রেবু ধলা

ট্রেনের হুইসেলটা সবসময়ই ওর কাছে মাছির ভনভনের মত লাগে। হাতটা দিয়ে নাড়া দিলে দু-এক সেকেন্ডের বিরতি দিয়ে আবার নাকের আগায় বসে যেমন ঠিক তেমন। নিজের কাজে ব্যস্ত থাকলে কখন যে এই বিছার মত যন্ত্রটা আসে আর যায় খেয়ালই থাকেনা ওর। আধা হাত দুরত্বে দাড়িয়ে ও ওর কাজ করে আর ট্রেনগুলোও তার হিসাব বরাবর রাখে। নো ইন্টারফেয়ার। পেট উদোম করে উস্কোখুস্কো চুল নিয়ে

চটের ইকটু ফাঁক দিয়ে শরীরটাকে বের করে আনে রেবু ধলা। অভ্যাস। গত চার বছরের দরকারি অভ্যাস। টুথ পেষ্টের ফেনা হালকা ইকটু গড়িয়ে পড়ে চিবুক বেয়ে। সকালের মেল ট্রেনের যাত্রীগুলো হয়তো রেবুকে প্রতি সকালেই এই সময়টাই এভাবে দেখে। রেবুর একচুল খেয়াল হয়না ওদিকে। সে চার বছর আগেই প্রথম বেখেয়াল হয়েছিল এই ইয়াবড় বাজারে। এখানে তখন উত্তেজনা ছিল। আশেপাশে মাছ- সব্জির বিকট পঁচা গন্ধ প্রথম কয়েক দিন ওর সহ্য হয়নি। ধীরে ধীরে মানিয়ে নিয়েছিল রেবু। রেবুর স্বামী তখন সবজির ট্রাকের আনলোডার। বেশ টাকা আসতো তখন। কারওয়ান বাজার ছিল তাদের সুখের চাবিকাঠি।

তারও আগে রেবু থাকত তাদের গ্রামে। মেঘে জলে ভিজে মায়ের কাছে। সরলরেখার মত খুব সোজা হয়ে। কিন্তু রেবুন্নেসা এখন রেবু ধলা। ধলা মানে ফর্সা। তার নামের শেষে তার গায়ের রং যুক্ত হয়েছে । সবাই এই নামেই তাকে ডাকে। চারবছরে রেবু ধলা ধীরে ধীরে উজ্জ্বলতাই কেবল হারিয়েছে। কিন্তু বাড়িয়েছে একটা জিনিস- সাহস আর বুদ্ধির জোর। রেবুর শরীর সুন্দর। আগে আরো মোহনীয় ছিল। যখন ওর স্বামী ট্রাক থেমে সব্জি নামিয়ে ঔই চটের ঘরে আসতো। রেবু তখন সুন্দরী ছিল। এই চারবছরে রেবু সেই কমনীয়তা হারিয়েছে।

রেবু এখন মুহূর্তে পাল্টাতে পারে নিজেকে। এই রেল লাইনের বাসিন্দা হওয়ার ব্যকরণ সে অনেক আগেই মুখস্ত করে রেখেছে। এখানকার ময়লা আবর্জনাসম্বলিত অংক সে ভালো জানে। এখানে সে মানুষের কণ্ঠস্বর চেনে। তুচ্ছ ক্ষতির ব্যাপারেও প্রতিবাদে তাপশালী সিংহী হয়ে যায়।

এই পর্যন্ত প্রায় ত্রিশ চল্লিশবার থানায় গেছে ত্রিশ বয়সের এই রেবু। বিভিন্ন কারণ সেগুলোর। ইদানিং একটু অনিয়ম হচ্ছে এতে। টাকা দিলেই হয়ে যায়।

হালিম বৈরাগী রেবু ধলার বিজনেস পার্টনার। সে রেবুর চালান গুরু। দু বছরের পরিচিত। বর্ডারে কারিশমা ভাল তার। মাল কনফার্ম করে নিরাপদভাবে। লোকটা ষাটোর্ধ। স্বামী ওকে ছেড়ে যাওয়ার পর কাদঁতে কাঁদতে এই বৈরাগীর কাছেই এসেছিল রেবু।

