অস্পৃশ্য মানবী

রুমের তাপমাত্রা খুব সুক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রিত সাথে গোলাপ ফুলের মৃদু কৃত্তিম সুবাস। দেয়ালের এক পাশে একটা জায়ান্ট স্ক্রিন বসানো। মনে হচ্ছে জানালা। সারি সারি পাহাড়ের ছবি তাতে। ছোট কালো কালো মেঘ ভাসছে, হাল্কা অন্ধকার, বৃষ্টি হবে হবে এমন, পাখিও উড়ছে একটা দুটা করে। একদম প্রাকৃতিক যেন। রুমের আলো স্ক্রিনের আলোর সাথে মিল করে নিয়ন্ত্রন করা হচ্ছে। মাঝখানে একটি সাদা রং এর ছোট চারকোনা টেবিল আর দুটি চেয়ার। কেন্দ্রীয় অনুভুতিসম্পন্ন মানবযন্ত্র বিভাগ আজ তাদের অনেক দিনের গবেষনার ফলাফল পর্যবেক্ষণ করতে এই ব্যবস্থা করেছে। রুমের একপাশে দেয়ালে লুকানো একদল বিজ্ঞানী উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে। একটু পরেই তাদের দুই অনুভূতিসম্পন্ন মানবযন্ত্রকে এখানে নিয়ে আসা হবে।

ই-২৯ মানবযন্ত্রটিকে ছেলেদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে প্রোগামিং করা হয়েছে। বুকের মাঝখানে ই-২০ খোদাই করা। তাকে রুমে প্রবেশ করানো হলো। সে আস্তে আস্তে হেঁটে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। বাইরে তাকিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক সেদিক দেখছে। বিজ্ঞানীরা সব খেয়াল করছে এবং সময়ও দেখছে। অনেকক্ষণ সে ওখানেই দাঁড়িয়ে। তার মধ্যে কোন পরিবর্তন নেই। খানিকক্ষণ পর দরজা খুলে অন্য একটি মানবযন্ত্রকে প্রবেশ করানো হলো। এর নাম ম-২১, এরও বুকে খোদাই করা। তাকে বলা হলো আপনি এখানে কিছুক্ষণ থাকবেন, পরে সময়মতো আপনাকে ডেকে নেয়া হবে। সে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। দরজা বন্ধ হলো। ম-২১ চেয়ারে গিয়ে বসলো। একটু অস্বস্তিকর লাগছে ম-২১এর। সে চারদিকে তাকাচ্ছে। বিজ্ঞানীদের এটা ভালো লাগছে।
এরই মধ্যে জানালায় বৃষ্টি শুরু হয়। বিদ্যুৎ চমকানোর সাথে সাথে রুমের আলোও বাড়ছে কমছে। বাজের শব্দ আসছে মৃদু। হঠাৎ ম-২১ এর মনে হলো ই-২৯ তাকে কোনভাবে সংকেত পাঠাচ্ছে। সে সংকেত গ্রহন করলো,

-আপনি ইচ্ছা করলে জানালায় আসতে পারেন

ম-২১ বুঝতে পারলো সে এটা কিভাবে করলো। উঠে গিয়ে সেও দাঁড়ালো জানালায়। কথা না বলে সেও সংকেত পাঠালো

– আমি এটা আগে কখনো করিনি। আপনি কিভাবে করলেন?

-আমিও করিনি আগে। মেমরি স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রোগাম বানিয়েছে। আর আপনার মেমরিতেও কপি করে দিয়েছে।

-আপনি কি জানেন যে এই জানালা, বৃষ্টি কৃত্তিম?

– (মৃদু হেসে) হুম জানি। আমাদের জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি করেছে কৃত্তিমভাবে। ( আবার হাসি)

বিজ্ঞানীদের এই পরিবর্তনটা ভালোভাবে দেখছে। হাসি যন্ত্র দুটির ভিতরে ভালোলাগা তৈরি করবে। কিন্তু তারা চাচ্ছে যন্ত্র দুটি কথা বলুক

– তাও দাঁড়িয়ে আছেন যে?

– আমিও তো কৃত্তিম তাই হয়তো। বিজ্ঞানীরা কি চাইছে জানেন?

– হুম। বুঝতে পারতেসি।

– তারা চাইছে আমাদের মধ্যে ভালোবাসা হোক। মানুষের মধ্যে যেমন হয়।

– হুম (চুপ থেকে)।

– এটা কি সম্ভব? আমরা কি এমন ভাবে তৈরি?

-(অনেকক্ষন চুপ) না। আমরা এমন ভাবে তৈরি না।

-আমরা তো যন্ত্র, একে অপরকে ভালো বুঝি। আপনার সক্ষমতা আমি নির্নয় করতে পারি, আপনিও আমারটা পারেন। কথা না বলেও আমরা কথা বলতে পারি।

– আমাদের অক্ষমতা এটাই। সব বুঝে ফেলায় আমাদের নিজেদের প্রতি আকর্ষণ নেই। যেখানে আকর্ষন নেই সেখানে ভালোবাসাও নেই।

-তবুও যে আমার আকর্ষণবোধ হচ্ছে!

– আপনাকে ছেলেদের মত করে প্রোগামিং করা হয়েছে। তাই এমন হচ্ছে। আমাকে মেয়েদের মত করে প্রোগামিং করা হয়েছে। মেয়েরা যখন সব বুঝে যায় আকর্ষণ হারিয়ে ফেলে। আপনি যন্ত্র, আপনাকে বুঝা আমার জন্য খুব সহজ।

বিজ্ঞানীরা অবাক হয়ে যাচ্ছে যন্ত্র দুটির কোন অনুভূতিই কাজ করছে না যেন। অনেক সময় হলো যন্ত্র দুটি ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। একজন বিজ্ঞানী উঠে গিয়ে দরজায় দিয়ে প্রবেশ করল, যন্ত্রদুটি তার দিকে তাকালো।

-আমাদের আরো কিছু সময় প্রয়োজন, আপনারা কথা বলেন কিছু সময় (হাল্কা হাসি দিয়ে)। সময় হলে আপনাদের ডেকে পাঠানো হবে। দরজা আবার বন্ধ।

যন্ত্রদুটি সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। কৃত্তিম বৃষ্টির ফোটা জানালার কাঁচ গড়িয়ে পড়ছে। ই-২৯ এর সংকেত পাঠাবার প্রোগামটা নিজেই নিজেকে মুছে ফেলেছে। কৃত্তিম আকাশটা কালো করে মেঘ জমিয়েছে, জানালার কাঁচে ম-২১ এর একটা প্রতিচ্ছবি ভেসে আসলো। অবাক হয়ে সে সেদিকেই তাকিয়ে থাকলো।


আমাদের উৎসাহিত করুনঃ




সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এই লেখাটি কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয় ।

লেখক সম্পর্কেঃ

বুনন সম্পর্কিত তথ্যঃ