ইন্দ্রজাল

১.

অফিস থেকে কিছুদূর এগুলেই চৌরাস্তা মোড়। মোড় দিয়ে হসপিটাল রোড বরাবর সোজা খানিকদূর হাটলেই মীর জসিমের আলিসান বাড়িটি চোখে পড়ে। বাহির থেকে এমন চোখ ধাঁধানো, ভিতরটা না জানি কত জাঁকজমকপূর্ণ, মনোমুগ্ধকর। প্রতিদিন একবার এই বাড়িটি দেখলেও চোখ জুড়িয়ে যায়। একটা মানুষের রুচিবোধ কত সৌখিনই না হতে পারে। সৌখিনতার সাথে আর একটা শব্দ যোগ না করলে সৌখিনতায় হয়ত অভাব থেকেই যাবে। অর্থ-সম্পদ। সৌখিনতাকে বাস্তবে রূপ দিতে এই সম্পদের যে কোনো বিকল্প নেই। শুধু চাহিদা থাকলেই হয় না, যোগানও থাকা যে অতীব প্রয়োজন। যখন এই দুটির সংমিশ্রণ গ্রাফ অঙ্কিত হয় তখনো কিন্তু চাহিদা পূর্ণ হয় না যতক্ষণ না ব্যয় করার ইচ্ছার সৃষ্টি হবে। মীর জসিমের বাড়িটিকে সৌখিনতা নাকি বিলাসিতা, দুটোই অথবা কোনোটিই না, কোনটি দ্বারা আখ্যায়িত করবেন জমিরুল, বুঝে উঠতে পারছেন না।

বসের ঝাড়ি খেয়ে এসে মীর জসিমের আলিসান বাড়িটি দেখে কিছুক্ষণ চিন্তায় মগ্ন থাকতে খারাপ লাগে না জমিরুলের। অনেকটা অভ্যাস হয়ে যাওয়ার মত ব্যাপারস্যাপার। চাকরির প্রথম প্রথম যখন বস ঝাড়ি দিত, খুব মন খারাপ হত তার। মাঝে মাঝে চোখের কোণে অশ্রুও চলে আসত। এতগুলা কলিগ, কর্মচারী এদের সামনে অপমান হওয়াটা খুব লাগত। খারাপ লাগাটাই যে স্বাভাবিক। ওয়াশরুমে গিয়ে খানিকক্ষণ কাঁদতেনও। কাঁদলে নাকি মন হালকা হয়। কষ্ট সব অশ্রুকণার সাথে বের হয়ে যায়। সাথে শরীরটাও নাকি ঝরঝরা হয়ে যায়। প্রফুলতা লাগে মনে। এমন কথাগুলো বিশ্বাস করে জমিরুল। বিশ্বাসটা আসে তার দাদির কাছ থেকে। তার ফুপুর ভাঙাচোরা সংসারে যখনই ঝামেলা হত, তিনি বাপের বাড়ি এসে পড়ত। বছরের ৮মাসই বাপের বাড়িতেই কাটত। প্রথমে ফুপা নিতে আসলেও এরপর আর খুব একটা আসে নি। ফুপু যখন কাঁদত তখন দাদি কথাগুলা মেয়েকে উদ্দেশ্য করে বলত। ছোট জমিরুল সেগুলোই বসে বসে গিলত। ওয়াশরুম থেকে যখন বেরোত অফিসের সহকারীরা সবাই বুঝে ফেলত। কাঁদলে আবার জমিরুলের চোখ টসটসা টমেটোর মত হয়ে যায়। কেউ কেউ আবার আড়ালে হেসে একাকার হয়ে যেত। পুরুষমানুষ এভাবে কাঁদে কিভাবে। কয়েকজন সহমর্মিতার উষ্ণ হাত বাড়িয়ে দিত। জমিরুল একটু শান্তি পেত তখন। মনে হত, এখনো এই দুনিয়ায় কিছু ভাল মানুষ আছে।

২.

