অমীমাংসিত

১.

‘পৃথিবীর কেন্দ্রে মোমেন্টাম জিরো কেনো – এখন বুঝতে পারছো?’ বলেই অনুরিমার দিকে তাঁকালাম। দেখি গালে হাত দিয়ে মাথাটা একটু বেঁকিয়ে একদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
আবারো বললাম,
-কি হলো, বুঝতে পারছো?
কথায় একটু নড়েচড়ে বসে খুব আস্তে সংক্ষিপ্ত উত্তর,
-জ্বী ভাইয়া, বুঝছি।
-এই টপিকসে কোনো প্রশ্ন আছে?
-না, ভাইয়া।
-আজকের পড়াও শিখো নাই। দু-তিন সপ্তাহ ধরে তোমার একি অবস্থা। পরীক্ষায় কি করবা?
-জানি না।
-পাশমার্কও তো পাবা না এভাবে চলতে থাকলে
-জানি না।
– এই চাপ্টারের হাফ আর বায়োলজির ফোর্থ চাপ্টার এইগুলা নেক্সট ক্লাসে পড়া থাকবে।
– ওকে ভাইয়া
– নেক্সট ক্লাসে পড়া শিখবা তো?
– জ্বী ভাইয়া
– আজ শিখো নাই, গার্জিয়ানকে কিছু জানাই নাই। নেক্সট ক্লাসে না শিখলে তোমার বাবাকে ডাকবো।
– ঠিক আছে
-মনে থাকবে তো যা বললাম?
– জ্বী।

কথা দিয়েও নেক্সট ক্লাসে পড়া শিখে নাই অনুরিমা। রাগ হয়েছিল। অনুরিমা দেখতে খুব মায়াবী। এর প্রতি খুব বেশীক্ষণ রাগ করা যায় না। প্রায় ১ মাস ধরে পড়া শিখে না এরপরও কখনো গায়ে হাত তুলি নি। তুলি নি বলতে তুলতে পারি নি। যদিও পড়াতে আসার প্রথম দিনই মেহরাব স্যার বলেছিল, ” আমার মেয়ে বলে কখনো ছাড় দিও না। পড়াশোনায় কোনো ছাড় নেই। যদি পড়া না শিখে এই যে স্কেল দিয়ে গেলাম, এর ব্যবহার করতে ইতস্তত করবে না।” প্রতি ক্লাসেই স্কেলটা টেবিলের উপরই দেখতাম। অনুরিমা এই দিক থেকে সৎ বলা যায়। কখনো স্কেলের স্থান পরিবর্তন করেনি, কখনো লুকাবার চেষ্টা করে নি, সরাবার চেষ্টাও করেনি। তবে মাঝে মাঝে অনুপম এসে স্কেল নিয়ে অনুরিমাকে সপাৎ সপাৎ করে মেরে দিত।

২.

মেহরাব স্যার একাধারে অনুরিমার বাবা আবার আমার ভা্সিটির ডিপার্টমেন্টাল হেড। স্যারের প্রিয় স্টুডেন্টদের মাঝে আমিও একজন। যদিও প্রথম সেমিস্টারে স্যারকে আমি চিনতামও না। আর এর খেসারতও দিতে হয়েছিল। ভার্সিটি লাইফের সবেমাত্র তিনমাস হয়েছিল। একবারে নতুন। র্যাগের যন্ত্রণায় জীবন অতিষ্ঠ হয়ে যাচ্ছিল। উঠতে-বসতে র্যাগ। কথা বললেও র্যাগ, আবার না বললেও র্যাগ। মহাবিপদ। সিনিয়র ভাইদের সাথে একসাথে উঠেও, পরে গাট্টিবস্তা সহ আপুর বাসায় চলে যাই। একটু দূর হলেও আপুর বাসা থেকেই ক্লাস করতাম। ভার্সিটিতে আসতাম, কোনভাবে ক্লাস করে আবার সোজাসুজি বাসায় চলে আসতাম, আশেপাশে তাঁকানোর সাহস পেতাম না। তো অইদিন জ্যামে পড়ে একটু লেট হয়ে যায়। দৌড়ে ডিপার্টমেন্ট এ ঢুকেই ক্লাসরুমের দিকে যাচ্ছি। বশীর স্যারের ম্যাথ-১ ক্লাস। খুব কড়া মানুষ।ক্লাসে এসে প্রথমেই প্রেজেন্ট নেয়। এরপর ভিক্ষা চাইলেও প্রেজেন্ট পাওয়া যায় না। দৌড়ে ক্লাসে যাওয়ার সময় একজনের সাথে ধাক্কা লাগে। দৌড়ানোর মাঝেই সরি বলে ক্লাসে আসি। পিছনে ফিরে তাকাই নাই। ক্লাসে গিয়ে শুনি স্যারের রোল কল করা শেষ। কি আর করা। এক সাইডে চুপ করে বসে আছি। বরিং লাগছিল। ফোন টিপবো সে উপায়ও নাই। একবার নীরব ফোন চেপে ধরা খাইছিলো। সবার সামনে দাড়া করিয়ে স্যার অপমান করছিল।