রেবু তাই বিক্রির ব্যপারটা দেখে। বৈরাগি কুটিল স্বভাবের হলেও চরিত্রবান। বৈরাগি রেবু ধলা কে আশ্রয় দিয়েছে। স্বামী পরিত্যাক্তা হয়েও ও নিশ্চয়তা পেয়েছে খাবারের, নিজের সম্ভ্রমের। হোক না সেটা অল্পকদিনের জন্য। বৈরাগী তো চাচার মতই যতটুকু পেরেছে সেই দুঃসময়ে কুটিল শহরের থাবা থেকে এই রেবুকে রক্ষা করেছে। বেশ কয়েক মাসের জন্য হলেও ………………………

রেবু ধলা বৈরাগীর দেখাশোনায় শহর কে আরো বুঝতে থাকে। স্বামীদের সুরত কেমন হয়, স্বভাব কেমন হয়, তাদের মুহূর্তে পল্টি নেওয়ার নির্দয় পাঠের বিশ্লেষণ করতে থাকে। তখন সবে মাত্র এই শহরে তার মাস তিনেক হয়েছে। স্বামী বকুল মিয়া তাকে তুচ্ছ কারণে সেইদিন সকালে এভাবে মারল, আর বলছিল- ‘শইলডা কি বানাইছস এই কয় দিনেই, কিমুন আনছিলাম আর কিমুন দেহায় তরে, দেখ।’

রেবু কাদঁছিল অসহায়ের মত। বুকের খাচাঁর একটি হাড় বোধ হয় সেদিন ফেটে গিয়েছিল। সারারাত ককিয়েছে বেচারি। চামড়ার মুখের তালাক শব্দটির এত শক্ত আঘাত! রেবুর শুধু কলিজাটা ফেড়েফুড়ে যাচ্ছিল কষ্টে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ অমূলক। পাতলা শরীর নিয়ে সে কয়েক মাস আগে স্বামী সহ ঢাকায় এসেছে। এখন একটু নাদুস-নুদুস ভাব এসেছে তার শরীরে। আড়তের লোকজন হাতমুখ ধুতে গেলে হয়তো রান্নারত রেবুকে একটু দেখে। হয়তো রেবুর অন্যমনস্কতায় ওকে একটু লোভনীয় লাগে। স্বামী বকুলের জন্য চোখে একটু কাজল মাখলে বকুল নিজেই ওকে মারত । বলতো-

‘শহরের রং শইললে লাগছে নারে। হালা আমি হারাদিন বলদের মত মাল নামাই আর আমার জিনিস অন্য কেউ নামায়া লইয়া যায়।’ রেবুর বুক ফাটে। স্বামীকে কিভাবে বোঝায় যে সে ভুলেও কোন অপরাধ করছে না বরং যে পরিমাণ সুখ বকুল তার স্বামী হিসেবে বরাদ্দ দিয়েছে তা-ই যথেষ্ট।

তালাক পাওয়ার পর রেবু কারওয়ান বাজার ছাড়ে। দু-একদিন পর রেবু আবার ফিরে আসে। ফিরে আসে হালিম বৈরাগীর কাছে। বৈরাগীর বউ জুমেলা চাচী ওকে অনেক ভাল জানত। পাষন্ড বকুল কে অভিশাপ দেয় সে। বলে- চরিত্র যাগো নড়বড়ে, হে রা বউগুলারেই সন্দহ করে`

হালিম বৈরাগী মদ বেচে দুধ খায় টাইপের লোক। তাই ভরণপোষনের জন্য বাড়তি এই নতুন খরচ যোগাতে সে রেবুকে একটা কাজ দেয়। আনলোডের সময় ট্রাক থেকে পড়ে যাওয়া সবজিগুলো সে কুড়াবে এবং রেল লাইনের পাশে বসে বিক্রি করবে।

