সন্ধ্যাকাল

সুচনা

আমরা ছিলাম পাঁচ জনের একটা গ্রুপ। আমি, নয়ন, পায়েল, বিনয় আর কৃষাণু। আমাদের একজনকে ছাড়াও কখনো কলেজের লাল বিল্ডিং এর পাশে কেউ আড্ডায় দেখেনি, আমাদের আড্ডার নির্ধারিত জায়গা ছিল এই লাল বিল্ডিং এর কোণাটা। প্রতিদিন ক্লাস শেষে এই একজায়গায় মিনিমাম আধা ঘন্টার আড্ডায় বসতামই। অবশ্য সেখানে যে শুধু ফালতু কথার ফুলঝুরি ফুটতো তা নয়, প্রায়ই গ্রুপ স্টাডিতে মেতে থাকতাম। বিশেষকরে যখন পরীক্ষার সময় ছুঁইছুঁই হয়।

আমাদের মাঝে কৃষাণু ছিল একটু আলাদা, আসলে একটু না অনেকটাই আলাদা। ওর জগৎ ছিল আমাদের জগতের বাইরে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা জগৎ। আমাদের পড়ালেখার বাইরের সরস আড্ডায়ও দেখতাম হাতে একটা বই আর পেন্সিল নিয়ে বসে আছে নিজ মনে। অবশ্য খুব একটা বিরক্ত আমরা হতাম না ওর উপর কারণ ওর এই একাগ্রতার সুফল আমরা পেতাম যখন পরীক্ষার আগে খুব কঠিন কিছু না বুঝলে কৃষাণুর দ্বারস্থ হতাম। শুধুমাত্র পায়েল মাঝেমাঝে বিরক্ত করতো ওকে, কিন্তু খুব একটা সুবিধা করতে পারতো না। বেচারি খুব পছন্দ করতো কৃষাণুকে। আমরা জানতাম সব কিন্তু কৃষাণুর দিক থেকে কখনো রেসপন্স পাইনি, এতটাই ডুবে থাকতো ছেলেটা তার জগৎ নিয়ে।

কলেজ শেষ হল আজ প্রায় আট বছর। কে যে এখন কোথায় জানিই না। সর্বশেষ দেড় বছর আগে একবার নয়নের সাথে দেখা। দেখে প্রথমে তো চিনতেই পারিনি, আগে থেকে কিছুটা মোটা হয়েছে। সাথে ছিল দুই বা আড়াই বছরের ফুটফুটে মেয়ে, বুঝলাম ও নয়নের মেয়ে। কথায় কথায় জানলাম এক পাইলটের সাথে বিয়ে হয়েছে। এখন আপাতত পূর্ণ ঘরণীর রোল পালন করছে। কথা বার্তায় বুঝলাম সুখেই আছে। তাঁর থেকে জানতে পারলাম পায়েল নাকি এখন আমেরিকায় থাকে, বিয়ে থা এখনো করেনি।

আজ সকালবেলা কৃষাণুর চিঠিটা পেয়ে অবাকই হই। সে আমাকে আর বিনয়কে খুলনা যেতে বললো দুইদিনের মাঝে, আমাদের জন্য নাকি অনেক বড় সারপ্রাইজ আছে।

বেপারটা কি তার কিছুই অনুমান করতে পারলাম না। এতদিন কোথায় ছিল আর এখনই বা কোত্থেকে উদয় হয়ে একেবারে জরুরি তলব। অবশ্য নিজের ভেতরও খুব উৎসাহ অনুভব করছি, আমাদের শান্তশিষ্ট বন্ধুবর এতদিন বাদে কি সারপ্রাইজ নিয়ে বসে আছে দেখার জন্য।

বিনয় ঠিকানা পালটেছে, কোথায় এখন সে কেউ বলতে পারল না। অবশ্য  কলেজে থাকাকালীন একবার বলেছিল তাঁর ইচ্ছা সে ডাক্তারি পাশ করে গ্রামে চলে যাবে। অবশেষে গ্রামের ঠিকানায় তাকে পেয়ে যখন কৃষাণুর কথা বললাম, সে একবার আমার দিকে স্থির ভাবে তাকিয়ে বলল “মৌনী ঋষিও সারপ্রাইজ দেয় আজকাল?” বলেই হোহো হাসিতে ঘর কাঁপিয়ে দিল।