হঠাৎই। আরে অই লোকটা, যার সাথে ক্লাসে ঢোকার কিছুক্ষণ আগে ধাক্কা লেগেছিল, সে ক্লাসে ঢুকল। আমি এবং আর কয়েকজন ছাড়া বাকি সবাই দাঁড়িয়ে গেলো। উনি বশীর স্যারের সাথে কি যেন কথা বলছেন। পাশে থেকে নীরব বলল, “অই দাঁড়াস না কেন? তাড়াতাড়ি দাড়া”। দাড়ালাম। লোকটি হাত দিয়ে ইশারা করে বসতে বলল। অবাক হলাম। হঠাৎ বশীর স্যার বলল, সবার শেষে ক্লাসে এসেছে কে? আমিই তো সবার পরে এসেছি। শুনেও বসে রইলাম।ভয় কাজ করতেছিল। এবার স্যার ধমক দিয়ে একই কথা আবার বলল। আমি দাঁড়ালাম, জড়সড় হয়ে। বশীর স্যার আমাকে বলল, “তুমি ক্লাস শেষে স্যারের রুমে গিয়ে দেখা করবে।” শোনেই আমার মুখ লাল হয়ে গেল। পাশেই নীরব ছিল। জিগাসা করলাম এটা কোন স্যার?? নীরবের উত্তর শোনেই মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। শুধু আকাশ না একেবারে মাথায় বাজ পরলো এমন অবস্থা।

রুমের সামনে গেলাম। দরজার উপর নেমপ্লেটে লেখা, ‘Mehrab Uddin Bhuiyan
Head of the Department,
Biotechnology & Genetic Engineering’

দরজায় নক করে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বললাম, স্যার আসবো? উনি হ্যাঁসূচক উত্তর দিলেন। প্রায় পনের মিনিট পর রুম থেকে বের হলাম। আমার নিশ্বাস দিয়ে গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে। মুখ- কান লালবর্ণ। ভিতরের পনের মিনিট আমার কাছে দেড়শ মিনিটের বেশী মনে হয়েছিল।

৩.

অথচ এই মেহরাব স্যার যখন আমাদের ২-২ তে ক্লাস নিল, প্রথমে উনাকে দেখে ভয় পেলেও পরে উনার ফ্যান বনে গেলাম। স্যারের পড়ানোর স্টাইল, কথা বলার ভঙ্গিমা ছিল নজরকাড়ার মত। আমি কখনো প্রথম সারিতে বসতাম না। কেনো যেনো ইচ্ছা করত না বসতে, অবশ্য এর অন্য একটা কারণও ছিল।স্কুলে পড়া-চোর ছিলাম। স্কুলে স্যার-মেডামরা প্রথমেই ফার্স্ট বেঞ্চের গুলারে পড়া ধরত, কয়েকবার না পেরে হাতে স্কেলের ঠাস ঠাস মারও সহ্য করতে হইছে। সেই আমিই স্যারের ক্লাসে একদিনের জন্যেও প্রথম সারির মাঝের চেয়ারটা চেঞ্জ করি নাই। একপর্যায়ে এমন হয়ে গিয়েছিল, সবাই জানত ঐ সিটে আমি বসি, তাই সবাই সিটটা আমার জন্য রেখে দিত। অবশ্য মাঝে মাঝে প্রিয়সীর সাথে এই সিট নিয়ে মারামারি লাগত।

