কোলাহলের অন্তরালে

শব্দ দূষনের শহরে বিচিত্র শব্দের মাঝে নিজেদেরকে অভ্যস্থ করে ফেলাটা কঠিন কিছু না। এই যেমন আজ আসার পথেই ভাবছিলাম। একটা বাস একটানা হর্ণ দিয়েই যাচ্ছে আর সেই সময় প্রচন্ড শব্দে মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেলে বিমানটা! কেমন আজব দেখুন, আমাদের মনটা মুহূর্তে সড়ক থেকে একেবারে আকাশে গিয়ে হাজির! এটা ভাবতে ভাবতেই বাসটা হার্ড ব্রেক করে থেমে গেলো ।আর শুনতে পেলাম অ্যাম্বুলেন্সের চিরচেনা শব্দটা। ধক করে যেন চমকে উঠলো বুকের ভেতরটা। এই শব্দটাতো কখনো ভালো কিছুর ইংগিত দেয় না! এই একটা শব্দটা হয়ে যায় কারো কারো জন্যে দীর্ঘশ্বাস নাহয় আভিশাপ ! কিন্তু তাতে কারো কিছুই এসে যায় না । ছোটবেলায় বইয়ে পরেছিলাম –

“সময় এবং স্রোত কারো জন্যে অপেক্ষা করে না”

আসলেই , সময় যেমন থেমে থাকে না তেমনি আমাদের জীবনও ।

নিজের জীবনের অনুভূতিকেই যেখানে “পাত্তা দেয়ার” সময় পাই না আমরা সেখানে এত শত ভাবার সময় কোথায়!

ভোরের ঘুমটা কোকিলের কুহু কুহু ,কাকের কাকা ডাকে বা অ্যালার্মে যেভাবেই শুরু হোক না কেন তা কিন্তু একটাই বার্তা দেয়, ” সকাল হয়ে এল ,শুয়ে থাকলে চলবে না!” টিভিতে যখন খবরে দেখি কোন মৃত্যুর খবরে স্বজনদের আহাজারিতে মনে হয় ড্রয়িং রুমের বাতাসটাও ভারী হয়ে উঠেছে তখন সেই ভারী বাতাসকে মুহূর্তে হালকা করে দিতে পারে বিজ্ঞপনে মডেলের গেয়ে ওঠা একটা জিংগেলেই। আমরা আসলে সেইসব শব্দের ভিরে নিজেকে হারাতে চাই না । সবাই আমরা স্ব স্ব কাজে ব্যস্ত । কেউ কারো কল্পনার রাজ্যেটাকে নতুন করে খরখুটো দিয়ে শক্তপোক্ত করতে ব্যস্ত কেউবা আবার ভেঙ্গে যাওয়া রাজ্যের হিসেব কসতে ।

এসবের মাঝে, সমস্ত দিনের ক্লান্তিতে আপনি যখন আপনার শ্রান্ত-ক্লান্ত দেহটাকে এলিয়ে দেন বিছানায়, দুনিয়ার কাছে আপনার শত অভিযোগ আর অভিমান যখন দুমড়ে মুচড়ে দেয় আপনার ভেতরটা, আচ্ছা আপনার পাশেই শুয়ে থাকা মানুষটা কি তা বুঝতে পারে? জানতে পারে সেই নীরব অনুভূতি? পারে না ! আর পারবেই বা কি করে আমরাতো অনেকসময় শব্দবিহীন ভাবে কারো চোখ থেকে জল পড়তে দেখলে সেটা আনন্দাশ্রু না বিষাদের চিন্হ বুঝে উঠতে অপারগতা প্রকাশ করি । আমরা আসলে ভুলে যাই অনেক বেশি কাঁদার পর আসলে সে আর চাইলেও কাঁদতে পারে না ।সে ব্যক্তিটার মনের আবেগ , অনুভূতি , কী আমরা বুঝতে পারি নাকি না বুঝেই তাকে একটা পাথরসম হৃদয়ের মানুষ হিসেবে আখ্যায়িত করে বসি ??
এইতো রোজকার মতো আজো খবরের পাতা উল্টাতে না উল্টাতেই চোখে পড়লো সেই সংবাদ , যা শুনে আমাদের চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যাওয়ার কথা , লজ্জায় মাথা নত হয়ে যাওয়ার কথা কিনতু কই আমরাতো দিব্যি চায়ের কাপের টেস্ট নিয়ে নিয়েই পাতা উল্টিয়ে যেতে পারছি , সেসব নরপিশাচগুলোতো ঠিকই হেঁটে বেড়াচ্ছে বুক ফুলিয়ে রাজপথে । কই কেউতো লজ্জায় ঘরের কোণে গুমরে মরা মেয়েদের কান্নার শব্দ শুনতে পাচ্ছে না । দিনতো চলে যাচ্ছে , সেই সাথে বেড়েই যাচ্ছে ঝড়ের গতিতে এসব অন্যায় । কই ওদের কান্নার শব্দতো চারদেয়াল ভেদ করে উদ্ধতন পর্যায়ের লোকদের কানে পৌঁছাচ্ছে না ?? হয়তো পৌঁছাবেও না !

আর এভাবেই কিছু কিছু অনুভূতি অনেক তীব্র হওয়া সত্ত্বেও তা অপ্রকাশিত থেকে যায় পৃথিবীর কাছে।

আচ্ছা, এই শেষটুকু কি একটু অন্যরকম হতে পারে না? যদি আমরা শুধু কান দিয়ে না শুনে একটু হৃদয় দিয়ে শোনার চেষ্টা করি এই লক্ষ্য লক্ষ্য কান্নাগুলো? আমাদের হাত ধরে কি নীরবে শেষ হয়ে যাওয়া এই কান্নাগুলো সশব্দ হাসিতে রূপ নিতে পারে না? সেই হাসি ,যা ভুলিয়ে দিতে পারে তাদের অতীতের কান্নাগুলো?


আমাদের উৎসাহিত করুনঃ




সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এই লেখাটি কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয় ।

লেখক সম্পর্কেঃ

বুনন সম্পর্কিত তথ্যঃ