ভালোবাসি তোমায়

জাকারিয়া আর ওয়াহিদার বিয়ে হল কিছুদিন আগে। বিয়েটা পারিবারিকভাবেই হয়েছে। পরিবারের কোন চাপ ছাড়াই জাকারিয়া ও ওয়াহিদা বিয়েতে রাজি হয়েছিল। ওয়াহিদার মন ভয়ানক খারাপ। হঠাত্ করে খারাপ হয় নি। প্রতিদিন একটু একটু করে খারাপ হয়েছে। কিন্তু প্রতিদিনের মন খারাপ গুলোকে সে মুছে ফেলতে পারে নি। তাই সেই ছোট ছোট মন খারাপগুলো একত্রিত হয়ে এক বিশাল মন খারাপের তৈরি করেছে। তারপরও সে স্বাভাবিকভাবে চলার চেষ্টা করে। নতুন বউ সে… তার আচার ব্যবহার সবাই লক্ষ্য করবে… একথাটা ওয়াহিদা বুঝে। তাই সে তার মন খারাপটা কাউকে বুঝতে দেয় না। লুকিয়ে রাখে।একজন হয়তো বুঝতে পারে। সে জাকারিয়া। এই জাকারিয়ার জন্যই ওয়াহিদার মন খারাপ। বিয়ের ১৫ দিন হলো অথচ জাকারিয়া ওয়াহিদার সাথে তেমন কথাই বলে না।

এ বিষয়টা ওয়াহিদার প্রতি মুহুর্তেই কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। সংসার নিয়ে কতই না স্বপ্ন দেখত সে…. ছোটবেলায় যখন সে পুতুলেরবিয়ে দিত তখনই এই স্বপ্নের বীজ রোপণ করে সে। এই স্বপ্নটাকে পরিচর্যা করতে গিয়ে বান্ধবীদের মত আর প্রেম করা হয়ে উঠেনি ওয়াহিদার। কিন্তু এত যত্নে পালিত হওয়া স্বপ্নটার সাথে কিছুই যে মিলছেনা।

সেএখন প্রায়ই একটা কথা চিন্তা করে।জাকারিয়া কি তাহলে এ বিয়ে মেনে নিতে পারে নি? তার পছন্দ কি অন্য কেউ ছিল?ওয়াহিদাকে কি জাকারিয়া পছন্দ হয়নি। এই প্রশ্নগুলো প্রতিক্ষণেই ওয়াহিদার মনে তীরের মত বিঁধছে। তার হৃদয় নামের বস্তুটা থেকে যে পরিমাণ রক্ত ক্ষরিত হচ্ছে ঠিক একই পরিমাণ নোনতা পানি বের হচ্ছে তার চোখ থেকে। কিন্তু সেই রক্তক্ষরণ ও চোখের পানির খবর কাউকেই পেতে দেয় না সে, জাকারিয়া একটা নামীদামী ব্যাংকে উচ্চপদে চাকরি করে। রেজাল্ট ভালো হওয়ায় খুব কম সময়েই চাকরিটা পায় সে। আর চাকরি পাওয়ারপরপরই বাড়ি থেকে বিয়ের চাপ দিতে থাকে। প্রথমে না বললেও পরে আর পরিবারের সাথে জেদাজেদি করে না জাকারিয়া। বিয়ে ও বউ এই দুটো নিয়ে ফিলিংসের শেষ নেই জাকারিয়ার। কলেজ লাইফ থেকেই সে বন্ধুদের প্রেম নিয়ে ফিলিংস দেখে আসছে। এগুলো দেখে তারও প্রেম করতে ইচ্ছে করত। কিন্তু কেউ তার মনে তখন প্রেমধনুরএকটি রংয়ের ছাপও ফেলতে পারে নি। তাছাড়া পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় ছাত্রজীবনে আর প্রেম করা হয়ে ওঠেনা জাকারিয়ার। নিজের মনের রং দিয়ে সে তার মনের দেয়ালে একটি অবয়ব আঁকত। অবয়বটি মনের দেয়ালে থাকলেও সে এটিকে ছুঁতে পারত। প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন রংয়ে রাঙাত।জাকারিয়া আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করে সেই অবয়বের সাথে ওয়াহিদার কি মিল। ওয়াহিদার মুখখানার প্রতিচ্ছবি নদীর স্বচ্ছ্ব পানির ঢেউয়ের মধ্যে যেমন দেখাবে অবয়বটি যেন ঠিক সেরকমই ছিল। নিজের কল্পনার চেহারাটির মানুষটিকে এত কাছে পেয়েও জাকারিয়া কথা বলত না। জাকারিয়া মনের দিক থেকে বেশ স্মার্ট ছেলে। সে মেয়েদের সাথে কথা বলতে পারত না, এমন নয়। তারপরও সে ওয়াহিদার সাথে কথা বলে না।
বাইরে অবশ্য মানুষকে দেখানোর জন্য ওরা দুজনই ভালোই অভিনয় করে। এই অভিনয়টুকুতেই ওয়াহিদা যা একটু কাছে পায় জাকারিয়াকে। অভিনয়টা শেষ হয়ে গেলেই তার মন খারাপের পাহাড়টা বড় হতে থাকে।এই অভিনয়ের বাইরে যখন ওয়াহিদা জাকারিয়ার সামনে থাকে তখন সে ভয়ে, আতংকে রীতিমত কাঁপতো। এসবের কোন কিছুই এড়াত না জাকারিয়ার চোখকে। কিন্তু তারপরও সে কথা বলত না।

