করেছিলে?
শুরুতে কড়া ধমক, ভয়ে থত্থর মনীষা।কোনমতে তাড়াহুড়া করে ডাইনিং টেবিল সাজালো। স্বামী,শ্বশুর, শ্বাশুড়ী, দেবর, ননদ,সবাই খেতে বসলো। মনীষা একপাশে দাঁড়িয়ে রইল।খানা শেষে সবাই স্ব-স্ব স্থানে চলে গেল।কেউ একবারের জন্যও জানতে চাইলো না, বউ খেয়েছে কি না? পাছে নতুন বউকে আপ্যায়ন করাতো দূরের কথা। এমনি কড়া আইনের মধ্য দিয়ে চলেছে মনীষার সংসার।মাঝে মাস ছ’য়েক পার হলো। শাশুড়ী কড়া ধমক দিলেও স্বামী তার পক্ষে ছিলো। ঠিক মতো তার টেক কেয়ার করতো। তাই মোটামুটি ভাবে সে সন্তুষ্ট ছিলো। ভালোভাবে কেটে চলেছে তার দিন-গুলো। বাবার বাড়ি থেকে এসেছে বেশ ক’দিন হলো। কথাটা ভাবতেই মনের আকাশ হু হু করে কেঁদে উঠলো। তখনি বাবাকে ফোন দিয়ে নিয়ে যেতে বলল।
সকাল দশটা, বাবা মেয়ের বাড়িতে পদার্পন করলো। বৈঠক খানায় বেয়াইন সাহেবা বসাত। তাকে সালাম দিতে তিনি সালামের জবাব দিয়ে তাকে ভিতরে নিয়ে গেলেন। দু’জনার কুশল বিনিময় পর্ব শেষ। এবার মনীষার প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা শুরু…। মনীষার বাবা বলে,
বেয়াইন সাহেবা, নতুন মেয়ে ‘এসেছে বেশ ক’দিন হলো। আমি তাকে নিতে এসেছি। আপনি যদি অনুমতি দেন আমি তাকে নিয়ে যাবো।
এই সেরেছে, একেতো ছেলের মা, তার উপরে পাওয়ার, ফুলে একেবারে বোম, আর কি থেমে থাকতে পারে? কড়া স্বরে বলে উঠলো,
মেয়ে বিয়ে দিয়ে এত দরদ দেখাচ্ছেন কেন? ক’দিন হলো এসেছে। এক্ষনি তাকে নিতে এসেছেন। তাছাড়া সে চলে গেলে সংসারের কাজ করবে কে? এখন সে যাবেনা আপনি চলে যান।
জবাব দিল মনীষার বাবা,
কি বলেন বেয়াইন সাহেবা, নতুন মেয়ে এতদিন থাকার পরও…..।
আপনার কাজের জন্য মেয়ে বেড়াতে পারবে না, এত বড় নোংরা কথা! আমার মেয়েকি কাজের বুয়া?যে কাজ মিস দিলে টাকা কাটা যাবে।
বেয়াইন সাহেবা আরও ফুলে উঠে বলে,
মেয়ের বাবা হয়ে আমাকে এত বড় জঘন্য আচরন! তাও আবার আমার বাড়িতে,আমাকে এত বড় অপমান! ওরে তোরা কে কোথায় শুনে যা রিপনের শ্বশুর আমাকে…. ।
কথা বলার ফাঁকে তিনি কেঁদে উঠলেন।ফ্যামিলির লোকজন কি আর থেমে থাকে, তার উপরে পাত্র পক্ষ।সবাই মিলে মনীষার বাবাকে সিরিয়াস ভাবে অপমান করলো। এত অপমানের পর কোন বাবা স্থির থাকতে পারে বলুন। মেয়েকে নিতে এসে এত অপমান অপধস্ত সহ্য করা যায়। রাগে ক্ষোভে তিনি বাড়ি ফিরে গেলেন।
এদিকে মনীষাকে নিয়ে সবাই ছুটলো। কারো মুখ কি আর থেমে থাকে। হাজার হোক মা তো, তার উপরে উনার চোখের পানি, সন্তানেরা কি সহ্য করতে পারে?সবাই একবাক্যে বলাবলি শুরু….।
তোর বাবার এত বড় সাহস আমাদের বাড়িতে এসে মা’কে অপমান। এর পরিণাম যে কত ভয়াবহ তা তুমি বুঝতে পারবেনা, শুধু সময়ের অপেক্ষা….।
মনীষা চুপচাপ, কোন কথা বলার মতো পরিবেশ নেই। অঝর ধারায় চোখের জল পড়ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে রিপন উপস্থিত। সবাইর উচু কন্ঠে আওয়াজ….।
কারন জানতে চাইলে মা কেঁদে উঠে বলে,
তোর শ্বশুর আমাকে উঁঃ উঁঃ উঁঃ, কেন তোকে দশ মাস দশদিন পেটে ধরলাম,এমন কথা শোনার আগে আমার মরন হলো না কেন?
তিনি বিছানায় গড়াগড়ি দিয়ে জোরে জোরে কাঁদছেন। মনে হয় কেউ তাকে মেরে রক্তাক্ত করেছে।
রিপন ভাবলো সত্যি সিরিয়াস কিছু ঘটেছে। তাই আলতো করে সোহাগের সহিত মায়ের চোখের জল মুছে দিয়ে নরম স্বরে জিজ্ঞেস করলো।
মা কি হয়েছে, কাঁদছ কেন?আগে বলবে তো কি হয়েছে?
এবার তিনি মায়া কান্না থামিয়ে বলতে শুরু….।
মিথ্যাবাদী দজ্জাল শ্বাশুড়ীদের একটা কু’অভ্যাস ইনিয়ে বিনিয়ে কথা বলা। আর সত্যকে ঢেকে রেখে মিথ্যা বানোয়াট গল্প বলে ছেলেদের কান ভারী করা। ইয়্যং ছেলেদের মন মেজাজ সব সময় গরম থাকে। এই গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট আধুনিক যুগের মা বাবা বুঝতে মোটেও চেষ্টা করেন না। পাছে উস্কানি দিয়ে ছেলেদের মাথা নষ্ট করে দেন। ঠিক আজও তাই হলো। বেয়াইর বিপক্ষে কিছু মিথ্যে বানোয়াট গল্প বলে ছেলের মাথা নষ্ট করে দিলেন। ছেলের মেজাজ কি আর থেমে থাকে? হাজার হোক মা তো, মায়ের অপমান কি বর্দাস্ত করা যায়। রিপন ইন্টারনেট গতিতে ছুটে গিয়ে নতুন বউয়ের তুলতুলে গালে কষে দিল চড় । দু’চারটা চড় মারতে তার গাল ফেটে রক্ত বেরিয়ে পড়লো। গাল ফুলে তুয়া তুয়া। মনীষা মাথা ঘোরে পড়ে গেল। তবুও তারা থামলো না। ক’মিনিট পরে মনীষা একটু সুস্থ বোধ করলো। তখনি বাবাকে ফোন দিয়ে বলল,
বাবা ওরা আমাকে খুব মেরেছে, আমার মুখ ফেটে রক্ত…..।
সে আর কিছুই বলতে পারলো না। কেঁদে উঠলো।
মেয়ের কান্না শোনে বাবার চোখের জল আর ধরে রাখতে পারলো না। কেঁদে কেঁদে বলে,
এই অমানুষটা শেষ পর্যন্ত আমার মেয়ের গায়ে হাত তুললো,না বুঝে না শুনে ঘটকের কথায় বিশ্বাস করে এই অমানুষের হাতে….।
আমি ওকে ছাড়বো না,পুলিশে দেবো। বলতে না বলতে তিনি পুলিশ কল করলেন। নারী নির্যাতন মামলা দায়ের করার সকল প্ল্যান ওকে। ঠিক সেই মুহূর্তে মনীষা ফোন করে বলে,
বাবা শুরুতে পুলিশ কেচ, লোকে শুনলে কি ভাববে!
