ভয় ও ভয়ংকর

পিচঢালা রাস্তাটি ভিজে চিকচিক করছে। মোটরগাড়ির হেডলাইটের আলো রাস্তায় প্রতিফলনের ফলে বৃষ্টিফোঁটার আপতন প্রকটভাবে দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। দিনের সময় হলে হয়ত মরীচিকা নামের দৃষ্টিভ্রমের দেখা মিলত। কিন্তু এ বিদঘুটে অন্ধকারে সেটা সম্ভব নয়। রাস্তাটির দুপাশে শতবর্ষী প্রকাণ্ডকায় বৃক্ষগুলো মাথানিচু করে হেলে রয়েছে। ব্রিটিশরা যতই শাসন-শোষণ করুক, অন্তত কিছু ভালকাজও করেছেন, অস্বীকার করার উপায় নেই। জিলা স্কুলগুলো, জজ আদালত, কোর্ট বিল্ডিং, প্রাচীন ভার্সিটি-কলেজগুলোর বিভিন্ন বিল্ডিং, হল, জমিদার বাড়িসহ দৃষ্টিনন্দন স্থাপনাগুলোর নির্মাণশৈলী সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। অনেক স্থাপনাই উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে আজ ব্যবহারের অনুপযোগী।

গাড়ির লাইটের আলো ব্যতীত এ অন্ধকার রাতে বৃষ্টির উপস্থিতি বোঝা মুশকিল। মাঝে মাঝে বায়ুপ্রবাহের বেগ হ্রাস-বৃদ্ধির ফলে আষাঢ় মাসেও শীতের অনুভূতি দিয়ে দেহে কম্পনের জাগরণ দিচ্ছে।গাছের ডালপালাগুলোও সাথে তাল মিলিয়ে নাচনভঙ্গী করে চলেছে। যদিও এমন সময় দু তিনটে রিক্সা দেখা যেত। থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে আজ সেটাও নেই। হেঁটে যাওয়া ছাড়া বিকল্প উপায়ও নেই। একা হলে দ্রুত পা চালিয়ে যাওয়া যেত, মান্ধাতার আমলের বাইক নিয়েই যত সমস্যা। বাইকেরও স্টার্ট নিচ্ছে না। রতনের গ্যারেজটিও বন্ধ। টিনের চালের ফুটো দিয়ে পড়া বৃষ্টির পানি আর মাটির মিশ্রণে কাঁদার মাঝে তো আর কাজ করা যায় না। অবশ্য বন্ধ না করেই কি করবে, এদিনে কাস্টমারই তো পাওয়া দুষ্কর। নিম্নবিত্ত শ্রেণীর এ মানুষগুলোরও তো ইচ্ছে করে এমন দিনে কাজের ব্যস্ততাকে ছুটি দিয়ে সঙ্গিনীকে নিয়ে সময় কাটাতে। এ আদিম যুগের বাইক বিক্রি করে যে নতুন বাইকের চিন্তা করবো, সে রাস্তাও একেবারে বন্ধ। বাইকের আউটলুক দেখেই কেউ কিনতে চায় না। প্রায় এক যুগের সম্পর্কে অন্যরকম মায়াও ধরে গিয়েছে।এক যুগ বললে ভুল হবে, দুই যুগেরও বেশী সময়ের ফলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বাইকটিও অন্তর্ভুক্ত হয়ে গিয়েছে।

বাতাসে কুকুরের ধ্বনি ভেসে আসছে। এরা যখন কোনো অশরীরী কিছু দেখে তখনই আওয়াজের তীক্ষ্ণতা বেড়ে যায়। মানুষ দেখতে পায় না, তাই হয়ত অশান্তির মাত্রা তুলনামূলক কম। নানি বলেছিল, একবার কাঁচা ঘুমের মাঝে অশরীরী উনার কপালে হাত রেখেছিল। উনি হাতটি ধরতে গেলেই হাতের স্পর্শ চলে যায়। আমার নানি খুব সাহসী ছিলেন। একাই পুরো সংসার টেনে নিয়ে গেছেন। নানা সহজ-সরলগোছের, সংসারের ঝামেলা থেকে সবসময় দূরে থাকতেই পছন্দ করতেন। এতগুলো সন্তান লালনপালন, ধানিজমিগুলোর দেখাশোনা সকলদিক দেখভাল করার গুরুদায়িত্ব সামলানোর জন্য কঠোর মনের অধিকারিণী না হয়েও সম্ভব ছিল না।