মীর জসিমের বাসার পর আরো তিনটি বাসা ক্রস করলেই বা দিক দিয়ে একটি সরু রাস্তা। শর্টকাটে এ রাস্তা ধরে জিলা স্কুলে যাওয়া যায়। হসপিটাল রোড থেকে রিক্সা নিলে যেখানে পনের টাকা ভাড়ার ফ্যাঁকড়া, সেখানে শর্টকাটে সাত-আট মিনিট হাঁটলেই স্কুলগেট দেখা মিলে। এ রাস্তা দিয়ে দশ পা এগুলেই একটি মিস্ত্রীর দোকান আর একটি ফ্লেক্সির দোকান । পলেস্তারাহীন। কোনো রকমে ইটের গাঁথুনি দিয়ে দাড় করানো দোকান দুটি। এ দু দোকানের মাঝে দিয়ে এক চিপা গলি বরাবর গেলেই একটি টং দোকান চোখে পড়ে। পলেস্তারাবিহীন দেয়ালে চক দিয়ে লেখা,
”বুলেট মামার রুবেল চা”
প্রথমে যারাই পড়েন হেসে একাকার হয়ে যান।

দোকানটি চালান রুবেল নামের চল্লিশোর্ধ মানুষটি। নিরক্ষর। একেবারে নিজের নামটিও লেখতে পারেন না। বাপের কৃষিজমি ছিল, বাপের সাথে তিনিও কয়েক মৌসুম কৃষিকাজ করেছেন। বাপ মারা যাওয়ার সাথে সাথে চাচা, চাচাতো ভাইরা এসে জোর জবরদস্তি করে সব দখল করে নেয়। বলে কিনা, তার বাপ অনেক টাকা ঋণ রেখে গেছেন তার চাচার কাছে, তাই জমিজমা সব দেয়া লাগবে। ভিটেমাটি টাও ছাড়ে নাই। জোঁকের মত চুষে নিয়ে গেছে। এদেশে জোর যার মুল্লুক তার। চেয়ারম্যানবাড়ি গিয়ে রুবেলের মা আর রুবেল নাক-চোখের পানি একাকার করে সব বলেও কোনো লাভ হয়নি। আশা দিয়ে গেছেন কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। অথচ এই চেয়ারম্যানই কত হাতে-পায়ে ধরে নির্বাচনের সময় ভোট নিয়ে গেছেন। মুখোশ। সবই চামড়ার উপর লাগানো মুখোশ।

রুবেল টং শুরু করার প্রথমদিকে তেমন মানুষ পেত না। তবে তার চায়ে সত্যিই জাদু ছিল, যেই একবার এ চায়ে চুমুক দিত, এ টং আর ছাড়ে নি। কলেজ-ভার্সিটিপড়ুয়ারা তো বলত, ”মামা একবারে বুলেটের মত চা বানাও” সেইথেকেই রুবেলের মাথায় ঘুরতে থাকতে থাকে টং এর একটা জম্পেশ নাম দেয়া দরকার। এক কলেজবয়সীকে নামটি পলেস্তারাহীন দেয়ালে লিখে দিতে বলেছিল রুবেল। এরপর যেই নামটি দেখে হেসে একাকার হয়ে যায়। রুবেল শুনে মন খারাপ করেছিল। বজ্জাত ছেলেটি ইচ্ছাকরে এমন কেন করলো?! আস্তে আস্তে রুবেলও মজা পেতে থাকে। নামের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়।
“বুলেট মামার রুবেল চা”। নাহ, নামটা একেবারে খারাপ না, একটা জাদুকরি অনুভুতি আসে নামেই। চা-বিস্কুট সাথে পান-সিগারেট বেচেই যে ভালই উপার্জন হয় রুবেলের।

৩.

জমিরুল হাঁটতে হাঁটতে রুবেলের দোকানে আসে। বয়সে প্রায় দশ বছরের বড় হলেও, রুবেলকে নাম ধরেই ডাকে জমিরুল। রুবেল এতে কিছু মনে করে না। প্রতিদিনের মতই জমিরুল এসেই গলা খাকানী দিয়েই বলে,
“রুবেল, কড়া করে একটা চা বানা তো।”
টং এ এসে গলা খাকানো দেয়াটা রীতিমত অভ্যাস জমিরুলের। আগে অফিসেও দিত, কয়েকবার এরজন্য সবার সামনে অপমানিতও হতে হয়। বস তো আর মেপে কথা বলেন না।
রুবেল জানে এ কড়া মানে, চায়ে আড়াই চামচ চিনি দেয়া। জমিরুল চিনিখোর।
জমিরুল ফুলহাতা শার্টের হাতা গুটিয়ে বেঞ্চিতে বসেন।

