প্রেম ও তার সত্যতা

আজ যেন মনটা হাল্কা মনে হচ্ছে সম্রাটের।। যেন মাথার উপর থেকে ১ মণ এর একটা বোঝা নেমে গেল।। হাটতে হাটতে সে পার্কের একটা বেঞ্চে বসল গিয়ে।। মুখে হাল্কা হাসি যেন কি জয় করে ফেলেছে।। অথচ এখন থেকে ৩০ মিনিট আগে তার ব্রেক হয়েছে প্রেম।। পকেটে থেকে তার স্মার্টফোন বের করল যার স্ক্রিন এর গ্লাসটা ভাঙ্গা।। তিন মাস আগে ভেঙ্গেছে ঠিক করতে পারে নাই।।পারবে কিভাবে তার রিলশন হওয়ার পর থেকে যেন টাকা তার দিকে ফিরে তাকাছে না শুধু পকেট থেকে বের হয়ে যাচ্ছে।। মোবাইলে বিপ্লবের নাম্বার বের করে কল দিলো……টিং টং…..

অপর পাশ থেকে বিপ্লব কল ধরে বলল, “দোস্ত, বল।।”
সম্রাট : দোস্ত, একটা ঘটনা ঘটেছে…
বিপ্লব :আবার কি চাইল তোর কাছে প্রিতি??
বিপ্লব আশ্চর্য হয়ে:আসলে??
সম্রাট : হুম রে।।
বিপ্লব: বাহ সেই একটা খবর।। ট্রিট কবে দিবি।।
সম্রাট : দোস্ত ভুল করলাম না ত??
বিপ্লব: তুই নিজেই একবার ভেবে দেখ।।
সম্রাট : বড্ড ভালবাসতাম রে।।
বিপ্লব:তুই এক আগে থেকে ভাব কি কি হয়েছে??
সম্রাট : আমিই প্রথম বলেছিলাম ভালবাসি।।
বিপ্লব:ও প্রথম বলেছিল ডেট চল।।
সম্রাট : আমি বলেছিলাম সারাজীবন পাশে থাকব।।
বিপ্লব: ও না থাকতে চাইলে কিভাবে হবে।।
সম্রাট : আমি ত ভালবাসা ছাড়া কিছু চাই নি।।
বিপ্লব:ও ই বলেছিল কাল আমার জন্মদিন কি দিবা আমায়।।
সম্রাট :আমি আমার বাড়িতে যে টাকা দেয়ার কথা তা দিয়ে একটা গলার সেট দিয়েছিলাম।।
বিপ্লব: চাইল কেন?
সম্রাট : চাইতেই পারে।।
বিপ্লব: ত তুই কিভাবে ভাবলি ও তোকে ভালবাসে!!
সম্রাট : তাহলে ও যে বলেছিল ভালবাসে….
বিপ্লব: মিথ্যে ছিল।।
সম্রাট : তাহলে এতদিন কি অভিনয় করেছে??
বিপ্লব: হুম।।
সম্রাট :তাহলে আমি অন্ধকারে পথ খুজতেছিলাম??
বিপ্লব:হুম
বিপ্লব পরে কথা বলব বলে কল কেটে দিল।।

ঠিক ভুল এর প্রশ্নটা যেন মাথায় তখন ও ঘুরপাক খাচ্ছে।।সম্রাট এক বছর আগের কথা ভাবতে লাগল……

মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে সম্রাট।। তাই ছোট বেলা থেকে জীবন কি শিখেছে।। বুঝেছে শিক্ষা হচ্ছে মধ্যবিত্তের উত্তরণের উপায়।। তাইতো তার এই আশা থেকে ই বিশ্ববিদ্যালয়ে আশা।। ভাল ই কাটছিল সব যত দিন তার জীবনে প্রিতি এসেছিল।। হরিণ টানা চোখ, হাসিভরা মুখ, বাতাসে এলোচুল যখন উড়ে তখন মনে হয় যেন এক পরী।।আসলে প্রেমে পড়লে সবার তাই ই মনে হয়।। যাক পরের কথায় আসি, পরিবারের অভাব জানে সম্রাট, তাইতো টিউশন দিয়ে চলে বাড়ি থেকে একটা টাকাও নেয় না।জানে চাইলে বাবা দিবে কিন্তু তখন পরিবারের খরচে টান পরবে।। তাই চায় না বাবার কাছে উল্টো মাঝে মাঝে পাঠায়।। প্রিতি কে দেখার পর সে নিজের মাজে কেন যেন টান অনুভব করেছিল জানে না।। যেন মন টা কেমন কেমন করে।। ও মনে মনে ভাবে এ কি ভালবাসা।। একেই কি বলে love at first sight….. যাই হোক ওর কেন জানি মনে হলো ওকে ছাড়া বাঁচবে না সে।। প্রিতি কে পটানো ই যেন তার একমাত্র লক্ষ্য হয়ে গেল তার।। কিন্তু কিভাবে…………..এটাই ভাবতে লাগল সে।।

