ই প্রত্যয়যোগে ভালবাসি

গভীর রাত। ঘুটঘুটে অন্ধকার।একে কালো রাত বললেও কেউ ভুল বলবে বলে মনে হয় না। কালো রাতের সংজ্ঞা কি, রাতকে কেনোই বা কালো রাত বলা হয় সেটা জানা নেই অমিতের। শুধু এটুকু জানে একটি রাতকে কালো রাত বলা হয়। ২৫ শে মার্চ। ছোটোবেলায় বইয়ে পড়েছে।এখনো মনে আছে। ছোটো সময় তো কত প্রশ্ন-উত্তর-কবিতা-ছড়া মুখস্থ করেছে। কই সেগুলো তো এখন আর মনে পড়ে না। তবে এখনো তার কিছু ছড়া দিব্যি মনে আছে। ঐযে কানা বগির ছা, লিচু চোর,হাট্টিমাটিম টিম, আতা গাছে তোতা পাখি, Humty Dumty, Twinkle Twinkle এছাড়াও ”সংকল্প” ”আদর্শ ছেলে” “কুলি” এই কবিতাগুলিও ভাল মনে করতে পারে। হয়ত চেষ্টা করলে আরো কিছু ছড়া-কবিতার নামও বের হয়ে আসবে। কিন্তু এখন সে চেষ্টা করতে একদমই ইচ্ছে করছে না তার। তবে ক্লাস নাইনে তাকে যে স্যার ইংরেজি পড়াতো তিনি একটা কথা বারবার বলতেন- “তোমার ব্রেইন যে বিষয়টা ভালভাবে বুঝে ফেলবে,সেটা সে কখনই ভুলবে না।” এর পিছনেও একটা কারণ আছে। শুধু শুধুই বলতেন না। যখন পড়ার কথা জিজ্ঞাসা করত, উত্তরে সে বলত ‘স্যার, শিখছি। কিন্তু এখন মনে পড়তেছে না, ভুলে গেছি’। এরপরই স্যারের বন্ধ মুখ নিমেষেই খুলে যেত, তেতো শব্দগুলি বের হওয়ার জন্য। শুনতে একদমই ভাল লাগত না অমিতের। কিন্তু দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে যে অনেক কিছুই করতে হয়। তাই সে শুধু মাথা নাড়িয়ে যেত। অন্যথায়, আব্বুর কাছে নালিশ চলে যাবার সমূহ সম্ভবনা। আব্বুর কাছে নালিশ যাওয়া মানে- খবর আছে। মার একটাও মাটিতে পড়বে না। সব পিঠে। বাবাকে সে প্রচন্ড ভয় পায়। তখন মাত্র ক্লাস ওয়ানে পড়ে। কতটাই আর বুঝে। বন্দুক দিয়ে বেলুন ফুটাবে এই নেশায় বন্দুকওয়ালার পিছনে হাঁটতে হাঁটতে মাইলখানি চলে গিয়েছিল। বাবা শক্ত হাতে ধরে নিয়ে এসে ঘরের দরজা বন্ধ করেই ঘাড়ে ধরে বিছানার উপর ছুঁড়ে ফেলে। বিড়ালের বাচ্চাকে যেমন ঘাড়ে ধরে ফেলে দেয়া হয়, তাকে ঠিক সেইভাবেই বিছানার উপর ছুঁড়ে মারা হয়েছিল।ব্যথা পায় নি। তবে খুব ভয়ে কান্না করেছিল। মা দাড়িয়েছিল।কিন্তু কাছে আসে নি। বাবার ভয়ে। বাবা চলে গেলে মা এসে তাঁকে বুকে নিয়ে আদর করেছিল।