জবের জয়েনিং ডে তে অফিসে ঢোকেন পাক্কা চল্লিশ মিনিট লেট করে। বিসমিল্লাহতেই গলদ বলতে যা হয়। কিছুক্ষণের মাঝেই বসের কল আসে। বসের রুম থেকে চোখ মুছতে মুছতে বের হতে দেখা যায় জমিরুলকে। বেচারা। একে তো চল্লিশ মিনিট লেট, এর সাথে উল্লুকের মত ফরমাল শার্ট-প্যান্টের সাথে বাসার স্যান্ডেল নিয়েই এসে পড়েছে।বাথরুমের স্যান্ডেল বললেও ক্ষতি নেই। কলিগরা এসে সান্ত্বনা দেয়, বুঝায়, সব ঠিক হয়ে যাবে। কয়েকজন দেখেই ফিকফিক করে হেসে ফেলে।

“এই লন আফনের চা”
চা নিয়ে শব্দকরে চুমুক দেয় জমিরুল।

সেদিন জমিরুলের লাঞ্চটাইম পুরুটাই কাটে অফিসের ওয়াশরুমে। লাঞ্চটাইমের পর জমিরুলকে দেখে সবাই অবাক। বস তো আরো রেগেমেগে ফায়ার। এমন মেন্দা স্বভাবের ছেলে চাকরী করবে কিভাবে। চোখদুটো ফুলিয়ে টসটসা টমেটোর মত বানিয়ে ফেলেছে। জমিরুলকে দেখে নাজু ম্যামের খারাপই লেগেছিল। বোকাচণ্ডীকে প্রথমদিনেই এমন নাজেহাল অবস্থায় পড়তে হল।

৪.

নাজিফা ইসলাম। বড়ই ভাল মনের মানুষ।বড় মনের মানুষ। আচার-ব্যবহার অমায়িক। সবার সাথে ভাল মিশতে পারেন। দেখতে একটু কালচে বর্ণের কিন্তু মিষ্টি চেহারা। মুচকি হাসিটা মারাত্মক রকমের কিউটনেসে ভরপুর। মেরিটরিয়াস। এডুকেশনাল ব্যাকগ্রাউন্ডও ভাল। পারিবারিকভাবেই বিয়ে হয়। ধনাঢ্য বাবার সন্তান। স্বামী পৈত্রিকসূত্রে গুলশানে দুইটি ফ্ল্যাটের অধিকারী। বেসরকারি ফার্মে সফটওয়্যার ডেভেলপার হিসেবে কর্মরত। মোটা অংকের সেলারি, সাথে দুটো ফ্ল্যাটের ভাড়া। দুজনের একমাত্র ছেলে চীনে বেসরকারি মেডিকেলে অধ্যয়নরত।

নাজিফা ইসলামের ডুপ্লেক্স বাসা পছন্দ। বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রী মিলে একটি ডুপ্লেক্স বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন। এতবড় ডুপ্লেক্স বাসা, অথচ নাজিফা ইসলামের সঙ্গী একাকীত্ব। একাকীত্বকেই আপন করে নিয়েছেন।

মুখটি বাংলার পাঁচের চেয়েও বেশী বিকৃত হয়ে গেল জমিরুলের। মেজাজটা গরম হয়ে গেল।

“অই রুবেল, তরে কতবার কইছি, আমার চায়ে এলাচ দিবি না, আর তুই দুনিয়ার সব এলাচ আমার চায়েই দেস”

রুবেল কিছু বলে না। মতি চাচার চায়ে এলাচ দিতে গিয়ে জমিরুলের চায়ে দিয়ে দিছে।

রাগেগরগর করে জমিরুল চলে যায়। রুবেল খাতা টেনে একটি দাগ দেয়।

অফিস শেষে চৌরাস্তায় বাসের জন্য অপেক্ষা করছে জমিরুল। নাজু ম্যাম এদিকেই আসছে।
”জমিরুল সাহেব, বাসায় যাচ্ছেন?”
“জ্বী ম্যাম, আপনার গাড়ি আসে নি?”
“না, আজ আসবে না। আপনি কষ্টকরে আমাকে একটু বাসায় নামিয়ে যেতে পারবেন?”
”পারবো ম্যাম, সমস্যা নাই।”

বাসে সামনের সংরক্ষিত মহিলা আসনে বসে নাজু ম্যাম। জমিরুল তিন সারি পিছনে সিট পায়।

অর্থ-আভিজাত্য কোনোকিছুরই অভাব নেই নাজিফা ইসলাম ওরফে নাজু ম্যামের। কিন্তু মনের মানুষটিরই যে অভাব। এ অভাব ঘুচবে কিসে? একমাত্র সন্তানটিও দেশের বাইরে। স্বামীর সাথে কিছু সুখ-দুঃখের গল্প করে ঘুমাবেন সে ভাগ্যও হয়ত বিধায়ক লিখেনি।তার প্রাপ্যটা হয়ত অন্য কোনো স্ত্রীর কপালে লিখে দিয়েছেন। প্রায় রাতেই ঘরে ফিরেন না স্বামী আকবর-উল-হক। কোথায় যান, কি করেন কিছুই বলে যান না। প্রশ্ন করেও কখনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

৫.

