এবং বনলতা সেন thumbnail

এবং বনলতা সেন

১.

পার্কের প্রবেশপথেই পার্ক কর্তৃপক্ষের দেয়া প্রায় দশ-বারোটা আদেশ-উপদেশ লেখা একটি জংধরা টিনের নোটিশবোর্ড টাঙানো। প্রবেশপথের বাঁ দিকের বেঞ্চিগুলোর ঠিক মাঝের বেঞ্চিটিতে বসি। কখনো যদি মাঝের বেঞ্চটি ফাঁকা না পাই তবে লেকব্রীজের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রকান্ড বৃক্ষের ছায়াতলে বসে সময়ের কথা ভুলে যাই আমরা। আমরা বলতে আমি আর বনলতা সেন। হ্যাঁ, নাটোরের সেই বিখ্যাত বনলতা সেনের কথাই বলছি।

বনলতা সেনের সাথে আমার প্রথম দেখা মিলে নাটোরের রাজবাড়িতে। নাটোর রাজপরিবারের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা রামজীবন নাটোরেই স্থাপন করেছিলেন তাঁর প্রশাসনিক কেন্দ্র। সাথে নির্মাণ করেছিলেন রাজপ্রাসাদ,দিঘি,মন্দির,ফুল ও ফলের বাগান। ইতিহাস বলে, রাজবাড়িটি ১৭০৬ থেকে ১৭১০ সালে নির্মীত হয়েছিল। রাজবাড়ির মোট আয়তন ১২০ একর। বিশাল আয়তনের রাজবাড়িতে উল্লেখযোগ্য মন্দিরগুলো হল- শ্যামসুন্দর মন্দির, আনন্দময়ী কালিবাড়ি মন্দির,তারকেশ্বর শিব মন্দির।

শ্যামসুন্দর মন্দিরের সামনেই দেখা পাই আসমানি রঙের সুতি শাড়িতে বনলতা সেনকে। সাজ একেবারেই সাদামাটা। সাদা ঢিলা হাতার ব্লাউজের উপর দিয়ে ভালো করে শাড়ি জড়ানো। খুব ঢেকেঢুকে শাড়ি পড়াটা চোখে পড়ার মত। চুলে পাতা কেটে সিঁথি করা, পরিপাটি করে চেপে চুল আঁচড়ানো। অবাধ্য চুলগুলি কানের পাশ দিয়ে উঁকিঝুকি দেয় না।

১৯৩৪ সালে যখন কবি জীবনানন্দ দাশ বনলতা সেনকে প্রথমে কবিতায় স্থান দিয়েছিলেন, তখন তিনি বনলতার আশ্চর্য নান্দনিক সৌন্দর্যের বর্ণনা নিখুঁতভাবেই করেছিলেন। বনলতা সেনকে কবি প্রত্যক্ষ করেছিলেন অন্ধকারে। সেজন্যই কেশরাজি সম্পর্কে লিখেছেন,
“চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা”
কবির চোখে বনলতার মুখাবয়ব প্রতীয়মান হয়েছে শ্রাবস্তীর কারুকার্যের মত।
বলেছেন,
“মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য”
ভারতের কোশল রাজ্যের এক সমৃদ্ধশালী নগরী শ্রাবস্তী। ভারত উপমহাদেশের মহাকাব্য ‘রামায়ণ’ এর সূত্রপাত কোশল রাজ্যের অযোধ্যা নগরী থেকেই। মহাভারতের তথ্যানুযায়ী, শ্রাবস্তী নগরীর গোড়াপত্তন করেছিলেন কিংবদন্তীতুল্য সম্রাট শ্রাবস্ত।

জীবনানন্দ দাশ সত্যিই কি কোনো বনলতার রূপে মুগ্ধ হয়ে প্রেমের মায়ায় জড়িয়েছিলেন কিনা জানা নেই। তবে এটুকু বলতে পারি, আমি যে বনলতার মায়ায় পড়েছি সে কোনো অংশেই কম নয়।

২.