অনেকেই ভাবেন তার বাবা খুব বদমেজাজি মানুষ। আসলে মোটেও এমন না। ঠিক উল্টোটি।খুব হাস্যরসিক। মিশুক। মানুষ যে কেনো এমন ভাবে সে উপলব্ধি করতে পারে না। তবে ছোটো থেকেই দেখে আসতেছে, বাবা সহজে রাগ করে না তবে রেগে গেলে উনাকে থামানো মুশকিল হয়ে যায়। আম্মুর মুখে শোনা, একবার নাকি তার কাকাকে একটা গুন্ডা টাইপ ছেলে থ্রেড দিয়েছিল।খুন করে ফেলবে বলে হুমকিও নাকি দিয়েছিল। সেটা শোনে অমিতের বাবা একটা গাছের ডাল দিয়ে ছেলেটিকে খুব পিটিয়েছিল।শেষে নাকি পা ধরে মাফ চেয়েছিল। গ্রামের লোকেরা তাঁর বাবাকে খুব ভয় পায়, আবার সম্মানও করে কারণ শালিসে সবসময় সুষ্ঠু বিচার করেন। বেয়াদবি, মিথ্যা বলা, অনৈতিকতা দেখতে পারেন না একদমই। আর একটা জিনিস সহ্য করতে পারেন না,পরিবারের কারো নামে বিচার। যে দিবে তাকে কিছু বলবেন না, যার নামে বিচার তার খবর হয়ে যায়।

অমিত এখন বুঝতে পারে স্যারের কথাগুলো অযৌক্তিক না। সাইকোলজিক্যাল বইয়েও সে পড়েছে, মানুষ যে ঘটনাটা বারবার স্মরণ করে সেটা সে কখনো ভুলে না। এই ছড়া-কবিতাগুলি সে বারবার অনামিকাকে বলত, ফোনে কথা বলার সময়। দুজনে মিলে বলত একসাথে। আর দুজনে হেসে লুটুপুটি খেতো।অমিত আর অনামিকা দুজনেই খুব হাসতে ভালবাসে। অমিত বুঝে।অনামিকা যে ব্যাপারটা বুঝে না এমন না। অনামিকা খুব চাপা স্বভাবের।কোনোভাবেই কথা বের হবে না। কোনো কিছু সে ততক্ষণ প্রকাশ করবে না, যতক্ষণ না অমিত খুঁজে বের করে আনে। এইজন্যই অনামিকার বন্ধু-বান্ধব তেমন নেই বললেই চলে। স্কুলজীবনে একটি ফ্রেন্ড ছিল।অনামিকা নামটি বলেছিল কিন্তু তার মনে নেই।টেনেই মেয়ের বয়স বেড়ে যাচ্ছে ভেবে বাবা-মা বিয়ের পিড়িতে বসিয়ে দেন।বেচারী পড়াশোনা আর কন্টিনিউ করতে পারে নি, সংসারের চাপে পড়ে। অনেক যৌতুকও নাকি দিতে হয়েছিল। আবার একা হয়ে যায় অনামিকা। অবশ্য অমিত আসার পূর্বপর্যন্ত একাকী জীবনই কাটে অনামিকার। দাদুর কাছে বড় হয়ে কিন্ডারগার্টেনে ভর্তির পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত দাদা-দাদুকেই সে ‘বাবা-মা’ ডাকত। একটু বুঝতে শিখে আর ডাকে নি। বাবা-মা দুজনেই চাকরিজীবী। রাতে খাবার টেবিলে শুধু দেখা হওয়া, আবার সকালে ঘুম ভাঙার আগেই তাদের বিদায় এই রুটিনেই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল । জরিনা দুইবার এসে তিনবেলার রান্না করে দিয়ে যেত। ভোরে অনামিকার বাবা-মা থাকতেই এসে যেত।তার মায়ের আদেশ। জরিনা আবার তার মাকে খুব ভয় পেত। দুপুরে যোহরের আযান দেয়ার আগে এসেই দু’বেলার তরকারি,এক বেলার ভাত রান্না করে, ঘরদোর কোনোভাবে গুছিয়ে যতদ্রুত পারত চলে যেত। জরিনার একটা দিক ভাল ছিল। খালি ঘর থাকলেও কখনো চুরি করেনি। অনামিকা ঘরে থাকা আর খালি ঘর এই দু’য়ের মাঝে খুব বেশী পার্থক্য নেই।

