এক চিলতে হাসি

অনেক দিন পর গ্রামে আসলাম। গ্রামের বাড়িটা খুব পুরাতন। শুনেছি আমার দাদু নিজের শখের বশে বাড়িটা গড়েছেন। শখের জিনিস যেমন হয় বাড়িটাও তেমনি। তখনকার সময় উনি নাকি জমিদারের মত বেশ প্রভাবশালী ছিলেন। গ্রামের সাধারন মানুষরাও তাকে দেবতার মত দেখতেন। কিন্তু দাদুর মৃত্যুর কারনটা সবার কাছে ছিলো অজানা আর আশ্চর্যের।

দাদুর বই পড়ার শখ ছিলো। শখের বশে তিনি এই বিশাল বাড়ির এক কোনে একটা লাইব্রেরী গড়ে তুলেন। সেখানে প্রায় চার-পাঁচশ দুঃষ্প্রাপ্য বই রেখেছেন। দাদুর শখ দেখে আমি অবাক আবার গর্বিতও। সেই সময় বই গুলো কিভাবে যে উনি কালেক্ট করতেন ভেবে অবাক লাগে। এই পুরো বাড়িতে লাইব্রেরীটা আলাদা একটা সৌন্দর্য্য ধারন করে রেখেছে। রুমটাতে ঢুকলেই যেটা প্রথম চোখে পড়ে সেটা হল তেল রঙ্গে আঁকা দাদুর বিশাল বড় একটা ছবি। দাদু একটা কালো চেয়ারে বসে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছেন। চেয়ারটা এখনো আছে আমার রুমে। চেয়ারটাতে আমার কেন যেন বসতে সাহস হয় না। কেন যেন ইচ্ছে হলো চেয়ারটা লাইব্রেরীর জানালার পাশটায় রাখলে খুব মানাতো। ভেবে রাখলাম সকালে মাখন দাদুকে দিয়ে চেয়ারটা লাইব্রেরীতে এনে রাখবো। আর নিজের জন্য একটা চেয়ার নিয়ে আসতে হবে। এখান বসে পড়ার মাঝে একটা নির্জনতা আর মুগ্ধতা পাওয়া যাবে। সন্ধ্যায় খাটে হেলান দিয়ে একটা শিশুতোষ বই হাতে নিয়ে পড়ছি। সচরাচর এই বই গুলো পড়া হয় না। দাদুর বিশাল বই ভান্ডারে দেখলাম তাই পড়া। খুব ভালো লাগছিলো। লেখকটার বাচ্চাদের মন বুঝার ক্ষমতা অসাধারন বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রায় একশ এগার পৃষ্ঠার শেষ পর্যন্ত এসে হঠাৎ অবাক হলাম, এত ধৈর্য্য ধরে কখনো পড়িনি, আর টানা এতটুকু পড়ার অভিজ্ঞতা এই প্রথম। বলতেই হয় লেখক পেরেছেন বটে।

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম রাত একটা বেজে এগার। গ্রামের নির্জনতা আর ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক গভীর রাতের সৌন্দর্যকে যেন শত গুন বাড়িয়ে দেয়। হাতের বইটা নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। নিজের অজান্তেই দাদুর চেয়ারটার দিকে চোখ চলে গেল। মোমের আলোতে চেয়ারটা চকচক করছে। এখনো চেয়ারটা নতুনের মত।বলার অপেক্ষা রাখে না মাখন দাদু চেয়ারটার অনেক যত্ন করেন। মাখন দাদু নাকি আমার দাদুর বিশ্বস্ত কর্মচারী ছিলেন। আমাদের পরিবার শহরে উঠার সময় মাখন দাদুকে অনেকবার আমাদের সাথে যেতে বলেছিলো বাবা, কিন্তু দাদু যান নি। মোমবাতি গুলো প্রায় নিভে আসছে। হাতের বইটা চেয়ারে রেখে একটা মোম নিয়ে জ্বালিয়ে দিলাম। খুব ইচ্ছে করছে বারান্দায় গিয়ে মৃদু সুরে গান গাইতে। কিন্তু এত রাত! নাহ, কোন এক অদৃশ্য ইচ্ছা আমাকে বারান্দায় নিয়ে গেল। স্নিগ্ধ জোৎস্নার আলো যেন তার সবটা দিয়ে পুরো বাড়িটাকে আলোকিত করে রেখেছে। বাড়িটার এত সৌন্দর্য্য দিনের বেলায় চোখেই পড়ে না। গলা থেকে মিহি কিন্তু গম্ভীর সুর বের হল। আমার মনে হচ্ছে গলাটা আমার না। অন্য কেউ হবে। রাতের নিস্তব্ধতার সাথে গানটা কেমন যেন মায়া জাল বিস্তার করছে। বাড়ির সামনের ফুল বাগানটায় জোনাকি গুলো যেন সুরের তালে তালে নৃত্য প্রদর্শন করছে। বাড়ির ডানের বাগানে ফোঁটা হাসনাহেনা ফুলের মিষ্টি গন্ধ যেন মোহিত করছে পুরো বাড়ি।