বাবা রেগে উঠে বলে,
কে কি ভাবলো তা ভেবে কাজ নেই। নর পশুটি বিনা অপরাধে কেন তোর গায়ে হাত তুললো, তাকে সিরিয়াস পানিস্টম্যান্ট দিয়ে তবে আমি শান্ত।
বাবার কড়া আইন শুনে মেয়ে বলে, বাবা আমি তোমার কাছে মাফ চাই, তুমি পুলিশ নিয়ে এসো না। আমার কপালে যা আছে তাই হবে। আমার সংসার আমি সামলাবো।
মেয়ের অনুরোধে বাবা আপাতত থামলেন। কিন্তু টেনশন মুক্ত হলেন না। যে মেয়ের গায়ে বাবা কোন দিন হাত তুলেন নি, সেই আদরের মেয়েকে এত অমানুষিক নির্যাতন! উহু! ভাবতেই বাবার বুক ফেটে যাচ্ছে। ইচ্ছে করছে পরিবার শুদ্ধ সবাইকে গন-ধোলাই দিতে। কিন্তু মেয়ের অনুরোধে…….।
এদিকে মা ছেলেকে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে ভুল বুঝাতে শুরু…।বউ ভালো না, তার অন্য ছেলের সাথে রিলেশন, এই মেয়ের দ্বারা সংসার হবেনা। দেখলি না সে মাথা ঘুরে পড়ে গেল, আমি শুনেছি তার কঠিন রোগ, অনেক বড় বড় ডাক্তার দেখিয়েছে, কিন্তু রোগ সারছে না। আমি শুনেছি স্বামী কাছাকাছি থাকলে তাকেও এ রোগে ধরবে। আমার চাকরীজীবি ছেলে, এমন কি দিয়েছে? নিচু মানের কটা ফার্নিচার, আমার দেখে ঘেন্না….।
ছিঃ ছিঃ এত ছোট জাতের মানুষ! অন্য কোথাও বিয়ে করালে অনেক অনেক…… ।
ছলনাময়ী মা, মায়া কান্না কেঁদে বলে, বাবা তুই আমার বড় ছেলে, অনেক আদর যত্নে তোকে মানুষ করেছি, আমি চাইনা তোর কোন সর্বনাশ হোক। আজ থেকে বউয়ের কাছ থেকে আলাদা শুইবি। আর কখনো শ্বশুর বাড়ি যাবিনা। যেমন করে হোক ওকে তাড়াতে হবে। তাড়ানোর কিছু প্রকিয়া…..।
তোকে একটু কড়া আইন প্রয়োগ করতে হবে। কথায় কথায় হুকুম জারি,আর না মানলে কড় চড়। দেখবি একদিন সে বলবে শ্বাশুড়ীর চেয়ে স্বামী খারাপ আমি চলে যাবো। তবে আমরা মুক্ত, আর পুলিশ কেচ হবে না।
মায়ের আদেশ শিরেধার্য, ভালো হোক আর মন্দ হোক। একেতো নাছনি বুড়ি আরও হলো ঢোলকের বাড়ি,ঢোলের বাজনা কি আর থামে, মায়ের শেখানো বুলি যথাযত ভাবে প্রয়োগ….।
অমনি সংসারের সুখ শান্তি নষ্ট, দাম্পত্য কলহ।একজন বিবাহিত ইয়্যং ছেলে বউ ছেড়ে আলাদা থাকা কি সম্ভব?আদৌ না। আর এই সুযোগে মোবাইল ফোনে রিপন ডার্লিং নিয়ে ব্যস্ত। তাছাড়া ভার্সিটি লাইফে অনেক মেয়ের সাথে তার রিলেশন ছিলো। যাকে বলে টাইম পাস। তাই সম্পর্ক গড়াতে লেট হলোনা। মায়ের কু’পরামর্শ ফলো করতে গিয়ে রিপন আজ নোংরা জগতের……।
ডজন খানেক ডার্লিং ইতিমধ্যে….. ।মোটা এমাউন্ট মাইনে তাই ডার্লিং’র পেছনে টাকা ব্যয় করতে সমস্যা হয় না। মিতা, রিতা, সীতা,…. সবাইকে বিয়ে করার আশায় আশায় টাইম পাস করার নামে নোংরামি……. ।
এদিকে ডার্লিংদের সময় দিতে অপিসিয়াল কাজকর্মে বরখেলাপ, নিয়মিত অনুপস্থিত, যখন-তখন অফিস ত্যাগ, আরও অনেক অনেক অনিয়ম তার। আজও সে অফিসে নেই ডার্লিং নিয়ে ঘুরতে গেছে হোটেল সেরাটনে। ঠিক সেই মুহূর্তে অডিট অফিসার এসেছে কাগজ পত্র চেকিং করতে। সকল স্টাফ, অফিসারের সামনে হাজির, কিন্তু ব্যাংকার রিপন নেই, তার কথা জিজ্ঞেস করতে সবাই সঠিক উত্তর দিলো……।
তিনি রেগে একেবারে আগুন। তক্ষনি দেখলেন কাগজ পত্র, তাও ঠিক নেই। সব কিছুতে অনিয়ম, কাজ কর্ম, স্বভাব চরিত্র, তাই আর লেট না করে তাকে চাকরী থেকে বরখাস্ত করলেন।
এদিকে বউ শ্বাশুড়ীর হ্রেষা হ্রেষি সম্পর্ক।কি ভাবে বউকে তাড়ানো যায় সেই চিন্তাই তিনি মগ্ন। একটু পান থেকে চুন খসলে চলে কটুক্তি যা বুকের মধ্যখানে মিছরির ছুরির মতো বাঁধে। একদিন, দুইদিন, তিনদিন, এর বাইরে কোন মেয়ে এত জঘন্য আচরণ সহ্য করতে পারবে না। সে যতই ভালো হোক।এজন্য প্রায় সময় বউ শ্বাশুড়ীতে কথা কাটা কাটি হয়। শ্বাশুড়ী প্রায়ই বলে,
তোর কিসের এত দেমাগ, বাবা এমন কি দিয়েছে যে, কথায় কথায় চ্যাটাং চ্যাটাং, আবার মুখে মুখে তর্ক , এত কাজ আমি একা করতে পারবো না, আর কোনদিন যদি এমন কথা বলিস সঙ্গে সঙ্গে গলা ধাক্কা দিয়ে…… ।