টার্ম টু শেষ করে যখন টার্ম থ্রিতে উঠলাম, এমন হলো যে স্যার উনার ক্লাসের সকল ইনফরমেশন আমাকেই বলত। ক্লাস মডারেটরের সকল দ্বায়িত্ব আমাকেই পালন করতে হত। এতে অবশ্য মডারেটর আমার প্রতি জেলাস থাকত। শুধু জেলাসির বসে একটা মানুষ যে কত কি ছড়াতে পারে তা এই শালা মডারেটরকে দেখলে বুঝা যায়। যদিও কোনো ভাবেই সে আমার শালা হয় না, তবুও রাগে বলা। শালাকে গালির পর্যায়েও বলা যায় না, ট্রেন্ড হয়ে গেছে, সবাই বলে। ডিপার্টমেন্টে আমি ছিলাম ৪র্থ। ফার্স্ট হয়া মডারেটরকে না, স্যার আমাকে কেয়ার করে। আর স্যারের সাবজেক্টে হায়েস্ট পেতাম। এগুলাই জেলাসির প্রধান কারণ। সেজন্য সে ক্যাম্পাস ছড়িয়ে দিল, প্রিয়সীর সাথে আমার নাকি প্রেম চলছে।

সেদিনের ক্লাসের শেষে মেহরাব স্যার আমাকে তার রুমে যেতে বললো। রাতে ঘুমুতে লেট করার জন্য প্রথম ক্লাস মিস যায়। স্যার ক্লাসে এসে আমাকে খুঁজে না পেয়ে ইরিশকে বলে গেছে, আমি যেনো এসেই দেখা করি। স্যারের অনুমতি নিয়ে রুমে গেলাম।
-তোমার স্টুডেন্ট পড়ানোর অভিজ্ঞতা আছে?
– জ্বী স্যার, কলেজের সময় থেকেই অল্প অল্প পড়াই।
– আমার মেয়েকে পড়াতে হবে। এবার ইন্টারে উঠলো।
-স্যার??
-কি? কোনো আপত্তি আছে পড়াতে?
– না স্যার।
-তবে আমার বাসা একটু দূরে। মিরপুর -১০ এ। তোমার ত এখানে থেকে দূরে হয়ে যাবে।
– আমার আপুর বাসা কাছেই। সমস্যা হবে না স্যার।
– গুড। তাহলে শনিবার থেকে পড়ানো শুরু করো, এর আগে বাসার এড্রেস নিয়ে যেয়ো।
– ঠিক আছে, স্যার।

শনিবারে সারাদিন ক্লাস-ল্যাবের প্যারা, বিকেলে আবার মিতুর বার্থডে ট্রিট, রাতে টায়ার্ড হয়ে বাসায় ফিরলাম। ঘুম ছাড়া আর অন্য কিছু মাথায় কাজ করতেছে না। ফোন বাজলো। সিট। মেহবার স্যারের ফোন।

স্যারের ফোন দেখে মনে হল। আজ তো উনার বাসায় যাওয়ার কথা। একদমই মনে নাই। ভাবলাম স্যার খুব রাগবে। কিন্তু না। স্যার প্রথমেই জিজ্ঞাসা করল, আমি অসুস্থ নাকি? এরপর স্যারকে সংক্ষেপে যখন সারাদিনের বিবরণ দিলাম, স্যার কিছুই না মনে করে বলল, পরশু মানে সোমবার যাওয়ার জন্য। আগামীকাল স্যার পরিবারসহ ঘুরতে যাবে।