নাজু ম্যামকে তার বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে জমিরুল হেঁটে চলল। নাজু ম্যাম বলেছিল, চা-নাস্তা করে যেতে।
“আজ না ম্যাম, আরেকদিন করবো।” বলে পাশ কাটে।
কি আশ্চর্য! রাত বাজে ৮টা, অথচ সম্পূর্ণ বাসা কালোচাদরে আবৃত। নাজু ম্যাম নিজের কাজ নিজেই করতে পছন্দ করেন তাই কোনো কাজের লোকও রাখেননি। সত্যিই এই মহিলাটা পারেও! ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে জমিরুল।

মিশন রোডের সামনে আসতেই একটি জটলা দেখে জমিরুল। এগিয়ে জটলার কাছে ভিড়ে। একটি মেয়ে পড়ে আছে। জায়গায় জায়গায় ছেঁড়া কাপড়। মুখে আঘাতের চিহ্ন। রক্তাক্ত। শুধু গোঙরানি শোনা যাচ্ছে। পাশে এক লোক আরেক জনকে বলছে, “আমি এই রাস্তা দিয়াই হাইট্টা যাইতাছিলাম, কোনো কথা-বার্তা নাই, ধুম কইর‍্যা একটা সবুজ রংগের সিএনজি থামল, আর মাইয়্যাডারে রাস্তাত ফালায়া গেলো গা। আল্লাহ তুমি দেহো না?! দেশটা শেষ! কি যে অইতাছে দেশটাত?!” সাথে কয়েকজন মনোযোগী শ্রোতা মাথা সায় দিয়ে আফসোস প্রকাশ করলো। কেউ কেউ আবার ঘটনার চিত্র-ভিডিও ধারণ করেও দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিল। বুঝতে বাকি রইল না জমিরুলের।

জমিরুল আর কয়েকজন মিলে ক্ষতবিক্ষত দেহটিকে অটোরিকশায় তুলে হাসপাতালের দিকে রওনা দেয়।
অবস্থা বেগতিক দেখে কর্তব্যরত ডাক্তার ব্লাড সাপ্লাই দিলেন এবং হসপিটাল অথোরিটিকে বললেন পুলিশকে ইনফর্ম করতে।

কিছুক্ষণ পর পুলিশ আসলো। জমিরুল ঘটনার বিবরণ দিল। পুলিশ আশ্বস্ত করলো, ফরেনসিক রিপোর্ট পাওয়ার পরই তারা এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবেন।

রাত বাজে ১টা। জমিরুল হাসপাতাল থেকে বের হয়ে রাস্তায় উঠলো। রাস্তার দুধারের দোকানগুলোর সাটার বন্ধ। শুধু ল্যাম্পপোস্ট গুলো জেগে। মাথানিচু করে দাঁড়িয়ে আছে এরাও। এদেশে জন্মে যে ভিকটিমদের মাথা নিচু করেই চলতে হয় এটাই হয়ত ইঙ্গিত করছে ল্যাম্পপোস্ট গুলোও। মাথা উঁচু করে চলার অধিকার শুধু ক্রিমিনালদেরই। এ কাজ কেউ করে গদিতে বসে, লোকচক্ষুর সম্মুক্ষেই। আবার কেউ লোকচক্ষুর অন্তরালে, বনে-জংগলে। বাকিরা??? সবাই ভিকটিম। কেউ প্রত্যক্ষভাবে মেয়েটির মত সব বিসর্জন দিয়ে। কেউবা নানাস্তরে শোষণের শিকার হয়ে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে জমিরুল।

৬.