মনীষা আজ আর থেমে থাকলো না। রাগ অনুরাগ সব মানুষের থাকে। মনীষা অনেক সহ্য করেছে। আর কত! তাই প্রতিবাদী কন্ঠে বলে উঠলো, আমি আমার স্বামীর ঘর থেকে এক পাও নড়বো না। কারন এটা আমার অধিকার। যদি সাহস থাকে বের করে দেন।তারপর বুঝবেন কত ধানে কত চাল।
বউ শ্বাশুড়ী আরও কিছু সময় তর্ক বিতর্ক….. ।
ঘটনা খুব সিরিয়াস, শ্বাশুড়ী এক পর্যায়ে বউকে ঘর থেকে টেনে হেঁচড়ে……।
ঠিক সেই মুহুর্তে রিপন উপস্থিত। তার মেজাজ আরও হাই ইন্টারনেট গতিতে চলছে। কারন ইতিমধ্যে চাকরী বরখাস্তের খবর তার কানে এসে গেছে। অডিট অফিসারের কাছে মাফ চাইতে গেলে তিনি গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে বলেন,
তোমার মত অসৎ চরিত্রের লোককে কখনও এ পদে বহাল রাখা যাবেনা। এতে দেশের ক্ষতি দশের ক্ষতি। তাছাড়া তোমার সকল কু’কীর্তি আমি জেনে গেছি। যে নিজের বউকে রেখে পরনারী নিয়ে ফুর্তি করে সে কখনও ভালো হতে পারেনা। I say get out.
সেখান থেকে রিপনের মেজাজ হাই। তার উপরে বউ শ্বাশুড়ীর যুদ্ধ,সে আর থেমে থাকতে পারলো না। মনীষাকে মেরে রক্তাক্ত। পুলিশ কেচ করার কথা বললে, সে ভয় দেখিয়ে বলে,
আমাকে ফাঁসালে আমি ও ছাড়বো না। তোমাদের পরিবারের সবাইকে অস্ত্র মামলায়……।
সত্যকে লুকিয়ে মিথ্যা বাক্য পেশ করলো,
তোর বাবাকে বল, বিশ লাখ টাকা দিতে, আমি আর চাকরী করবো না, ব্যাবসা করবো। বড় লোক হতে হলে ব্যাবসা ছাড়া আর কোন উপায় নেই।
বউকে মেরে তার বাবার কাছে টাকা চাওয়া,ছিঃছিঃকি লজ্জা….।
এরা মানুষ নাকি জানোয়ার? সমাজে তিন চরিত্রের পুরুষ দেখা যায়। যেমন কেউ কেউ বিয়ের পর মা বাবাকে ভুলে যায়। বউয়ের কথায় উঠ বস করে। বউয়ের ভয়ে টাকা পয়সা সেবা যত্ন, কথা বার্তা সব কিছু বন্ধ করে দেয়। এমনও দেখা যায়, বউয়ের অসুখ হলে পকেট থেকে ভুরি ভুরি টাকা বের হয়। আর মায়ের অসুখ হলে পকেট খালী টাকা নেই বলে অযুহাত দেখায়। সর্বশেষে দেখা যায় মায়ের সাথে যোগাযোগ বিছিন্ন। সন্তান নেই বললে চলে। এদেরকে বলা হয় কু’সন্তান, মায়ের অভিশাপ। আল্লাহপাক পবিত্র কোরানে উল্লেখ করেছেন এদের ইহকাল পরকাল অমঙ্গলের হবে।তাদের জায়গা হবে জাহান্নামের সর্বোচ্ছ স্থানে। এতে কোন সন্দেহ নেই।
আর এক শ্রেণির পুরুষ আছে যারা বিয়ে করে শো মাত্র। মায়ের কথায় উঠ বস করে।বউকে হাজার নির্যাতন করলেও বলে আমার মায়ের কথার উপর কথা, বলার অধিকার আমার নেই। আমার মা বাবা আমার সবকিছু।এমন কি মায়ের অর্ডার ছাড়া শ্বশুর বাড়িতেও যাতায়াত করে না। কেনা কাটার কথা তো বাদএ দিলাম। অথচ ছেলে শিক্ষিত ও চাকরীজিবী। সেই ছেলে জানেনা স্ত্রীর অধিকার কি? এদেরকে বলে শিক্ষিত “স্টুপিড”।
সমাজে আরেক শ্রেণির পুরুষ আছে যারা মাঝামাঝি অবস্থানে আছেন। তারা মা এবং বউ দু’জনের অধিকার দায়িত্ব ও কর্তব্য মোটামুটি ভাবে পালন করেন। তাদের সংসারে নেই কোন দাম্পত্য কলহ, নেই বউ শ্বাশুড়ীর কেলেংকারী। মোটামুটি সুখে শান্তিতে দিনকাল যাপন করছে তারা।
প্রায়ই দেখা যায় সত্তর আশি বছরের বৃদ্ধ শ্রদ্ধাভাজন মায়েরা এখনও সংসারের বিভিন্ন কাজ কর্মে বউদেরকে হেল্প করছেন। নাতী নাতনীর টেক কেয়ার করছেন।
এবার চল্লিশ পঞ্চাশ বছেরর ইয়্যং শ্বাশুড়ীর দিকে একটু তাকায়। তারা কি করে দেখেন, ছেলেদেরকে শিক্ষিত করান, ঘুষ-টুষ দিয়ে একটা চাকরী,তারপর মেয়ে দেখা শুরু….. ।কমছে কম শত খানেক। কারন মেয়ে পছন্দ হলে, দেনা পাওনা মানে যৌতুকের হিসাব মিলেনা। আবার যৌতুকের হিসাব মিললে, মেয়ে পছন্দ হয় না। ছেলে চাকরীজীবি মা বাবা পাওয়ারে ফুলে একেবারে বোম।এক সময় দেখা গেল তাদের টার্গেট পূর্ণ হলো। মানে যৌতুক ও মেয়ে দুটো পছন্দ, তারপর বিয়ে। এরপর ছেলে কি পেলো, স্বর্ণ অলঙ্কার, টাকা পয়সা। একটু কম পড়েছে তো সেরেছে। চলছে শ্বাশুড়ীর কটুক্তি, আমার চাকরীজীবি ছেলেকে এত বড় অপমান।এরপর থেকে চলে শারিরিক ও মানষিক নির্যাতন। শিক্ষিত “স্টুপিড” ছেলে গুলো চুপচাপ….।