পরদিন ক্লাসে গিয়ে দেখি প্রিয়সী এক কোণায় মন খারাপ করে বসে আছে। বাকি সবাই যে যার আড্ডায় ব্যস্ত। প্রিয়সীর কাছে গিয়ে বললাম, ”কিরে প্যাঁচা, মুখ ভোঁতা কেন?” সাধারণ দিন হলে প্রিয়সী বলত, ”প্যাঁচি, আমার মুখ ভোঁতা না, তর চোখ কানা।” কিন্তু আজ কোনো কথা বলে নাই। চুপ করেই আছে। পাশে বসলাম। আস্তে বললাম -” কোনো সমস্যা?”। প্রিয়সী ফোন বের করে যা দেখালো মাথায় রক্ত উঠে গেলো। বুঝতে বাকি রইলো না মডা ছাগলটা এটা করছে। কোন কাপলের বিয়ের পিকে ফোটোসপ দিয়ে মাথা কেটে আমার আর প্রিয়সীর মাথা লাগিয়ে দিয়েছিল। সাগরকে আমরা ছাগল বলেই ডাকি, এরপর আবার মডারেটর। শর্টে বলি – ‘মডা ছাগল’।

ফোন হাতে নিয়েই আমি উঠে পড়ি। প্রিয়সী হাতে টান দিয়ে বসিয়ে দিল। নাহলে অই মডা ছাগলকে আমিও কয়েকটা বসিয়ে দিতাম। ডিপার্টমেন্টে পিকটা ছড়িয়ে গেল। জুনিয়র- সিনিয়র যার সাথেই দেখা হোক, কিছু বলে না, শুধু তাকিয়ে হাসে। ক্লোজ বড় ভাইরা বলে- চালায়া যা। চালায়া যা। কেউ কেউ আবার একটু এড করে বলে, দিন তো তদেরই ভাই। মেজাজ এমনেই গরম। ক্লাস শেষে বের হবার সময় কোন থেকে আবীর আর আতিক এসে বলে, ‘ভাই ভাই ট্রিট দেন। না দিলে যাইতে দিব না।’ সাহস কত বড়! কয়েকদিন ধরে ক্যাম্পাসে আসছে। মোস্ট জুনিয়র। কয়েকদিন ভাল বিহেভ করছি, কয়েকটা র্যাগ খাওয়া থেকে বাচাইছি আর এখন আমারে এসে বলে ট্রিট বলে। দুইটারে ধরে টানা ২ ঘন্টা নাচ-গান করাইলাম। মানে একপ্রকার র্যাগ দিয়ে দিলাম। মডা ছাগলের উপর উঠা রাগটা এদের দিয়ে ঝাড়লাম। বেচারাগুলা মন খারাপ করে চলে গেল।

বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে খেয়ে ল্যাব রিপোর্ট লেখতে বসলাম। টুং করে মেসেঞ্জার এ আওয়াজ হল। প্রিয়সীর মেসেজ।

” ভার্সিটিতে গিয়ে যখন রোমানার কাছে ছবিটা দেখি। চোখে পানি এসে গেছিলো। সাগর বিষয়ে শুধু একটা কথাই রোমানাকে বলেছিলাম, একটা মানুষ এত খারাপ কেমনে হয়??? সাগরকে কিছুই বলি নাই। ভাবছিলাম আজ তুই আসবি না। কারণ আমি যা চাই তা বেশীরভাগ সময় হয় না। তুই আসছিলি। ক্লাসের সবাই আমাকে টিজ করেছিল শুধু তুই ছাড়া। তুই আমাকে বুঝালি। আবার স্বান্তনাও দিলি। বিষয়টা খুব সুন্দরভাবে হ্যান্ডেল করে নিলি। আমি জানি তর আমার মাঝে বন্ধুত্ব ছাড়া অন্য কিছু নাই। আর কিছু হবেও না। আজ যেভাবে পাশে ছিলি এভাবেই পাশে থাকিস আজিবন। পরম বন্ধু হয়ে। ”

মেসেজের কি রিপ্লাই দিব বুঝি নাই। তাই শুধু একটা স্মাইলি দিলাম। প্রেয়সী সিন করে রেখে দিল।

৪.

