রক্তদান

বাবার কাছেই লালন পালন আমার,১২ বছর বয়সে মা মারা যায়, তারপর আর বাবা বিয়ে করে নি, আমাকে নিয়েই বাবার সব স্বপ্ন।
এস এস সি পরীক্ষার পর থেকে মাথা ব্যথা শুরু হয়, মাত্রাতিরিক্ত মাথাব্যথা। আমরা মধ্যবিত্ত পরিবার, ঠিকঠাক সময় চিকিৎসা ও করা হয় নাই। হাতুড়ে ডাক্তারই দেখাতাম,মাঝে মাঝে নিরবে কাঁদতাম। ম্যাট্রিক পরিক্ষায় (A+) পাওয়ায় বাবা আমাকে হোস্টেলে রেখে পড়াশোনা করান, যাতে করে পড়াশোনা ভালো মতো করতে পারি।বাবার ইচ্ছে আমাকে ডাক্তার বানাবে, এর জন্য সব কষ্ট করতেই রাজি। প্রথমে হোস্টেলে থেকে থাকতে না চাইলে ও পড়ে বাবার অনুরোধে রাজি হই। এবং নিজে নিজেই প্রতিজ্ঞা করি, বাবার স্বপ্ন পূরন করতে আমি আমার সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করব। হোস্টেলে থাকা শুরু করি, বাবার কাছে খরচের টাকা চাইতে বিবেকে বাধত, বাবা এতো টাকা দিবে কি করে? তাই ক্লাস শেষে একটা টিউশন ঠিক করি,অষ্টম শ্রেনীর এক মেয়েকে পড়াতে হবে প্রতি মাসে ১৫০০ করে টাকা দিবে, আমি খুব খুশি হয়েই পড়ানো শুরু করি।এবং নিজের খরচ ভালো মতোই চালাতে পারতাম।

মাথাব্যথা বেশি থাকলে ও বাড়িতে জানাতাম না।

হোস্টেলে আমার সাথে আর ও ২জন থাকত, একজন অনার্স ১ম বর্ষে পড়ে (রোমানা), আর একজন আমার সাথে(হাবিবা)। আমরা তিনজন খুব ফ্রেন্ডলি। একে অপরের সাথে প্রায় সব কিছুই শেয়ার করতাম।

এইচ,এস,সি পরিক্ষার আগে বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ি। রুমমেট এর একজন(রোমানা) বাড়িতে ফোন করে আমার অসুস্থতার কথা জানায়, বাবা মা ওই দিনই চলে আসে আমাকে নিতে। একটি সরকারী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, ডাক্তার জানায় ব্রেন টিউমার, ২-১ দিনের মধ্যেই অপারেশন করতে হবে।
বাবা আত্মীয়-স্বজন আরো ধনী লোকের সাহায্য নিয়ে আমাকে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে,অপারেশন শুরু করার আগে ডাক্তার জানায় চার ব্যাগ রক্ত লাগবে। আমার রক্ত (O-)। আমার রুমমেট রোমানার রক্ত ও নেগেটিভ, আমরা কলেজে ২০টাকা টিকিট কেটে রক্ত পরিক্ষা করেছিলাম, তখন থেকেই একে অপরের রক্তের গ্রুপ জানি। আমি বাবাকে বললাম রোমানা আপুকে একটা ফোন করতে তাঁর রক্তের গ্রুপ ও নেগেটিভ আমার কথা শুনলে নিশ্চই রক্ত দিতে রাজি হবে। বাবা ফোন করে বলল, রোমানা আপু রাজি হল,সাথে সাথেই রওনা দিল, আমাকে দুই ব্যাগ পর্যন্ত রক্ত দিল, বাকিটা কেনা হল।
অপারেশনের পরে মোটামুটি সুস্থ, সামনে এইচ এস সি পরিক্ষা। ডাক্তার বেশি চাপ নিতে নিষেধ করলে ও আমি দিন রাত ১২ ঘন্টাই পড়াশোনা করতাম, বাবার ইচ্ছে পুরন করতেই যে হবে।

পরিক্ষা শেষে বাবার অনুরোধে মেডিকেল কোচিং এ আমাকে ভর্তি হতে হয়,যদিও আমাদের সেই সার্মথ্য নেই তবুও বাবা রাত দিন কষ্ট করে আমার কোচিং এর টাকা জোগাড় করে।