এমনি অবস্থার শিকার আজ মনীষা।স্বামী মেরে রক্তাক্ত তবু ও মুখ বুঝে সব…… ।
কিন্তু সত্য কি চাপা থাকে!ঠিক মনীষার বাবার কানে পৌছে গেল। বাবা কি আর থেমে থাকে। তিনি নারী নির্যাতন মামালা করতে ছুটে গেলেন। পথে যেতে কিছু সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তির সঙ্গে দেখা হয়।তাকে হন্ত দন্ত হয়ে যেতে দেখে কারন জানতে চাইলে তিনি মনীষার ব্যাপারে বিস্তারিত খুলে বললেন। আপাতত উনারা তাকে শান্তনা দিলেন।প্রাথমিক পর্যায়ে সিরিয়াসে না গিয়ে একটা ঘরোয়া বৈঠকে বসার সিদ্ধান্ত দিলেন।মনীষার বাবা তাতে রাজী হলেন।
এদিকে মনীষার স্বামী টাকার জন্য তোলপাড়…..।
মনীষা মানসিক যন্ত্রনায় কাতর। বিছানা থেকে উঠতে পারছে না।কিন্তু দজ্জাল শ্বাশুড়ী তা মানতে রাজী না,ধপাধপ বলতে শুরু,
বউ রোগা, কাজ করতে পারবে না,যত টাকা যাক তাকে তাড়িয়ে দিয়ে ভালো মেয়ে বিয়ে করাবো। মনীষা আজ কিন্তু থেমে নেই। পাটাপাটি জবাব দিলো, সাহস থাকলে বিয়ে করান।
এই সেরেছে একটা উত্তর গোটা পরিবারকে ক্ষেপিয়ে তুলল।অমনি বউ শ্বাশুড়ীর কড়া যুদ্ধ। অনেক সময় ধরে তর্ক বিতর্ক……।
এমন সময় মনীষার বাবা একজন আলেম, দু’জন সমাজ সেবক, একজন মানবধিকার মহিলা কর্মীকে নিয়ে উপস্থিত হলেন। সবাই ভিতর মহলে গিয়ে বসলো। বিচার কার্জ শুরু…..।
প্রথমে শ্বাশুড়ীর, তারপর শ্বশুর, তারপর জামাই, তিনজনের একই রকম জবান বন্দী অর্থাৎ সত্য ঘটনাকে লুকিয়ে একটা মিথ্যা বানোয়াট গল্প বানিয়ে সবার সামনে প্রকাশ করলো।মানে তারা সবাই নির্দোষ আর মনীষাকে সম্পূর্ণ দোষী সাব্যস্থ করলো।
মনীষা আর থেমে থাকতে পারলো না। প্রতিবাদী কন্ঠে জবাব দিলো,
বাবা উনারা সব মিথ্যে বলেছে। আমি কখনো মায়ের সাথে বিনা কারনে তর্ক করিনি। উনি সব সময় অকথ্য ভাষায় গালমন্দ….।
কথায় কথায় বলেন, ছোট লোকের মেয়ে, তোর কিসের এত দেমাগ, তোর বাবা এমন কি দিয়েছে? নিচু মানের কটা ফার্নিচার। ছিঃছিঃ এমন জিনিস কেউ মেয়ের বাড়িতে দেয়? এরপরও পাওয়ার……..।
কাজ করবি নাতো কি করবি? সংসারের সব কাজ তোকে একলাই করতে হবে। তানা হলে আমার ছেলেকে আরেক বিয়ে করাবো। আরও অনেক জঘন্য কথা বলেন, যা আমি বলতে পারবো না। তাই সহ্য করতে না পারলে মাঝে মাঝে দু’একটা কথার উত্তর দি। অমনি মা, ছেলে সবাই মিলে….. ।
সরাসরি শ্বাশুড়ীকে মিথ্যেবাদী প্রমান করা, তিনি সহ্য করতে পারলেন না।তাই বললেন,
দেখলেন আপনার মেয়ে কত বড় বেয়াদব,আমার নামে বদনাম…..।
এই বেয়াদব মেয়ের দরকার নেই, আপনার মেয়ে আপনি নিয়ে যান।
বিচারক দেখলেন শ্বাশুড়ীর ভাবমুর্তি ভালো না। তাই মনীষা আরও কিছু বলতে চাইলে, তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন,
বেয়াইন সাহেবা, মনীষা মেয়ে মানুষ, বয়স কম, এখনও তেমন বুদ্ধি জ্ঞান হয়ে উঠেনি। কি থেকে কি বলেছে,এই নিয়ে আপনি টেনশন কইরেন না। সব ঠিক হয়ে যাবে। মনীষা তোর শ্বাশুড়ীর পা ধরে মাফ চা।
মহিলা কর্মী এতক্ষন পুরুষদের রায় শুনার অপেক্ষায়…..।
এবার বলে উঠলো, মনীষা মাফ চাওয়ার আগে আমার কিছু কথা।
সবাই এক বাক্যে বলল,
জ্বি বলুন।
আমি নেত্রীও নই, গভঃমেন্ট কর্মকর্তাও নই, সাধারন একজন মুসলিম নারী। ইতিমধ্যে কোরানের নিয়ম অনুযায়ী নারীদের অধিকার প্রয়োগের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমি প্রথমে প্রশ্ন করবো মৌলবী সাহেবকে,
আপনি যে রায় দিয়েছেন , তা কি কোরান ও সুন্নাহ সম্মত হয়েছে?মৌলবী সাহেব চুপচাপ। এতে কি প্রমান হলো বুঝতে পেরেছেন তো?