রাতে ঘুমানোর উদ্দেশ্যে বিছানায় গা হেলান দেয়ার পরই প্রিয়সীর কথা মনে পড়লো। ভার্সিটিতে ভর্তির পর প্রথম ক্লাসের দিন আমার পাশে একটা মেয়ে বসেছিল। জিগাসা করেছিলাম, ”কি খবর?”
উত্তর দিল, ”প্রিয়সী”
আমিও বুঝলাম না এমন উত্তর কেন, এরপরো বললাম, “কার?”
ধমকের সুরে “মানে???”
“তুমি না বললা, তুমি প্রিয়সী, তো কার প্রিয়সী??”
“ফালতু। মেয়ে দেখলেই…….. ” বলতে বলতেই সিট চেঞ্জ করে নীরবের সাথে বসেছিল। তাই সম্পূর্ণ বাক্য শুনতে পারি নাই। বশীর স্যারের বোরিং ক্লাসে আবার মনোযোগী হয়েছিলাম।

প্রেয়সীর সাথে ভাল বন্ধুত্ব হওয়ার পর এই ঘটনা রিপিট শুনিয়েছিলাম। প্রেয়সী শুনেই হেসে হেসে লুটুপুটি খেয়েছিলো। সে ভেবেছিল, প্রশ্নটা ছিল ”কি নাম তর?”। মেয়ে মানুষ খুব আজিব জিনিস। ভুল করেও উলটা ফাপর নিবেই। এরপর থেকে আমাকে সবসময় ”গাধা” ”গরু” ”ছাগল” থেকে শুরু করে এমন কোনো নিরীহ প্রাণী বাদ দেয়নি, যে নামে আমাকে ডাকে নি। প্রতিবাদ করলে আবার শোনাতো “তুই এত মেয়ে মানুষের মত তর্ক করিস কেন?” তখন মুখ বুজে শোনা ছাড়া আর কিছু বলার থাকত না। এগুলা চিন্তা করতে করতেই ঘুমিয়ে যাই।

গভীর অন্ধকার। আমি রাস্তা খুঁজে পাচ্ছি না। ডান দিক থেকে কে জানি আসছে। একে তো মডা ছাগলের মত লাগে। আসলেই ত মডা ছাগল। মুখে কুটিল হাসি। দুহাত পিছনে। কাছে আসতে আসতে বলে, “আমি তোকে খাব।” ভয় পেয়ে পিছুপা বাড়াই। কে জানি এসে হাত ধরল। কোমল হাত। একবারে তুলতুলে। সব ভয় চলে গেল। এত সুন্দর চেহারা আমি কোনোদিন দেখিনি। ওমা, এযে প্রিয়সী। প্রিয়সী এসেই মডা ছাগলকে ঠাস ঠাস দুটো চড় দিল। মডা দৌড়ে পালালো। প্রিয়সী আমার দিকে ফিরে মুচকি হেসে আবার দুটো হাত ধরলো। খুব ভাল লাগছিল। প্রিয়সী মুচকি মুচকি হাসছে। হেসেই চলছে। এতো সুন্দর করে একটা মানুষ কিভাবে হাসে, আমি পরম মুগ্ধতায় তাকিয়ে আছি। হাসির মাঝে হারিয়ে যাচ্ছি। হারিয়ে যাচ্ছি।

“কিরে আজ তর ক্লাস নাই?” বড় আপু বলেই ধাক্কানো শুরু করল।
“ধেৎ। হাসিটা চলে গেলো।”
“কি? কি চলে গেল?”
“কিছু না। কয়টা বাজে?”
”৮টা। ”
“সিট। দেরী হয়ে গেল।”
না খেয়েই ব্যাগ নিয়ে ভার্সিটির দিকে রওনা দিলাম।

ক্লাস শেষে প্রিয়সীকে স্বপ্নের কথা বললাম। হেসেই উড়িয়ে দিল। শেষে আবার কথা শুনিয়েও দিল, “চান্দু, যতই বানায়া স্বপ্ন বলো, ফ্রেন্ডের বেশী কিছু হইতে পারবা না।” আমিও বললাম, “আমার ঠেকছে বেশী কিছু হইতে।

৫.

