স্মৃতি

প্রিয় কাঠখোট্টা,

জানি ভালো আছো তাই আর নতুন করে জিজ্ঞাসা করলাম না। তবে কেমন ভাল আছ? বেশী ভাল? নাকি আমি যেমন আছি তেমন? শেষ কবে চিঠিপত্র পাঠিয়েছিলে মনে আছে? আমার কিন্তু দিব্যি মনে আছে। সময়টা হয়ত কিছুদিন পর মাস পেরিয়ে বছরে রূপ নিবে। সময় কি আসলেই দ্রুত চলে যায়, না আমরা ধীরে চলছি? দেখো, মনের ভুলে কলমটিও দৃশ্যগত ভুল করে ফেললো। এখন তো ‘আমরা’ ব্যবহার করাটাই মস্ত বড় ভুল। অধিকারটা হারিয়ে গেছে।

শোনলাম, ঠিকানাও পরিবর্তন করেছো। চিঠি পেয়ে সবার প্রথমেই হয়ত ভাববে নতুন ঠিকানা পেলাম কোথায়? সে বিস্তর ইতিহাস। কয়েকমাসে কত গোছানো জিনিস উলটপালট হয়েছে আর উলটপালট বিষয়গুলো হয়েছে গোছানো। কত কথা চাপা পড়েছে মনের স্তূপে, এই কথাটাও না হয় চাপাবাক্যগুলোর সঙ্গী হয়ে রইলো। দিনদিন স্তূপাকৃতি বৃদ্ধিই হচ্ছে। তবে এখনো হ্রাস করবার মত কাউকে বাছাই করিনি। আমার চিঠিগুলো কি এখনো বারবার পড়ে মাথার বালিশের নিচে রেখে ঘুমাও? এখনো কি তোমার ভাই লুকিয়ে চিঠি পড়ে বাবা-মাকে বলে দিয়ে ভবিষ্যতে গোয়েন্দা হওয়ার স্বপ্ন বুকে লালন করে? এখনো কি প্রতিরাতে তোমার আম্মু উঁকি দিয়ে হাতে ফোন দেখে রাগে কটমট করে? প্রতিদিনের রুটিনের মত এখনো তোমার বাবা প্রেমের অপকারিতা বুঝিয়ে ভাষণ দিয়ে যায়? মামা এসে মাথায় হাত বুলিয়ে ভুলিয়ে রাতজাগার রহস্য উদঘাটন করতে চায়? আমার কবিতা হাতে এখনো কি ধরা খেয়ে বকুনি শোনো?দেখো এখনো সেই বাচালের মত প্রশ্নই করে যাচ্ছি। অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল এইযা। এখন ভুলে যাই অনেককিছুই। বয়স বেড়ে যাচ্ছে। মনের। যেমন গত বুধবার রুম থেকে বেরোলাম একটি ডায়রি কিনবো বলে। অথচ একা রাস্তার ধার ধরে হেঁটে যখন হিজল মোড়ে পৌঁছলাম, একেবারেই ভুলে গেলাম কি জন্য বের হয়েছি। কিছুক্ষণ হাঁটাহাটি করেও যখন ব্যর্থ হলাম, নিজের উপর অভিমান করে ফিরে আসি। টেবিলের উপর কালোরঙের জেল কলমটি দেখে যখন খেয়াল হল, তখন রুমটিকে অন্ধকার চাদরে ঢেকে ঘুমিয়ে পড়ি। জানো, আমার ঘুমের উন্নতি হয়েছে। আগের মত আর রাতজাগা হয় না, ঠিক বারটায় ঘুমিয়ে পড়ি। কখনো এর আগেই ঘুমিয়ে যাই। বিশ্বাস করা যায়, যেই আমি তিন-চারটার আগে ঘুমোতামই না। সকালে দশটা-এগোরোটায় উঠি। ইচ্ছে হলে নাস্তা করি, নাহলে কিছুক্ষণ ফোন চেপে আবার ঘুমিয়ে একেবারে রৌদ্রস্নাত হয়ে উঠি। নতুন রুমে আমার বেডটি জানালার ধারে। পশ্চিমের সূর্যরশ্মি যখন দেহের উষ্ণতা বাড়িয়ে দেয়, তখন চোখ মেলে কয়েকবার হাই তুলে ধীরেধীরে উঠি। বড় আলসে হয়েছি। তুমি তো খেলাধুলা পছন্দই করতে না। খেলাধুলা একেবারে ছেড়ে দিয়েছি। তোমার মনরক্ষা করে নয়, আলসেমির জন্য। সময় পেলেই ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেই। তবে অদ্ভুত লাগে কি জানো, শোয়ার কিছুক্ষণের মাঝেই নিদ্রায় ডুবে যাই। কি আজব, হাস্যকর আবার ভয়ংকর স্বপ্ন দেখি। একরাতে দেখি, বাসার সবাই খুব খুশী। আমার বিয়ে। আব্বু-আম্মু-ভাইয়া-আপু, কিছুদূর দেখি তোমার বাবা-মা-ভাই, কথা বলছে একে অপরের সাথে। আত্মীয়স্বজনরা। পাত্রী কিনা তুমি। মানে তোমার সাথে আমার বিয়ে। সাথে সাথে ঘুম ভেঙে যায়। রাতের আঁধারে একা একাই হাসি মিনিটখানেক। সে রাতে আর ঘুম আসেনি। তবে এমন অদ্ভুতুড়ে স্বপ্ন দেখিনি আর। শুনে খুশী হবে, নিজের উপর নির্ভরশীল হতে পেরেছি। একসময় দুইজন হাতধরে ভার্সিটি রোডে সময়ের পর সময় হেঁটে চলতাম। এখন একাই হেঁটে বেড়াই। একাকীত্বকে ভালবাসতে পেরেছি, তোমার মত।