পরদিন আমরা খুলনায় যখন পৌঁছালাম তখন প্রায় চারদিকে সন্ধ্যার চাদর মুড়ে দিয়েছে। চিঠির ঠিকানায় গিয়ে দেখি ওখানে বিশাল এক পুরনো বাড়ি। কেয়ারটেকার একজন আছে তবে বসে বসে ঘুমোচ্ছে। কাছে গিয়ে ডাকতেই ভয়ে যেন লাফিয়ে উঠলো, তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল আমরা কারা। আমরা নিজের পরিচয় দিয়ে কৃষাণুর কথা জিজ্ঞেস করাতে লোকটা খুব সম্ভ্রমের সাথে আমাদের বলল যে এটাই তার বাড়ি। এবার আমাদের ভিতরে নিয়ে গেল।

সদরদরজা খুলে দিল স্বয়ং পায়েল। আমি আর বিনয় সত্যি সত্যি হা হয়ে গেলাম। পায়েল হেঁসেই কুটিকুটি, বললো “আগে তোরা ভিতরে আয় তারপর শুনবি।”

ঘরের ভেতরটা অনেক গোছালো আর খোলামেলা। আমরা কৃষাণুর কথা জিজ্ঞেস করাতে পায়েল বলল যে, ও ওর ল্যাবে আছে এখনো, আমরা যেন ওর জন্য অপেক্ষা না করে রাতের খাবার খেয়ে নিই। আমরাও অবশ্য যথেষ্ট ক্লান্ত ছিলাম, তাই ফ্রেশ হয়ে খেয়েদেয়ে সোজা ঘুম দিলাম।

পরদিন সকালবেলা ব্রেকফাস্টের টেবিলে আমি পায়েল আর বিনয় বসে আছি। আমাদের বন্ধুবরের পাত্তা এখন অব্ধি নেই। পায়েল আমাদের দুইজোড়া কৌতূহল দৃষ্টি দেখে নিজেই বলে উঠল

-বাছারা প্রশ্নের উত্তর ক্রমশপ্রকাশ্য।

-আচ্ছা ল্যাবরেটরিটা কোন দিকে?(বিনয়)

-লাইব্রেরির পাশে।

-লাইব্রেরিটা কোনদিকে? তোদের কি বিশাল বাড়ি, হারালে তো নিজেই নিজেকে খুঁজে পাব না(আমি)

-ক্রমশ প্রকাশ্য বৎস।

  • 17
    Shares

পাঠটিকে একটি রেটিং দিনঃ
খুব খারাপ, পাঠটিকে ১ রেটিং দিনখারাপ, পাঠটিকে ২ রেটিং দিনমোটামুটি, পাঠটিকে ৩ রেটিং দিনভাল, পাঠটিকে ৪ রেটিং দিনআসাধারন, পাঠটিকে ৫ রেটিং দিন (টি ভোট, গড়ে: এ ৫.০০)
Loading...

আমাদের উৎসাহিত করুনঃ




সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এই লেখাটি কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়



  • লেখক সম্পর্কেঃ উৎপল আচার্য্য

    নাম: উৎপল আচার্য্য জন্মতারিখ : ০১/০৯/১৯৯৬
    বুনন সম্পর্কিত তথ্যঃ 0000-00-00 00:00:00 তারিখ নিবন্ধিত হয়েছিলেন, এই পর্যন্ত প্রকাশিত লেখা সংখ্যা 11টি, মোট -100 পয়েন্ট সংগ্রহ করে 83 অবস্থানে আছেন।
    সংগঠন ও গোষ্ঠীঃ লেখক কোন সংগঠন বা গোষ্ঠী এর সদস্য নন

    আপনার ভাল লাগতে পারে

    avatar
      
    smilegrinwinkmrgreenneutraltwistedarrowshockunamusedcooleviloopsrazzrollcryeeklolmadsadexclamationquestionideahmmbegwhewchucklesillyenvyshutmouth
    3 আলোচনা
    0 আলোচনায় উত্তরগুলো
    1 অনুসরন করেছেন
     
    সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়া
    আলোচিত মতামত
    2 মতামত প্রদানকারী
    তাছনীম বিন আহসানশাশ্বত ভৌমিক সাম্প্রতিক মতামত প্রদানকারী
    তাছনীম বিন আহসান
    সদস্য

    kothay jeno hariye giye cilam…

    তাছনীম বিন আহসান
    সদস্য

    valo

    শাশ্বত ভৌমিক
    সদস্য

    কখন যে পড়া শেষ হল।বলতে ও পারি নাহ।।