বিকেল সবে শুরু হয়েছে। বয়স্ক এবং যারা শরীরের প্রতি অধিক যত্নবান তাদের রমনায় দেখা যায় সকালের স্নিগ্ধ আলোয়। এরা মাঝবয়সের বুড়ো-বুড়ি। পায়ে কেডস বা স্নিকার পড়ে ঘাড়ের উপর ঘাম মোছার লাল-নীল তোয়ালে নিয়ে মেদ কমাতে দৌড়াদৌড়ি করে চলেন। এরা সকালের পার্টি। বিকেলে আবার ভিন্নরূপ। উঠতি বয়সীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। এদের মাঝেই বনলতাকে খুঁজে চলছি। বাঁ পাশের বেঞ্চিটিতে কলেজ পড়ুয়া কিশোর-কিশোরী। লেকব্রীজের গাছটির নিচে একটি পরিবার, ছোটো ছেলেপেলেগুলো ছুটোছুটি করছে। করবেই না কেনো, এই ঢাকা শহরে প্রাণখুলে একটু ছোঁটার জন্যেও তো জায়গা পাওয়া মুশকিল।

বনলতা এখানেও নেই। রাস্তা মেপে হেঁটে চলেছি। ঐ তো, বনলতা সেন। রমনার বটমূলে বসে। বনলতাকে দূর থেকে দেখেই আমি চিনতে পারি। না, কোনো অলৌকিক ক্ষমতাবলে নয়। সাদামাটা সাজ, পরিচিত সুতি শাড়িগুলোর রঙই এর সহায়ক। বনলতা উচ্চমনা, কিন্তু অপচয়কে বড় অপছন্দ তাঁর। দু-তিনটে সুতি শাড়ির কাঁধে ভর দিয়েই বছর পার করেন, কিন্তু এতে উজ্জ্বলতা একবিন্দুও কমে না। অপরূপা, অনন্যা। প্রতিবছর এই বটমূলেই রাজধানী ঢাকার পহেলা বৈশাখের মূল অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট সঙ্গীতানুষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন সূর্যকে স্বাগত জানায়। স্থানটির পরিচিতি হলেও প্রকৃতপক্ষে যে গাছের ছায়ায় বটগাছ তৈরি হয় সেটি বটগাছ নয়, অশ্বথ গাছ। ষাটের দশকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়ন আর সাংস্কৃতিক সংঘাতের প্রতিবাদে ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানটের এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা।

বনলতা আমায় লক্ষ্য করেনি। প্রকৃতির খেয়ালে নিমজ্জিত। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের মায়ায় হারিয়ে গিয়েছে।আজ বনলতা পাতা কেটে সিঁথি করেনি। চুলগুলোকে চেপে রাখেনি। অবাধ্য করে রেখেছে। হালকা হাওয়ায় দুলছে। খোলা চুল বনলতাকে অসামান্য রূপলাবণ্যতায় মোহিনীরূপ দিয়েছে।

-কখন এসেছেন?
-(চমকে উঠে) একটু সাড়া-শব্দ করে আসবেন তো
-চারপাশে কত ধ্বনি-বাক্যরা ছুটোছুটি করছে, এরপরও?
-আপনার ধ্বনি তো না
প্রকৃতির ধ্যানে গভীর নিমজ্জনের ফলে বনলতা আমার বসার উপস্থিতিই টের পায়নি।