চুলগুলো ভিজে ফোঁটায় ফোঁটায় কাঁধে পানি পড়ছে। শার্টও ভিজেছে হয়ত। সারাদিনের কর্মব্যস্ততার পর সাথে যন্ত্র টানার বিন্দু ইচ্ছে করছে না। পুরো এরিয়াতেই ইলেক্ট্রিসিটি নেই। ল্যাম্পপোস্টগুলো মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

সারারাস্তায় মানুষ তো দূরে থাক, একটা কাক-পক্ষীও নেই। ভুতুড়ে পরিবেশ। দোকানপাটগুলোও বন্ধ। এই রোডের কয়েকটি সমস্যার মাঝে একটি হল, এদিকে কোনো ঘরবাড়ির হদিস পাওয়া যায় না। মিল-কারখানা, একটি মার্কেট ( রাত ৯টা বাজার পূর্বেই বন্ধ হয়ে যায়), কিছু দোকানপাট এইত এগুলোই। রাস্তার দুপাশে প্রকাণ্ডকায় বৃক্ষ।

ছয়টি চোখ জ্বলজ্বল করছে। প্রথমে ভয় পেয়ে নিজেকে সামলে উঠি। এগুলোর ডাকই শোনা যাচ্ছিল। দুটি আমার দিকে ফিরে ঘেউঘেউ করছে, আর একটি মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে শিমুল গাছের দিকে মুখ করে ডেকে চলছে । শিমুল গাছের দিকে তাকালাম।

গাছে ঠেস দিয়ে কেউ একজন বসে রয়েছে। হেডলাইটটি ঘুরিয়ে অবয়বটির উপর আলোর প্রতিফলন ঘটাতেই –

একটি লাশ। মাথাবিচ্ছিন্ন লাশ। লালচে রক্তেমাখা শরীর।

আআআআ আ আ আ আ”……..[nextpage title=”পর্ব ২”]

মাংকি ক্যাপ পড়া দুজন কাছে এসে দাঁড়ালো। একে অপরকে চোখে ইশারা দিয়েই আমার দুহাত টেনে ধরল। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে বস্তাবন্দী করে মুখ আটকে দিল। প্রশ্বাস-নিশ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে। পঁচা বোটকা গন্ধ। বস্তায় আঠালো কিছু ছিল যা গায়ে লেগে গন্ধের তীব্রতা বেড়ে যাচ্ছে। ওরা কোথাও আমাকে নিয়ে যাচ্ছে। চোখগুলো কোনোদিন দেখিনি। সেই পরিচিত ডাক। মাংকি ক্যাপ পড়া দুজন বস্তার মুখ খুলে আমাকে ছুড়ে মারল। মাথা গিয়ে সজোরে একটা গাছে ধাক্কা লাগে। মনে হচ্ছে স্কালে ফ্রেকচার হয়ে গেছে। বহুকষ্টে চোখের পাপড়ি মেলি। সেই গাছ। সেই শিমুল গাছ। দুজন এসে সজোরে আমার হাত দুটো আঁকড়ে ধরে গাছের সাথে যুক্ত করে। আমি খুব জোরে চিৎকার করছি। কিন্তু কোনো আওয়াজ বের হচ্ছে না। হঠাৎ অন্ধকার থেকে কেউ একজন বেরিয়ে আসছে। এইত কয়েকঘন্টা আগের সেই মাথাবিচ্ছিন্ন লাশটি। একটি ল্যাম্পপোস্ট জ্বলে উঠলো। দেহটির গলা দিয়ে টপটপ করে রক্ত ঝরছে। লালচে রক্ত। হাতে চাইনিজ কুড়াল। শরীরের সমস্ত শক্তি জোরো করে চিৎকার দিচ্ছি। কেউ শুনছে না। আমার দিকেই আসছে। কুকুরগুলোর চিৎকার। তীক্ষ্ণতা বাড়ছে। বেড়েই চলছে। হেডলেস দেহটি সামনে এসে কুড়ালটি উপরে তুলল…

“নাআআআআ আ আ আ আ আ আ আ”

