ভাগ্যের পরিহাস

সদ্য বিয়ে হয়েছে নিত্য আর ছবির। নিত্য একটা খাবারের হোটেলে কাজ করে। বাড়িতে ওর মা, বাবা আর এক ভাই আছে। আর্থিক কস্ট থাকলেও ভালোবাসার কমতি নেই তাদের। বিয়ের দুইবছর ঘুরতে না ঘুরতেই গর্ভে ছোঁয়া এল ছবির গর্ভে। সব ঠিক ঠাকই চলছিল। গ্রামের পরিবেশে হাজারটা প্রতিবন্ধকতা থাকলে তাদের ভালোবাসায় কোনো কিছুই বাঁধা হতে পারে নি। লোকের নানা কথা উপেক্ষা করে লেখা যেত নিত্য তার স্ত্রীকে নিয়ে বারান্দায় বসে মাথায় পরম যত্নে তেল দিয়ে দিচ্ছে, দুজনে একসাথে বসে মাছ ধরছে, এক পলক ছায়ার মুখটা দেখার জন্য বাড়ি একটু আগেই ফিরে এসে “ক্ষুধা আজ একটু বেশি লাগছে”, “শরীরটা ঠিক নাই” এসব অজুহাতও দিত।
এভাবেই ছোঁয়ার এই ভুবনে আসার দিন এগিয়ে এল। একদিন সকাল বেলা হঠাত্ই ছবির তুমুল ব্যাথা শুরু হয়। অনেকে বলতে শুরু করলো এসে ” আরে এসব হয়।” “তেমন কিছুই না, সবাই সহ্য করে” “হাসপাতাল নিয়ে কি হবে শুনি, বাড়িতে হবে” … আরে কত্ত কি!
নিত্য লোকের এত কথাই কান না দিয়ে হসপিটালে নিয়ে গেলো তাড়াতাড়ি করে। হসপিটালে নেয়ার ঘন্টা তিনেক পরে ছোঁয়া এলো নিত্য আর ছায়ার ঘরে। কিনতু যেখানে ছোঁয়ার হাত ধরে নিত্য আর ছায়ার পথের সব অশুভ ছায়াদের বিদায় দেবার কথা ছিল সেখানে ছোঁয়া একটু নিষ্পাপ মেয়েটাই যেন একটা ‘অশুভ ছায়া’ হয়ে গেল! ওর জন্মানোর একদিন পর ছায়াকে বাড়িতে আনা হলো। কত স্বপ্ন নিয়ে নিত্য ছায়া আর ছোঁয়াকে নিয়ে ঘরে এল। কিনতু তার পর থেকেই ছায়া কেমন যেন অস্বাভাবিক আচরন করা শুরু করলো! প্রথমে সবাই ভাবলো হয়তো এখনো দুর্বল আছে তাই এমন করছে। দিনদিনকে বিষয়গুলো সবারই দৃষ্টিগোচর হতে লাগলো। দেখা যেত ছায়া টয়লেটে যেয়ে বসে আছে তিন বা চার ঘন্টা হয়ে গেছে কিনতু বের হচ্ছে না, একা একা কি যেন বলছে কিনতু কেউ কিছু জানতে চাইলে জবাব নাই, কেমন অদ্ভুত ভাবে যেন তাকিয়ে থাকতো একদৃষ্টিতে, খেতে দিলে খেত না কিছু আরো অনেক অদ্ভুত কাজ করতে দেখা যেত ওকে। অনেক ডক্টর, কবিরাজ দেখানো হলো ছায়াকে। নিজের সাধ্যের বাইরে যেয়েও নিত্য করলো।

এভাবেই দিন চলতে লাগলো। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো ছায়া ছোঁয়াকেই ডাকতো মাঝে মাঝে আর ওর দিকে অপলক তাকিয়ে শুধু কি যেন দেখতো আপনমনে। ” আমার ছোঁয়া, আমার ছোঁয়া”…গুনগুন করে বলতো শুধু। কিনতু এর বেশি কিছু করতে পারত না। তবে কখনো সখনো আবার বাইরের কেউ গেলে আবার অনেক বার ডাকলে উত্তর দিত। ছায়া সবসময় বড়দের সম্মান করতো। কেউ গেলো এই দুইটা কথা প্রায়ই বলতো,
“মামী বসেন, কি রান্না করছেন আজকে?” “দিদি বসেন, ভালো??….

