দ্বিধা

সরদ এর অসাধারণ সুরের সাথে হারিয়ে গেছে সমুদ্র,তার মনে হচ্ছিল চার পাঁচ বছরের বাচ্চা গুলো নয়, মঞ্চে ত্রিশ চল্লিশ বছরের অভিজ্ঞ অনেকে সরদে সুর তুলেছে সুনিপুণ ভাবে।তার সাথে তবলা এর তাল, এক স্বর্গীয় পরিবেশের সৃষ্টি করেছে।হঠাৎ পেছন থেকে

-এই সমুদ্র?

খানিক টা বিরক্ত হল সে,পিছন ফিরে দেখল, তার স্কুলের বন্ধু শুভ কে।

-কিরে কি খবর তোর?
-এই চলছে,বেকার জীবন
-কেন তোর তবলা, ভায়োলিন, গীটার, গান….
-থাম থাম,এই টুক টাক চলছে,আর এগুলো তো পেশন থেকে করি,এটা বেকারত্ব দূর করার হাতিয়ার না,হাহাহা?

খানিকটা বিব্রত হয়ে স্বভাব সুলভ লাজুকতা নিয়ে সমুদ্র বলল

-না না আমি সে কথা বলি নি,তুই অনেক ভাল –গান করতি,আই মিন এখনো করিস, তাই জানতে চাইলাম….
-শুভ এর পেছনে ঠিক ডান পাশ করে কে যেন দাঁড়ানো,স্টেডিয়ামের এত আলো ও যেন তাকে আড়াল করতে চাইছে? কিন্তু কে সে
-দোস্ত পরিচয় করিয়ে দেই, ও রুহি!

সমুদ্রের ঢেউ যেন অগত্যা বন্ধ হয়ে গেল! কিছু সেকেন্ডের জন্য মনে হল,সে শ্বাস নিতে পারছে না।
সামনে দাঁড়ানো মেয়েটা সমুদ্রের এত বছরের কলকল ধ্বনি থামিয়ে দিয়েছে অনায়াসে,সে বুঝল তার মুখ থেকে কথা বের হচ্ছে না।

-হ্যলো,আমি রুহি
-হায় আমি সমুদ্র।
-বাহ বেশ সুন্দর তো,নামটা

তুমিও, অস্পষ্ট স্বরে বের হয়ে গেল সমুদ্রের মুখ থেকে।তবে শুভ বা রুহি কেউই বোধ হয় শুনতে পায় নি।রুহি বলল

-আপনারা থাকুন আমি একটু বন্ধুর সাথে কথা বলে আসি।
-কি হল তোর ?
-কই না ত!একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল সমুদ্র।
-জানিস রুহি খুব ভাল গান গায়।
-তাই নাকি?
-হুম,আর?
-আর কি?
-কিছু না।
-কি ব্যাপার সমুদ্র?দেইখো মামা ক্রাশ টাশ খাইস নাকি?
-আরে ধুর।
-ও কিন্তু আমার বন্ধুর প্রেমিকা,সো বি কেয়ারফুল?
-কি? না মানে সত্যি?
-হুম।
-তাতে আমার কি, তোতলালো সমুদ্র।
-আপনারা কি করছেন?

হঠাৎ রুহীর কন্ঠ শুনে অপ্রস্তুত হয়ে গেল দু জনেই।

চলুন ওই দিকটাই,সেখান থেকে ভাল দেখা যাবে স্টেজ। লোকে লোকারণ্য স্টেডিয়াম।আজ উপমহাদেশের অনেকগুণী শিল্পী এসেছেন। মঞ্চের শিল্পী দের গান রুহি ও গাইছে, ঠোট নড়ছে সমান লয়ে।সমুদ্র বরং রুহির কন্ঠ শুনতে চাইছে প্রাণ পণ। অবশেষে অনুষ্ঠান শেষ হল।সমুদ্রের কেমন যেন লাগছে।সে ভাবল ঘণ্টা খানেক আগে পরিচিত হওয়া মেয়েটির জন্য তার এমন লাগছে কেন? তাছাড়া সে অন্য এক জনের প্রেমিকা, সেদিকে এটি এক প্রকার অন্যায়। শুভ বলল

-রুহিকে বাসায় দিয়ে আসি,তুই ও চল সাথে।
-না আমি বাসার দিকে যাচ্ছি।
-ওকে।
-বাই আবির, বাই রুহি।
-আচ্ছা সমুদ্রে কি ঝড় হয়?

