চৌরাস্তার দিকে

১. মেশিনে বসে

ফেনী মহিপাল হয়ে একটা হিনো লাক্সারি কোচ বেগমগঞ্জ চৌরাস্তার  উদ্দেশ্যে সাঁ সাঁ করে এগিয়ে যাচ্ছে। গাছের ছায়াগুলো ভেঙে যাচ্ছে কালো জানালায়। মটোরোলার সিটিসেল সিমভরা মোবাইলে ডিজিট ভাসছে ১১:৩৩ বুড়োসকাল, সুপারভাইজার বলেছেন, ১২ টার মধ্যে চৌরাস্তায় পৌছানো যাবে। ভর্তিপরীক্ষা শুরু হবে ২:৩০ টায়। ফলে ব্যাপারটা ভালোই হলো–এ সময়টায় হাতের কিছু নোট ও নিজের করা চূড়ান্ত ব্রহ্মাস্ত্র শান দেওয়ার সুযোগ খাওয়া দাওয়া বাদেই পাওয়া যাবে ।

চৌরাস্তার পশ্চিমে সুপারস্টার হোটেলে কাচকি মাছ দিয়ে পেটপুজো করে ( ধনেপাতার দারুণ ঘ্রাণসহ) পুরো একটা গোল্ডলিফ আরামের ঠেলায় দুই মিনিটে শেষ করি। হাতে হয়তো  হাইড্রোকার্বনের শিট তখন। ভ্রু কুঞ্চিত। হাঁটতে হাঁটতে কালচারাল একাডেমির ছাতার পাশের টিউবওয়েলের দিকে যাই। হাঁটি। হাঁটি। হাইড্রোকার্বন থেকে মন চলে যায় নোয়াখালী’র মতো একটা বহুশ্রূত ধারালো প্রভাবশালী জনপদের আলো বাতাস মর্জির দিকে। বারবার চলে যাচ্ছিল। যদি এখানে আমি টিকে যাই তাহলে তো সত্যিই ছাড়তে হবে বাবা মা ভাই বোন। । বুকে টেনে নেবে কয়েক বছরের জন্য এই অচেনা পর্দানশীন চৌরাস্তার মায়া।

জালাল উদ্দীন কলেজের উত্তর ভিটের টিনের ক্লাশরুমগুলোর সামনে ক্ষেত থেকে মাটি তুলে ছোট মাট ভরা হয়েছে তখন। এই মাঠেই বাবা মা-সহ সোনাধন ক্যান্ডিডেটগণ কাইত চিইত বসে খই ফোটাচ্ছে। কেউ  G -এর মানকে শেষবারের মতো মুখস্ত করতে চাইছে। কেউ প্রবাবিলিটি বা কম্পাউন্ড সেনটেন্সটা গিলতে চাইছে। ভেক্টরের তীর হয়তো কোন মেয়ে ক্যান্ডিডেটকে ক্যান্টিনের পাশে নিরন্তর বিরক্ত করে যাচ্ছে, ধরা দিচ্ছে না।

এমন করে টেস্টের  সময়টা একদম নোস্ট্রিলের কাছে চলে আসে। আমি বিড়ি ফেলে সড়কের ঠিক পাশের দুতলা বিল্ডিংটায় সবার সাথে উঠি। যা এখন উপরের দিকে বাড়ানো হয়েছে। সিট প্লান খুঁজে গিয়ে আমি আমার সিট পাই।

রুমভর্তি জুকি সেলাই মেশিন (গার্মেন্টস ল্যাব)। আমার পরীক্ষার সিট পড়েছে এরই একটাতে। কিছুটা অন্যরকম দৃশ্য। আম্মার সিঙ্গার সাউথ চায়না মেশিনটার কথা তাই মনে পড়লো কিছুক্ষণ ধরে । ভাবতে  ভাবতে পরীক্ষা দিতে বসি। শরিফ স্যারের ইনভিজিলেশন পড়ে ঐ রুমে। খাতার নির্ধারিত ঘরে অংক করি। রসায়নের উত্তর, ফিজিক্সের উত্তর –এসব বসিয়ে বের হয়ে আসি। ক্যাম্পাসের আর কোথাও একচুল ঘুরিনি সেদিন কারণ ঐ সহজ প্রশ্নপত্রেও আমি জোত করে আসতে পারিনি বলে মনে হচ্ছিল। চরম হতাশ হয়ে গেসিলাম সেদিন। ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে রোড পার না হয়ে চৌরাস্তার দিকে হাঁটার সময় ( প্রস্রাবাগারের আগ পর্যন্ত) এখন যেখানে অটোস্ট্যান্ড, একটা ছেলে মোটামুটি ভালই লম্বা যার সিটও আমার রুমে পড়েছিল,  এটা খেয়াল আছে আমার, তাড়াতাড়ি হেঁটে এসে বললো–

‘ হায় বন্ধু, আমি হাসান। ডেবরা বন্ধু, বাঁহাতে তো ভালই কোপ দিলা!’

