গলা জবো

গল্পটা বলবো কিনা এটা নিয়ে অনেক দ্বিধা দন্দে ছিলাম। কেননা এই গল্পটা আমি এভাবে জনগনকে জানিয়ে দিয়েছি এটা জানতে পারলে আলু ভাই যে কি মনে করবে সেটাই
ভাবনার বিষয়। আলু ভাই মানে আমাদের আলমগির ভাই। কিন্তু ভেবে দেখলাম তার মত উদার খোলা মনের মানুষরা এইসব সাধারণ বিষয়ে বিষেশ রাগ করেন না। তাই গল্পটা
বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

আলু ভাই শুনেই গোলগাল গাব্দাগোবদা একজন মানুষের চেহেরা মনে ভেসে উঠছে নিশ্চই আপনাদের, উনি কিন্তু মোটেই তা নন, বরং তাকে শুকনো বলতে কোনই বাধা নেই। জীবনে অনেক চড়াইৎরাই পেরিয়ে উনি এখন গাইবান্ধা
শিল্পকলা একাডেমীতে সাউন্ড অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পড়া শুনাও চালিয়ে যাচ্ছেন। সব সময়ই একটা আধ্যাত্মিক জগতে থাকেন, মানে দার্শনিকের
মত কথা বলেন। আমাদের মেসের অন্যতম হাসিখুশি মানুষ। মেসের সবাই ওনার সাথে
ঠাট্টা মশকারা করে, উনি কিছু মনে করেন না।
আমি টুকটাক লেখালেখি করি এই জন্যে
আমার সাথে খুবই ভালো বন্ধুত্ব। যদিও তাকে
ভাই বলেই সম্বোধন করি আমি। ভুমিকা অনেক
হলো, অবশ্য তার দরকারও ছিল। যা হোক এখন
মুল গল্পটা বলি।

সেদিন রাতে আমি আর ইমতিয়াজ মেসের
ছাদে বসে গল্প করছি। আমাদের মেসটা নিয়ে
ভৌতিক কিছু রটনা আছে। তা নিয়ে কথা
বলতে বলতে ভুতের গল্প শুরু হয়ে গেল, এমন সময়
আলু ভাই আসলেন ছাদে, কিছুক্ষণ চুপচাপ
আমাদের গল্প শুনলেন, তারপর আমতাআমতা
করে বললেন
“একটা ঘটনার কথা কইতে চাইতেছিলাম, কিন্তু
তোমরা আবার আমারে ভিতু বলবা তাই বলতে
সাহস হয়না।”
আমি বললাম
“কি যে বলেন রে ভাই, আপনার মত বড় মাপের
মানুষরে ভিতু বলবো সেইরকম নির্বোধ আমরা
না, কি ঘটনা বলেন শুনি।”
উনি আরো কিছুক্ষণ আমতাআমতা করলেন,
অতঃপর আমাদের জোড়াজুরিতে ঘটনা বলতে
শুরু করলেন