রুহীর এমন প্রশ্নে কিছুটা বিব্রত হল সমুদ্র।

-বুঝলাম না।
-না এমনি কিছু না,ভাল থাকবেন।
-এক রহস্যময়ী হাসি দিয়ে চলে গেল রুহি।

সমুদ্র তাকিয়ে আছে, তারা দুজনেই দৃষ্টি সীমানার বাইরে চলে গেল,তাও সমুদ্রের তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে,যদিও সে জানে এর কোন অর্থ নেই। সমুদ্রের ঝড় তখন তছনছ করে ফেলেছে সমস্ত যুক্তি,বাস্তবতা, সব সব।মাঝে মাঝে মানুষ এমন কিছু কাজ করে, যেগুলোর অর্থ তার কাছে ও পরিষ্কার নয়।কিন্তু করে….

সকাল বেলায় মোবাইল টা বেজে উঠায়, খানিক বিরক্ত হল সমুদ্র,।ঘুম ঘুম চোখে কল টা রিসিভ করতেই অপর পাশে শুভর কণ্ঠ।

-কি করিস?
-ফুটবল খেলি?
-মানে?
-এত সকালে মানুষ ঘুম না গিয়ে কি করে?খানিক রেগে বলল সমুদ্র।
-আচ্ছা শোন না আমরা আজ পূর্বাচল যাচ্ছি,যাবি?
-আমরা মানে!
-আমি, আনিকা,রিমন, শিফাত আর রুহি!
-শেষ নাম টা শুনে বুকে ধক করে উঠল,সে বুঝল গতকালের ব্যাপারটা শুভ বুঝেছে।তাই মজা নেয়ার জন্য তাকে ইনভাইট করছে।
-আচ্ছা আমি গেলে জানাব।
-ওকে।কল দিস।

ফোন রেখে খানিক চিন্তায় ডুবে গেল সমুদ্র। সে ভাবছে রুহিকে আরেকবার দেখার সুযোগ সে ছাড়তে চায় না।কিন্তু এটা তার কি হল।কখনো ত এমন হয় নি।বরং তার বন্ধুরা তাকে মেয়ে বিদ্বেষী বলেই জানত। বিকেল ঠিক ৪টায় সবাই একত্রিত হল পূর্বাচলে শুভ সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল সমুদ্রকে। রুহির দিকে তাকিয়ে খানিক সময় হারিয়ে গেল সে। রুহিকে আজ ঠিক কোন দেবীর মত লাগছে।ঈশ্বর যেন তাকে নিজ হাতে গড়েছেন।শ্যামল বর্ণের মেয়েটা লাল টিপের সাথে পড়েছিল গোল এক নাক ফুল,।চুলগুলো ঘাড় বেয়ে নেমে ঠিক পিঠ জূড়ে উন্মুক্ত হয়েছে।চোখের কাজলের ঠিকানা তার গন্ডি পেরিয়ে বাক নিয়েছে একটু উপর দিকে।রুহীর চোখের চাহনীতে সমুদ্র নিজেকে হারিয়ে ফেলছে বার বার।

-এই সমুদ্র,সমুদ্র?
-হু
-এই হল সিফাত, আমাদের রুহী ম্যাডামের প্রেমিক মহাশয়।
-হ্যলো, ভাল আছেন?
-হুম আপনি।
-এই চলছে
-রু হু বলে উঠল উনি সমুদ্র, তবে মাঝে মাঝে ঢেউ থেমে যায়।বলেই হাসতে শুরু করল।

নিজেকে সামলিয়ে সমুদ্র বলল

-চলুন কোথাও বসা যাক।
-হুম ওই খালি জায়গাটাতে বসা যায়।

বসে সবাই জমিয়ে আড্ডা দিল। সমুদ্র এমনিতে কথা কম বলে। তাও সে আজ যথেষ্ট পরিমণ রেস্পন্স করল।এবার ফেরার পালা।সমুদ্র নিজেকে বুঝাল,রুহিকে নিয়ে তার আর ভাবা ঠিক হবে না, আর কখনো সে তার সামনে আসবে না। সবার কাছ থেকে সবাই বিদায় নিল, রুহি বলল সিফাত আমাকে ড্রপ করে দে।

“হুম তাতো করতেই হবে,মিথ্যা বয় ফ্রেন্ড বানিয়ে রেখেছেন, আর কি কি সেক্রিফাইস করতে হবে, একটা লিষ্ট করে দিবেন,আমি অক্ষরে অক্ষরে তা মেনে চলব…….”

কথাটা শুনে আবীরের মুখের দিকে তাকাল সমুদ্র,সে বুঝছে তার হৃদ কম্পন বেড়ে যাচ্ছে……


আমাদের উৎসাহিত করুনঃ




সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এই লেখাটি কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয় ।

লেখক সম্পর্কেঃ

বুনন সম্পর্কিত তথ্যঃ