‘ও ভাই, পানি লাগব?’
-পানি খাবেন?
– আমার তেষ্টা পায়নি, জলের প্রয়োজন নেই।
-না, দরকার নেই।
‘একটা পানি নেন না ভাই?’ সর্বোচ্চ দশ কি বারো বছর হবে, ছেলেটির চোখেমুখে আকুতি।
– কত টাকা?
-আফা, পনরো ট্যাকা।
-এই আপনি টাকা দিচ্ছেন কেনো, আমি দিচ্ছি।
-কেনো? আপনি সবসময় দিবেন, আমি দিতে পারবো না, এমন কোনো নিয়ম আছে কি?
-না, সেটা নেই। তবে…
-তবে কিছু না।
বনলতাকে আঁটকানো যায়নি। পানির মূল্য ঠিকই দিয়েছে। ছেলেটি হাসিমনে হনহন করে অন্যজনের কাছে যায়। পেটের টান। বুঝেছিলেন বনলতাও। তাই তৃষ্ণা না থাকা সত্ত্বেও মানসিক দায়বদ্ধতা থেকেই কিনেছেন।

-প্রশ্নের উত্তর পাইনি।
-খুব প্রয়োজন কি?
-জানার আগ্রহ।
-দমে রাখুন।
-নতুন একটি বই পড়েছি।
-নাম?
– নিঃসঙ্গ সম্রাট।
– সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের?
-পড়েছেন?
– গতবছরই।
– একদিক দিয়ে শিশিরকুমার ভাদুড়ীকে আমার ভালই লেগেছে। কতবার দেউলিয়া হলেও ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দেননি।
– এমন ব্যক্তিত্ব দিয়ে কি হবে বলুন তো?? উষা আগুনে পুড়ে মরলেন, কঙ্কা অবহেলায়। দু-দুটো মানুষ অবহেলা সহ্য কম করেছে কি?
– উষার তো সন্দেহের বাতিক ছিল আর কঙ্কা বিয়ে বিয়ে করে পাগল করে দিচ্ছিল তো
– তো এমন অবলা মেয়ে সন্দেহ করবে না কি করবে যদি স্বামী ঘরেই না থাকে, সাথে মাতূল্য শাশুড়ির কথায় কথায় খুঁত ধরা। বাঙালী মেয়ে হয়ে রাখীবন্ধন ছাড়া লিভ টুগেদার কেনো কঙ্কা মেনে নিবে আপনিই বলুন?
– কঙ্কার মা-বাবাও তো এভাবেই থেকেছিলেন
– শিশির ভাদুড়ী ছিলেন শিক্ষিত, জ্ঞানে-গুণে অসাধারণ অপরদিকে কঙ্কার বাবা পুরোনো আমলের লোক। দুজনের মানসিকতা এক হবে কেনো?
– উষার আত্মহনন তাঁর মনে দাগ কেঁটেছে, তাই বিয়ের চিন্তা-ভাবনা থেকে নিজের মনকে দূরে রেখেছেন। তবে উনার জীবনে একটি বিষয় কিন্তু প্রতীয়মান হয়ে উঠে- যত ঝড়ঝাপটা, প্রতিকূলতা আসুক না কেনো শেষে দারিদ্র‍্যের কষাঘাত সহ্য করেও ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দেন নি।
– এমন অহংপূর্ণ, জেদি মানুষেরা শেষে ওই দারিদ্রের কষাঘাতের শিকার হতে হয়।
– উনি কিন্তু নিজের জন্য করেছেন তা নয়, জাতীয় নাট্যশালার প্রতিষ্ঠার জন্যই লড়ে গিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র উনার থিয়েটার অভিনয়ের বেশ প্রশংসাও করেছেন। সুনীতিকুমারের ভাষায়, একই সঙ্গে পাগল আর জিনিয়াস।
– সে তো জানিই। কাজী নজরুল ইসলামও ‘নাট্যমন্দির’ এর উদ্বোধনীতে “বিদ্রোহী” কবিতা পাঠ করেছিলেন। তবে উনার খামখেয়ালীপূর্ণ জীবন আমার ভাল লাগেনি।

“নিঃসঙ্গ সম্রাট” এর আলোচনা-সমালোচনা চলতে চলতেই আকাশ থেকে জমীনের বুকে সন্ধ্যা নেমে এল।
আগামীকাল একি সময় আসার কথা বলে বিদায় নেয় বনলতা।

৩.

