কয়েন

দেয়ালে ২০ বছরের পুরোনো একটি ছবির দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে হাসান। সেই দৃষ্টিতে শুধুই অপরাধবোধ ছাড়া আর কিছুই নেই,অপলক নয়নে কখন যে অশ্রু গড়িয়ে পড়া শুরু হয়েছে,তা বোধহয় সে বলতে পারবে না।
মাঝারি সাইজের এই রুমটায়, ছবিটা ছাড়া আর দুটো জিনিসের সমাহার, তা হল কয়েন আর কয়েনের মত দেখতে চকলেট। পুরো রুমটা বোঝাই হয়ে গেছে। অনেক দুস্প্রাপ্প কয়েন ও আছে। কয়েন সংগ্রহ হাসানের ছোটবেলার শখ। এই কয়েন ই তাকে আজ কাঠগড়ায় দাড় করিয়ে বিদ্রুপের প্রশ্ন করে,তুমিই কি অপরাধী নও?
দেয়ালে টানানো বিশাল সাইজের ছবিটি ওর বোন নীলার। ছোটবেলা থেকেই খুব ডানপিঠে ছিল। সারাদিন ছোটাছুটি, হৈ হুল্লোড়, চেচঁমেচি,কান্নাকাটি,খিলখিল করে হাসিতে দিন চলে যেত ওর। এই রুটিনের বাইরেও ওর কয়েকটা কাজ ছিল, যেমন,সারাদিনে অন্তত কয়েকবার ভাই এর নামে মার কাছে নালিশ করা, বাবার অফিসে যাওয়ার সময় চিত্‍কার করে বাসা মাথায় তোলা যাতে বাবা না যায়,তারপর কাদঁতে কাদঁতে ঘুমিয়ে পড়া সেটাও অল্প কিছুক্ষন এর জন্য,তারপর আবার সেই লাফালাফি।
ভাই বোন সারাদিন খুনসুটি করেই যেত,হাসানের কয়েন সংগ্রহের ঘরটির দিকে তার প্রবল আগ্রহ ছিল। কিন্তু হাসান তাকে ঢুকতে দিত না। এই নিয়ে নীলা নির্দিষ্ট একটা সময় জুড়ে কান্নাকাটি করত,অবশ্য হাসান ওকে চকলেট দিলে কান্না বন্ধ হত।
এভাবেই দিন চলে যাচ্ছিল। যতক্ষন নীলা জেগে থাকত সারাবাড়িটা এত প্রানবন্ত হয়ে থাকত যে বাড়ি সবাই যেন ভুলেই গিয়েছিল যে মন খারাপ বলে অনুভূতিতে কোন জগত্‍ আছে।
এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল,হাসি খুশিতে সর্বদা প্রানবন্ত একটা পরিবারে কিছু বুঝে উঠার আগে হঠাত্‍ কোথা থেকে যে কি হয়ে গেল ।
দিনটা ছিল শনিবার, কলেজে আসার পর থেকেই কেমন যেন একটা অস্থিরতা কাজ করছিল হাসানের,কোথায় যেন একটা ভুল করে এসেছে ও,কিন্তু তেমন কিছুই মনে পড়ছে না তার।
হঠাত করেই বাসা থেকে ফোন এল। মোবাইল এর স্ক্রীন এ জ্বলজ্বল করছে মা নামটি। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম নিয়ে, কাপা কাপা হাতে কলটি রিসিভ করল হাসান। হ্যালো বলে ওপাশের কন্ঠ শুনেই একটা দৌড় দিল সে। দেখে মনে হল ভুতে তাড়া করছে হাসানকে, বন্ধুরা সব অবাক পানে ওর গমন পথের দিকে তাকিয়ে রইল। এলোপাথাড়ি দৌড়াতে গিয়ে কিছু একটার সাথে প্রচন্ড জোরে বাড়ি খেল হাসান। তারপর আর কিছু মনে নেই।
জ্ঞান ফেরার পর দেখল, নিজের বাড়িতেই শুয়ে আছে সে,কিন্তু সারা বাড়িতে কেমন যেন একটা শুন্যতা। কোথা থেকে যেন কান্নার রোল ভেসে ভেসে আসছে। অনেক কষ্টে নিজের ভারী দেহ বয়ে নিয়ে, নিচে যখন হাজির হল তখন……….
ডাক্তার আংকেল হাসানকে তার কয়েন টা ফিরিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু অতিরিক্ত রক্তক্ষরন এর কারনে তার বোনকে ফিরিয়ে দিতে পারেনি।