আজ সোমবার। মেহরাব স্যারের কাছ থেকে এড্রেস নিয়ে বাসায় গেলাম। স্টুডেন্টের রুমে বসে আছি, স্টুডেন্টের খবর নাই। প্রায় বিশ মিনিট পর স্টুডেন্ট আসল। এসে সালাম দিল। আমিও নিলাম। নাম জিগাসা না করতেই বলে “ভাইয়া আমার নাম অনুরিমা। আপনার নাম কি?” এ কেমন স্টুডেন্ট রে বাবা। একেই তো টিচার মনে হচ্ছে। যাই হোক, প্রথম দিন পড়াশোনার অবস্থা জেনে কিভাবে পড়তে হবে কিছু জ্ঞান দিয়ে বিদায় হলাম।

সময় কিভাবে চলে যায় সময়ও হয়ত জানে না। ভার্সিটি লাইফের শেষ বর্ষের শেষ সময়ে এসে পৌঁছেছি। আর দু’মাস পরই বের হয়ে যাব। আস্তে আস্তে কেমন জানি একটা ফাঁকা ফাঁকা ভাব অনুভূত হচ্ছে। মনে হচ্ছে, ইশ আরো যদি থেকে যেতে পারতাম। ভার্সিটি থেকে বের হওয়ার পর সবচেয়ে বেশী মিস করবো ভার্সিটিকেই।পরিবেশ, ফ্রেন্ড সার্কেল, সিনিয়র, জুনিয়র, আড্ডা, টিচারদের সাথে ঘনিষ্ঠতা, হল,ক্লাস সবকিছুই। বটতলায় বসে চিন্তা করতে করতেই দেখি প্রেয়সী আসছে। এসেই পাশে বসে ঢাকার জ্যাম আর গরমের গোষ্ঠী উদ্ধার করলো। যদি এরা কেউ মানুষ হত, অথবা মানুষ হওয়ার দরকার নেই যদি এদের কান আর মুখ থাকত তাহলে এতক্ষণে বলে ফেলত, “ছাইড়্যা দে মা, কাইন্দা বাঁচি।”
বললাম – “বাদাম খাবে?”
-“কিছুই ত রাখো নাই! কি খাব? চোঁচা??”
-” একটা খেয়ে দেখো, আজিবন মুখে স্বাদ লেগে থাকবে”
-“যেমনে এডভার্টাইজ করতেছো, মনে হয় তুমি বাদামের ক্ষেত করতেছো?”
– ”কেনো! করি ত! জানো না?”
– “আকাইম্মার ঢেঁকি! ”

প্রিয়সীকে বিকেলে তার মামার বাসায় পৌঁছে দিয়ে বাসায় আসলাম। মামী ডিনার করে যেতে বলেছিল।বেশী রাত হয়ে যাবে তাই এসে পড়েছি। ভুলেই গিয়েছিলাম। আজ অনুরিমার কেমিস্ট্রি এক্সাম হল। ফোন দেয়া দরকার ছিল। রাত হয়ে গেছে। থাক। কাল ফোন দিব।

এমন খুশীর দিন আমার জীবনে খুব কমই এসেছে। হয়ত ভার্সিটির মায়া ছাড়তে চাইনি বলে, ভার্সিটিও আমাকে ধরে রেখেছে। আমার ডিপার্টমেন্টেই আমি লেকচারার হিসেবে নিয়োগ পেলাম। প্রিয়সী বিসিএস ক্যাডার হয়ে গিয়েছে। মিষ্টি কিনে বাসায় ফেরার সময় দেখি। অনুরিমার মতই ত দেখা যায়। হ্যাঁ অনুরিমাই ত। আরো কাছে গিয়ে দেখি। চোখের নিচে কালো স্তর। চেহারা আগের মত নেই। ফ্যাকাসে। মায়াবী মুখটাও আর নেই। মুহূর্তে মনটা বিষন্ন হয়ে গেল। মেয়েটা এইচএসসিতে ৪.৩৮ পেয়েছিল। যার কিনা এসএসসিতে গোল্ডেন ছিল।