উঠে বসে পড়লাম। ঘাম ঝরছে। ঘামে ভিজে একাকার। মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা। মনে হচ্ছে রুমটি ঘুরছে। প্রচন্ডভাবে বুক ধড়ফড় করছে। গলা শুকিয়ে গেছে। চোখ বন্ধ। কানে বাজছে কুকুরগুলোর চিৎকার। চোখে ভাসছে মাংকি ক্যাপ পরিহিত চারটি চোখ। গলা থেকে বেয়ে পড়ছে রক্ত, লালচে রক্ত।

পঞ্চাশোর্ধ পিয়ন চাচা আজ আমার উপর একটু বেশীই বিরক্ত। এই নিয়ে তৃতীয়বার কফি আনলো। মাথা ব্যথা অথবা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকলে অইদিন একটু বেশীই কফির প্রয়োজন পড়ে। আজ দুটোই ধরেছে। ডেস্কে একগাদা ফাইলের স্তূপ। মাথার ফ্রন্টাল সাইডে ব্যথা। ছুটি নেয়াও সম্ভব না। লাঞ্চব্রেকের এখনো পনেরমিনিট বাকি। অনলাইনের নিউজে চোখ আটকে গেল,

“পিরোজপুর সদরে হরিনা এলাকায় অজ্ঞাত এক ব্যক্তির মাথা কাটা লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
আজ (রবিবার)ভোরে উপজেলার হরিণা এলাকায় ওই ব্যক্তির লাশ পাওয়া যায় বলে সদর থানার ওসি মোঃ আলাল উদ্দিন জানান।
তিনি বলেন, দুপুরে হরিণা এলাকায় মাথা কাটা একটি লাশ দেখতে পেয়ে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেয়। পরে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে। লাশ থেকে ১২০ গজ দূরে খুলি উদ্ধার করা হয়।
অজ্ঞাত ব্যক্তির নাম বিনয় কর্মকার। পেশায় সুইপার।বাড়ি রাজশাহীর নওহাটা গ্রামে। তার প্যান্টের পকেটের আইডি দেখে বিষয়টি নিশ্চিত করে পুলিশ।”

লাঞ্চব্রেকে অফিস থেকে বাইকটি নিয়ে রতনের গ্যারেজের দিকে পা বাড়ালাম। ভাঙা হেডলাইট। টায়ার পাঞ্চার। স্টার্ট নিচ্ছে না। এসকল সমস্যার সমাধানের জন্য অত্র এলাকায় রতনের চেয়ে ভাল মেকানিক পাওয়া দুষ্কর। বয়স খুব বেশী না। বেশী হলেও চব্বিশ-পঁচিশ হবে হয়ত। মিশুক স্বভাবের। তবে ভীষণ রগচটা। দুমাস হল বিয়ে করেছে। বিয়ের কয়েকদিন পর আমাকে বলেছিলো “স্যার বউডা চান্দের লাহান সুন্দর”, সাথে মুচকি হাসি। পৈত্রিকসূত্রে এ পেশায় আশা। বাবা হাশেম মিয়ার দেয়া গ্যারেজটি এখন ছেলের আয়-উপার্জনের উৎস। রতন জন্মের এক বছরের মাঝেই মাকে হারায়। বড়ভাই ও তাঁর বউ-বাচ্চা,বৃদ্ধ বাবা আর সদ্য বিবাহিতা বউ নিয়ে অভাবের সংসার। কোনোভাবে টেনেটুনে যতটুকু চলা যায়। গ্যারেজ থেকে রতনের বাড়ি প্রায় চল্লিশ মিনিটের পথ, ক্ষেতের আইল ধরে, গ্রামের কাঁচা-পাকা রাস্তা ধরে যেতে হয়।

গ্যারেজের জংধরা টিন ও ঘুনেধরা কাঠের দরজারটি চাপানো। ভিতরে কেউ আছে কিনা বুঝে উঠতে সমস্যা হচ্ছিল, তাই নামধরে ডাক দিলাম। দরজার ফাঁক দিয়ে কে জেনো উঁকি মেরে আবার চলে যায়। মিনিট পাঁচেক পর রতন বেরিয়ে আসলো।
“ও স্যার, আফনে?”
” বাইকটি স্টার্ট নিচ্ছে না, টায়ার পাঞ্চার আর…”