এই পুরুষ শাসিত সমাজের রায় এমন। আমি কোরান ও সুন্নাহর আলোকে সংক্ষিপ্ত কিছু কথা বলছি,
আমাদের সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা:)।তার পরে আর কোন নবী আসবেন না। তাই উনার উপর নাযিলকৃত কোরানে আল্লাহ পাক সব কিছু লিপিবদ্ধ করেছেন। যা পরবর্তী প্রজন্মের জীবন চলার পথের দলিল। অর্থাৎ মানুষ যখন বিপদে বা কোন সমস্যায় পড়বে কোরানের বিধান অনুযায়ী সমাধান করতে হবে। তানা হলে পরকালে জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে হবে। আল্লাহ পাক পবিত্র কোরানে এরশাদ করেছেন নারীদেরকে সর্বদা পর্দা মোতাবেক চলাফেরা করার জন্য। আজ সেই নারীরা রাস্তায় নেমে আন্দোলন করছে,কেন জানেন? তাদের অধিকার আদায়ের জন্য।আওয়ামী লীগ সরকার নারী নির্যাতন বন্ধের জন্য ইভটিজিং, নারী নির্যাতন, ও সমান অধিকার আইন পাস করেছেন। এবং চাকরী থেকে শুরু করে ইউ, পি নির্বাচন পর্যন্ত সকল পদে পুরুষের পাশাপাশি নারীদেরকে ও বহাল
রেখেছেন। কারন তারা যেন তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়।অথচ এর পরও তারা প্রতি পদে পদে লাঞ্চিত,অপমানিত,নির্যাতিত। যার জ্বলন্ত প্রমান হলো আজকে আপনাদের রায়।আমি নির্যাতিত নারীদের জন্য কিছু করতে চাই। তাই যখনি কোন নির্যাতনের খবর শুনি তখনি তার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। আজও অনুরুপ মনীষার পাশে এসে দাঁড়িয়েছি এবং তার নির্যাতনের সকল তথ্য সংগ্রহ করে তবে এখানে এসেছি।
আমি প্রথমে মনীষার শ্বাশুড়ীর প্রসঙ্গে কিছু কথা….. ।
আল্লাহ পাক পবিত্র কোরানে এশরাদ করেছেন মিথ্যা বলা মহাপাপ। আমরা কথায় কথায় কত যে মিথ্যা বলি, এই যে মই মা মনীষার প্রসঙ্গে যে সব নোংরা কথা বলেছেন তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট গল্প।কারন মনীষা আমাকে সব বলেছে।বড়দের কাছ থেকে ছোটরা শিখে। আমার এক টিচার বলেছেন, উনি একদিন উনার পাঁচ বছরের বাচ্চাকে নিয়ে গাড়ি করে বাড়ি আসছেন। এমন সময় তিনি সিগারেট ধরিয়ে মুখে দিলেন। তখনি বাচ্চাটি জিজ্ঞেস করলো, বাবা এটা কি?
বাবা বললেন,
এটা সিগারেট।
তারপর বাচ্চাটি বলল,
বাবা আমাকে একটা দাও।
তিনি নিষেধ না করে ছেলেকে একটা ধরিয়ে দিলেন।
এ,কথার মূল সারমর্ম হলো বাচ্চাটিকে যদি তিনি বলতেন, বাবু সিগেরেট খাওয়া ভালো না, ক্ষতিকর। সে বলতো তুমি খাচ্ছ কেন?এই ভয়ে। তার পর তিনি সিগেরেট খাওয়া ছেড়ে দিলেন। মানে আগে নিজেকে সুধরে নিলেন, যাতে ছেলেকে শাসন করতে পারেন। আমদের প্রত্যেক মা বাবার উচিত নিজেদের দোষত্রুটি গুলো প্রথমে সংশোধন করা,তারপর ছেলে মেয়েকে শাসন করা। কিন্তু আমাদের সুশীল সমাজে সব কিছু ব্যতিক্রম নিয়মে চলে।
যেমন মনীষার শ্বাশু মার জঘন্য আচরণ ইতিমধ্যে আপনারা লক্ষ্য করেছেন, এবার আপনারাই বলুন উনার এ আচরণ কি পরিবর্তন হওয়া উচিৎ?তানা হলে নতুন প্রজন্ম তা ফলো করবে।
এবার আমরা যৌতুকের প্রসঙ্গে আসি। বিয়ের সময় সামাজিক রীতি নীতি অনুযায়ী যা কিছু দেয়ার মনীষার বাবা সব দিয়েছেন। যেমন ছেলের সাজ, মেয়ের সাজ, ঘর সাজানোর ফার্নিচার, এসি কেনার টাকা সব নগদ পেইড করেছেন, এরপরও উনারা অসন্তুষ্ট। অন্য কোথাও বিয়ে করালে আরও বেশি বেশি……।
তাই আবার মোটা এমাউন্ট টাকা মানে যৌতুক দাবী করছেন।
পবিত্র কোরানে আল্লাহ পাক যৌতুক দেয়া এবং নেয়া দুটোকে হারাম বলে ঘোষনা করেছেন।হারাম জিনিস ভক্ষণ কারীর স্থান কোথায় জানেন?জাহান্নামে। আর এই হারাম খাওয়ার জন্য মনীষার শ্বাশু মা রোজ রোজ ঘ্যাচাং ঘ্যাচাং কথা বলেন, যাকে বলে মানষিক নির্যাতন। আর এই মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে গৃহ বধুরা প্রতিনিয়ত সুইসাইড করছে। এবার আপনারা বলুন এই সুইসাইডের পেছনে কার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি?
এবার মনীষার স্বামীর প্রসঙ্গে আসি,
আল্লাহ পাক পবিত্র কোরানে এশরাদ করেছেন, মায়ের পায়ের তলে সন্তানের “বেহেস্ত”অনুরুপ বিয়েটাকে ও “ফরজ”বলে ঘোষনা করেছেন। মা এবং স্ত্রী দুটোই একজন পুরুষের জীবনে মুখ্য সাবজেক্ট। মা হলো সন্তানের মাথার চাঁদ।মায়ের কথা ছেলে শুনবেনা এত বড় পাপের কথা আমি বলতে পারবো না। তবে একটা কথা মা যদি কোরান ও সুন্নাহ সম্পর্কিত কোন পরামর্শ দিয়ে থাকেন তা অবশ্যই পালন করতে হবে। আর যদি কোন নোংরা পরামর্শ যা কোরান ও সুন্নাহ বহির্ভূত তা বর্জণ করতে হবে। এবং মাকে সুন্দর ভাবে বুঝিয়ে বলতে হবে,এগলো সম্পূর্ন অযুক্তিক ও পাপাচার। অনুরুপ খারাপ স্ত্রীর ক্ষেত্রেও তাই।
কিন্তু মনীষার শিক্ষিত “স্টুপিড” স্বামী কি করেছে দেখেন,…….।
মায়ের কু’পরামর্শ ফলো করতে গিয়ে নিজের লাইফ শেষ করে দিয়েছে।এদেরকে বলা হয় মায়ের বাধ্য কু’সন্তান। স্ত্রীকে দূরে রাখতে গিয়ে নিজে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছে। যার ফলে তাকে চাকরী থেকে বরখাস্ত…. ।
এবার পাপকে ঢাকা দিতে মিথ্যে বাক্য প্রয়োগ,চাকরী ভালো লাগেনা, ছেড়ে দিয়েছে।এবার ব্যবসা…..।
তার জন্য মোটা এমাউন্ট দাবী এবং বউকে মারধর। শুধু তাই নয়, কথায় কথায় তালাক দেয়ার হুমকিও দেয়।শুধু রিপন নয়, তার মতো অনেক শিক্ষিত “স্টুপিড” আছে, স্ত্রীর অধিকার কি জানেনা। সেই শিক্ষিত স্টুপিডদের উদ্দেশ্য কিছু কথা….।
মা হচ্ছে গুরুজন, যাকে শ্রদ্ধা করা যায়, কদম বুচি করা যায়। আর স্ত্রী হচ্ছে প্রিয়জন, যাকে আবেগের চোখ দিয়ে দেখা হয়। এই দু’নারীর অধিকার দায়িত্ব ও কর্তব্য আলাদা। মায়ের আসনে কখনো স্ত্রী বসবেনা,আর স্ত্রীর আসনে কখনো মা বসবেনা।এই দুই নারীর অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য আলাদা। যে পুরুষ কোরান ও সুন্নার নিয়ম অনুযায়ী এই দুই নারীর অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য ঠিকভাবে পালন করবে,সে হবে সুপুরুষ,অন্যথায় কাপুরুষ।এবার আপনারা বলেন রিপন কোন পুরুষের আওতায় পড়েছে?আর সে যা করে চলেছে তা কি কোরান ও সুন্নাহ সম্পর্কিত হয়েছে?