অনামিকা যখন প্রথম অমিতকে ফোন দেয়, একটা মেয়ে কন্ঠস্বর শুনে সে বেশ অবাক হয়েছিল।কারণ তাকে ফোন দেবার মত মেয়ে নাই। জিলা স্কুলে পড়া অমিতকে আবার কোন মেয়ে ফোন দিবে? কিছুক্ষণ ফাজলামো করে পরিচয় বলে অনামিকা। অমিত চিনে ফেলে। কিন্ডারগার্টেনে ক্লাস ফোর পর্যন্ত একসাথে পড়া সেই অনামিকা। কত ছোটোবেলার স্মৃতি ঘিরে রয়েছে। অবশ্য তখন বন্ধুত্ব-ভাললাগা এগুলা বোঝার আগেই দু’জন আলাদা হয়ে গিয়েছিল।অনামিকার ফোন দেয়ার কারণও ছিল। সময়ের ব্যবধানে অনামিকা-অমিতের দু-তিনবার চোখাচোখি হয়। কিন্তু ক্লাস ফোরের পর আর কথা হয় নি।কলেজ ভর্তির কিছুদিন পরই অনামিকার দেখা পায় অমিত।রাস্তায়। তাঁর দিকেই আসছিল। চোখের ইশারার মাধ্যমে বলতে চেয়েছিল, ‘কেমন আছ?’ অনামিকা খেয়াল করে নি। ভুল বুঝাবুঝি ভাঙতে এগিয়ে এসেছিল দুইজনেরই এক মিউচুয়াল ফ্রেন্ড। সেজন্যই অনামিকার ফোন। দুজন-দুজনার মাঝে মিলের পরিমাণটা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছিল।ভাল বোঝাপড়া থেকে খুব দ্রুতই ফ্রেন্ডশিপ থেকে রিলেশনশিপ এ মোড় নেয় সম্পর্কটি।

প্রবল ঘেউ ঘেউ ডাকে ঘোর ভাঙে অমিতের। এত রাতে এমন নির্জন-নিস্তব্ধ স্থান, শশানের নীরবতা, কাক-পক্ষী পর্যন্ত নেই সেখানে সে একা একা হেঁটে চলছে। সরু রাস্তা। কালো ঘুটঘুটে অন্ধকার। যেকোনো সাহসী ব্যক্তিরও হৃদকম্পন বেড়ে যাবার মত পরিবেশ। হঠাৎ আঁতকে উঠে অমিত। সামনে চারটি চোখ জ্বলজ্বল করছে। ভয়ংকর। ঘোরের মাঝে থাকায় একটু বেশীই ভয় পেয়ে যায় । নিজেকে সামলে নিয়ে পাশেই পড়ে থাকা ভাঙা গাছের ডাল দিয়ে হাত উপরে তুলতেই কুকুর দুটো দৌড় দেয়। বেশীদূর যায় নি। দশ-বার হাত দূরত্বে থেকেই ঘেউ ঘেউ করছে। অমিত কান দেয় না তবে হাতের মৃতডালটিও ফেলে দেয়ার সাহসও পায় না।

রাস্তা পরিবর্তন করে অন্য একটি সরু রাস্তার মাঝে দিয়ে হেঁটে চলছে । কুকুরদুটোর ঘেউ ঘেউ আর শোনা যাচ্ছে না।