“গতবার রমজান মাসের ঘটনা, মনে আছে
তোমাদের, তোমরা সবাই ২৬ রোজায় বাড়ি
চইলা গেলা, শিল্পকলায় ২৭ রমজানে একটা
প্রোগ্রাম আছিলো জন্যে আমি গেলামনা,
সেই ২৬ রোজার রাইতের ঘটনা। তোমরাতো
সবাই দুপুরে চইলা গেলা, আমি ইফতার করলাম
হোটেলে, একেবারে তারাবির নামাজ পইরা,
সেহেরীর জন্য খাবার দাবার কিনা নিয়া
আইসা, মেসের গেটে ভালো কইরা তালা
দিয়ে রুমে আইসা ঢুকলাম। ইউটিউবে গান শুনতে
শুনতে কখন যে রাইত সারে বারোটা বাজছে
খেয়াল করি নাই, হঠাৎ শুনি জানালায় একটু
পরপর ঠুংঠাং শব্দ হইতেছে, অনেক ক্ষন চুপ
কইরা খেয়াল করলাম, শব্দটা কখনো আস্তে হয়
আবার কখনো জোরে, কিন্তু শব্দটা যে কিসের
তা ধরতে পারলাম না। বুক আমার ধুকপুক শুরু
করছে বুঝতেছিলাম, আল্লা রাসুলের নাম
নিয়া অনেক সাহস কইরা জানালা খুললাম,
কিন্তু কই কিছুইতো নাই। কিছুক্ষণ জানালার
সামনে দাঁড়ায় থাকলাম, ঐ জানালার
কাছেতো গাছও নাই যে গাছের ডাল
জানালায় লাইগা শব্দ হবে। ভাবলাম এইটা
আমার মনের ভুল। জানালা বন্ধ কইরা যেই
বিছানায় গিয়া বসছি, তখনই তোমার রুম থাইকা
কার জানি হাসির শব্দ শুনলাম, মনে হইলো
মেয়ে কন্ঠের হাসি। তোমার রুম আর আমার
রুমের তো একটা ভেন্টিলেটর আছে, সেইটা
দিয়া শব্দ আসতেছে, কিছু মনে কইরো না আমি
ভাবছিলাম তুমি বুঝি মেস ফাকা পাইয়া কোন
মেয়ে নিয়া আসছো তোমার রুমে।”
এইখানে আলু ভাইকে থামায়া আমি বললাম
“এইটা কি বলেন ভাই, এতদিন থেকে আপনার
সাথে পরিচয়, আপনি আমারে এমন ভাবতে
পারলেন!”
আলু ভাই ভিষন বিব্রত হয়ে বললেন
“না না, রাগ কইরো না, আরে তখন ঐটা ছাড়া
মাথায় আর কিছু আসে নাই।”
আমি বললাম
“ঠিক আছে আপনি গল্প শেষ করেন”
উনি আবার বলতে শুরু করলেন
“তখন আমি রুম থাইকা বের হয়ে তোমার রুমের
সামনে গেলাম, রুম বাহির থেকে তালা দেয়া,
লাইট বন্ধ, দরজায় কান পেতে শুনলাম কোন
আওয়াজ নাই, অনেক্ষন দাঁড়ায় থেকেও কিছু
শুনতে না পেয়ে আবার রুমে আসল, ভাবলাম
মাথাটা বোধহয় কাজ করছেনা ঠিকঠাক,
ভালোমত ঘুম দরকার। রুমের লাইট বন্ধ করে শুয়ে
পরলাম। আর তখনি একটা ফ্যাসফ্যাসে মেয়ে
কন্ঠে কে যেন আমার নাম ধরে ডাক দিলো,
চমকে বিছানায় উইঠা বসলাম, আবার সেই
ফ্যাসফ্যাসে গলা ‘আ-ল-ম-গি-র’!
আমার গলা দিয়ে কোন মতে একটু আওয়াজ বের
হলো
‘কে?’
সেই কন্ঠটা বলে উঠলো
‘আমি মিনা, অনেকদিন কারো সাথে কথা
কইতে পারিনি গো, এই নিস্তব্ধ রাতে
তোমারে একা পেয়ে মনের কথা আমার
কষ্টের কথা বলতে ইচ্ছা করছে গো’
বলেই বিশ্রী ভাবে হেসে উঠলো কন্ঠটা।
আমি মনের সব জোর এক করে জিজ্ঞাস
করলাম ‘কি কষ্ট?’
কন্ঠটা বলে উঠলো
‘গলা জবোর কষ্টগো’
গলা জবো যে কি আমি বুঝতে পারলাম না,
ভয়ের সাথে সাথে ভিষন কৌতহলও হলো,
জিজ্ঞাস করলাম
‘গলা জবো মানে? আমি বুঝতেছিনা’
তখন কন্ঠটা বললো
‘আজ থেকে অনেক বছর আগে আমার স্বামি
আমাকে এইখানে, এই ঘরে, আমার গলা কেটে
দিয়েছিল। মধ্যরাতে যখন সমস্ত কিছু নিশ্চুপ
ছিল, তখন সে চকচকে ছুরি দিয়ে আমার গলা
কেটে দিয়েছিল, আমি গলা কাটা মুরগির মত
ছটফট করে করে মরে গিয়েছিলাম এই ঘরে।’
আমি বিছানায় কাঠ হয়ে বসে কথা গুলা
শুনতেছিলাম, কাঠ হয়েই বসে থাকলাম, মুখ
দিয়ে কথা বাইর হইলোনা। কন্ঠটা আবার বলে
উঠলো,
‘তোমরা অনেক মানুষ এখানে থাকো, তাই
এখানে আমি ঠিকমত চলেফিরে বেরাতে
পারিনাগো, আজ থেকে কয়েকদিন শান্তি
করে বেরাবো, তুমি এখন ঘর থেকে বের হবেনা,
সেহরি খেয়ে ফজরের আজান দিলে তবে বের
হয়ে মসজিদে যাবে নামাজে, তার আগে বের
হবেনা, মনে রেখ আ-ল-ম-গি-র, মনে রেখো।’
তারপর কিছুক্ষন সব চুপ। তারপর ফজর পর্যন্ত
কিছুক্ষণ পরপর নুপুরের রুনুঝুনু শব্দ শুনতে
পেয়েছি আমি। কি যে রাত গেছে ভাবতেও
গায়ে কাটা দিয়া উঠে। ফজরের আজান
দেয়ার সাথেই সব ঠিকঠাক। সকালে উঠেই সব
গোছায় নিয়া শিল্পকলায় চলে গেছি, সন্ধ্যায়
প্রোগ্রাম শেষ করে বাড়ি চলে গেছি। মেসে
আসছি ঈদের অনেক পরে যখন সবাই আসছে”
গল্প শেষ করে আলু ভাই থামলেন, দেখলাম
ওনার কপাল ঘামে ভিজে উঠছে। আমি বললাম
“বড় বাচা বাইচা গেছেন ভাই, এমন হবে
জানলে কি আপ্নারে একলা রাইখা যাইতাম,
যা হওয়ার হইছে, ভুইলা যান।”
উনি আধ্যাত্মিক ভাবে বললেন
“চাইলেই কি সব ভুলা যায়রে ভাই, যাইহোক
রাত মেলা হইছে ঘুমাই গিয়া, সকালে ওফিস
আছে, তোমরা ঘুমাইবানা?”
আমি বললাম
“আমাদের ঘুমাইতে দেরি আছে ভাই,
সাহিত্যিকের তো রাইতের নির্জনতাই পছন্দ
বেশি, আপনি ঘুমান গিয়া”
আলু ভাই ধীর পায়ে নেমে গেলেন ছাদ
থেকে। উনি নামার কিছুক্ষন পরে আমি আকাশ
বাতাস কাপিয়ে হো হো করে হেসে উঠলাম,
হাসি আর থামতেই চায়না, ইমতিয়াজ বারবার
জিজ্ঞেস করে “ভাই হাসেন ক্যান?”
আমি উত্তর দেইনা শুধু হাসি। অনেক্ষন পর
হাসি একটু থামলে ক্লান্ত কন্ঠে ইমতিয়াজকে
আসল ঘটনাটা খুলে বললাম।