কথা শেষের আগেই কথার মাঝে রতন বলে উঠলো,

“স্যার, আইজক্যা এট্টু সমস্যা। বাড়িত যাওন লাগব তাড়াতাড়ি। আইন্নে বাইক রাইখ্যা যাইন, আমি কাইল ঠিক কইর‍্যা রাখমু নে”

“আমার যে আজই দরকার ছিল”

“আজকে পারুম না স্যার। এম্নেই বউডারে….। ভিতরে রাইখ্যা যাইন। কাইলক্যা লইয়্যা যায়েন স্যার।”

রতনের কথামত বাইকটি গ্যারেজের ভিতরে রেখে আসলাম। রতনের কথা ধরে বসে থাকলে নিজেরই ক্ষতি কারণ অত্র এলাকায় মাইল দেড়েকের মাঝে কোনো মোটর মেকানিকের দোকান নেই। রতন স্বভাবে রগচটা হলেও কাজে পটু।[nextpage title=”পর্ব ৩”]

হরিনায় যে একটিমাত্র মার্কেট সেটিও এ বাড়ি থেকে মিনিট পঞ্চাশের পথ। রিক্সা করে রওনা দিলাম। তখনই প্রায় চারটা বাজে। মার্কেটের কাছেই একটা ভাতের হোটেল রয়েছে। হোটেলটি বিখ্যাত এর পনেরো পদের ভর্তা-ভাজি পরিবেশনের জন্য। একসাথে কয়েকটি কাজের জন্য মার্কেটের উদ্দেশ্যে যাওয়া বলা যায়। ফোনের চার্জ শূন্য হয়ে ফোন সাট ডাউন হয়েছে অফিসেই।মার্কেট থেকে দশ টাকায় একঘন্টা চার্জ করে নেয়া যাবে। এই সময়ে হোটেলটিতে খাওয়াদাওয়ার কাজটিও হয়ে যাবে। যাওয়ার পথে একটা টর্চ লাইট কিনে নিয়ে যাওয়া লাগবে। অহ, আর দুটি ফোন নাম্বার সংগ্রহ করার প্রয়োজন পড়বে।

খাবার পরিবেশনে দেড়ি করায় এক ঘন্টার জায়গায় দেড় ঘন্টা লেগে যায় মার্কেটেই।

প্রায় সাতটার দিকে রিক্সা দিয়ে অফিসের অভিমুখে যাত্রা করলাম। হাতে সদ্যকেনা টর্চলাইট আর পকেটে ফুলচার্জ ফোন। যেভাবে চাচ্ছি সবকিছু সেভাবেই এগুচ্ছে। যখন অফিসে পৌঁছেছি তখন বাজে ৮:১০। বস আর ক্যাশিয়ার ছাড়া অফিস ফাঁকা। পিয়ন আর দারোয়ান আছে। লাঞ্চের পর এতক্ষণ না থাকার জন্য পুরোদিনের বেতন কাটার হুমকিসহ ঝাড়ি সবকিছুই হজম করলাম। বস একবার বলেছিল, সদর থানার ওসি উনার পরিচিত।

রাত ১০টা বেজে ১৩ মিনিট।

সাধারণত এই সময়ে হরিনায় ইলেক্ট্রিসিটি থাকে না। বৃষ্টির ছিটেফোঁটা পাওয়া গেলে তো কথাই নেই। বাইকটি আজ রতনের গ্যারেজে। অনেকটা খালি খালি লাগার কথা। কিন্তু কোনো অনুভূতি কাজ করছে না। গা ছমছমে পরিবেশ। জনমানবশূন্য। কোনো বৃষ্টিপাতের লক্ষণ নেই। তবে বাতাস বইছে। এই সময়টাতে বৃষ্টিপাত সম্পর্কে কিছু অনুমান করা যায় না। সৃষ্টিকর্তার যখন ইচ্ছে তখনই প্রকৃতি হুকুম মানতে বাধ্য।

