আলো ছায়া

ভালোবাসা জিনিসটা সবসময় কেমন জানি ঘোলাটে।ব্যাখ্যা করা যায় না হয়তবা সবসময়। নতুবা তোমাকে মনে পড়ে কষ্ট পাবার কথা ছিলো না,যুক্তিও নেই।তবু কষ্ট পাচ্ছি। জিজ্ঞাস করতে ইচ্ছে করছে,”রিধিমা কেমন আছো?????”

রিধিধা তোমার মনে আছে!! আমি প্রথম যখন তোমাকে প্রথম দেখি তখন তুমি ক্লাস সিক্সে পড়ো আর আমি এইটে।তোমার আম্মুর সাথে আমাদের বাসায় এসেছিলে।আমাদের স্কুলে নতুন ভর্তি হয়েছিলে, টিচার আর স্কুল ভ্যান সার্ভিস কোনটা ঠিক করবে তার জন্য এসেছিলে।আমি ছিলাম চুপচাপ আর আতেল টাইপ তাই এক নজর দেখেই বইয়ের মাঝেই ডুব দিয়েছিলাম।মেয়েদের বেপারে আগ্রহ তখন পর্যন্ত জাগেনি আমার মধ্যে।

কিন্তু তুমি আমার লাইফে অনেকটা স্লো পয়জন এর মতো ছিলে। একই ভ্যানে স্কুলে যাওয়ায় তোমার চঞ্চলতা, হো হো করে হাসি আর মিশতে পারার বেপারগুলো দিন দিন কেমন করে যেনো আমাকে গ্রাস করে ফেলে। সারাদিন কেমন জানি করতাম তোমাকে দেখার জন্য।তোমাকে ইম্প্রেস করার চিন্তা থাকত সব সময়। আতেল টাইপ হওয়ায় চুল তেল দিয়েই রাখতাম কিন্তু তোমাকে ইম্প্রেস করার জন্য যেদিন চুল স্পাইক করে আসলাম সেদিন তোমার হাসিটা এখনো চোখে ভাসে।
রিধিমা হয়ত তুমি কখনোই জানবে না তোমার বাসার টেলিফোন এ কতবার কল দিতাম আর অপেক্ষায় থাকতাম তুমি কখন কল ধরবে।আমি কেনো জানি কিছুই বলতে পারতাম না।

হয়তবা দেখতে আমি ক্ষেত আর আতেল টাইপ ছিলাম দেখে নিজেকে ছোটো মনে হতো খুব।

আস্তে আস্তে করে কিভাবে যেনো তোমার প্রতি টান চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তেই থাকে।তবু একবারের জন্যও বলতে পারিনি তোমাকে। কত রাত যে মনে মনে ভাবতাম তোমাকে বলে দিলে তুমি কি ভাববে!!! মাঝেমাঝে তো জেগে জেগেই স্বপ্নে তোমার ভালোবাসার কথা বলে দিতাম আর তুমি রাজি হয়ে হাত ধরতে আমার।স্বপ্ন দেখতে দেখতেই কলেজ লাইফ শেষ হয় আমার আর ততোদিনে তুমি কলেজে।ভাবলাম ভালো ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েই তোমাকে বলে দিবো এতো দিনের জমানো সব কথা। ভালো ভার্সিটিতে ভর্তি তো হয়েছিলাম কিন্তু ততোদিনে তুমি অন্য আরেকজন এর হাতে হাত রেখে দিয়েছিলে।

রিধিমা যেদিন আরমানের সাথে এলাকার মোড়ে তোমাকে দেখি নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছিলো।জমানো কথাগুলোকে সারাজীবন এর জন্য সিন্ধুকে বন্ধ করে দেই। এরপর নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত হওয়ায় খুব একটা তোমার সাথে দেখাও হয় নি। ভালোবাসা টুকু তবু কেন জানি বেচে ছিলো।অন্য কারোর প্রতি আগ্রহ জন্মায় নি।

এরপর এর ঘটনাটাই হয়তবা আমাদের জীবনে এতো কিছুর সৃষ্টি করেছে।

বিয়ের বয়স হচ্ছিলো আর বাসা থেকেও চাপ দিচ্ছিলো প্রচুর।আর যখন আম্মু পাত্রী হিসেবে তোমার নাম বলল আমি না করতে পারলাম না।

তোমাকে দেখতে যাওয়ার মতো আনুষ্ঠানিকতার দরকার ও ছিলো।

তুমি যখন কল করে সামনাসামনি দেখা করতে চাইলে, তখন আমি ভাবছিলাম আরমান আর তোমার বেপারটা বলবে।আমিও মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলাম তোমাকে বলব যে তোমার অতীত নিয়ে আমার মাথা ব্যাথা নেই।আর সিন্ধুকের জমানো সব কথা বলে দিবো।

কিন্তু তুমি যখন বললে তোমার গর্ভে আরমানের সন্তান বড় হচ্ছে।আরমান তোমাকে ধোকা দিয়ে চলে গেছে আর তুমিও এবোর্শন করাতে চাও না।তখন তোমার দিকে তাকিয়ে কিছুই বলতে পারি নি।

বাসায় আসার পর কেনো জানি এতোদিন ধরে তোমাকে পাওয়ার ইচ্ছা আরো বেশি করে পেয়ে বসে। বিয়ের বেপারে মত দিয়ে দেই।তুমি অবাক হয়েছিলে খুব এটাও জানতাম।আর জানতাম আমাদের মধ্যে হয়তবা ভালোবাসাটা এক পাক্ষিক ই হবে। তুমি আমাকে ভালোবাসতে পারবে না তবুও কেনো বিয়ে করেছিলাম আমি নিজেও তা জানি না।