বনলতা কোনো ফোন ব্যবহার করে না। কয়েকবার ফোনের কথা বলেও তাঁকে নতুন ডিভাইসটির প্রয়োজনীয়তা বুঝাতে ব্যর্থ হই প্রতিবারই। একই জবাব- প্রযুক্তি মানবসত্তাকে করছে যান্ত্রিক, মনুষ্যত্বকে করছে পণ্য, মনকে বানাচ্ছে সংকীর্ণ। বনলতার কথাগুলো একেবারে উড়িয়ে দিতেও পারি না। কিছুটা না অনেকটাই সত্যি যে প্রযুক্তি মানবসত্তাকে যান্ত্রিকতায় রূপ দিয়ে চলেছে।

রমনার বিকেলপার্টির মানুষজনের আনাগোনা বাড়ছে। বটমূলে বসে আছি। বনলতার অপেক্ষায়।

নাটোরের শ্যামসুন্দর মন্দিরে প্রথম বনলতার সাথে দেখার প্রায় ন’মাস পর একুশে বইমেলায় ঘুরতে ঘুরতে দ্বিতীয়বার কিন্তু প্রথমবারের মত ঢাকায় বনলতার সাক্ষাৎদর্শন মিলে। প্রথমে চোখেরভুল মনে হলেও পরবর্তীতে কাছে গিয়ে পরখ করে বিশ্বাস জুগিয়েছি। একই রূপ, একই চেহারা এমনকি একই সাজে। আসমানি রঙের সুতি শাড়িতে। সাদা ঢিলা হাতার ব্লাউজের উপর ভালোকরে শাড়ি জড়ানো।পাতাকেটে সিঁথিকরা,পরিপাটি করে চেপে চুল আছড়ানো। নতুন লেখকদের বইগুলো নিয়ে খুঁতিয়ে দেখছিল। পাশে দাঁড়িয়ে কুশল বিনিময় ছাড়াই নতুন বইগুলো নিয়ে সাহিত্য আলোচনা শুরু করে দিলাম। প্রথমে বিরক্তি ভঙ্গিমায় দৃষ্টিপাত করলেও পরবর্তীতে বনলতাও বইগুলোর দোষ-গুণ জানার আগ্রহ দেখায়। আমার বক্তব্যের উপর ভিত্তি করে সে স্টল থেকে তিনটি বই কিনে। সেদিনের পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই বইমেলায় ছুটে আসতাম, বনলতার টানে, দেখবার বাসনায়। অবশ্য সবদিন বৃথা যায়নি। আরো তিনদিন দেখা হয়েছিল। কথাবলার মূল বিষয় ছিল সাহিত্য আলোচনা। এভাবেই ঘনিষ্ঠতায় রূপ নেয় আমাদের সম্পর্কটি। যদিও এখনো আমি ধরতে পারি না, এটা কি বন্ধুত্ব, ভালোলাগা নাকি ভালোবাসা? তবে বনলতার মুখনিঃসৃত প্রতিটি শব্দ মুগ্ধতায় ভরপুর।

বনলতা হেঁটে আসছে। আজ আর আসমানি রঙের সুতি শাড়িতে নয়,হালকা খাকি রঙের সুতি শাড়িতে। বনলতা যে রঙেই সাজুক, সব রঙই তাঁর গায়ে মিশে নতুন রূপে রূপায়িত করে। আজ অর্ধেক চুল বেঁধে বাকি অর্ধেক ছেড়ে রেখেছে। বাতাসে মৃদু দুলছে।

– দেরী করে ফেললাম কি?
– আজ যদি আমি উত্তর না দেই?
‘ক্ষতি নেই’ ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি নিয়ে সোজাসাপ্টা জবাব বনলতার।
মনোযোগ সরিয়ে এনে বলি, দেখুন, পাখিগুলো কি চমৎকারভাবে কিচিরমিচির আওয়াজে এ গাছ থেকে অন্য গাছে দলবদ্ধভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
– আপনার গতদিনের দেরীতে এসকল আমি পরমানন্দে অবলোকন করেছি।
– তাই বুঝি আজ প্রতিশোধ নিলেন?
– ওমা, ছিঃ। তা কেনো হবে? আপনি আমাকে এমন ভাবলেন?
– আরে না। দুষ্টুমি করছিলাম।
– বুঝেছি। কবিতা শুনতে ইচ্ছে করছে। শোনাবেন?
– কোন কবির?
– আপনার ইচ্ছেমত।

তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি শত রূপে শত বার
জনমে জনমে, যুগে যুগে অনিবার।
চিরকাল ধরে মুগ্ধ হৃদয় গাঁথিয়াছে গীতহার,
কত রূপ ধরে পরেছ গলায়, নিয়েছ সে উপহার
জনমে জনমে, যুগে যুগে অনিবার।

যত শুনি সেই অতীত কাহিনী, প্রাচীন প্রেমের ব্যথা,
অতি পুরাতন বিরহমিলনকথা,
অসীম অতীতে চাহিতে চাহিতে দেখা দেয় অবশেষে
কালের তিমিররজনী ভেদিয়া তোমারি মুরতি এসে,
চিরস্মৃতিময়ী ধ্রুবতারকার বেশে।

এবার আমার সাথে বনলতাও কন্ঠ মিলিয়ে যাচ্ছে,

আমরা দুজনে ভাসিয়া এসেছি যুগল প্রেমের স্রোতে
অনাদিকালের হৃদয়-উৎস হতে।
আমরা দুজনে করিয়াছি খেলা কোটি প্রেমিকের মাঝে
বিরহবিধুর নয়নসলিলে,মিলনমধুর লাজে—
পুরাতন প্রেম নিত্যনূতন সাজে।

আজি সেই চিরদিবসের প্রেম অবসান লভিয়াছে
রাশি রাশি হয়ে তোমার পায়ের কাছে।
নিখিলের সুখ, নিখিলের দুখ, নিখিল প্রাণের প্রীতি,
একটি প্রেমের মাঝারে মিশেছে সকল প্রেমের স্মৃতি—
সকল কালের সকল কবির গীতি।

‘বাহ, আপনার আবৃতির গলা তো অসাধারণ।’ রবীঠাকুরের “অনন্ত প্রেম” শেষ হতেই বনলতা বলে উঠলো।
– আপনার আবৃতি কন্ঠও কিন্তু চমৎকার।
– ‘অনন্ত প্রেম’ আমার প্রিয় কবিতাগুলোর মাঝে একটি। আরেকটি শোনাবেন?
– রবীন্দ্রনাথের?
– না। এবার আপনার কবিতার পালা।
– আমার?
– কেনো শুনাতে অসুবিধে?
– না, তা হবে কেনো।

সোনালী আভায় আলোকিত বিকেল,
মিলিয়ে যায় এক নিমিষেই,
এক টুকরো মেঘের দুষ্টুমিতে,
সদ্য প্রস্ফুটিত কালো গোলাপটি
এক দমকা হাওয়ায় কেঁদে উঠে।

কানে বাজে না কোনো আর্তনাদধ্বনি
গঠিত হয় না কোনো চার্জশিট,
মামলা চলে না কোনো নিম্ন আদালতে,
বিচার হয় না কালো গোলাপটির প্রাণ হত্যার।

বহুমূল্যে কেনা অনুজ গোলাপটি,
প্রেমিকের হাত ধরে অবুঝ প্রেমিকার নিষ্পাপ হাতে বন্দী,
গোলাপি লিপস্টিক ঠোঁটের চিলতে হাসিতে আড়ালে পড়ে
শত গোলাপের ক্রন্দনরোল, পাঁজরভাঙার ধ্বনি।

– শেষ হয়ে গেল?
– কেনো? আরো দীর্ঘায়ত চান?
‘এ কবিতাটাই আরেকবার শুনাবেন? ‘ বনলতা সেনের চোখে-মুখে প্রথম কোনো আকুতি দেখে আবার কবিতাটি আবৃতি করলাম।

সন্ধ্যা নেমেছে। দুদিন বাদে একই সময়ে দেখা হবে। এখন থেকে শুধু আপনার কবিতাই শুনবো। প্রতিদিন আপনার দুটোকরে কবিতাপাঠ শুনার অপেক্ষায় থাকবো। আজ তবে যাওয়া যাক।

বলে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায় হেঁটে চলল বনলতা সেন।

৪.