বাসার মেইন গেট বন্ধ। বন্ধ হওয়াটাই স্বাভাবিক। রাত কি কম হয়েছে। জমিরুল ফোন বের করে। চমকে উঠে। ১৭টা মিসড কল। শুধু একটা কন্টাক্ট নাম্বার থেকেই। এবিসি। জমিরুল কল ব্যাক করে।
“কি হইছিলো তোমার? কতগুলা ফোন দিলাম? ধরলা না, কোথায় আছো? কোনো প্রব্লেমে…..” ফোন ধরেই একনিঃশ্বাসে বলতে থাকে শিরিনা। কথা শুনতে ইচ্ছে করছিলোনা,
“বাসার নিচে দাঁড়িয়ে। গেটম্যানকে বলো, গেট খুলতে।” ফোন কেটে দেয় জমিরুল।

জমিরুলকে বিয়ে দেয়ার জন্য পাত্রীর সন্ধান চলছিল, তখন দূরসম্পর্কের এক মামা এসে জমিরুলের বাবার কাছে শিরিনার জন্য প্রস্তাব করেন। জমিরুলের বাবা, চাচা মিলে খোঁজখবর নিয়ে শিরিনাকে পছন্দ হয়ে যায়।এংগেজমেন্টের দিন প্রথম সামনাসামনি জমিরুল শিরিনা একে অপরকে দেখে। জমিরুল তখন কোনো কথাই বলতে পারেনি শিরিনার সাথে। লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছিল। শিরিনা মুচকি হেসেছিল শুধু।
দুদিনপরই জমিরুলকে শিরিনা ফোন দেয়, কিন্তু পরিচয় গোপন করে। জমিরুল বুঝতে পারে। নাম জানতে চাইলে বলেছিল,
– “এ বি সি ডি ই এফ জি এইস আই…. ”
-“বুঝে গেছি আপনার নাম। আর বলতে হবে না”
অপরপাশ থেকে শুধু অট্টোহাসি শুনেছিল।
এরপর থেকেই জমিরুল নাম সেভ করে “এবিসি” দিয়েই, যা বিয়ের পরও পরিবর্তন হয়নি।

পা গুলো অবশ হয়ে গেছে মনে হচ্ছে জমিরুলের।শরীরের ভাড় আর নিতে পারছে না। দশ মিনিটপর দারোয়ান এসে গেট খুলল। পাকা ঘুম ভেঙে এসেছে। রাগে কটমট করতে করতে “এতো রাতে গেট খুলতে মালিকের নিষেধ আছে।” কোনো কথা না বলে উপরে উঠে যায়। শিরিনা গ্রাউন্ড ফ্লোরে এসেই দারোয়ানকে ডেকে তুলে। কোনো কথা না বলে সেও পিছু পিছু উঠে। জমিরুল ডাইনিং রুমে ঢুকেই এক গ্লাস পানি একচুমুকে শেষ করে বেডে গিয়ে শুয়ে পড়ে।
“কি হইছিলো তোমার? এতবার ফোন দিলাম, ধরলা না। কোথায় ছিলা এতরাত?? কি হইছিলো বল??” আবার শুরু করে শিরিনা।
“প্লিজ এখন আর কিছু বলতে বইলো না। ঘুমাতে দাও।”

জোর করে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে জমিরুল। শিরিনাও। দুইজন বিপরীতপাশে ফিরে। শিরিনা ঘুমায়নি। বুঝতে পারে জমিরুল। চুপ থাকতেই ইচ্ছা করছে জমিরুলের। চোখে ভাসছে, ক্ষতবিক্ষত দেহটি। গোঙরানোর আওয়াজ। পুলিশ। ফরেনসিক রিপোর্ট। আর মনে হচ্ছে, কালো কাপড়ে ঢাকা কিছু মানুষ উচ্চস্বরে হাসছে। হেসেই যাচ্ছে। ধ্বনি তীব্র থেকে তীব্রতরও হচ্ছে।

৭.

মন খারাপ নিয়েই বাসা থেকে বের হল জমিরুল। রিক্সা দিয়ে অফিসের দিকে যাচ্ছে। নাজু ম্যামের বাসার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় সে সবসময়ই একবার তাকায়।আজ আর তাকায়নি। ইচ্ছা করছিলো না। শিরিনা নাস্তা রেডি করে বসে ছিল, দুজনে নাস্তা করবে। কৌতুহলী দৃষ্টি ছিল। হয়ত গতরাতের বিষয়টা জানতে চাইত। নাস্তা না করেই চলে আসে । মেয়েটি গতরাতেও হয়ত না খেয়েই থেকেছে। এখনো?? এবার সত্যিই খারাপ লাগে তার। কাজটা ঠিক করেনি।
সৃষ্টিকর্তা কেউকে দুহাত ভরে দেয় আবার কেউকে কিছুই দেন না। হয়ত এভাবেই তিনি ভারসাম্য রাখেন! নাহলে এই শিরিনারই বা কি দোষ ছিল?? না এটা শুধু শিরিনার দোষ না, তার দোষও বটে! আচ্ছা, একে কি দোষের মাঝে অন্তর্ভুক্ত করা যায়?! এতে তো তাদের কোনো হাত নেই। ভাবতে ভাবতে আবারো দীর্ঘশ্বাস পড়ে জমিরুলের।