ছায়ার দিনকে দিন কেবল অবস্থার অবনতিই হচ্ছিল। এদিকে নিত্যর মা, বাবারও বয়স হয়েছে। এই ছোট্ট বাচ্চাকে ওকে দেখতে হয় পাশাপশি ছায়াকে দেখা আর সম্ভব হচ্ছিল না। তাই ওর বোন ওকে নিয়ে যায় এসে। ওর বাড়িতেও কেউ নেই তেমন। দুইবোন আর একটা ছোট ভাই সাত বছর ছিল তখন বয়স ভাইটার। ছায়া ছিল সবার বড়, তারপর মায়া ওর বয়স ছিল পনের তারপর ভাই ছোটভাই তনু। মাতো সেই ছোট কালেই মারা যায় তারপর থেকে ছায়ার হাত ধরেই ওর বিয়ের আগ পর্যন্ত চলছিল সংসারটা। অবস্থা বেগতিক দেখে আবার ওকে বাড়িতে নিয়ে এল। ওখানে কিছুদিন থাকার পর হঠাত্ হাত কেটে যায় কিনতু অনেকদিন পর্যন্ত শুকায় নি তাই দেখে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যায় ওর বাবার বাড়ি থেকেই নিত্য। ডাক্তার বললো “পঁচে গেছে জায়গাটা আর ডায়াবেটিস অনেক বেশি তাই এমন হইছে”! তারপর এভাবেই একটা থেকে আরেকটা এভাবে হতে হতে একসময় চুল ও পরে গেলো মাথার সব। তারপর একদিন আর শ্বাস নিতে পারছে না কিনতু সেদিনও ছোঁয়ার নামটা নিয়েছিল ছায়া। ছোঁয়াকে নিয়ে হসপিটালে যাওয়ার পর কিছু বলতে পারে নি। শুধু চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়েছিল ছায়ার তার কিছু সময় পর এই ভবলীলা সাঙ্গ পরলোকের পথে পারি জমিয়েছিল ছায়া; তখন ছোঁয়া ছিল তিন বছরের!

তারপর থেকে নিত্য কেমন যেন ছন্নছাড়া হয়ে গেলো! রাতেও ঘরে ফিরে না, তেমন একটা কথাও বলে না কারো সাথে। বাজারেই পরে থাকে। পরিবারের সবাই ঠিক করলো নিত্যকে আবার বিয়ে দিবে। ও রাজি ছিল না তাই এটা এত সহজও ছিল না তবুও অনেক ভেবে সবার চাপে দুই বছর পরে নিত্য দ্বিতীয় বিয়ে করলো। ছোঁয়ার মা এসেছে এই ভেবেছিল হয়তো সবাই। ছোঁয়া বুঝে না তবুও হয়তো ওর অবুঝ মনটা তাই চেয়েছিল কিনতু আদৌ কি তাই পেলো …?
আমার আজো কানে বাজে যেদিন নিত্য ওর বৌ নিয়ে ঢুকে ঘরে ছোঁয়া সবাইকে বলছিল হেসে হেসে
“আমার বাবুর বিয়ে” “আমার বাবুর বিয়ে”….। ওতো এটাও বুঝে নি এর মানে কতটা নির্মম!

এখন হয়তো না বুঝলেও কিছুটা বুঝে। ছোঁয়ার বয়স এখন আট। ওর একটা বোন হয়েছে; বছর হতে চললো। কাকাও সদ্য বিয়ে করেছে। ওর কাছে মা, বাবা সবই ওর ঠাম্মাই। ঊনি থাকলেই পরিবেশ এক আর না থাকলেই পরিবেশ অন্য, একদম অপরিচিত। ছোঁয়ার ঠাম্মা কিছুদিন ধরে বাড়ি নাই কারণ ওর বাবা নতুন দোকান দিয়েছে খাবারের তাই এখানে কিছুদিন কাজ আছে কিছু। বাড়িতে আছে ছোঁয়া, দাদু, কাকা, কাকী, নতুন মা আর বোন। ছোঁয়া ক্লাস ফোরে পড়ে একটা প্রাইমারী স্কুলে। বারোটার সময় খালি পেটে মেয়েটা স্কুলে গেছে। যে মেয়েটা টিফিনে ঘন্টা দেবার আগেই কখন টিফিন দিবে বাড়ি আসবে বলে লাফায় সে আজ না খেয়ে যাওয়ার পরে বাড়ি আসেনা! তাই দেখে স্কুলের এক দিদিমনি জানতে চাইলে এই আট বছরের বাচ্চাও জলভরা চোখ নিয়েও ভিতরে সব চেপে বলতে পারে “না দিদিমনি, ক্ষিধা ধরছে না যে আজকা তাই যামু না বাড়ি”!
এই ঘটনার দেখে পাশের বাসার একজন হাসির ছলে কথাটা বললে ছোঁয়ার নতুন মা বলে “এত তাড়াতাড়ি হয় না তাছাড়া দরকার হলে মাটি কামড়ে পড়ে থাকবো তবুও আমার এটার কোনো কস্ট হতে দিব না, আমার রিয়ার জন্য সব করবো!” সাথে তো আছেই ছোঁয়ার কাকীর সুর……
আসলেই ছোঁয়াতো আর রিয়ার মতন তার পেটের সন্তান না। তা হলে সত্যিই এভাবে এই বাচ্চা মেয়েটাকে না খাইয়ে স্কুলে পাঠাতে পারত না।