ভাল ও লাভজনক। রেবুর আনন্দ লাগে। আনন্দ আরেকটা কারনেও লাগে। বকুল নামের মীরজাফরটা এই কাওরান বাজারে থাকে না। ওকে তালাকের ঘটনায় কয়েকজন মিলে উত্তম মধ্যম দিয়ে বের করে দিয়েছে। রেবুর কাছে আর কোন জায়গা নেই সেই কীটের । রেবু পাখির মত স্বাধীন এখন। হালিম বৈরাগী এখানে ত্রাণকর্তার ভুমিকায় এসেছে। রেবু তাই হালিম চাচার কথা অক্ষরে অক্ষরে শুনে। গ্রামে টাকা পাঠাতে , নিজের জীবন আবার গোছাতে , সম্ভ্রম রক্ষায় সংগ্রামে নামতে ছবক দিচ্ছে হালিম চাচা। তার মেয়ে শিরিনের মত যেন রেবুও মরে না যায় আত্বগ্লানিতে। হালিম চাচার চোখে মুখে সে কষ্ট। রেবু তাই শিরিনের জায়গাটায় আছে।

রেবু তখনও ধলা নামটা পায় নি। ধলা নামটা তাকে দেয় এক ট্রাক ড্রাইভার। অনেকগুলো বেগুন সে ঐ ট্রাক থেকে কুড়িয়ে পেয়েছে। সে যখন মাটি থেকে বেগুন গুলো কুড়াচ্ছিল তখন ঐ ড্রাইভার ওর কাছে আসে। বলে-

‘অত ধলা শইল নিয়া ছেমড়ি খোলা ময়দানে আইছো ক্যাঁ? যাও অন্য কাম কর গিয়া। ’ বাজারের আরো ক`জন ঐ মুহুর্তে ড্রাইভারের কথাটা শুনে। একটা পরিচিত লোডার বলে ওঠে- রেবু ধলা! সেই প্রথম রব টা উঠে। রেবু ধলা। ফর্সা রেবু। ভুল জায়গায় ভুল গায়ের রং।

রেবুর সবজি বেচার জায়গাটা হালিম বৈরাগীর ঘরের বেশ খানিকটা দুরে। বিশ গজের মত দুরে। ভোর থেকে শুরু করে দুপুর পর্যন্ত সবজি কুড়ায় আর নাওয়া খাওয়া শেষে বিকেলের দিকে বেচতে শুরু করে। প্রতিদিন টাকা আসে। কিছু টাকা বৈরাগীকে দেয়, কিছু টাকা গ্রামে পাঠায়। রেবু ধলার আর তেমন কোন স্বাদ আহ্লাদ নেই । ফাঁক পেলে টিভিতে সিনেমা দেখা ছাড়া আনন্দ বিলাস তার তেমন নেই।

আরেকটু আনন্দ দেয় দীপু। সবজি বিক্রির সময় সে রেবুর কাছে মাঝে মাঝে আসে। বয়সে রেবুর অনেক ছোট হবে। বয়স বড়জোর বছর পনের। বেশ মিষ্টি চেহারা। দাড়ি গোঁফ উকি দিয়েছে দলবল নিয়ে। বেচাকেনার ফাঁকে গল্প করে রেবু ধলা। ওর ও একটা ছোটভাই আছে গ্রামে। ওরই মতো। হালিম বৈরাগী অবশ্য ব্যপারটা জানে। সদ্য স্বামী পরিত্যাক্তা একটা মেয়ে । রেবু কে সে সাবধান করে দিয়েছে। বলেছে-

‘কারো সাথে গল্প করবা না, শুধু টাকারে চেনার চেষ্টা করবা। টেকা তুমারে বিশ্বাস কিইনা দিব, সন্দেহ তাড়াইয়া দিব, টেকা বাদে এই ভেজাল তল্লাটে আর কাউরে বিশ্বাস কইরো না মা’

রেবু কথাটা বিশ্বাস করে। সাথে দীপুকেও অবিশ্বাস করে না। রেবু ধলা ভাবে ছোট মানুষদের কোন ভয় নেই। বলুক চাচা। দীপু ওর সবজি গুলো বিক্রিতে সাহায্য করে। এটা ওটা গল্প করে। ফেলে আসা গ্রামের গল্প, পুকুরের গল্প, মেলার গল্প। কত কি!