লাঞ্চব্রেকের দশ মিনিট আগেই অফিস থেকে বেরিয়ে গেল জমিরুল। ক্লাইন্ট অভিযোগ করেছে- গতমাসে তাদের কাছে সেল করা সফটওয়্যারে ইনকন্সিসটেন্ট প্রসেসিং প্রব্লেম দেখা দিয়েছে। জমিরুল এর কোনো সলভ দিতে পারেনি। বস আজ একটু বেশীই কথা শুনিয়েছে। যদিও এর অর্ধেক দায় সহকর্মী মামুনেরও। কিন্তু তাকে ঝারি দেয়াটা বসের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। মাথা নিচু করে শুধু শোনে গেছে। কোনো কথা বলেনি।

মীর জসিমের বাড়িটির সামনে দাঁড়াল জমিরুল। কিছু মানুষের জটলা। মীর জসিমের বাসা আর পাশের বাসার মাঝের অল্প জায়গাটিতে থাকা পেয়ারা গাছটি কেটে ফেলা হচ্ছে। কাটার কারণ, ইতর ছেলেপেলে পেয়ারা গাছে ঢিল মেরে বাসার জানালার গ্লাস ভেঙে ফেলেছে। জমিরুল এখানে কেউকেই দোষী মনে করছে না। অবুঝ ছেলেপেলের পেয়ারা খাওয়ার শখ হতেই পারে, যেহেতু গাছটি বাসার বাইরে ছিল। আবার পজিটিভ এক্সটার্নিলিটির কথাও মনে পড়ছে। মীর জসিম পেয়ারা গাছটি লাগিয়েছিল ভেবে, এটি তাকে ফল দেবে, বাড়ির সৌন্দর্য বাড়াবে। এ গাছ অক্সিজেন তৈরি করবে, কার্বন-ডাই-অক্সাইড খেয়ে পরিবেশ উন্নত করবে। মীর জসিম আর আশেপাশের মানুষের স্বাস্থ্য ভাল রাখবে। যদিও এই এক্সটার্নিলিটি পজিটিভ তবুও এতে মীর জসিমের কোনো লাভ হচ্ছে না। কারণ এই গাছের দ্বারা যারা উপকৃত হচ্ছেন, তারা এর বিনিময়ে তাকে কোনো মূল্য দিতে রাজি না। অর্থনীতির ভাষায়, একে পাবলিক গুড বা, মেরিট গুড বলা হয়। মানে যে জিনিস সবাই চায় কিন্তু কেউ পয়সা দিতে রাজি না।

৮.

কড়া করে একটা চা লাগবে। রুবেলের টং এর উদ্দেশ্যে পা বাড়ায় জমিরুল।

মানুষ কি অদ্ভুতুড়ে! অন্য ভাবনা দোল খায় জমিরুলের মাথায়। রাস্তার ছেলেপেলে একটু না পেয়েরাই খেত, এজন্য গাছটা কাটার কি দরকার ছিল? মীর জসিম গাছ লাগিয়েছে বলে তাকেই খেতে হবে, আর কেউ খেতে পারবে না, এমন তো কোনো কথা নেই। গাছ তো ছিল বাসার বাইরে তাহলে সে ফলের আশা করে কিভাবে? ছেলেপেলে খাওয়াটাই তো স্বাভাবিক। আসলে মানুষ যত পায় ততই চায়! বড়লোকের আকাঙ্ক্ষার কোনো শেষ নেই। পাঁচটি বছর হয়েছে বিয়ে করেছে। তিন-তিনটি সন্তান নষ্ট হল। এরপরও আফসুস হয় না তার, আর একটি গ্লাস ভেঙেছে দেখে পুরো গাছটিই কেটে ফেলা লাগবে?? একটা গ্লাস ভেঙেছে বেশ করেছে। আরো কয়েকটি গ্লাস কেনো ভাঙলো না! রাগে ফসফস করতে থাকে জমিরুল।