কোচিং এ যাবার পর থেকেই আবার অসুস্থতা বোধ করি, নিজের শরীর দিন শুকিয়ে যাচ্ছে প্রথমে ভাবতাম হয়ত বেশি পড়াশোনার চাপে এমন হয়ে যাচ্ছি। কিন্তু আমার অসুস্থতা দিন দিন বাড়তেই থাকে, কিছু খেতে পারি না। কোচিং ৩মাস শেষ ও করতে পারি নাই, এর আগেই অসুস্থ হয়ে পড়ি, বিছানা থেকে উঠতেই পারি না এমন অবস্থা।বাবা ঢাকা আসে একটা সরকারি মেডিকেলে ভর্তি করে, দু তিন দিন মেডিকেলেই থাকতে হয়, ডাক্তার বাবাকে ডেকে নিয়ে জিঙ্গেস করে, আপনার মেয়ে কি করে? বাবা বলল, পড়াশোনা। ডাক্তার জানায় ওর (HIV) এইড্স হয়েছে। বাবা মাথায় হাত রেখে বলে আপনি কি বলেন ডাক্তার? আমার মেয়ে এমন নয়, বাবা আমার কাছে দৌড়ে এসে বললঃ মা শুনছোস? ডাক্তার বলে তোর নাকি এইড্স হয়েছে। আমি শোনা মাত্রই অবাক হয়ে গেলাম, মনে হচ্ছে আকাশ ভেঙ্গে পড়ার মতো খবর, এ কি করে সম্ভব? আমার এই রোগ কি করে হবে? জিবনটাকে অন্ধকারের মতো মনে হল।

মেডিকেল থেকে ছাড়পত্র দিল না, ডাক্তার বলল কিছুদিন চিকিৎসা চলবে এখানে….
এইচ এস সি পরিক্ষার রেজাল্ট দেয়া হল আমি এবার গোল্ডেন এ প্লাস পেলাম। রেজল্ট শুনে বাবা চিৎকার করে কাঁদতে লাগল,আর বলল আমার মেয়ে ডাক্তার হবে ? আমার কান্নার শব্দ বের হচ্ছিল না, মনে হচ্ছিল জোরে চিৎকার করে কাঁদলে মনে শান্তি পেতাম, আমি আমার বাবার ইচ্ছা পূরন করতে পারলাম না।

মেডিকেলের ভর্তি ফরম কিনে আনল বাবা, বাবা বলছে আমার মেয়ের কিছুই হয় নাই আর হবে ও না।
মেডিকেলে পরিক্ষা দিতে চাইলাম না কারন আমি জানি এই রোগের শেষ পরিনতি মৃত্যু। কিন্তু বাবাকে বোঝাতে পারছি না, তিনি মানতেই রাজি না আমি মরে যাব।

যাই হোক বাবার কথা মতো মেডিকেলে অসুস্থ শরির নিয়েই পরিক্ষা দিলাম।
আমি ভাবতে লাগলাম আমি তো এমন কিছু করি নাই যে এইড্স হবে? কেনো হলো? ভাবতে ভাবতে মনে হলো রোমানা আপুর আমাকে রক্ত দেয়ার কথা মনে পড়ল। আমি তাঁর নাম্বারে ফোন করলাম,

-হ্যালো রোমানা আপু ?
-হ্যাঁ। তুই কেমন আছিস? এতোদিন পর মনে পড়ল?
-হুমম,,তুমি কেমন আছ?
-ভালো না রে ঢাকার একটা হসপিটালে ভর্তি আছি।
-কেনো কি হয়েছে?
-তুই তো দেখতি, আমি ঠিকটাইম মতো হোস্টেলে পৌছাতাম না, ছেলেদের সাথে টাইম পাস করতাম, এমন কি শারিরীক সম্পর্ক পর্যন্তও। আজ সেই অপরাধের মাসুল গুনতেছি। আমার এইড্স হয়েছে রে…

আমার আর বুঝতে বাকি রইল না যে আমার এইচ আই ভি কি করে হল। আপু তোমার সাথে আমাকে ও শেষ করেছ, তোমার রক্ত নেয়ায় আজ আমি ও এইড্স রোগী। এই বলে ফোন রেখে দিলাম।

মেডিকেলের রেজাল্ট দেয়া হল, আমি ঢাকা মেডিকেলে চান্স পেলাম, খুশি হব না কাঁদব বুঝতে পারছি না, বাবা অনেক খুশি, দেশে গিয়ে মিষ্টি বিতরন করে আসলেন। আমি মেডিকেলে ভর্তি হলাম না, কারন ডাক্তার আমাকে ১৫ দিনের সময় দিয়েছে। হয়ত এই ১৫ দিনের মধ্যেই জিবনের শেষ নিশ্বাস নিতে হবে। পৃথিবীর আনন্দ দেখে ও উপভোগ করতে পারলাম না। আফসোস রয়ে গেল আমার বাবার ইচ্ছে পূর্ণ করতে পারলাম না। যাই হোক বাবা আমার মৃত্যুর পর তুমি কাঁদবা না, কাঁদলে কিন্তু আমি কষ্ট পাব বুঝে নিও…!

মোরাল অব দ্যা স্টোরিঃ আজকাল অনেকেরই একে অপরের রক্ত দরকার হয়, রক্ত নেয়ার আগে ভালো মতো পরিক্ষা করে নিন।)


আমাদের উৎসাহিত করুনঃ




সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এই লেখাটি কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয় ।

লেখক সম্পর্কেঃ

বুনন সম্পর্কিত তথ্যঃ