আমাদের বিয়েটা সাদামাটা ভাবেই হয়েছিলো।আমাদের কারো চোখেই আনন্দের ছাপ ছিলো না।
বিয়ের পর তোমার সবকিছু কেমন জানি আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে।তোমার গুছিয়ে রাখা, শাসন করা,বেশি রাত জাগতে না দেওয়া জিনিসগুলা তোমাকে ভালোবাসি আগে না বলার আক্ষেপটাকে আরো বাড়িয়ে দিতে থাকে।

ভালোই যাচ্ছিলো সবকিছু সবাই জানত তোমার অনাগত সন্তান এর পিতা আমি।আমিও আস্তে আস্তে ভালোবাসার চরম শিখরে ছিলাম।হঠাৎ করে মনে হতে লাগল এ সন্তান আমারই।যেদিন তোমার হাত ধরে কথা দিয়েছিলাম এই সন্তানকে আমি আমার পরিচয়ে বড় করব তখন তুমি আমার বুকে যখন মাথা রাখলে তখন মনে হচ্ছিলো পৃথিবীতে শুধু তুমি আর আমি।ছোটোবেলা থেকে লালন করা ভালোবাসা তখন আমার মনে বসন্ত এনে দিয়েছিলো।তোমার মেয়ে হওয়ার পর সবচেয়ে খুশি হয়েছিলাম আমি।তোমার মনে তখন আমার একার বসবাস। তোমার মনের গভীরতম স্থানে আমি।আমাদের ভালোবাসার উপন্যাস তখন শুরু হওয়ার কথা তখন আমার ভিতরের কাপুরুষ সত্ত্বা জেগে উঠল।তোমার মেয়ে অধরা যখন আমাকে বাবা ডাকা শুরু করল কেনো জানি অসহ্য লাগত।মনে হতো তখন তুমি তো আমাকে ভালোবাসো নি কখনো।তুমি আরমানকেই ভালোবাসতে তাই তার স্মৃতি বহন করে যাচ্ছো।অধরাকে দেখলেই আরমানের কথা মনে হতো আমার।

সবাই হয়তবা তাদের ভালোবাসাটাকে ধরে রাখতে পারে না।অথবা আমার মতো কাপুরুষ রা পারে না।তাই ডিভোর্স পেপারে সাইন করতে একবারের জন্যও হাত কাঁপেনি।আমার কাছে মনে হচ্ছিলো আমি ঠকেছি।আমি মোহে অন্ধ ছিলাম।

তোমার মনের মধ্যে বেড়ে ওঠা আমার জন্য শ্রদ্ধা আর ভালোবাসাকে গুড়ো করে দিয়েছি অনেক সহজে।

রিধিমা বিশ্বাস করো আমি আজো ভুলতে পারি নি তোমাকে।বরং আরো গভীরতম স্থানে তুমি এখন। বিয়ের পরের মুহুর্ত গুলো প্রতি ক্ষনে আমাকে নাড়া দেয়।এখন চশমাটা খোজার জন্য কাউকে বলি না।

বিশ্বাস করবে না হয়ত এখন আর চা খাই না।তুমি ছাড়া অন্য কেউ চা এনে দিবে তা ভাবলেই খারাপ লাগে। তোমার মেয়েকে আমি আমার ভাবতে পারি নি,ভালোবাসাটা যে আত্মার তা কাপুরুষ মনটা বোঝাতে পারি নি।

আর তুমি তো জানো আমি বিয়ে করেছি।ভেবে ছিলাম হয়তবা বিয়ে করলে তোমার স্মৃতিগুলো মুছে যাবে,কিন্তু এখন কেমন জানি আরো বেশি চোখে ভাসে।মেয়েটার সাথে প্রতিদিন ভালোবাসার নাটক করি। তোমার বেপারে তেমন কিছুই জানে না।জানে তুমি আরেকজন এর জন্য আমাকে ছেড়ে চলে গেছো।আমি কাপুরুষ তাই সত্য বলতে পারিনি।

রাত এখন সাড়ে চারটা।আমার স্ত্রী ঘুমে।মেয়েটার চোখে মুখে মিষ্টি একটা আভা ছড়িয়ে আছে।তবুও কেনো জানি তোমাকেই বেশি মনে পড়ছে।কিন্তু আমাকে যে করেই হোক তোমাকে ভুলতে হবে।তোমার সাথে যে অন্যায় করেছি তা এই মেয়েটার সাথে করতে পারি না।ডায়েরীতে তোমাকে নিয়ে এটাই শেষ লেখা।তোমাকে না বলা হাজারো কথা গুলো সিন্দুকেই তোলা থাক।হয়তবা আবার কোনো এক নির্জন রাতে ভালোবাসা যখন আর বাঁধ মানবে না আবার বলব কিছু কথা।আর আমার শাস্তি সরুপ ভালো থাকা আর ভালোবাসার নাটক চলবে আমৃত্যু।

ভালোবাসা কাপুরুষদের জন্য না,যারা মনের কথা শুনতে পারে না।যারা অব্যক্ত অনুভূতি ব্যক্ত করতে পারে না,রাত জাগা হাহাকার তাদের জন্য,আমার জন্য।


আমাদের উৎসাহিত করুনঃ




সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এই লেখাটি কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয় ।

লেখক সম্পর্কেঃ

বুনন সম্পর্কিত তথ্যঃ