একদিনের ঘটনা….. জাকারিয়া সেদিন বেশ আগেই অফিস থেকে বাসায় ফিরল। ফিরে দেখল ওয়াহিদা লুকিয়ে লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। জাকারিয়া কর্কশ গলায় ডাকল, “ওয়াহিদা চমকে উঠে ঘুরে দেখে জাকারিয়া দাড়িয়ে আছে।

সেই মুহুর্তে ওয়াহিদারচেহারা ভয়ে, আতংকে, লজ্জায়, আকস্মিয়তায় যে রূপ ধারণ করল তা জাকারিয়ার মনের সেই দেয়ালে গিয়ে ঘা মারল। জাকারিয়ার কলিজার কাছ দিয়ে মৃদু একটা বাতাস বয়ে গেল। ওয়াহিদা আর সেখানে দাড়িয়ে থাকতে পারল না। সে চোখের পানি আড়াল করতে দ্রুত সরেপড়ল।

ওয়াহিদা জাকারিয়া কে প্রচণ্ড ভয় পায়, সেই সাথে প্রচণ্ড ভালবাসে এবং শ্রদ্ধাও করে। সেদিন বিকেলে জাকারিয়াকে চা দিয়ে গেলেন ওর মা সেলিনা বেগম। জাকারিয়া চা শেষ করে বলল, “আম্মা আজকের চা’টা কিন্তু অসাধারণ বানিয়েছো”। মা বলল, “আমি কি এখনও চা বানাইরে…. চা তো বানিয়েছে তোর বউ।” জাকারিয়া শুধু আস্তে করে বলল, “ও…আচ্ছা ”

এই “ও আচ্ছা” টাইপের শব্দগুলো শুনেই জাকারিয়ার প্রেমে পড়ে ওয়াহিদা। পরম আরাধ্য মানুষটির কাছ থেকে যখন খুব সামান্য পরিমাণ প্রশংসা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পাওয়া যায়, তখন সেই সামান্য প্রশংসাই ব্যাপক ভালবাসার যোগান দেয়। ওয়াহিদার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয় না।

আরও একদিনের ঘটনা…… ওয়াহিদা কাঁদতে গিয়ে ধরা পড়ে যায় জাকারিয়ার কাছে। জাকারিয়া জানে, ওয়াহিদা কেন কাঁদছে। আজও জাকারিয়া দাঁড় হয় ওয়াহিদার সামনে। তবে আজ আর তেমন কঠিনভাবে দাঁড়াতে পারলনা… সে আজ অনেক নার্ভাস… তার পা আজ কাঁপছে… কিন্তু এসবের কিছুই দেখতে পেল না ওয়াহিদা। সে চোখের পানি মুছে সেদিনের মত সরে পড়তে চাইল।
কিন্তু জাকারিয়া ওয়াহিদাকে যেতে দিল না। তার হাতটি ধরে অন্য পাশে মুখ করে আছে জাকারিয়া । বিস্ময়ে শিহরিত হয়ে উঠল ওয়াহিদা।জাকারিয়
া ওয়াহিদা দুজনই কাঁপছে। জাকারিয়া অনেক কষ্টে বলা শুরু করল। “ওয়াহিদা… , না জানি তুমি কত কষ্ট পেয়েছ এই এক মাস। তুমি হয়তো ভেবেছিলে আমি তোমাকে মেনে নিতে পারিনি। কিন্তু বিশ্বাস কর তুমিই আমার একমাত্র কল্পনাচারিণী। সেই কলেজ জীবন থেকেই আমি তোমাকে কল্পনা করে আসছি…” এটুকু বলার পর একটু থামে জাকারিয়া। আর ওয়াহিদা বিস্ময়ে, ভয়ে শুধু ঠকঠক করে কাঁপছে। চারদিকে কি ঘটছে সে কিছুই জানেনা। সে কার সামনে দাড়িয়ে আছে সেটা সেজানে কিন্তু ভাবতে পারছে না। সে পাথরের মত দাড়িয়ে শুধু কথাগুলো শুনছে। “আমি আসলে এই একমাস মিলিয়ে দেখছিলাম। তুমিই আমার সেই কল্পনার মানুষ কিনা। কিন্তু কি জান, তুমি আমার কল্পনার মানুষটির চেয়ে একটু ব্যতিক্রম।” এটা শুনে ওয়াহিদার চোখগুলো বড় হয়ে উঠল। তার হৃদয়ে যেন আরেকটা বিষে মাখাতীর ঢুকল। ‘ব্যতিক্রম’ শব্দটা তাকে অনেক ভয় পাইয়ে দিল।
জাকারিয়া আবারো কথা বলা শুরু করে। কিন্তু তার এতদিনের জমানো সব কথাগুলো একসাথে বেরিয়ে আসতে চাইছে। ফলে তার মুখে একটা বড় ধরনের “কথাজ্যাম” লেগে গেল। কিন্তু তারপরও সে অনেক কষ্টে আবার বলা শুরু করল…. “তুমি আমার কল্পনার মানুষের চেয়ে একটু ব্যতিক্রম। কারণ আমার কল্পনার মানুষটা অপূর্ণ ছিল। আমি তাকে পুরোপুরি সাজাতে পারিনি। কিন্তু তোমাকে দেখার পর আমি ঐ মানুষটিকে আর সাজাতে যাইনি। সাজাবো কি করে। সে তো নিজেই আমার সামনে সেজে আছে। ওয়াহিদা এখন পুরো গুমোট অবস্থায় আছে। তার চোখমুখ ১০ নম্বর মহাসুখ সংকেত ঘোষণা দিচ্ছে। মনের মধ্যে ঝড় শুরু হয়েছে। ঝড়টা একটু কমলেই চোখ দিয়ে বৃষ্টি পড়া শুরু করবে। জাকারিয়া আর কিছু বলতে পারছেনা। মুখে একরাশ জড়তা নিয়ে সে ওয়াহিদাকে বলল, “আই লাভ ইউ”