দুদিনবাদে বনলতার সাথে দেখা। আধুনিকতা, প্রযুক্তির মোহ থেকে নিজেকে সবসময় দূরে রেখেও কখনো কোনপ্রকার অভিযোগের চিহ্ন শুনিনি, হতাশার শব্দ বেরোয়নি। বরঞ্চ সবসময় প্রশান্তির নমনীয় আভা দীপ্তিমান হয়েছে। এভাবে পরপর তিনদিন চলল। বনলতাকে দুটির স্থলে কোনকোন দিন তিনটি থেকে চারটি আবার কোনদিন একটিই বারবার আবৃতি শুনিয়েছি। রাত জেগে কবিতা লিখি, দিনে ঘুমের সাগরে ভাসি, বিকেলে বনলতাকে উৎসর্গ করি। নিত্যদিনের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিনকিদিন বনলতার মায়াময়রূপে জড়িয়ে পড়ছি। প্রতিদিন নতুনভাবে নতুনরূপে এক বনলতার মাঝে নানাগুণের সত্তার সন্ধ্যানে বিমোহিত হচ্ছি।

পুরোনো পাঞ্জাবী বাদ দিয়ে বনলতা আজ নতুন পাঞ্জাবিতে আসতে বলেছিলেন। পুরোনো কাঠের আলমারি থেকে ইস্ত্রিকরা সাদা পাঞ্জাবি নামিয়ে, সাথে সাদা পায়জামায় ছেঁড়া স্যান্ডেলটি পাল্টিয়ে নতুন স্যান্ডেলে পুরোনো আমি থেকে নতুন আমিতে রূপান্তরিত হয়েছি। না, সব পাল্টাইনি। শুধু উপরের বেশ-ভুষা পাল্টিয়েছি, মনের গহীনটা বনলতার জন্য বনলতার মায়ায় জড়িয়ে রয়েছে।

গেলোদিন বনলতা বলেছিল, ঢাকায় নাকি বেশীদিন আর তাঁকে রাখবে না কাকা-কাকী । রাখিবন্ধনের ব্যবস্থা নিয়েছেন। স্বর্ণকার এক বুড়োর সঙ্গে। কাকা অর্থলোভী, ইন্ধনদানকারীর ভূমিকায় কাকী।

বটমূলে এসে বসেছি। মেঘলা আকাশ। ঘন কালো মেঘে বিদীর্ণ হয়েছে চিরচেনা আসমানি রঙ। মেঘ নিজের ভার বইতে অসম্মতি জানিয়ে যেকোনো সময় গর্জন করে উঠবে হয়ত। বাদামওয়ালার আজ বাদাম বিক্রি কম। সবথেকে বেশী বাদামক্রেতাদের অধিকাংশই যে আজ অনুপস্থিত কালো মেঘের আবির্ভাবে। বাদামক্রেতাদের কেউ যে নেই সেটা ভাবাও ভুল। অতিসচেতনেরা আবার এক ছাতার নিচেই ঘাপটি মেরে বসে হেসে যাচ্ছে, বৃষ্টিজলের নিম্নপতনের পূর্বেই। মূলত মধ্যবয়সী এই কপোত-কপোতীরাই বাদামওয়ালার প্রধান এবং নিয়মিত কাস্টমার। কিছু স্কুল-কলেজ ড্রেস পড়ুয়াদেরও দেখা যায়, সন্ধ্যা নামতেই এরা পালায়। কালো মেঘও এই দশ-বারো বয়সের পানিবিক্রেতাদের থামাতে পারেনি। প্লাস্টিকের কার্টুনে পানির বোতল, জুস নিয়েই চলছে। ক্ষুধার তাড়নায় কিছু উপার্জনের আশায়।