হঠাত করেই চমকে ওঠে বাস্তবে ফিরে এল হাসান। ভাবতে ভাবতেই চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল তার। তার পাশের ছবিটির দিকে চোখ পড়তেই দম বন্ধ হয়ে আসতে চাইল হাসানের। ছবিটি তার কলিজার টুকরা ছোট মেয়ে নীরার। বোনকে হারানোর অনেক দিন পরের ঘটনা। এমএসসি শেষ করে একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করে হাসান। ভালবেসে বিয়ে করে নিপাকে। তারপর অনেক সুখ- দুঃখের মুহুর্ত। ফুটফুটে দুই মেয়ের বাবা তখন হাসান। বাবা,মা,স্ত্রী,সন্তানদের নিয়ে তার সুখী পরিবার। নীলার মৃত্যুর পর কয়েনের ঘরটা বন্ধই হয়ে গেল। হাসানের এই শখের জিনিস তার কাছে ঘৃনার বস্তুতে পরিনত হল। শুধু সেই কয়েনটা হাসান তার ওয়ালেটধীরে ধীরে তার মেয়েরা বড় হতে লাগল। ওর ছোট মেয়ে নীরার দিকে তাকালেই কেমন যেন নীলার কথা মনে পড়ে যেত তার। নীরাটাও হয়েছে তার ফুপির মত। সারা বাড়ি মাতানো মেয়েটি ছিল দাদু-দীদার অসম্ভব আদরের, উনারাও বুঝি তাদের ছোট মেয়েকে খুঁজে পেতেন নীরার মাঝে। নীলা মারা যাওয়ার পর, সেই কয়েনটা হাসান সবসময় নিজের কাছেই রাখত। নীরার যখন দশ বছর বয়স, তখন সবাই মিলে ওরা পাহাড়ি অঞ্চলে বেড়াতে গিয়েছিল। হাসান,নিপা,বাবা,মা,নিতু আর নীরা। অনেক হৈ হুল্লোড় করে তারা দিন গুলো পার করছিল। ফিরে আসার দিন ঘুরতে গিয়েছিল একটা পাহাড়ে, সবাই খুব খুশি। হাসান, নিতু এবং নীরার জন্য পানি কিনতে মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করছিল, হুট করে কয়েন টা পড়ে তা নীরার পায়ের কাছে চলে গেল। নীরা কয়েনটি হাতে তুলে নিল। তার খুব ভাল লাগল কয়েনটি। দূর থেকে হাসান দেখল নীরা কি যেন একটা মনোযোগ দিয়ে দেখছে। কাছে গিয়ে দেখল সেই কয়েনটি। সে নীরাকে বলল কয়েনটি দেয়ার জন্য। নীরা দুষ্টুমির ছলে না দিয়ে দৌড় দিল। হাসান ও তার পিছু নিল। সবাই দেখল বাপ বেটিতে কি দুষ্টুমি টাই না করছে। ওরাও হেসে উঠল। হঠাত করে হাসানের একটা আর্তচিৎকারে সবাই স্তব্দ হয়ে গেল, দৌড়ে গিয়ে যা দেখল, তাতে নিপা অজ্ঞান হয়ে গেল। পাহাড়ের নিচে পাথরের উপর নীরার নিথর দেহ আর হাতে মুঠোতে একখানি দুষ্প্রাপ্য কয়েন।


আমাদের উৎসাহিত করুনঃ




সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এই লেখাটি কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয় ।

লেখক সম্পর্কেঃ

বুনন সম্পর্কিত তথ্যঃ