শিমুল গাছটির কাছে আসতেই ঝড়ো বাতাস বইতে শুরু করলো। শিমুল গাছটির পাশে দিয়ে দু-তিনটি ধানক্ষেতের পরই ঘন জঙ্গল। কেউ একজন দৌড়াচ্ছে। টর্চ জ্বালাতেই, দৌড়ে পালাচ্ছে। অন্ধকারে মিশে যাচ্ছে। জংগলের দিকে। পকেট থেকে ফোন বের করেই কানে ধরলাম। টর্চলাইটে অবয়বটি আর দেখা যাচ্ছে না। দৌড়াতে লাগলাম, জঙ্গলের দিকে। কুকুরের চিৎকার শুনতে পাচ্ছি। সৃষ্টিকর্তার নাম নিয়ে দ্বিগুণ বেগে দৌড়োচ্ছি। মেয়েলী গলায় বিকট চিৎকার। এরপর শশানের নিস্তব্ধতা। শুধু কুকুরগুলোর আর্তনাদধ্বনি কানে আসছে। কোনোকিছুর সাথে ধাক্কা লেগে ছিটকে পড়লাম। টর্চটিও ছিটকে দূরে পড়লো। ডান পা অবশ হয়ে যাচ্ছে, নাড়াতে পাচ্ছি না। উঠে দাঁড়ানোর শক্তি নেই। হয়ত আর রেশমাকে বাঁচাতে পারলাম না।

দুহাতে ভর দিয়ে উঠবো, এমন সময় একজন সজোরে মুখে লাথি মারল। রক্তচলাচল হয়ত বন্ধ হয়ে গিয়েছে। সারাদেহ অবশ হয়ে যাচ্ছে। দুহাত ধরে দুজন টেনে চলছে। চোখ খুলতে পারছি না। অনুভব করছি। কিছুক্ষণ টানার পর ছুড়ে মারে। সজোরে মাথা গিয়ে ধাক্কা লাগে একটি গাছে। স্কালের ফ্রন্টাল সাইডে প্রচন্ড ব্যথা। দুজন আমার দুহাত শক্তি দিয়ে গাছটির সাথে টেনে ধরে আছে। মনে হচ্ছে কুকুরগুলো খুব কাছেই আর্তনাদ করছে। অসহায় আর্তনাদ। সজোরে আরেকটি মাথায় আঘাত…..

চোখ মেলে দেখি অনেকগুলো চোখ আমায় ঘিরে রয়েছে। নিজেকে আবিষ্কার করলাম বেডে। হাসপাতালের বেডে। পা ব্যান্ডেজ। নার্স হাতে ইনজেকশন পুশ করছে। মাথায় ব্যান্ডেজ। সারাদেহে ব্যথা। বাম দিকে ওসি মোঃ আলাল উদ্দিন। পুলিশের ইউনিফর্ম পড়া আরো কয়েকজন। অফিসের বস। কলিগরা। মুখে উদ্বেগ।

চোখ খোলা দেখে ওসি আলাল উদ্দিন কাছে এসে বলল,

কনগ্রাচুলেশন্স ইয়ং ম্যান। ইউ ডিড ইট ভেরি ওয়েল। বাট উই আর রিয়েলি ভেরি মাচ ওরিড। তুমি সুস্থ হও এরপর একটা সাক্ষাৎকারের দরকার আছে।

মাথায় প্রচন্ড ব্যথা। গলায় জোর দিয়ে বললাম, না, স্যার। আমি একটু আড়ালে থাকতে চাই।

-অকে। নো প্রব্লেম। তোমার কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। আগে সুস্থ হউ। সব শুনবো। নাউ টেক রেস্ট।

বলে আলাল উদ্দিন স্যার চলে গেলেন।

দুই দিন পর-

সকালে হাসপাতাল থেকে রিলিজ দেয়। বাসায় শুয়ে আছি। বস নিজেই দুসপ্তাহের ছুটি দেন। বুয়া রান্না করছে। কলিংবেল বেজে উঠলো। বুয়া দরজা খুলে দেয়। সকালে রিলিজ হওয়ার খবর শুনে ওসি আলাল উদ্দিন বাসার ঠিকানা নেয়, আসবেন বলেছিলেন।

-এখন কেমন আছ, ইয়ং ম্যান?

-এইত স্যার, আগের চেয়ে অনেকটা ভাল।

-কথা বলতে সমস্যা হচ্ছে না তো??

-না স্যার। এখন আর সমস্যা হচ্ছে না। বুয়া চা-নাস্তা দিয়ে যাও।

-চা নাস্তা পরে। আমি একটা বিষয় এখনো বুঝতে পারছি না, তুমি বুঝলে কিভাবে যে এরাই সেই হিন্দুটাকে খুন করেছে?