চারিপাশের সকল দৃশ্য নিরীক্ষণ করতে করতেই দিনের আলো বিলীন হয়ে অন্ধকারের চাদরে ঢেকে যাচ্ছে। এখনো বনলতা আসলো না। বনলতা কখনো আসবে বলে আসেনি, এমনটা হয়নি। আজ কি তবে অসুখে পড়লো? বিয়ের কথা বলেছিল, সেরকম কোনো সমস্যা হল? না, ধুর, এই সময়ে শুধু শুধু আজগুবি চিন্তা করা যাবে না। আজ আসেনি, কাল আসবে।
এরচেয়ে ভাল এমন পরিবেশে শব্দগুলো নিয়ে খেলি, একটি কবিতা সৃষ্টিসুখ অর্জন করুক।

না, বেশকিছুক্ষণ ভেবেও শব্দগুলো একত্রিত করতে পারিনি। মাথাজুড়ে বনলতাই ঘুরপাক খাচ্ছে। আজ আর থাকব না, উঠে যাব।

চতুর্থদিনের মত একই পোশাকে এসেছি। কয়েকবার রমনা খুঁজেও বনলতার চিহ্ন পেলাম না। সাদা ইস্ত্রিকরা পাঞ্জাবিতে এমন ক্লান্তির ভাঁজ পড়েছে। মসৃণ হৃদয়ে বনলতার চিন্তায় দাগ কেটেছে। বনলতার ঢাকার ঠিকানা জানি নেই। কখনো জিগাসা করিনি, করার প্রয়োজনও বোধ করিনি। বনলতার উপস্থিতিতে স্বাভাবিকদিনের চেয়েও দ্রুতগতিতে সূর্য ডুবে অন্ধকার নেমে আসতো। সময়ের হিসাব রাখতাম না কেউই। একবার কথার মাঝে বনলতা বলেছিল আদিনিবাস চলনবিলে। নাটোরের চলনবিলে।

শুক্রবারে বনলতা কখনো বের হত না। পরশু দিন, শনিবারে রমনায় শেষবারের মত খোঁজ করবো।

বনলতা আমার ঠিকানাও জানেনা। তাহলে হয়ত চিঠি দিতে পারত। চিঠি লিখে কিনা অথবা এখন কোন অবস্থায় আছে চিঠিপত্রাদি দেয়া সম্ভব হত কিনা সে ধারণাও নেই।

শনিবার বিকেলবেলা থেকে সন্ধ্যা অবধি রমনায় থেকেও বনলতার দেখা পেলাম না। ময়লা জমতে থাকা সাদা পাঞ্জাবি গায়েই নাটোর যাত্রা করলাম।

৫.

নাটোরে দুদিনের পর গাড়ি শোঁ শোঁ করে রাজধানীর দিকে ছুঁটছে। আকাশে কোনো কালো মেঘ নেই। বর্ষণের সম্ভাবনাও নেই। ঝড়ের লক্ষণ তো আরো দূরে। কিন্তু মনের ঝড়ের গতি ক্রমাগত বেড়েই চলছে, ভেঙেচুড়ে ধ্বংসস্তূপে হাহাকার বাড়ছে।

চলনবিলে যখন বনলতার সন্ধ্যান পেয়েছিলাম ততক্ষণে সবকিছুই শেষ। বনলতার কাকা লোক লাগিয়ে আমার তথ্য নিয়েই বনলতার বিয়ের জন্য তড়িঘড়ি শুরু করে। বনলতা বুঝতে পেরে আমাকে সাদা পাঞ্জাবিতে আসতে বলেছিল। কিন্তু ধর্মের শিকল সে অতিক্রম করতে পারেনি। ক্ষত্রিয়সমাজের মেয়ে হয়ে মুসলমানের সঙ্গ সহ্য করতে পারেনি এ সমাজও। সমাজের অগণিত নিয়মের বেড়াজাল আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে বলি হয়েছে আমাদের সম্পর্ক।