হয়েছিল কি, গতবার রমজানে যখন জানলাম
আমরা চলে গেলেও আলু ভাইকে একরাত বেশি
থাকতে হবে মেসে, তখন আমি আমার রুমমেট
ফাহিম একটা প্লান করি। আলু ভাইকে ভয়
দেখানোর প্লান। দুপুরে আমরা মেস থেকে
বাড়ি যাবার নাম করে বেরিয়ে অন্য একজনের
মেসে গিয়ে থাকি, পরে মধ্যরাতে আবার
চুপিচুপি ফেরত আসি মেসে, ফাহিমকে রুমে
ঢুকিয়ে দিয়ে বাহির থেকে তালা দিয়ে আমি
নিচে চলে আসি আর রাস্তার নুরি পাথর নিয়ে
আলু ভাইয়ের জানালায় ছুরতে থাকি। পরে
ফাহিম রুম থেকে মেয়ে গলায় কথা বলে আলু
ভাইকে ভয় দেখায়। আমি ততখনে আবার মেসে
ঢুকে পরি। সারারাত ঝুনঝুনি বাজিয়ে মেসে
হেটে বেরাই। ফজরের আগে আগে মেস থেকে
বেরিয়ে আসি। এই হলো আলু ভাইয়ের গলা
জবোর ভুতের রহস্য।
আসল ঘটনা শুনে ইমতিয়াজও হাসতে শুরু করলো।

[ বি.দ্র. চরিত্র গুলি সব বাস্তব হলেও ঘটনা
পুরোটাই কাল্পনিক। আলমগির ভাই
গলা জবো দিয়া গল্প লিখলাম, আর হ্যা
আপনাকে একটা গল্পে প্রধান চরিত্রে রাখবো
বলে কথা দিয়েছিলাম, সেটাও রাখলাম ]

#তাছনীম

  • 23
    Shares

পাঠটিকে একটি রেটিং দিনঃ
খুব খারাপ, পাঠটিকে ১ রেটিং দিনখারাপ, পাঠটিকে ২ রেটিং দিনমোটামুটি, পাঠটিকে ৩ রেটিং দিনভাল, পাঠটিকে ৪ রেটিং দিনআসাধারন, পাঠটিকে ৫ রেটিং দিন (টি ভোট, গড়ে: এ ৫.০০)
Loading...