নিজের বিয়ে করা বউকে কেউ এত জড়তা নিয়ে ‘আই লাভ ইউ’ বলেছিল কিনা তা জাকারিয়া জানে না। জাকারিয়ার এই তিন শব্দবিশিষ্ট বাক্যটা ওয়াহিদার মনে বিদ্যুতের ঝলক হিসেবে কাজ করে। সাথে সাথেই শুরু হয়ে যায় অশ্রুবৃষ্টি। ছোটবাচ্চার মত কাঁদতে কাঁদতে সে জাকারিয়াকে ঘুষি মারতে শুরু করল। জাকারিয়া পুরা হতভম্ব হয়ে গেল। আবেগে মানুষের আচরণের পরিবর্তন ঘটে তা জাকারিয়া জানে। কিন্তু তাই বলে এতটা! যে মানুষটা তাকে দেখলে ভয়ে কাঁপত সেই মানুষটাই এখন তাকে ঘুষি মারছে..! এটা নিয়ে গবেষণার সময় ওয়াহিদা জাকারিয়াকে দিল না। ওয়াহিদা কাঁদতে কাঁদতে জাকারিয়ার বুকে মাথা রেখে বলল, “এত দেরি করলে কেন.? আমি যদি চলে যেতাম, কি হত তাহলে ?” জাকারিয়া ওয়াহিদাকে শক্তভাবে জড়িয়ে ধরে বলল, “তুমি যেতে পারতেনা তা আমি ভালভাবেই জানি। আমি এও জানতাম তুমি আমাকে ভালবাসো। আর তারপরও যদি ভালোবাসার অধিকারে অভিমান করে চলে যেতে, তাহলে আমিও তোমার মান ভাঙাতাম, তোমাকে এমনি করে কষ্ট দেয়ার পর নিজের ভালবাসার সমস্ত সত্ত্বা দিয়ে চমকে দিতাম। আর তুমি এমনি করে আমার বুকে মাথা রেখে কাঁদতে।

কোথায় চলে যাবে তুমি,,তোমাকে তো আমি সেই কবে থেকেই বেঁধে রেখেছি। এ বাঁধন ছেড়ার ক্ষমতা তোমার নেই। এ বাঁধন গড়তে যে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা আমাকে সাহায্য করেছেন। কোথায় চলে যাবে তুমি,, তুমি যে আমার স্বপ্নচারিণী,,,তুমি যে আমার বউ।

……রাত গভীর হচ্ছে। আর এভাবেই ওদের কথোপকথন এগিয়ে চলছে,,,এক মাসের জমানো কথোপকথন এক রাতেই শেষ করতে চাচ্ছে ওরা।
….রাত শেষ হয়ে যায়, দিন চলে যায়, ক্যালেণ্ডারেরপাতা বদলাতে থাকে, নতুন বছরের ক্যালেণ্ডার স্থান পায় ওদের ঘরে। কিন্তু তাদের কথা শেষ হয় না। আরো নতুনকরে জমা হতে শুরু করে।


আমাদের উৎসাহিত করুনঃ




সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এই লেখাটি কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয় ।

লেখক সম্পর্কেঃ

বুনন সম্পর্কিত তথ্যঃ