আব্বা মেহরাব স্যারকে আমার আর প্রেয়সীর বিয়ের কার্ড পাঠায়। স্যার কেনো যেনো আসেননি। অনুরিমাও না। প্রেয়সীকে বিয়ের দিন রাজরানির মত লেগেছিল। বিয়ের দিন বুঝি নি, বিয়ে যাওয়ার কিছুদিন পর দুজন একসাথে বিয়ের ভিডিও গুলা দেখার সময় বুঝতে পারি।

এভাবে এক বছর চলে যায়। ভার্সিটিতে অফিস রুমে বসে ল্যাপটপে কিছু ডকুমেন্টারি দেখছি তখন, জিমেইলে কে জানি ইনবক্স করেছে।

” স্যার। আমাকে চিনতে পারছো? মেসেজ পড়েও অনেক সময় চেনা যায়। অবশ্য তুমি চিনবে কিভাবে?? দুই বছর চিনো নাই, আর এক মেসেজে চিনে যাবা! আশা করি না! বউ নিয়ে তো ভালই সুখে আছো স্যার। আমিও সুখে আছি। কেমন সুখ জানি না। তোমার বন্ধু নীরবকে বিয়ে করেছিলাম। দুইমাস খেয়ে আমাকে ছেড়ে দিল। এখন নতুন রমণী এসেছে তার ঘরে। তুমি যখন আমাকে পড়াতে আমি তোমার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতাম। কেনো জানো? তোমার কথা শুনতেই খুব ভাল্লাগতো, পড়াগুলোকে না। প্রায় রাতে তোমাকে নিয়ে আমি হারিয়ে যেতাম। তোমার বার্থডেতে আমি একটা টেডি দিয়ে তোমাকে চমকে দিয়েছিলাম। তোমার মনে আছে? একবার কি টেডির বুক ছিড়ে মাঝখানটা দেখেছিলে? যদি দেখতে তবে আমি কি চেয়েছিলাম সেটাও বুঝতে। তোমাকে আমি যে আজিবনের টিচার হিসেবে চেয়েছিলাম।তুমি বুঝলে না। স্যার। তুমি বুঝলে না। এই অনুরিমাকে তুমি আজো বুঝলে না। ভাল থাকো। সুখে থাকো। ”

দুটি ক্লাসে শুধু প্রেজেন্ট নিয়ে চলে আসি। আম্মার ফোন। প্রেয়সীর পেইন উঠেছে খুব। গাড়ি ড্রাইভ করে বাসায় গিয়ে দেখি, প্রেয়সী ব্যথায় কুঁকড়াচ্ছে। আম্মা বলে, তাড়াতাড়ি হসপিটালে নিয়ে চল। প্রেয়সীকে হসপিটালে ভর্তি করলাম। ডাক্তার বলল, এক-দুদিনের মাঝে সিজার করা লাগবে। সব কিছু এরেঞ্জ করতে।

প্রেয়সী ওটিতে। সবাই দোয়া দরুদ পড়ছে। ফ্যামিলির প্রথম নাতি হবে। হঠাৎ ফোন। মেহরাব স্যারের ফোন। অনুরিমা সুইসাইড করেছে। স্যারকে কি বলব,বলার পূর্বেই স্যার ফোন কেটে দেয়। ওটি ডোর খুলল। আলহামদুলিল্লাহ। প্রেয়সীর মেয়ে হয়েছে। দেখতে খুব মায়াবী। মুখের দিকে তাকালে দুনিয়ার সব কষ্ট চলে যাবে। প্রেয়সীও খুব খুশী।

মেয়েটির নাম রাখলাম “অনুরিমা”।।।।।।।।।।।।।


আমাদের উৎসাহিত করুনঃ




সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এই লেখাটি কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয় ।

লেখক সম্পর্কেঃ

বুনন সম্পর্কিত তথ্যঃ