যে ছেলে সাদাসিধে পোশাকে চলত আজ সে নানারকম ফ্যাশনবহুল কাপড় পরা শুরু করল।। এইদিকে প্রিতির দিকে তাকিয়ে থাকত ফেলফেল করে যেন বাচ্চা ছেলে সে।। প্রিতি ব্যাপারটা লক্ষ্য করল কিন্তু কিছু বলত না বরং উপভোগ করত।। সম্রাটের মত ছেলে তাকে দেখতেছে ভাল লাগারই কথা।। তার বান্ধবী বলল তাকে সম্রাট খুব ভাল ছেলে।।প্রেম করবি নাকি?? প্রিতির জবাব,” খেলিয়ে দেখি।।”একদিন প্রিতি সম্রাটের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিল।। যদিওবা সম্রাটের কাছে ভাল লেগেছিল কিন্তু এটা ছিল নিছকই একটা সাধারণ ঘটনা।। কিন্তু প্রেমে পরলে যা হয় আর কি বুদ্ধি সব হাটুতে চলে যায় সম্রাটের ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম হবে কেন??প্রিতির এই হাসি তার কাছে প্রেম সংকেত মনে হল।। এই মনে হওয়াটাই তার জীবনে নতুন অধ্যায় শুরু করল।।

[nextpage title=”পর্ব ২”]
এই অধ্যায় যেন এক অন্যরকম পরিবর্তন আনল সম্রাটের জীবনে।। সহজসরল সাধাসিধে ছেলেটা হয়ে উঠল অন্যরকম।। যাকে কেউ কখনো কোনা বড় জেমস আইটেম এর দোকানে নিতে পারে নি;সে আজ বড় মার্কেট ছাড়া তার কাপড় কিনে না।। যে জিন্স পরত না, সে আজ জিন্স ছাড়া কিছু বুঝে না।। বিষয়টা চোখে পরার মত তাই এটা চোখে পরল সম্রাটের বন্ধুদের(বিপ্লব,রাজু,মেহেদি)।।ওরা ভাবল এমনেই পরে বিষয়টার বিশদ শুনল সম্রাটের মুখ থেকেই।। সম্রাটের কথাগুলো সবার কাছে যেন স্বপ্নের মত লাগল।।ওরা ভাবল সম্রাট আর প্রেম কি যে বলে।। কিছুদিন আগে ও একটা মেয়ে সম্রাটের পিছনে লাট্টু হয়ে ঘুরেছিল;নাম ছিল কাজল অনেক ভালবাসত তাকে।। অনেক ঘুরেছিল তার পিছনে।।তাকে চিঠিও দিয়েছিল কয়েকবার।। কিন্তু ও সোজাসুজি না করে দিয়েছিল আর আমাদের বলল আগে ক্যারিয়ার পরে প্রেম।। এখন সেই ছেলে যদি বলে আমি প্রিতি কে ছাড়া বাচব না তাহলে হাস্যকর লাগারই কথা।।সম্রাট বলা শুরু করল,” আমি প্রিতি যে দিন থেকে দেখেছি আমার ঘুম আসে না রাতে শুধু তার কথা মনে পরে;আমি তাকে ছাড়া বাচব না।” একনিশ্বাস এ বলল কথা গুলো।।কথা শেষে রাজু বিপ্লবের গায়ে চিমটি কাটল।।বিপ্লব বলল, “কি করিস,লাগে ত।”
রাজু:না স্বপ্ন কিনা টেস্টিং করতেছিলাম।
মেহেদী : আসলে কি যুগ আসল আজকাল সম্রাট প্রেমে পরতেছে।।
একথা বলে সে হাসতে লাগল।।তারপর সম্রাট বলল ও সিরিয়াস।।
সম্রাট : আমাকে কোনো বুদ্ধি দে কেমনে কি করমু??
রাজু: গিয়ে বলে দে, আমি তোমাকে ভালবাসি।।
বিপ্লব: বললেই ত হল না।। সরাসরি বললে থাপ্পড় দিবে একটা আর বলবে ঘরে মা বোন নেই।। একথা বলে ও একটু হাসল।।
সম্রাট : আরে মজা পরে নিছ আগে সমাধান দে।।
রাজু: প্রথমে চোখাচুখি হয়ে বন্ধুত্ব পরে মুখোমুখি হয়ে প্রপোজাল।। ইজি প্রসেস।।
বিপ্লব: এই জিনিস টাই একটু সময় নিয়ে করতে হবে।।
সম্রাট : ওকে বুঝেছি।।
তারপর শুরু হল সম্রাটের প্রেমের পথে হাটা।। এর পর ঘটনাটা চোখের পলকে ঘটে গেল।।ক্লাসে সম্রাট এমন ভাবে বসত যেন প্রিতি দেখা যায়।। প্রিতির দিকে তাকিয়ে থাকত ও অপলক।।যখন ই চোখাচুখি হত সম্রাট মাথা নিচু করে নিত।। আর এটা দেখে প্রিতি একটা হাসি ছুড়ে দিত ওর দিকে।।ও ভাবত ভালবাসার লক্ষণ।। কিন্তু সম্রাট বুঝতে পারে নি এই হাসির পিছনে লুকিয়ে আছে কত বড় ছলনা।। এভাবে চোখচুখি চলল কিছু দিন।। একদিন সম্রাট অনেক সাহস সঞ্চার করে গেল প্রপোজাল দিতে। প্রিতির পিছন পিছন ওর বাড়ির গেট পর্যন্ত।। তারপর প্রিতি বলে ডাক দিল।। যখন প্রিতি পটল চেরা চোখে মুখে মুচকি হাসি নিয়ে যখন বলল, ” হুম,বল সম্রাট।।”
তার মুখের ভুবন ভুলানো হাসি দেখে সম্রাট যেন সব ভুলে গেল।।ও হকচকিয়ে উঠে বলে,”কাল কি কি ক্লাস হবে??”
প্রিতি:তুমি কলেজ থেকে ৪ কি.মি. এসেছ আমাকে এটা বলার জন্য।।
তারপর একটু মুচকি হাসল প্রিতি।।
সম্রাট :আসলে আমি বলতে চাই………
প্রিতি:বল চুপ কেন।
সম্রাট :(চোখ বন্ধ করে)আমি তোমাকে ভালবাসি।
চোখ খুলে দেখল প্রিতি মুচকি হেসে চলে গেল।। তারপর শুরু হল সম্রাটের সিংগেল থেকে মিংগেল জীবন।
[nextpage title=”শেষ পর্ব”]