আমাদের উৎসাহিত করুনঃ




সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এই লেখাটি কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয় ।

লেখক সম্পর্কেঃ তাছনীম বিন আহসান

জন্ম ১৯৯৬ সালের এপ্রিল মাসে রংপুর জেলার মাহিগঞ্জ এ ! স্কুল জীবনেই বিভিন্ন শিশু-কিশোর পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হয়, সাহিত্য চর্চার অন্যতম অনুপ্রেরনা বড় বোন ও বড় ভাই ! উত্তর বঙ্গের অন্যতম বিদ্যাপিঠ বড় রংপুর কারামতিয়া আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষা জীবন শুরু , পরবর্তিতে উত্তর বঙ্গের আর এক শ্রেস্ট বিদ্যাপিঠ ধাপ সাতগারা বাইতুল মুকাররম মডেল কামিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল (এস এস সি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ! পরবর্তিতে বড় রংপুর কারামতিয়া আলিয়া মাদ্রাসা থেকে আলিম (এইচ এস সি) পাশ | বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় রসায়নে সম্মান শ্রেনীতে আধ্যায়নরত ! বর্তমানে " মাহিগঞ্জ সাহিত্য সংসদ " এ " পত্রিকা ও সাহিত্য সম্পাদক " এর দায়িত্ব পালনরত !
বুনন সম্পর্কিত তথ্যঃ 2018-01-27 06:31:37 তারিখ নিবন্ধিত হয়েছিলেন, এই পর্যন্ত প্রকাশিত লেখা সংখ্যা 24টি, মোট 77 পয়েন্ট সংগ্রহ করে [mycred_my_ranking user_id=157] অবস্থানে আছেন।
সংগঠন ও গোষ্ঠীঃ মাহিগঞ্জ সাহিত্য সংসদ

আপনার ভাল লাগতে পারে

5 1 vote
Article Rating
guest
2105 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
Jewel Rana
2 মাস আগে

অসাধারণ তাছনিম।আমার খুবই ভালো লাগছে। প্রথমে তো একটু ভয়ই লাগতেছিল পরে পুরোটা পড়ে ভয়টা কাটলো। ধন্যবাদ। এরকম আরো লিখ।

Jewel Rana
2 মাস আগে

অসাধারণ তাছনিম।আমার খুবই ভালো লাগছে। প্রথমে তো একটু ভয়ই লাগতেছিল পরে পুরোটা পড়ে ভয়টা কাটলো। ধন্যবাদ। এরকম আরো লিখ।

হুতুম পেঁচা সুজা

Muhammad Bin Naime Mijanur Rahman Limon Šhãmîm Ãhmęđ Moyna R K Mona Jewel Rana Md Solaiman Moyna Vai H.m. Alomgir Kabir

হুতুম পেঁচা সুজা

Muhammad Bin Naime Mijanur Rahman Limon Šhãmîm Ãhmęđ Moyna R K Mona Jewel Rana Md Solaiman Moyna Vai H.m. Alomgir Kabir

হুতুম পেঁচা সুজা

Muhammad Bin Naime Mijanur Rahman Limon Šhãmîm Ãhmęđ Moyna R K Mona Jewel Rana Md Solaiman Moyna Vai H.m. Alomgir Kabir

হুতুম পেঁচা সুজা

Muhammad Bin Naime Mijanur Rahman Limon Šhãmîm Ãhmęđ Moyna R K Mona Jewel Rana Md Solaiman Moyna Vai H.m. Alomgir Kabir

হুতুম পেঁচা সুজা

Muhammad Bin Naime Mijanur Rahman Limon Šhãmîm Ãhmęđ Moyna R K Mona Jewel Rana Md Solaiman Moyna Vai H.m. Alomgir Kabir

হুতুম পেঁচা সুজা

Muhammad Bin Naime Mijanur Rahman Limon Šhãmîm Ãhmęđ Moyna R K Mona Jewel Rana Md Solaiman Moyna Vai H.m. Alomgir Kabir

হুতুম পেঁচা সুজা

Muhammad Bin Naime Mijanur Rahman Limon Šhãmîm Ãhmęđ Moyna R K Mona Jewel Rana Md Solaiman Moyna Vai H.m. Alomgir Kabir

হুতুম পেঁচা সুজা

Muhammad Bin Naime Mijanur Rahman Limon Šhãmîm Ãhmęđ Moyna R K Mona Jewel Rana Md Solaiman Moyna Vai H.m. Alomgir Kabir

2105
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x