বিচারক ও রিপনের পরিবারে লোকজন চুপচাপ। আমল না করলেও কোরানের কড়া আইনের কথা শুনলে অনেকে ভয় পায়।আসলে সেই চিন্তা, না অন্য কোন কু’চিন্তা কে জানে।
এখনো কথা শেষ হয়নি,আরও তিন জন বাকী আছেন। দেখি উনারা….. ।এবার মনীষার শ্বশুরের প্রসঙ্গে আসি,
পরিবারের প্রধান হলেন বাবা, আর উনার মৃত্যুর পরে হবেন মা, কিন্তু বাবার জীবিত অবস্থায় মা পরিবারের প্রধান,কারন কি?আমরা যতটুকু জেনেছি হাকিম সাহেব স্ত্রীকে খুব ভয় পান, সেই ইয়্যং বয়স থেকে, তিনি মাইনে তুলে বউয়ের হাতে তুলে দিতেন,বউ যে ভাবে ইচ্ছা সেভাবে ব্যয় করতেন, তিনি কোনদিন কেয়ার করতেন না। তাই আজ উনার পরিবারের এত অধঃপতন।নারী হয়ে নারীর অধিকার ক্ষুন্ন……।
অথচ তিনিও এক সময় বউ ছিলেন। আজ হয়েছেন শ্বাশুড়ী। কিন্তু এই কথাটা শ্বাশুড়ীরা ভুলে যান। মনে হয় শ্বাশুড়ী হয়ে জন্মে ছিলেন।উনারা যদি বউ হওয়ার কথাটা একটি বারের জন্য মনে করতেন তবে সব সমস্যার সমাধান হয়ে……।
যেমন উনাদের এক সময় ইয়্যং বয়স ছিলো, বউ ছিলেন, চোখে ছিলো রঙিন চশমা,রঙিন রঙিন স্বপ্ন দেখতেন, স্বামীকে নিয়ে মার্কেট থেকে শুরু করে দর্শনীয় স্থান…. ।
নিজের স্বাধীন মতে চলা ফেরা….. ।কাজকর্মে কম পারদর্শী থাকা সত্বেও শ্বাশুড়ী কিছু বলতেন না।মেয়ে মানুষ, বয়স কম, বয়সের সাথে সাথে সবকিছু ম্যাচিং হবে। বউকে কাজ শেখানোর চেষ্টা, পাছে সকল কাজে সহযোগিতা করতেন। আজ সেই বউরা শ্বাশুড়ীর আসনে বসে নেত্রী নেত্রী করছে।এ অন্যায় কি সহ্য করা যায়?মনীষার শ্বাশুড়ী সকল অধিকার অর্জন করেছেন। যেমন বউয়ের অধিকার ও শ্বাশুড়ীর….।
নিজের হিসাব ষোল আনা বউয়ের হিসাব এক আনাও না। মানে বউকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করছেন প্রতি পদে পদে। শ্বশুর এসব অন্যায় জেনেও কোন প্রতিবাদ করছেন না।শ্বশুরকে যদি শ্বাশুড়ী মুল্যায়ন না করে, তাহলে মনীষা কেন রিপনকে স্বামী…..।
ঐ যে বললাম বড়দের কাছ থেকে ছোটরা শিখে। শ্বাশুড়ী যা যা করবে বউ তা ফলো করবে।এবার আপনারা বলুন আমার এই যুক্তি কতটুকু সঠিক?
এবার মনীষার ননদের প্রসঙ্গে আসি সে যেমন মেয়ে, মনীষাও অনুরুপ তাই। পার্থক্য একটা মনীষা বউ,রুনা বউ হওয়ার স্বপ্ন দেখে, এখনো হয়নি। একদিন তাকেও চলে যেতে হবে বউ সেজে অন্যের বাড়িতে। এই কথাটা মনে ধারন করে মায়ের সঙ্গে অন্যায় তাল না মিলিয়ে ভাবীকে সংসারের কাজে হেল্প করতে হবে। মনীষা যাতে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়, সেদিকে তাকে বিশেষ ভাবে খেয়াল রাখতে হবে। তা না হলে বিপদ তারই……।
বিয়ের পর শ্বশুর বাড়ির লোক জন তাকেও ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করবে,এটা আমার কথা নয়, কোরানের কথা।
এবার মনীষার দেবর রুমেলের প্রসঙ্গে আসি, রিপনের পরে তার স্থান। প্রায় মা বাবা ভুল কর,তা যে সুধরানো যাবেনা এমন নই,তাছাড়া উনার বয়স এখনো পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হয়নি। আমার মনে হয় রুমেল ভালো করে বুঝালে উনি হয়তো স্বভাবের পরিবর্তন করতেও পারেন। তা না হলে রুমেলের স্ত্রীও এই নির্যাতনের স্বীকার হবেন। এটা আমার কথা নয়,কোরানের কথা।
এবার মহিলা কর্মী বলল,
কি আলেম সাহেব সবাই চুপচাপ যে,কেমন হলো আমার যুক্তি তর্ক?
আলেম সাহেব বলে উঠলো,
কি করবো ম্যাডাম গভঃমেন্ট দেশ চালাই অন্য নিয়মে, এ অবস্থায় আমরা যদি কোরানের বিধি বিধান প্রয়োগ করি তাহলে জনগন গন ধোলাই দেবে না?
মহিলা কর্মী হেসে উঠে বলেন,
বাহ!আলেম সাহেব বাহ!সরকারের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমান করলেন এই তো….।
কেন যে আপনারা কোরানের সঠিক আইন প্রয়োগ করেন না, তার ছোট্ট একটা ব্যাখ্যা আমি দিচ্ছি,
আমার এলকায় একটা ব্যভিচারের বিচার হয়েছিলো।ব্যভিচারিণী মহিলার প্রসঙ্গে অনেকে অনেক নোংরা কথা বলেছিলো, বিচারক একেক জনে, একেক রায় দিয়েছিলেন। শেষে আলেম সাহেবের হুকুমে তার রায় অনুযায়ী তাকে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দিলেন। তার দুদিন পর উনার সাথে আমার দেখা হয়। কথার প্রসঙ্গে বললাম, আলেম সাহেব সেদিন বিচারের রায়… ।
উনি রসালো হেসে বললেন,
কি আর বলবো ম্যাডাম,শরমের কথা, মহিলাটি জঘন্য চরিত্রহীনা,সকল পুরুষকে নষ্ট…।
তাই এলাকা ছাড়া করেছি।
আমি বললাম,
রায়টা কি সঠিক হলো?