অনামিকা প্রায়ই বলত “দেখো আমাদের কত মিল।নামটিও শুরু হয়েছে একই অক্ষর দ্বারা।বলতো কয়জনের আর এমন সৌভাগ্য হয় এক বর্ণে দুটি নাম শুরু করার। যেনো একি আত্মা, একি প্রাণ।” শেষের লাইনটিতে ছন্দ খুঁজে পেতো অমিত। কবিমন অমিতের।শুধু অনামিকার জন্যই কবিতা লিখে পাঠাতো অমিত, অনামিকা খুব খুশী হত। অনামিকা যখন হাসত খুব ভাল লাগত অমিতের। দু’জন একসাথে হাসত। কতবার যে এমনি হেসে গিয়েছে অমিত, অপর পাশের খুশী বুঝতে পেরে। হিসাব করা সম্ভব না। যখন দুজনে একসাথে হাত ধরে ভার্সিটির রাস্তায় হাঁটত, কথা বলত, সময়কে ভুলে যেতো তারা। অনামিকা নিজেকে খুব ভাগ্যবতী মনে করত। কিন্তু কখনো প্রকাশ করত না। অমিতকে বুঝতেও দিত না। অনামিকা কান্নার সময় হেচকি তুলে ফেলত কাঁদতে কাঁদতে। অমিতও সে কান্না শোনে কেঁদে দিত।অমিতের কান্না শোনে আবার দুইজন একসাথে কাঁদতো। মহা যন্ত্রণা। তবে এতেই ভালবাসা ছিল।গাঢ় বর্ণ। চিকন অমিতকে যখন অনামিকা ‘মোটকু’ বলে ডাকত তখন ভালবাসাটাও গাঢ়তর হত।তখন দুজন শুধু হাসত। একিসাথে। একিশব্দে।

একটি বাসা থেকে খুব চিল্লাপাল্লা শোনে দাঁড়াল অমিত। হাঁটতে হাঁটতে কোথায় এসেছে জানে না। তিনটি সরু রাস্তার মিলনমেলা। তিন-রাস্তার মোড়ও বলা চলে। বাসার ভেতর থেকেই আওয়াজ আসছে। একটি কর্কশ পুরুষ কন্ঠস্বর, একটি নারীর জোরে কান্নার আওয়াজ। সাথে কয়েকটি বাচ্চার শব্দ, কান্নার শব্দ। চারপাশে ঘুমন্ত গাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে। সাথে অমিত জেগে দাঁড়িয়ে। অকথ্য ভাষায় গালাগালি আর কিল- ঘুষি-কান্নার শব্দ বাতাসে ভেসে অমিতের কানে আসছে। লোকটি হিংস্রতায় গর্জন করছে – “বাপের বাড়িত্তে ট্যাকা আনবার পাস না, তে আমারডা খাস কে, হারামজাদী?” একটা পড়ে যাওয়ার শব্দ। বাচ্চাকন্ঠে “আম্মা – আম্মা – আম্মাগো – আম্মা ” ডাকগুলো গাঢ়তর রূপ পাচ্ছে।

অমিতের আর ভালো লাগছেনা। স্থানপরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েই পা চলতে শুরু করল। বাচ্চাকন্ঠে “আম্মা” শোনার পর অমিতেরও তাঁর মায়ের কথা মনে পড়ল।

ফজরের আযান দিচ্ছে।দরজা খোলা। অমিতের বাবা ড্রয়িংরুমে পায়চারি করছে। মা সোফায় বসে কাঁদছে। অমিতকে দেখামাত্রই বাবা তেড়ে এসেই দুই গালে পরপর দুটি সজোরে চড় দিয়েই – “সারারাত কই মরছিলি? হাজারটা ফোন দিছি। ফোন কি খাইছস?” “চার্জ ছিল না” উত্তরটা দেয়ার সাথেসাথেই আরেকটা চপেটাঘাত পড়ল। অমিত তার রুমে এসে দরজা লক করল।

অনামিকাকে খুব ভালবাসে অমিত। ন’বছর রিলেশনের পর অনামিকার বিয়ের দাওয়াতকে না করতে পারেনি।অনামিকাও অমিতকে খুব ভালবাসে নাহলে আজ তার চোখে পানি থাকবে কেনো??

অমিত বিশ্বাস করে, বাবা ঠান্ডা মাথার মানুষ, চপেটাঘাত ভালবাসারই প্রতীক। আর অনামিকা?? আর ভাবতে পারছে না অমিত। এবার সত্যিই মাথা ধরছে…………………..


আমাদের উৎসাহিত করুনঃ




সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এই লেখাটি কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয় ।

লেখক সম্পর্কেঃ

বুনন সম্পর্কিত তথ্যঃ