হঠাৎ আমার গান থেমে গেল। সাথে সাথেই আরেকটা গুন গুন আওয়াজ শুনলাম। এটা নারী কন্ঠ। খুব মিষ্টি আর মায়াময়। মোহিতের মত যেন আমার শরীরটা শব্দের সন্ধানে ছুটতে লাগলো। নিজেকে ইচ্ছে করেও ধরে রাখতে পারছি না। দেখতে দেখতে ছাদে চলে আসলাম। ছাদের দক্ষিন কোনার রেলিং এর উপর একটা মেয়ে বসে বসে নিজ মনে গান গেয়েই চলছে। মেয়েটার চুল রেলিঙ্গের গোড়া পর্যন্ত ছুঁই ছুঁই। এত লম্বা চুল আমি দেখিনি কখনো। আবার আমার শরীর চলতে শুরু করলো মেয়েটার কাছে যেতেই ঘুরে তাকালো মেয়েটা। অপরুপা সে, মনে হয় যেন স্বর্গের অপ্সরী। কোনদিন অপ্সরী দেখিনি ঠিকই। কিন্তু আমি হলফ করে বলতে পারি এই মেয়ে তার চেয়ে কোন অংশে কম না। ঠোঁটের কোনায় মেয়েটার এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো। খুব কম লোকই পারে এত সুন্দর করে হাসতে। আমার শরীর আবার নড়ে উঠলো। কেন যেন নে হলো আমার পালে ঘামের বিন্দু জমে উঠেছে। আমার হাত দুটো হঠাৎ করেই মেয়েটাকে একটা ধাক্কা দিলো। আর সাথে সাথেই চারদিকে আবার শুনশান নিরবতা। ছাদ থেকে তাকিয়ে দেখলাম নিচে পড়ে থাকা নিথর মেয়েটাকে। চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখলাম মেয়েটার ঠোঁটের সেই ভুবন ভোলানো হাসি।

-ছোট বাবু, এই ছোট বাবু, সেই কখন থেকে ডাকছি উঠছেনই না। এত ঘুমালে হবে?

অনেকদিন পর এখানে আসলেন কোথায় একটু ঘুরে-টুরে দেখবেন তা না দুপুর পর্যন্ত ঘুমাচ্ছেন।উঠুন তো। উঠে চা-টা খেয়ে নিন। এরপর আপনাকে গ্রামটা ঘুরে দেখাবো। চোখ ঘষতে ঘষতে উঠে বসলাম। কিন্তু রাতে কি যেন স্বপ্নে দেখেছি ঠিক মনে করতে পারছি না। মাখন দাদুর কথায় আবার হুশ ফিরলো

-ছোট বাবু কিছু খুঁজছেন? লাগবে কিছু?

-না, তুমি যাও আমি আসছি।

-ঠিক আছে।

নাশতা শেষ করার পর আর ঘুরতে যাওয়া হলো না। দাদুর লাইব্রেরীতে চেয়ারটা এনে রাখলাম আর নিজের জন্য একটা আনলাম। লাইব্রেরী ঘরের কর্ণারের আলমিরা থেকে একটা বই বের করতে পাশের বই গুলো একটু ফাঁক করতেই একটা কাগজ পেলাম। যাতে লেখা

“রাতে ছাদে এসো। আমি তোমার অপেক্ষায় থাকবো।”