মিংগেল যত তাড়াতাড়ি হল তত তাড়াতাড়ি হল তার মধ্যে পরিবর্তন। আজ সে বাড়িতে টাকা পাঠায় না সে প্রিতির মোবাইলে টাকা পাঠায়।। আজ সে পড়ার টেবিলে বসে পড়ে না, প্রিতির কল এর অপেক্ষা করে।। আজ সে আগের মত ফুতপাতে খায় না, আজ সে প্রিতির সাথে চাইনিজ খায়।। যে আগে বাবা টাকা দিতে চাইলে না বলত, আজ সে বাবার কাছে টাকা চায়।। এভাবেই চলতে থাকে তার প্রেম।। একটা কথা বলে প্রেমে পরলে নাকি বুদ্ধি হাটুর নিচে চলে কারণ মানুষ তখন চলে আবেগে।। সম্রাটের বেলায় তার উল্টো হবে কেন!! তার বেলায় ও তাই হল। সে তার আবেগের তারনে বুঝতে পারল না যে প্রিতি তার সাথে ঠান্ডা মাথায় খেলছে প্রেম প্রেম খেলা।। এভাবে একবছর পার হল।। আজ ওর প্রেমের এক বছর পূর্ণ হইছে তাই সে একগুচ্ছ লাল গোলাপ আর সাথে চকলেট নিয়ে প্রিতির সাথে দেখা করতে গেল।। সে ফুটপাত ধরে হাটছে আর তার মুখে একটা হাসির ঝলক।। ভাবছে তাকে দেখে কতই না খুশি হবে প্রিতি।।যখন ও কলেজ পার হচ্ছিল তখন দেখল প্রিতির মত কেউ একজন। সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখল এটা প্রিতি।। ও একটা ছেলে কাধে মাথা রেখে জানু জানু করে কথা বলছে। আর সম্রাটকে কিভাবে বোকা বানিয়েছে তাই বলে দুই জন হাসছিল।। কথাগুলো শুনে যেন সম্রাটের মাথায়, হাত থেকে ফুলের তোরা পরে যায়, চোখ বেয়ে নেমে আসল জল।। তারপর চকলেট গুলো পথশিশুদের দিয়ে ও হেটে গিয়ে প্রিতির সামনে দাঁড়ায়।। তাকে দেখে প্রিতি হতবাক তাকে দেখে।। সম্রাট কাঁদো কাঁদো গলায় বলল আমি তোমায় ভালোবেসেছিলাম।।তোমায় নিয়ে আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম।। আর তুমি আমাকে….. বলতে বলতে গলা ভার হয়ে আসল।। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলল তুমি ভাল থেকো।। এটা বলে ও চোখ মুছতে মুছতে চলে গেল।।
পার্কে বসে ভাবতে ভাবতে আবার চোখে পানি আসল কিন্তু নিজেকে সামলে নিল।। একবার ভাবল আত্মঘাতী হবে তখনই মনে পরল নিজের বাবা মার কথা।। ও ভাবল ভাল হইছে তাড়াতাড়ি বুঝতে পারছি তারপর ও আবার আগের মত লেখাপড়ায় মনোযোগ দিল। যদিওবা নিজেকে সামলে নিতে সময় লাগল।।


আমাদের উৎসাহিত করুনঃ




সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এই লেখাটি কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয় ।

লেখক সম্পর্কেঃ

বুনন সম্পর্কিত তথ্যঃ