ভেবেছিলাম অল্পকথায় শেষ করব। বরবারেই মতই এখানেও ব্যর্থ। আগের তিনটে চিঠির কোনো উত্তর পাইনি। হয়তো এই চিঠির ভাগ্যেও তাই জুটবে। তবে আমি কিন্তু তোমাকে আর মিস করি না। ভাল আছো। ভাল থেকো।

ইতি,
বাউণ্ডুলে।

 

খামের উপর প্রেরক-প্রাপকের ঠিকানা লিখে সিল করে বাচ্চু মিয়াকে দিলাম। পোস্টঅফিসের কর্মকর্তা বাচ্চু মিয়া চেনাজানা তালিকার একজন হয়ে উঠেছে চিঠিপত্রের কল্যানে। খামের উপর আঠা দিয়ে স্ট্যাম্প লাগিয়ে এক চিলতে হাসি দিল বাচ্চু মিয়া। পান-সিগারেটে প্রায় কালচে দাঁতগুলোর মাঝে বিস্তর ফাঁকা। তবে কৃত্রিমতাহীন হাসি।

পোস্টঅফিস থেকে দক্ষিণে সবুজ শ্যামল ছায়াঘেরা নিভৃত পল্লীর সীমানা ঘেঁষে একটি আধাপাকা রাস্তা। আমার প্রিয় স্থানগুলোর একটি। বছরখানেকের মাঝে কতপ্রিয় স্থানগুলো হয়েছে স্মৃতি, কত অচেনা প্রান্তর স্থান পেয়েছে পছন্দের তালিকায়। পৃথিবীর কঠিনতম অমীমাংসিত রহস্যগুলোর মাঝে একটি বোধহয় – স্মৃতি। না ভোলা যায়, না মুছা যায়, আঁকড়ে ধরে রাখলে শুধু কষ্টই বেড়ে যায়। সবুজ শ্যামল ছায়াঘেরা নিভৃত পল্লীর সীমানা ঘেঁষা আধাপাকা রাস্তাটির প্রান্তধরে হেঁটে চলেছি সেই অমীমাংসিত রহস্য স্মৃতিকে সঙ্গী নিয়ে।


আমাদের উৎসাহিত করুনঃ




সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এই লেখাটি কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয় ।

লেখক সম্পর্কেঃ

বুনন সম্পর্কিত তথ্যঃ