মেয়ে,সংখ্যালঘু তকমা সাথে ধর্মের বেড়ী পড়েই হারিয়ে গেল বনলতা সেন। যেভাবে হঠাৎ পেয়েছিলাম, ঠিক সেভাবেই অকস্মাৎ হারিয়েছি। হারাইনি শুধু বনলতার স্মৃতি। আসমানি রঙের সুতি শাড়িপরিহিতা। সাদা ঢিলা হাতার ব্লাউজের উপর শাড়ি জড়ানো। পরিপাটি করে চেপে পাতা কেটে সিঁথিকরে চুল আছড়ানো। মুচকি হাসি। হালকা খাকি রঙের শাড়ি। আধাখোলা চুল। মৃদু বাতাসে দোলা। একই সাথে ‘অনন্ত-প্রেম’ আবৃতি। সাহিত্য আলোচনা- সমালোচনা। বনলতার মায়া- মোহিনীশক্তি। নির্দিষ্ট সম্পর্কে আবদ্ধ না থেকেও ভাললাগাগুলোর গাঢ় মিল। অদৃষ্ট প্রবল টান। সবমিলেমিশে স্মৃতিগুলো ভারি করে তুলছে।

পৃথিবীর সব আলো মুছে যাচ্ছে। অন্ধকারে ছেয়ে যাচ্ছে চারপাশ। জীবনের জাগতিক লেনদেন সমাপ্ত হয়েছে। নতুন কবিতাগুলি তৈরি। এখন (কেবল) অন্ধকারে বনলতা সেনের সাথে একই সুরে আবৃতি করার অবসর। বনলতা সেন কি তার পাখির নীড়ের মত আশ্রয়ময় চোখ দুটি তুলে জানতে চাইবে, “এতদিন কোথায় ছিলেন?”

  • 23
    Shares

পাঠটিকে একটি রেটিং দিনঃ
খুব খারাপ, পাঠটিকে ১ রেটিং দিনখারাপ, পাঠটিকে ২ রেটিং দিনমোটামুটি, পাঠটিকে ৩ রেটিং দিনভাল, পাঠটিকে ৪ রেটিং দিনআসাধারন, পাঠটিকে ৫ রেটিং দিন (টি ভোট, গড়ে: এ ৫.০০)
Loading...

আমাদের উৎসাহিত করুনঃ




সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এই লেখাটি কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়



  • লেখক সম্পর্কেঃ সাকিব মাহমুদ সুহৃদ

    বুনন সম্পর্কিত তথ্যঃ 2017-10-07 12:32:16 তারিখ নিবন্ধিত হয়েছিলেন, এই পর্যন্ত প্রকাশিত লেখা সংখ্যা 10টি, মোট 6 পয়েন্ট সংগ্রহ করে 42 অবস্থানে আছেন।
    সংগঠন ও গোষ্ঠীঃ লেখক কোন সংগঠন বা গোষ্ঠী এর সদস্য নন

    আপনার ভাল লাগতে পারে

    avatar
      
    smilegrinwinkmrgreenneutraltwistedarrowshockunamusedcooleviloopsrazzrollcryeeklolmadsadexclamationquestionideahmmbegwhewchucklesillyenvyshutmouth
    2 আলোচনা
    1 আলোচনায় উত্তরগুলো
    2 অনুসরন করেছেন
     
    সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়া
    আলোচিত মতামত
    2 মতামত প্রদানকারী
    সাকিব মাহমুদ সুহৃদতাছনীম বিন আহসানসাকিব মাহমুদ সুহৃদ সাম্প্রতিক মতামত প্রদানকারী
    তাছনীম বিন আহসান
    সদস্য

    kothay jeno haray gelam. Khub sundor likhecen.

    You're currently offline