সন্ধ্যার মধ্যেই রেবুর সব সবজি বিক্রি শেষ হয়ে যায় সাধারণত। কোন কোন দিন দেরি হয় যেদিন অনেক কালেকশন হয় অথবা দীপু এসে সাহায্য না করে। চাচী এসে রেবুকে নিয়ে যায়। তারও আগে দীপু ফিরে যায়। দীপুর বাপ মা নেই। শহরের অন্য কোথাও হয়তো তারা থাকে । দীপু তাই এখানে ওখানে সমবয়সীদের নিয়ে আড্ডা দেয়।

এখানেও আড্ডার ফাকেঁ ফাকেঁ আলুর পচাঁকাটাঁ অংশটুকু বাদ দিয়ে বাকি অংশটুকু, থেতলে যাওয়া ফুলকপি, ফেটে যাওয়া বেগুন আর টমেটো- লাউ সব বিক্রি হয়ে যায়। রেবু ধলার ক্রেতা ভাগ্য ভাল বলা যাবে না তবে ওর হাসিভাগ্য ভাল। ভাল হোক আর মন্দ সব কথাতেই ও একটা হাসি জুড়ে দেয়। এটা অনিচ্ছাকৃত। সাথে দীপু বিক্রি আরো এগিয়ে নেয়। ছেলেটাকে যদিও রেবু ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। কথায় -ইশারায় সে ও বেশ হাসে।

‘আইচ্ছা, ধলাপা, একটা কথা কমু।’

আমিও সবজি টুকামু তোমার লগে।

রেবু দীপুর দিকে তাকায়। খুব বেশি সে অবাক হয়নি। তবে হালিম চাচা যে এই বেচাকেনা সামলায় এটা দীপু জানে। আর মেয়ে মানুষ হয়ে যে লেফট ওভার সে কুড়ায় এটা ঠিক দীপুকে সে বলেনি। একটু লজ্জাজনক ভাবত সেটা। কিছু না ভেবেই রেবু বলে-

‘গেলে যাবি । সমস্যা নাই । কিন্তু তোর বাকি দোস্ত গুলারে আনিস না। ওরা কেমনে কেমনে তাকায় আমার দিকে । ভাল লাগে না।’

‘কি কও আপা? ওরা এমুন না।’

‘তুই বুঝবি না , আমি মেয়ে মানুষ আমি বুঝি’

‘তুই ওগোরে কিছু কইসনা, তয় এদিকে আমি বেচনের সময় যাতে না আহে’

দীপু কি যেন ভাবে । সামনে দিয়ে চলে যায় জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস। সিলেটের ট্রেন । রেবু আর দীপু বসে থাকে। আজকে তেমন কিছুই বিক্রি হয়নি। একটা লাউ আর এক কেজি ফাটা ধুন্দল। আলু ,ফুলকপি গুলো তখনও রয়ে গেছে। অন্য দিন হলে এই জয়ন্তিকার যাওয়ার সময়ে রেবু চট গুছিয়ে ফেলে। আজ একটু সময় লাগছে। রেবুর শরীরটাও তেমন ভাল যাচ্ছেনা। দিনদিন ওর হাসি উবে যাচ্ছে যেন। স্বামী চলে গেছে বেশ কয়েক মাস হলো। দিন খারাপ হচ্ছে আরো। গ্রাম থেকে চাপ আসছে ফিরে যাওয়ার। কত দুর্ভাবনা। হালিম চাচার কথাও ভাবতে হয়। ভাল মানুষ। টাকা রোজগারের পথ দিয়েছে সে। সেও পায় চাচাও পায়।

মুনাফা এলে ভাল লাগে। সংগ্রাম করতে আনন্দ লাগে

রেবু সেটা বুঝে। বুঝে বলেই এখানে নানান রাক্ষস-খোক্কসের সাথে টিকে থাকার লড়াইয়ে নেমে গেছে সে। এ এক অন্য রকম লড়াই।