রুবেলের দোকানটি বন্ধ। মেজাজ আরো তিরিক্ষি হয়। দোকান বন্ধ কইর‍্যা কই গেছে, রুবেইল্যা মরছে নাকি?! মনেমনে একাই রুবেলকে কয়েকটা গালি দিয়ে দেয় জমিরুল।

সন্ধ্যায় অফিস থেকে বের হল জমিরুল। শরীর মন কোনোটার অবস্থাই ভাল না। ফোনে কার যেনো রিং বাজছে-
– হ্যালো
– কই তুমি?
– রিক্সায়
– কই যাও?
– বাসায় আসছি
– আসো।

কল কাটে শিরিনাই। মনে হয় এখনো কিছু খায়নি। হাহাকার করে উঠে বুকটায়। গতরাত থেকে একটি ভাল কথাও বলেনি বউটার সাথে। এরপরো ঠিকই কল দিয়ে খোঁজ নিল। এমন ধৈর্যময়ী, কোমলমনা সে কমই দেখেছে।

প্রথম বাচ্চাটা নষ্ট হওয়ার পরই ডাক্তার বলেছিল, স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই ডিএনএ গত জটিলতার কারণে বাচ্চা নষ্ট হয়েছে। সাথে যোগ করেছে, আর চেষ্টা করেও লাভ হবে না, নষ্ট হবার সম্ভবনাই বেশী, যদি হয় তবে বাচ্চা সুস্থ হবে না। এরপরেও দুজনই চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিল। দুজন বলতে শিরিনাই চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছে। জমিরুল না করেছিল, দরকার নেই সন্তানের, যদি তোমার কোনো সমস্যা হয়? কথা মানে নি শিরিনা।তার বিশ্বাস ছিল, সৃষ্টিকর্তা হয়ত একটিবার তাদের দিকে তাকাবেন। তৃতীয় সন্তানটির পরিণতিও যখন একই রকম হল, শিরিনা চুপ করে ছিল। একেবারে চুপ। একপাশে মুখ ফিরে ছিল। কারো সাথে কোনো কথা বলে নি। চোখ শুকিয়ে গিয়েছিল। কোনো অশ্রু দেখা যায়নি। আঘাত পেতে পেতে পাথর হয়ে গিয়েছিল। জমিরুল অইদিন অঝোরে কেঁদেছিল, সন্তানের জন্য না। শিরিনার জন্য। সৃষ্টিকর্তা আর কত পরীক্ষা নিবেন মেয়েটির? আর কত??

৯.

ডাইনিংএ একসাথে খাবার শেষে গতরাতের সম্পূর্ণ ঘটনাটিই খুলে বলে জমিরুল। শিরিনার চোখের কোণে পানি। ভূমির টানে অশ্রুবিন্দুটি পড়ার আগেই মুছে দেয় জমিরুল। শিরিনা কোমলমতী। কষ্ট সহ্য করতে পারে না। মেয়েটিকে হয়ত নিজের মাঝেই ধারণ করে কল্পনা করেছে ঘটনাটি, এতে আরো বেশী আবেগী হয়ে যায়।

গভীর রাত। জমিরুল ঘুমুচ্ছে। দিব্যি চোখের পাতা খুলে তাকিয়ে রয়েছে শিরিনা।

পরদিন। লাঞ্চব্রেকের এখনো ত্রিশ মিনিট বাকি। জমিরুল ডেটা ক্যালকুলেশনটা চেক করছিল। নাজু ম্যাম রুমের দরজায় এসে নক করছেন।

-আরে ম্যাম, আসুন।
-কি করছেন?
-এই ফাইলটার ডেটা ক্যালকুলেশনগুলা চেক করছিলাম।
– ওয়েল। আপনি কিছু শুনেছেন?
-ম্যাম, কি শুনবো?
-শুনেননি। বুঝেছি। আমি নিউক্রিড এ জয়েন করছি। আপনি ভাল থাকবেন।

নাজু ম্যাম চলে যাবার পর মনটা মারাত্মক খারাপ হয়ে গেল জমিরুলের। মাথার উপর থেকে ছাতা চলে যাচ্ছে। এই নাজু ম্যামের জন্যই দুবার চাকরি যায় যায় করে রক্ষা পেয়েছিল।