-স্যার, শিমুল গাছটির নিচে বিনয় কর্মকারের মাথাবিচ্ছিন্ন লাশ পাওয়া যায়। ভোরে আপনারা লাশ উদ্ধার করেন। সেদিন সকালেই আমি অফিসে যাওয়ার পূর্ব মুহুর্তে সেই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় গাছটির নিচে একটি ছেঁড়া পকেট দেখি। তখনই আমার সন্দেহ হয়েছিল পকেটটি বোধহয় খুনিদের কারো, ধস্তাধস্তির সময় ছিঁড়ে গিয়েছিল। অইদিনই দুপুরে রতনের গ্যারেজে যাই বাইক রিপেয়ারিংয়ের জন্য। গ্যারেজের জং ধরা দরজাটি চাপানো ছিল। ভিতরে কিছু হচ্ছিল। তাই কেউ একজন জং ধরা দরজার ছিদ্র দিয়ে উঁকি দিয়ে চলে যায়। তাঁরা প্রায় পাঁচ মিনিট সময় নেয় জিনিসপাতি সরানোর জন্য। দ্রুত সরানোর কাজ করেছিলো, তাই কিছু জিনিস সরাতে খেয়াল করেনি।
বাইকটি রেখে আসার জন্য গ্যারেজের ভিতরে প্রবেশ করতেই পঁচা বোটকা গন্ধ পাই। চমকে উঠি যখন দেখি সেই বস্তাটি যেটি গ্যারেজের কোণায় পড়ে আছে। বস্তার জায়গায় জায়গায় রক্তের ছোপ। বিনয়কে প্রথমে বস্তাবন্দি করেই পিটানো হয়।হয়ত কয়েকটি চাপাতির কোপও পড়ে। গ্যারেজে একটি ছেলে দেখি যাকে এই এলাকায় আগে কখনো দেখিনি। আর রতনের বড় ভাই ছিল, যার শার্টের পকেটটি নেই। পকেটের জায়গায় কিছু সুতা বের হয়ে আছে। ফুল-পাতা প্রিন্টের শার্টের পকেটটিই আমি সকালে শিমুল গাছতল থেকে পেয়েছি। রতন খালি গায়ে লুঙ্গীপড়া। অচেনা ছেলেটির সাদা গেঞ্জিটি ভেজা। ভালভাবে ধোয়নি। তাই জায়গায় জায়গায় হালকা লালছোপ। কলারে লালরক্ত স্পষ্ট দৃশ্যমান। আর প্রথম থেকেই রতনের কথায় তাড়াহুড়ো এবং এক পর্যায়ে “বউ” নিয়ে কি বলতে চেয়েও থেমে যায় তখনও সন্দেহ হয়েছিল।

কিন্তু বিনয়কে কেনোই বা এরা খুন করলো? বিনয় সুইপার, বাড়ি রাজশাহী। কৌতুহলী প্রশ্ন ওসি স্যারের।

আমার মনেও এই প্রশ্ন জেগেছিল স্যার। সবকিছু ক্লিয়ার হয়ে গেল যখন রতনের গ্যারেজ থেকে সরাসরি রতনের বাড়ি যাই। বাড়িতে শুধু রতনের বউ রেহানা ছিল, রতনের বৃদ্ধ বাবা ঘুমুচ্ছিলেন। রতনের বড় ভাই গতকাল সকালেই তাঁর বউকে বাচ্চাসহ বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। বাড়ির উঠোনে ফুঁপিয়ে কাঁদতে দেখি রেহানাকে। অপরিচিত দেখে নিজেকে আড়াল করতে চেষ্টা করে রেহানা। আমার পরিচয় দিয়েও রেহানার চোখে-মুখে আতংক আর সন্দেহের ভাব দেখে বড় ভাই এবং পরম শুভাকাঙ্ক্ষী যোগ করে আশ্বস্ত করি।