আজ আবার দেখা গেলো ছোঁয়ার নতুন মা আর কাকী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছে সন্ধার সময় আর ছোঁয়াকে ধমকে বলছে “যা হইছে, তাড়াতাড়ি সন্ধা দে”…। ছোঁয়া কেবল তাকালো একবার ওদের দিকে তারপর “যাই” বলে চলে গেলো।

এ যেন ঠিক নিন্মোক্ত গানের কথাগুলোর সাথে মিলে গেলো একেবারে।
“দিশাহীন চোখে খুঁজে যাই
শুধু খুঁজে যাই,কি আশায়
এ শহর বড় অচেনা,কেও বোঝেনা
তাকে হায়!
একা প্রাণ তবু খুঁজ়ে যায়
কোথা হারিয়ে গেছে মা
ভেজা চোখ ধরে রাখে আজ
শুধু অবুঝ বোবা কান্নায়..”

সত্যিই মায়ের আঁচলের তল ছাড়া মুখ লুকানোর নিরাপদ স্থল আর দ্বিতীয় হয় না। মা ছাড়া সন্তানের কস্ট দেখার কেউ নেই। চার দেওয়ালের মাঝে থেকেও সবাই পর!

হায় রে বাস্তবতা এই আট বছরের বাচ্চা যার এখন দিন দুনিয়া কি সেটাই বুঝার কথা না; চারদিকে দৌড় ঝাঁপ করে বেরোবার কথা তাকে চোখের পলকে একদম বাস্তব বুঝিয়ে দিলে, দুনিয়া কি চিনিয়ে দিলে!!

শুধু ছোঁয়া কেনো ছোঁয়ার মতন কত লাখো কিংবা তার চেয়েও বেশি ছোঁয়ারা এভাবে বেড়ে উঠছে নানা অযত্নে, অবহেলায়! এভাবেই চোখের জলে ঝাপসা হচ্ছে রোজ কত কত শৈশব; কিছু তো আবার চিরতরে হারিয়েই যাচ্ছে!

মানবিকতা শব্দটার ব্যবহার কি এতটাই দুর্লভ হয়ে গেলো যে বাস্তবিক ক্ষেত্রে এটাতো দৃষ্টিগোচর হয়ই না বরং এর উল্টোটাই বেশি হয়! আচ্ছা, আমরাতো একটু অন্যভাবেও ভাবতে পারি। সন্তান নিজের না হলেই বা কি এসে যায় তাতে? সব শিশুর শিশুসুলভ আচরণগুলো তেতো একই সরলতা খুঁজে পাওয়া যায় তাই না? ওদের চোখের দিকে তাকালে, নিজের বাচ্চার বেলায় যেমন নিষ্পাপ একটা শুভ্রতা মনে আসে এর অন্যথা হয়? হয় নাতো। কখনো হবার কথাও না। তাহলে কেনো ওদের দিনানিপাত হবে অযত্নে, অবহেলায়?

খুব বেশি কিছুর দরকার নাই। চলুন না, আমরা নিজের ভাবনা চিন্তায় খানিকটা বদল ঘটাই, যাই করি বা বলি, সেটা একটু মানবিকদৃষ্টিকোন থেকে ঠিক না ভুল সেটা বিচার বিবেচনা করে তারপর করি। মানুষকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসি। দেখবেন, এই ছোট্ট কাজটা করে অন্যের মুখে হাসি ফুটিয়ে আপনি নিজের মাঝে যে প্রশান্তি খুঁজে পাবেন সেটা অন্য কিছুতে খুঁজে পাবেন না। আমাদের একটু মানসিকতার বদলই পারে লাখো বা তার চেয়েও বেশি ছোঁয়ার পৃথিবী বদলে দিতে।


আমাদের উৎসাহিত করুনঃ




সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এই লেখাটি কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয় ।

লেখক সম্পর্কেঃ

বুনন সম্পর্কিত তথ্যঃ