তিনি পুনরায় হ্যাঁ বললেন। আমি আর থেমে থাকতে পারলাম না। বলে উঠলাম,
ব্যভিচারিণীকে তাড়িয়ে না দিয়ে, আপনাদের মত “ডুপ্লিকেট” আলেমদেরকে তাড়িয়ে দেয়া দরকার।
আলেম সাহেব নাযেহাল হয়ে বলেন,
ম্যাডাম আমরা এমন কি করেছি, যার জন্য এত বড় অপমান জনক কথা শুনতে হলো?
বলছি শুনুণ পবিত্র কোরানে আল্লাহ পাক এশরাদ করেছেন ব্যভিচারের জন্য নারী পুরুষ উভয়ে সমান পাপের অংশীদার। কেয়ামতের দিন, আগুনের পুরুষ, আগুনের স্ত্রী বানিয়ে আল্লাহ পাক নির্দেশ দিবেন, যাও তোমরা তোমাদের সঙ্গী,সঙ্গীনি খুঁজে নাও। যেমনটি দুনিয়াতে করেছিলে। আল্লাহ পাকের হুকুমে জোড়ায় জোড়ায় মিলন….।
তাদের আত্ন চিৎকারে আাকাশ পাতাল কেঁপে উঠবে।তবু আল্লাহপাক ক্ষমা করবেন না।
আর আপনারা কিনা একজনকে সাজা দিয়ে অন্য জনকে ছেড়ে দিলেন,এটা কি ন্যায় বিচার হলো?
ম্যাডাম মহিলাটা বেশি খারাপ,সে পুরুষদেরকে…..।
ব্যস ব্যস আর বলতে হবেনা,আমি বুঝতে পেরেছি। আপনি কি বলতে চেয়েছেন, মহিলা নিজ থেকে পুরুষদেরকে অফার দেয় এইতো……..।
ম্যাডাম আপনি ঠিক বুঝতে পেরেছেন।
আলেম সাহেব নিজেকে আর নির্দোষ প্রমান করতে চেষ্টা করবেন না, কোরানের নির্দেশ,
হে পুরুষগন তোমরা তোমাদের চক্ষু ও বডিকে হেফাযতে রেখো। পর নারীর দিকে তাকিও না এবং পরনারীকে স্পর্শ করোনা। অনুরুপ তোমাদের স্ত্রী লোকদেরকে সেভাবে চলার নির্দেশ দাও।কিন্তু আপনাদের মত “ডুপ্লিকেট” আলেমেরা কখনো কোরানের এই সত্য বানিগুলো জনগনের সামনে তুলে ধরেন না,শুধু নারীদেরকে নিয়ে টানাটানি।আপনাদের পাপের সাজার কথা একবারও বলেন না,কোন ওয়াজ মাহফিলে শুনেছি বলে মনে হয়না। এলাকা ছাড়া করা উচিৎ ছিলো দু’জনকে,কিন্তু করেছেন একজনকে, একে বলে পুরুষশাসিত সমাজের এক তরফা বিচার।আল্লাহ পাক এই অন্যায় রায় কখনো পছন্দ করবেন না। কেয়ামতের দিন আলেমদেরকে প্রথম প্রশ্ন করা হবে,
কোরানের আইন কতটুকু প্রয়োগ করা হয়েছে?
ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত ওমর (রা:) ব্যভিচারের জন্য আবু শাহামা কে দোররা্ দিয়ে মেরে ফেলেছেন।আর আপনাদের মত “ডুপ্লিকেট” আলেমেরা পুরুষের সাজা মওকুপ করছেন, আজকের পর থেকে ন্যায় বিচার করবেন। ব্যভিচারের জন্য দু’জন সমান পাপের অংশীদার, এলাকা ছাড়তে হলে দু’জনকে ছাড়তে হবে, একজনকে কেন? পাপ তো সে একা করেনি।
একটু আগে আপনি বলেছিলেন নারীরা পুরুষদেরকে অফার দেয়।তার ছোট্ট একটা উদাহরণ, পাঁচ বছরের শিশু কন্যা, সে কি পুরুষদেরকে অফার দিতে জানে?তাকে কেন ধর্ষন করা হলো?এর জন্য কি আপনাদের মনে কোন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিলো?নাকি আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন? কিছুই করেননি। বরং শিশু কন্যাকে নিয়ে উপহাস করেছেন।
এবার ছোট্ট আর একটা কথা বলি,পাগলির পেটে কেন বাচ্চা আসে? সে কি অফার দিতে জানে?আলেম সাহেব কিছু বলেন, চুপ করে আছেন কেন?পাগলীকে এলাকা ছাড়া করবেন না?এবার প্রমান পেলেন তো লুচু পুরুষেরা অফার ছাড়াও কত জঘন্য পাপ কাজ করতে পারে?
আপনাদের এই ভুল বিচারের কারনে বাবা তার মেয়েকে নিয়ে রেল লাইনে আত্নহত্যা, মা তার চার ছেলে মেয়েকে নিয়ে রেল লাইনে আত্নহত্যা, গৃহ বধুর সুইসাইড আরও অহরহ ঘটনা……..।
এসব কিছুর জন্য দায়ী হচ্ছেন আপনারা। ভবিষ্যতে যাতে এই ধরনের ঘটনা আর না ঘটতে পারে তার জন্য “দি কেয়ারফুল”ও আর একটা কথা, কোরান ও সুন্নাহর বাইরে কোন মনগড়া বই লিখে বাছারে ছাড়বেন না। কারন তা বিশ্বাস করা বেদাত।
তিনি আর কিছুই বললেন না, লজ্জিত হয়ে….।
উপস্থিত সবাই চুপচাপ। তখনি মহিলা কর্মী বললেন,
আলেম সাহেব ব্যভিচারের ব্যাখ্যা কেমন হলো? কিছু বলুন?
মনীষার শ্বশুর এতক্ষন পরে একটা সঠিক বাক্য প্রয়োগ করলেন,বললেন,
তিনি আর কি বলবেন…..?