আমি কিছুটা থতমত খেয়ে গেলাম। কথা শুনে নয়, ছেলেটাকে দেখে।  লম্বা, ডার্কার ব্রাউন এবং গলার স্বর নমনীয় নিম্নগামী, চেহারায় গুন্ডা ভাব, মুখে বহু ডানপিটে চিহ্ন। পরীক্ষার হলে বসেছিল তাই খেয়াল করিনি। কথার মধ্যে টাঙ্গাইলের ভাষার হালকা ছাপ। আমি ধাতস্থ হয়ে উত্তর দিলাম–

‘ হ্যালো আমি মোসাব্বির,  ইন শর্ট আমাকে সাব্বির  ডাকতে পারো। আর টেস্ট?  কয়ো না বন্ধু, তেজগাঁয় দিলাম, ওয়েটিং, পাবনায় দিলাম, ভাল হয় নাই, এইডাও ফসকাইতে পারে, পরীক্ষা ভাল হয় নাই’।

‘আরে না, অইয়া যাবো গা, দেইখো!’ — হাসান আশ্বস্ত করে।

এইটা সেইটা বলতে থাকি। কথা বলতে বলতে হাঁটি। হাতের ডানে টেকনিক্যাল স্কুল রেখে দু-একটা ফুলের দোকান পার হতে থাকি। ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে আসে একটি চৌরাস্তা। ঝলমল কি ম্লান– বুঝতে পারি না। হাসান একসময় বিদায় নিয়ে কোথায় যেন চলে যায়। সম্ভবত টাঙ্গাইলগামী কোন বাসের দিকে। আমি আবারো আরেকটি গোল্ডলিফের দিকে এগিয়ে যাই।

[nextpage title=”রোল নং- ২০০৭/৯৬”]একটা হলুদ দোতলা এল শেইপ বিল্ডিং। প্রস্তাবিত টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজটির প্রশাসনিক ভবন এটি। আমি তার নিচতলার বারান্দায় নোটিশ বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, এখন যেখানে দেয়ালিকা ঘুড্ডি’র দেয়ালটি রয়েছে, সেখানে । সাথে অন্যান্য ভর্তিচ্ছুদের ভীড়। আমার রোল নং ওয়েটিং লিস্টে। ইতোমধ্যে আগের দিন থেকে মেধাতালিকার প্রায় সবাই ভর্তি হয়ে গেছে। ৬০ টি আসনের আরো কয়েকটা আসন তখনো খালি। ওয়েটিং লিস্ট থেকে টানা শুরু হয়ে গেছে। আমি এমন এক অবস্থায় ছিলাম যা ছিল শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থান। অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে নিতে নিতে আমি প্রায় শেষের দিকে আটকে আছি। পাবলিক ভার্সিটির প্রায় সব সুযোগ ততদিনে শেষের দিকে। আমি প্রায় আশাহত। অফিস রুমের সামনে, একবার ভিতরে ঢুকি, আবার ভেতর থেকে শহীদুল্লাহ সাহেব বের করে দেন। বাইরে অপেক্ষা করি, আবার দুশ্চিন্তায় ভেতরে ঢুকে পড়ি, আবার বের করে দেন।

তখন বিকেল পড়ে এসেছে। গাঢ় গমরঙের বিকেল। তীর্যকভাবে পড়ে আছে দেয়ালে, প্রাঙ্গণের গোল চত্ত্বরের বাগানে, ফুলের পাপড়িতে। জুট শেডের ছাদের এক্জস্ট হুইলে। আমার কাছে এই বেহুঁশ সৌন্দর্যের বিকেল চৈত্রের খররোদ ঠাহর হচ্ছিল। পকেটে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ভর্তির জন্য নির্ধারিত টাকা আর দুচোখে বাবা-মা’র গচ্ছিত স্বপ্ন। ক্রমে বেশ ফিকে হয়ে যাচ্ছিল সেগুলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান, জাহাঙ্গীরনগরের ইংরেজি বিভাগ সব ভাসছিল চোখে। কিন্তু টাকার খনি টেক্সটাইল যা কয়েকজনের কাছে শুনে আসছিলাম–তা ক্রমাগত ফিকে হয়ে আসছিল। দু একজন ভর্তি হয়ে অভিভাবকসহ খুশি মনে বের হয়ে আসছিল সামনে দিয়ে। আমি তাদের দিকে তাকাচ্ছিলাম। হয়তো আমাদের হাফিজউল্লাহ অর্ণব কিংবা রিয়াজ কিংবা অন্য কেউ ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ করে বেরিয়ে আসছিল। আমি তখনো হতাশায়।