রেবুর কিছু টাকা জমে গেছে এই কয়দিনে। সাথে লড়াইটাও।

দীপু কে রেবু নিষেধ করেছে যাতে ওর বন্ধু দের ঐ ব্যাপারে কিছু না বলে। দীপুও কিছুই বলি নি। তবে ব্যাপারটা নিয়ে দীপু বেশ ভাবে। বন্ধুদের দিকে একটু আড়চোখে তাকায়। রেবু ধলার প্রসংগ তুলে ওদের চেহারার দিকে খেয়াল করে। ও কিছুই বুঝতে পারে না। ফলে সে আড্ডায় মজে যায়। কমলাপুর থেকে তেজগাঁও ট্রেনের ছাদের উপর দিয়ে দৌড়াদৌড়ি করে। ট্রেন থেকে নেমে আলমের টং দোকানে বসে ঢাকাই মাস্তান নামের সিনেমা দেখে। বিকালের দিকে সদলবলে বিড়ি খেতে খেতে সরগরম করে ফেলে রেললাইন। সবাই ওদের দিকে তাকিয়ে থাকে। পনের থেকে কুড়ি বছরের এই পাচঁ ছ-টা ছেলে এমন কোন হেন কাজ নাই যে করে না। কিন্ত দীপু একটু আলাদা । বিড়ি খুব কম টানে। চুপচাপ থাকে। চেহারায় কোমলতা আর মায়া এখনো উধাও হয় নি।

একদিন দীপু চুপিচুপি রেবু ধলার সাথে ট্রাক স্ট্যান্ডে যায়। সকাল বেলা। ভোরের পর একটু সময় পার হয়েছে মাত্র। সূর্য্য এফডিসি বিল্ডিং এর মাথার উপর দিয়ে উঠার চেষ্টা চালাচ্ছে। রেললাইনের পাশের চটঘরগুলোর বেড়ার উপর লাল লাল আলো ছড়াচ্ছে ক্রমশঃ। তারই পেছনে ইকটু ঢালুতে ট্রাকের সারি । দুপুর রাত থেকে আন্তঃজেলা ট্রাক গুলো নানান রকম মাছ-শাক-সবজি-মশলাসহ চাল ডাল তেল নুন বহনকারী ট্রাক গুলো এসে জড়ো হয়। ট্রাকের লেজে ট্রাক লেগে থাকে। লোডার রা চোখের পলকে এক ট্রাক আনলোড করে আরেক ট্রাকে হাত দেয়। আর এই দ্রুত কাজ করতে গিয়ে পড়ে যায় কিছু মাল। আর তা-ই কুড়িয়ে নেয় রেবুর মত অনেকেই। দীপু ঐদিন রেবুকে অনুসরণ করে। রেবু কিভাবে প্রতিযোগিতা করে সবজি কুড়ায়। লোডার দের তীরচক্ষু থেকে নিজেকে কখনোই যে বাচাঁতে পারে না তাও সে বুঝতে পারে । এক খাঁচি সবজি জড়ো করতে রেবু কে দশ-পনেরটা ট্রাক গুণতে হয়।

দীপু সব দেখে। ট্রাক ড্রাইভারদের কটুক্তি যে নতুন নয় তাও সে বুঝতে পারে। দীপু ফিরে আসে সেদিন। রেবু কিছুই টের পায় না।

বিকালে দীপু রেবু কে বোঝানোর চেষ্টা করে। বলে –

‘ধলাপা, তুমি একটা চৌকি কিন্না ফালাও। তুমি দোকানটা বড় কর। আমি অহনতে বমু। আমারে বেতন দেওন লাগবো না। ওগোর সাথে ঘুরতে আমার ভাল্লাগে না। জান ধলাপা, ওরা না অহনি গান্জা খায়। মাইয়াগোরে দেখলে বাজে কথা কয়। আমার এগুলা ভাল্লাগেনা। আমি তোমার দোহানে বমু। তুমি চৌকির উপরে দোহানডা বড়ো কইরা দেও’। তাছাড়া তুমি মাল টুকানের সময় অনেক কথা হোন হেইডাও আমার ভাল্লাগেনা। বৈরাগী খালি তোমারে খাডাইতাজে । তুমি বুঝতাছনা।

রেবু ধলা অবাক হয়। দীপু এত কিছু জানবে কেন? অথবা এত কিছুতে নাক গলাবে কেন? হালিম চাচার নামে এরকম বলবে কেন? এত কিসের ওর অধিকার ? রেবুর একটু রাগ লাগে। কিন্তু একটু পর মনটা ভালো ও হয়ে যায়। দীপু বলছে যে ও আর বিড়ি সিগারেট খাবে না। তারপর ওরা যে বখে গেছে এটাও যে সে বুঝেছে ভাবতে রেবুর ভাল লাগছে। রেবু অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর দীপুকে বলে-

‘আইচ্চা যা দীপু তর কথা হুনমু তবে হালিম চাচার লগে আগে কথা কয়া লই। বুদ্ধিডা খারাপ দেস নাই একদম’

‘হ, ধলাপা। তোমার ও তো জীবনডা পইড়া আছে। হেইডা ভাবো না?