বলার মতো মুখ থাকলে তো? মা তুমি তো “ডুপ্লিকেট” আলেমদের মুখোশ খুলে দিয়েছো, তুমি সত্য ও ন্যায়ের জন্য যে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছ আল্লাপাক তোমাকে কামিয়াব করুক সেই দোয়ায় করি।
এই কথার সুত্র ধরে মহিলা কর্মী বলেন,
তালই সাহেব আপনার দোয়া যেন আল্লাহ পাক কবুল করেন।তো বলছিলাম কি মনীষার ব্যাপারে….. ।
মা তোমাকে আর কিছুই বলতে হবেনা।তোমার যুক্তি সঙ্গত কোরান সম্পর্কিত সুন্দর বক্তব্য আমাদের সবার চোখের কালো চশমা সরিয়ে দিয়েছে, আমরা সবাই দোষী।তার সাথে এমন আচরণ করা কারো উচিত হয়নি।টাকা দাবী করাটাও অন্যায়। মনীষা আজ থেকে পুত্র বধু নয়, আমার বড় মেয়ে হয়ে থাকবে।তার উপর আর কোন অবিচার করতে আমি দেবো না।সবাইকে মিট করে দিয়ে তারা চলে গেলেন।
এদিকে মনীষার শ্বাশুড়ী কড়া ধমক দিয়ে স্বামীকে বলে,
পরের মেয়ের জন্য তোমার এত দরদ, আমাকে অপমান! আমি এর প্রতিশোধ নিয়ে ছাড়বো, উগ্র গতিতে ছুটে যাচ্ছিলেন বউয়ের দিকে,তখনি এত বছরের চুপ থাকা হাকিম সাহেব গর্জে উঠে কড়া ধমক দিয়ে বললেন,
স্টপ আর এক পাও এগুবেনা। তোমার অনেক অত্যাচার সহ্য করেছি, আর না…।
কাকে তুমি পরের মেয়ে বলছো, তুমিও তো একদিন বউ হয়ে এসেছিলে। আমার মা কি তোমাকে এমন অত্যাচার করেছিল ? করেনি।তাহলে তুমি কেন ওকে…. ।
তোমার স্বভাব কি কোনদিন পরিবর্তন হবেনা। আজ থেকে বউয়ের সাথে
আর ঝগড়া নয়,ভালোবাসতে শুরু করো…..।
চুপ থাকা হাকিম সাহেবের গর্জে উঠা ধমক কাজে লেগেছে।আপাতত তিনি থামলেন।মনে হয় তিনি ভালো হয়ে গেছেন।মনীষার সাথে সুন্দর আচরণ করছেন।যাক মনীষা মোটামুটি ভালো ভাবে দিনকাল যাপন করছে।এর ফাঁকে কেটে গেল মাস দু’য়েক।হঠাৎ তার শ্বশুর স্ট্রোক করলো।কথা বার্তা বন্ধ।দ্রুত গতিতে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। ডাক্তার পরীক্ষা করে বললেন,
রোগী মারা গেছে তাকে নিয়ে যান।
সবেমাত্র স্বামী মারা গেল। এখন থেকে যদি বউয়ের সাথে ঝগড়া করে তাহলে লোকে কি ভাববে? তাই ক’দিনের জন্য একটু ভালো মানুষ সাজলেন।দিন পনেরো যেতে না যেতে তিনি আগের রুপ ধারণ করলেন।
মা ছেলে সবাই এক হয়ে গেল।কারনে অকারনে মনীষার সঙ্গে ঝগড়া।কথায় কথায় তাড়িয়ে দেয়ার হুমকি। কে থামাবে এই জানোয়ারদের। হাকিম সাহেব তো এখন আর নেই।এমনি যন্ত্রনার মধ্য দিয়ে কাটতে লাগল মনীষার দিনগুলো।একদিন ভর দুপুরে মনীষা শুয়ে শুয়ে এফ, এম রেডিও শুনছে।
এমন সময় শ্বাশুড়ী আওয়াজ তুলল,
রুমেল দ্যাখ দ্যাখ মনীষা নবাবের বেটির মতো শুয়ে শুয়ে ভর দুপুরে গান শুনছে।এদিকে রান্না ঘরের সব কাজ পড়ে আছে,কাজ গুলো করবে কে? শুনি। এই ছোট লোকের মেয়ে,তোর কিসের এত অহংকার।
মনীষা সব অপমান সহ্য করেছে।আজ মা বাবার অপমান সহ্য করতে না পেরে বলে,
আপনি কি মন্ত্রীর মেয়ে নাকি?
যে কথায় কথায় আমার মা বাবাকে গালি দেন।উনারা আপনাদের বাড়িতে পড়ে থাকে নাকি?আমার মা বাবাকে নিয়ে আর একটি বাজে কথা বলবেন না।
তিনি এতদিন সুযোগ খুঁজছেন।যাক আজ একটা পেয়ে গেলেন। মনীষার সামান্য কটা কথার হ্রেষ ধরে শুরু হলো কড়া ভাষায় গালাগাল….
এমন কি তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়াও হয়…।
এমন সময় রিপন আসলো। মা ছেলের আগে যোগাযোগ ছিলো। তবু ও শ্বাশু মা অভিযোগ তুলল, রিপন দৌড়ে এসে মনীষার চুলের মুষ্টি ধরে বলে,
এই ছোট লোকের মেয়ে, তোর এত বড় সাহস মায়ের সাথে তর্ক,তোর বাবাকে বলেছিলি দশ লক্ষ টাকা দিতে?
মনীষা উত্তর দিলো,
তোমার মত অপদার্থ স্বামীর জন্য,দশ লক্ষ কেন,দশ টাকাও চাইতে পারবো না।যে কথায় কথায় বউয়ের গায়ে হাত তোলে,
সে কখনো ভালো স্বামী হতে পারে না।
যারা খারাপ তাদের মেজাজ অলটাইম খারাপ থাকে, এ আর নতুন কি….।
না শব্দ শোনার পর রিপন মনীষার গালে কষে দিল চড়, দুই তিন চড়ে মনীষা কাত হয়ে পড়ে গেল।এরপরও রিপন শান্ত হলো না। আরও আরও….।
মনীষার কোন সাড়া শব্দ নেই।পরিবারের সবাই ভয়ে জড়োসড়ো।
কি করবে ভাবনা চিন্তা….।
হঠাৎ একটা কু’বুদ্ধি মাথায় আসতে মিথ্যা রটনা রটিয়ে দিলো,মনীষা সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁছিয়ে সুইসাইড করেছে।দ্রুত গতিতে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। ডাক্তার পরীক্ষা নিরীক্ষা করে তাকে মৃত বলে ঘোষনা করলো।পোষ্ট মর্টেম রিপোর্টে জানানো হলো,সে সুইসাইড করেনি।তাকে অন্য কেউ মেরে ফেলেছে। মনীষার শ্বশুর বাড়ির কেউ হাসপাতালে নেই, সবাই দ্রুত পলায়ন করলো। রিপনের মতো “স্বামী নামক অমানুষটির” শারিরীক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে মনীষার মতো একজন গৃহবধু অকালে মৃত্যু বরন করলো।


আমাদের উৎসাহিত করুনঃ




সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এই লেখাটি কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয় ।

লেখক সম্পর্কেঃ

বুনন সম্পর্কিত তথ্যঃ