ঐদিন আগের রাতে আমি ওঠেছিলাম থানা রোডের বৈকালি মেসে। ডিপ্লোমার শুভ বা শুভ্র ( সম্ভবত) তার রুমে আমাকে আশ্রয় দেন। আলাপ হয় পলাশের সাথে( যিনি এখন একজন স্বনামধন্য মেধা, ডুয়েট ও ঢা.বির আইবিএ’র নামকরা ছাত্র। ঐ দিন উনি আমি ও মেসের অন্যান্য কয়েকজন মেসের লনেই ক্রিকেট খেলেছিলাম।

যাই হোক– ফিরে আসি ভর্তির দিনের বিকেলে। আমি শেষ বারের মত এডমিন বিল্ডিংয়ের নিচতলার প্রিন্সিপালের রুমের পাশের ছোট অফিসরুমে উঁকি দিই। গিয়ে শহিদুল্লাহ ও আলী সাহেবের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। আমার ওয়েটিং রোল নং প্রবেশপত্রে দেখিয়ে অনেকটা ব্যতিব্যস্ত হয়ে ভর্তির জন্য বলতে থাকি। তখনো প্রায় ১০-১৫ জনের ভর্তি বাকি কিন্তু আমাকে জানানো হচ্ছিল ভর্তি প্রায় শেষ অথবা বাকি থাকলে আরেকটি নোটিশে জানানো হবে। ষাট জনের ভেতর ঢোকার জন্য আমার ভেতর অস্থিরতা তখন চরমে।

অফিসরুম থেকে বের হয়ে আসি। অত্যন্ত হতোদ্যম হয়ে। বাইরে এসে আশা না ছেড়ে দাঁড়িয়ে থাকি। আমার সাথে আমি, একটা প্রবেশপত্র ও ৭০০০ টাকা( গাড়িভাড়া ও খাবার খরচ বাদে) এবং অতিঅবশ্যই একটি স্বপ্ন।

বিকেল প্রায় ৪টা। শেষবারের মতো অফিসরুমে ঢুঁ মারি। ভেবেছিলাম যা থাকে কপালে। বারবার মনে হচ্ছিল কোন রেলওয়ে স্টেশনে দিনের শেষ ট্রেনের জন্য টিকেট কাউন্টারে অন্তত স্ট্যান্ডিং টিকেটের আশায় দাঁড়িয়ে আছি। বিকেল বুড়ো হচ্ছিল। অফিসরুমে ঢুকার পর আমি শহীদুল্লাহ সাহেবের চোখের দিকে তাকাই। সাহস করে বলি—

‘ স্যার, আমি তো এখন সিরিয়ালে, আমাকে ভর্তি করান।’

আমার দিকে আগের মতো বিরক্তি তুলনামূলকভাবে কমিয়ে তিনি বললেন–

‘ কই এডমিট কার্ড দেখি?’ কাগজপত্র কই?’

শুনে আমি আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের মুকুটটি পেয়ে যাই মনে হয়। সাথে সাথে বাবার মুখটি হেসে অন্তর্চোখে ভেসে ওঠে। আমি প্রয়োজনীয় সনদ ও টাকা দিয়ে ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করি। ভর্তি রশিদে আমার রোল নং লেখা হয় ২০০৭/৯৬, ক্লাশ রোল ৪১। আমাকে বলো দেয়া হয় ক্লাশ ওরিয়েন্টেশনের তারিখ ৭ মে ২০০৭।

বিকেল ততক্ষণে স্বর্ণালি হাসিমুখে চারদিকে ঝনঝন করে উঠেছে। বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইন্জিনিয়ারিং এ আমি একজন ভর্তি হওয়া সরকারি ছাত্র। ততক্ষণে বাবার পকেটে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ভয়ংকর হাসি নেই। একটি সিটিসেল নম্বর তখন ব্যবহার করতাম( ০১১৯১১৭৫৮৪১) যা এখন অকেজো। সেই নম্বর দিয়ে বাবাকে ফোন দেই। জানাই সুখবর। ওদিকে স্বপ্নাতুর বাবা আবার ওঠে দাঁড়ান নতুন শক্তিতে। ঢাকার বাড্ডার নতুনবাজার এলাকায় একজন মায়ের হাসিমুখ বিস্তৃত হয়।

বৈকালি মেসে ফিরে গিয়ে শুভ বা শুভ্র ভাই এবং পলাশ ভাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে ইকোনো নামের বাস ধরার জন্য চৌরাস্তার দিকে পা বাড়াই। সম্ভবত সেদিন আইসিসি ওয়াল্ড কাপ’২০০৭ এর অষ্ট্রেলিয়া ও শ্রীলঙ্কার মধ্যেকার ফাইনাল( কিংবা সেমিফাইনাল) ম্যাচ চলছিল। আমি ব্যাগ কাঁধে হেঁটে চলি চৌরাস্তার দিকে।

(চলবে……)

 


আমাদের উৎসাহিত করুনঃ




সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এই লেখাটি কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয় ।

লেখক সম্পর্কেঃ

বুনন সম্পর্কিত তথ্যঃ