রেহানা বলা শুরু করল। বিনয়ের সাথে রেহানার প্রায় দুইবছরের সম্পর্ক পরিবারে জানাজানি হলে জোরপূর্বক দূরসম্পর্কের আত্মীয় রতনের সাথে বিয়ে দিয়ে দেয়। রতনের পরিবার যেদিন রেহানাকে দেখতে যায়, সেদিনই অল্প সময়ের মাঝেই বিয়ে কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়। গরীব হয়ে জন্মালে ভালবাসা তো দূরে থাক সেটা চিন্তায় আনাও যে পাপ সেটা এই নিম্নবিত্ত শ্রেণীর মেয়েটি ভালভাবেই বুঝেছিল। যদি হয় ভিন্ন ধর্মের, তবে তো কথাই নেই। সেখানে ভালবাসার পরিবর্তে গ্লানিই প্রাপ্তি হয়। বিয়ের পর বিনয় বাড়ির ঠিকানা জোগাড় করে গতমাসে একবার এসেছিল। রতনের পরিবার উত্তম-মধ্যম দিয়ে বিদায় করে। এবার যখন দ্বিতীয়বারের মত বিনয়কে রতন দেখে, তাদের খুনের পরিকল্পনার কথা ঘুনাক্ষরেও ভাবেনি রেহানা। খুন হওয়ার পর সে শুনতে পায়।

– ভেরি স্যাড। প্যাথেটিক। তবে রেহানার ব্যাপারটা?

– স্যার, বিনয়ের খুন হওয়ার ঘটনা জেনে পুলিশকে বলে দেয়ার হুমকি দিয়েছিল রেহানা। এর কিছুক্ষণ পরই রতন বাড়ি থেকে বের হয়। রেহানা আমার কাছে সাহায্য চেয়েছিল। রেহানার মুখ বন্ধ করতেই রাতেই রেহানাকে মেরে ফেলার প্রস্তুতি নিতে পারে বলে আমার সন্দেহ হয়েছিল। রতনের বাড়ির সাথে যেহেতু প্রতিবেশীদের বাড়িও আছে তাই কাজটি নির্জনে করার জন্য বিনয়ের খুনের জায়গাটিকেই তারা বেছে নিবে বলে আমার মনে হয়েছিল।

– পুরো ঘটনাটি এখন ক্লিয়ার। আর এটা জানাতেই তুমি অইদিন রাত ৮:৩০টায় আমাকে ফোন দিয়ে থানায় এসেছিলে, আর তোমার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমরা রতন, তার বড় ভাই ও সহযোগী আনোয়ারকেও হাতেনাতে এরেস্ট করতে সক্ষম হই। চায়ে চুমুক দিতে দিতে বললেন বাদশাহি গোঁফওয়ালা ওসি স্যার।

-জ্বী। বসের মুখে আপনার প্রশংসা শুনেছি। আর আপনি আব্বার স্কুলফ্রেন্ড এটা জানলে আমি আরো আগেই আপনার সাথে কন্টাক্ট করতাম।

– তোমার সাহায্য না হলে এই কালপ্রিটদের ধরা কষ্টসাধ্য হয়ে যেতো। ওয়েলডান, ইয়ং ডিটেকটিভ। একদিন সময় নিয়ে অফিসে এসো। চাও খাওয়া যাবে, গল্পও করা হবে। এখন আমি উঠি। টেক কেয়ার মাই বয়।

-অকে স্যার। সুস্থ হয়ে আসব। ভাল থাকবেন।

আলালউদ্দিন স্যার চলে গেলেন। জানালা দিয়ে আকাশ দেখছি। মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। বিষন্ন আকাশ। চোখদুটো বুজে আসছে ঘুমে। চিৎকার। ধস্তাধস্তি। তিনটি কুকুর ডাকছে। রেহানার ফুঁপিয়ে কান্না। গোঙরানির শব্দ। মাথায় সজোরে আঘাত। শিমুল গাছতলা। মেয়েলী কন্ঠে চিৎকার। গাছের সাথে দুহাত টেনে ধরা। কুকুরগুলোর কান্না। ল্যাম্পপোস্টের জ্বলে উঠা। বুক ধড়ফড়ানি। অন্ধকার থেকে আসছে।সেই মাথাবিচ্ছিন্ন লাশ। হাতে চাইনিজ কুড়াল। গলা বেয়ে টপটপ করে রক্ত পড়ছে। লালচে রক্ত। আমার দিকেই আসছে। কুকুরগুলোর আওয়াজের তীক্ষ্ণতা বাড়ছে। বেড়েই চলছে। হেডলেস দেহটি সামনে এসে কুড়ালটি উপরে তুলল..

“নাআআআআআ


আমাদের উৎসাহিত করুনঃ




সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এই লেখাটি কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয় ।

লেখক সম্পর্কেঃ

বুনন সম্পর্কিত তথ্যঃ