রেবু ভাবে একটা চৌকি কিনবে। খাচিঁ ভর্তি একদম ফ্রেশ সবজি কিনবে আড়ত থেকে। পাকা ব্যবসায়ী হবে। আর সে টোকাই হবে না। এমনিতেই নানান কথা বলে মানুষজন। হঠাত করে সেই দিনাজপুরের ট্রাক ড্রাইভারের কথা মনে পড়ে রেবুর। সুন্দরী মেয়েলোক হয়ে কারওয়ান বাজারের মত কঠিন জায়গায়

টিকে থাকা জলভাত নয় মোটেও।

রেবু পরামর্শ নেবার জন্য প্রস্তুত হয়। হালিম চাচার কাছে সে জানতে চায় সবজির দোকান বিষয়ে। চৌকি কিনে বড়সড় একটা দোকানের চেষ্টা করা যায় কিনা এ ব্যাপারে।

চাচা অনেক্ষণ চুপচাপ বসে থাকেন। কিন্তু রেবু ধলা আবার জানতে চায়-

হালিম চাচা নিচুস্বরে বলেন-

‘বেচলে ভাল কিছু বেচ মা। আমি বর্ডারেত্তে আইনা দিমু। তুমি খালি বেচবা। তয় তুমি এখন যেমন আছ তারচে বেশি নিরাপদে থাকবা।’

কথা শুনে রেবু থমকে যায়। চাচা কি আনবো বর্ডার দিয়া? দীপুর বন্ধুরা যেইডা খায়, হেগিলা! আমি এইগুলা বেচুম! রেবু ভাবে। ভেবে খুশি হয়। ভাবে তার সংগ্রামের কথা। প্রতারক কাপুরুষ বকুলের কথা ভাবে। ফর্সা মুখের ভেতরে দলা থুথু জমে।

‘আমি রাজি চাচা। চাচীরে আমার লগে রাখুমনে। ভাল অইবো।’

হালিম বৈরাগী খুশি হয়।

কারওয়ান বাজার সুনসান। রাত চারটা। রেল লাইনের লাগোয়া ঘরগুলোতে আলো নিভে গেছে। বেওয়ারিশ সারমেয়র দল এদিক ওদিক খাবার শুঁকে যাচ্ছে। রেবু জেগে আছে। হালিম চাচা পাশের ঘরে ঘুমে অচেতন। রেবু অনেক কিছু ভাবছে। আজকে বিকালে উপকুল এক্সপ্রেসে আসা চালানটা প্যাকেট করতে হবে। এদিকে হালিম চাচা কিছু টাকা চেয়েছে। আরো বড় চালান আনবে নাকি। বর্ডারে খরচ আছে তার । বছর তিন আগে চৌকিতে সব্জির দোকানের কথাও তার মনে পড়ে। মনে পড়তে পড়তে দীপুর কথাও মনে পড়ে। ওর বখাটে বন্ধু-বান্ধব হয়ে বকুল টকুল সহ সবার কথা! এ এক অদ্ভুদ ভাবনার জালে আটকে পড়ে রেবু। আচমকা এতকিছু কেন মনে পড়ছে তার বুঝে উঠতে পারে না। ট্রেন আসার হুইসেল ভেসে আসে তখন। ট্রেনটা ঠিক মালিবাগ আছে। হুইসেল দেয়ার আনুমানিক দুরত্ব হয়তো। রেবু ভাবে। রেবু মোমবাতি জ্বালায়। একটা -দুইটা করে প্যাকেট করতে থাকে। গত তিনবছর ধরে এই একই কাজ করে আসছে রেবু। চোখ বুজে করে ফেলার মত কাজ হয়ে গেছে এটি…

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

আমাদের উৎসাহিত করুনঃ




সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এই লেখাটি কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয় ।

লেখক সম্পর্কেঃ

বুনন সম্পর্কিত তথ্যঃ