অফিস থেকে দ্রুত বের হয়ে মীর জসিমের বাড়ির সামনে দাঁড়ায়। বাড়িটিকে নানারকম আলোকসজ্জা দিয়ে সাজানো হচ্ছে। আজ অসহ্য লাগছে জমিরুলের। বড়লোক হইলে যা হয়! মানুষ ভাত পায় না, এরা আমোদফূর্তির জন্য কাড়ি কাড়ি টাকা উড়ায়! আল্লাহ এদের উপ্রে গজব পড়ে না কেন! এরকম ভাবনা গিজগিজ করতে থাকে তার মাথায়।

রুবেলের টং এর সামনে গিয়ে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে জমিরুল।

১০.

রুবেলের দোকানটি ভেঙে তছনছ করে দিয়েছে। পাড়ার মাস্তানরা চাঁদা চেয়ে আসছিল। গতকাল দোকান বন্ধ রেখে বেঁচে যাবে ভেবেছিল রুবেল। শেষ রক্ষা হল না। আজ সকালে দশ-বারজনের গ্রুপ এসে দোকানটিকে দুমড়ে মুচড়ে যায়। চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে রুবেলের ডান হাতের কবজিঅব্দি আলাদা করে দেয়। কখনো যেনো আর চা বানাতে না পারে।কেউ প্রতিবাদ করেনি। প্রতিবাদ করারও কিছু ছিলনা। যেই কথা বলবে তারই একই পরিণতি হবে। কে চায় ডেকে এনে নিজের সর্বনাশ করতে?? সর্বনাশ তো সেদিনই হয়ে গেছিল যেদিন এদেশে জন্মগ্রহণ করে। নীতির ঢোল বাজায় নীতিহীনেরা। ন্যায়ের গান গায় অন্যায়ের পৃষ্ঠপোষকেরা। শিক্ষার বুলি আওড়ায় মূর্খেরা। কেউ কেউ চুপ করে দেখে গিয়েছে। কেউ কেউ স্থান পরিত্যাগ করে চলে গিয়েছে। দেখলেও তো বিপদ!

ব্লিডিং এর ফলে ব্লাডব্যাগ লাগানো ডান হাতে ব্যান্ডেজ নিয়ে শুয়ে আছে রুবেল। ঘুমুচ্ছে মনে হয়। বৃদ্ধা মা বারবার চোখ মুছেই চলেছেন। পাশের দোকানিরা সাথে এলাকার মানুষজন রুবেলকে হাসপাতালে ভর্তি করে। চিকিৎসার সকল ব্যয় বহন করেছে মীর জসিম। জমিরুল রুবেলের মায়ের হাতে তিনহাজার টাকা গুঁজে দেয়ার সময়ও লক্ষ্য করে বৃদ্ধার চোখ টলমল করছে। শার্টের হাতা দিয়ে চোখ মুছে জমিরুল।

মাত্রই বিছানায় গা হেলান দিয়েছে জমিরুল। শিরিনা লাইট অফ করে পাশেই শুয়েছে।

কোনোভাবেই ঘুম আসছে না জমিরুলের। ঘুমুতে পারছে না। লেড ওয়াল ক্লকে 01.28.54 বাজে। সাইড চেঞ্জ করে চমকে যায়। শিরিনার চোখ খোলা। সজাগ। সে ভেবেছিল ঘুমিয়ে পড়েছে।
– ঘুমাওনি এখনো??
– তোমাকে একটা কথা বলব ভাবছিলাম
– এত রাতে কি কথা? সকালেও তো বলতে পারবে
– তুমি আরেকটা বিয়ে করো।
– ঘুমাও।।।

চোখের কোণ বেয়ে ভূমির টানে এবার সফলভাবেই পতিত হল অশ্রুকণাটি। জমিরুল দেখতে পায়নি। এক ফোঁটা অশ্রুর সাথে অন্তরের শতফোঁটা রক্তক্ষরণও দেখতে পায় না জমিরুল। জমিরুলের মাথার নিচের বালিশটি ভিজতে শুরু করে।অন্তরের রক্তক্ষরণ বেড়েই যাচ্ছে। মিশে যাচ্ছে নির্লিপ্ততায়, আবেগে, অবহেলায়।


আমাদের উৎসাহিত করুনঃ




সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এই লেখাটি কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয় ।

লেখক সম্পর্কেঃ

বুনন সম্পর্কিত তথ্যঃ