গোটা গোটা হাতের মেয়েলি লেখা। যদিয়ো তখন মেয়েরা তেমন শিক্ষিত ছিলো না। কিন্তু মাখন দাদুর কাছে শুনেছি আমাদের ঘরে নাকি দু জন মেয়ে পড়ালেখা পারতো। দাদু নাকি তাদের শিখিয়ে ছিলো। চিঠিটা নিজের কাছে রেখে দিলাম। বিকেলে খবর এলো বাবা খুব অসুস্থ, আমি যেন দ্রুত ফিরে যাই। সন্ধ্যায় সবকিছু গুছিয়ে রওনা দিলাম। ফিরে আসার সময় মাখন দাদু থেকে যা যা জানলাম তা অনেকটা এমন..

“দাদু আমার ঠাকুরমা আর একটা মেয়েকে পড়ালেখা শিখাতেন শখের বশে। মেয়েটার নাম রাখী। যেমন দেখতে সুন্দরী তেমনি তার গানের গলা। দাদু মাঝে মাঝে ঐ মেয়ের কাছ থেকে গান শিখতেন। হঠাৎ এক রাতে মেয়েটা ছাদ থেকে পড়ে আত্মহত্যা করে। এর দুদিন পর আমার দাদুও ঠিক একই জায়গায় পড়ে আত্মহত্যা করেন।”

আমি বাসে উঠে অনেকবার মোবাইলের আলোতে চিঠিটা পড়লাম যেটা ঐ আলমিরাতে পেয়েছি। চিঠিটাতে লক্ষ করলাম লেখা “১১১”. এর মানে বুঝলাম না। ভাবতে ভাবতে চোখে ঘুম জড়িয়ে এলো। স্বপ্নে দেখতে লাগলাম কে যেন আমাকে বলছে

“প্রথম ১ তুমি, পরেরটা আমি, শেষটা বলে হি হি করে হাসতে লাগলো। হাসিটা যেন খুব চেনা। হ্যাঁ চেনাই তো।”

একটা ঝাকুনিতে ঘুম ভেঙ্গে গেলো। বাড়ি ফেরার পর প্রায় রাতেই স্বপ্নে সেই নারী মূর্তিকে দেখি অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। ঠোঁটের কোনায় সেই  হাসিটা।

মায়াময় হাসিটা…


পাঠটিকে একটি রেটিং দিনঃ
খুব খারাপ, পাঠটিকে ১ রেটিং দিনখারাপ, পাঠটিকে ২ রেটিং দিনমোটামুটি, পাঠটিকে ৩ রেটিং দিনভাল, পাঠটিকে ৪ রেটিং দিনআসাধারন, পাঠটিকে ৫ রেটিং দিন (টি ভোট, গড়ে: এ ৫.০০)
Loading...

আমাদের উৎসাহিত করুনঃ




সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এই লেখাটি কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয় ।

লেখক সম্পর্কেঃ উৎপল আচার্য্য

নাম: উৎপল আচার্য্য জন্মতারিখ : ০১/০৯/১৯৯৬
বুনন সম্পর্কিত তথ্যঃ 0000-00-00 00:00:00 তারিখ নিবন্ধিত হয়েছিলেন, এই পর্যন্ত প্রকাশিত লেখা সংখ্যা 11টি, মোট 0 পয়েন্ট সংগ্রহ করে [mycred_my_ranking user_id=16] অবস্থানে আছেন।
সংগঠন ও গোষ্ঠীঃ লেখক কোন সংগঠন বা গোষ্ঠী এর সদস্য নন

আপনার ভাল লাগতে পারে

avatar
  
smilegrinwinkmrgreenneutraltwistedarrowshockunamusedcooleviloopsrazzrollcryeeklolmadsadexclamationquestionideahmmbegwhewchucklesillyenvyshutmouth
Photo and Image Files
 
 
 
Audio and Video Files
 
 
 
Other File Types
 
 
 
1 আলোচনা
0 আলোচনায় উত্তরগুলো
0 অনুসরন করেছেন
 
সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়া
আলোচিত মতামত
1 মতামত প্রদানকারী
শাশ্বত ভৌমিক সাম্প্রতিক মতামত প্রদানকারী
শাশ্বত ভৌমিক
সদস্য

খুব ভাল লেগেছে ভাই।।