বিষাদপত্র

প্রিয় বাবা,

তুমি কোথায় আছো সেটা আমি জানি কিন্তু কেমন আছো জানি না, জানতেও চাই না। স্বার্থপরের মত আমাদের ফেলে যখন চলে গেলে তখন তো একবারের জন্যেও ভেবে যাও নি, আমরা কিভাবে থাকবো, কিভাবে চলবো ? তোমার ইচ্ছা হয়েছে চলে গিয়েছো, একবার বলার প্রয়োজনটা পর্যন্ত বোধ করোনি। এরপর এতবছরেও একবারের জন্যেও সামনে আসোনি, অথচ আড়াল থেকে ঠিকই জ্বালিয়ে গিয়েছো আমাদের বুকের গহীনটিকে। সেই বেদনায় জ্বলেছি-পুড়েছি, আবার সেই ভস্ম থেকে মানুষ হয়েছি কিন্তু আজও তোমাকে ভুলতে পারিনি। অন্তত কিভাবে ভুলতে হয় তা শিখিয়ে দিয়েও তো যেতে পারতে??

পরিবারের প্রথম মেয়েসন্তান হিসেবে যতটা না যোগ্য এরচেয়েও অনেক বেশী আদরে বড় হয়েছি। মায়ের মুখে শুনেছি, আমার মুখ দেখেই তুমি নাকি কেঁদে দিয়েছিলে। সারা গ্রামে মিষ্টি বিলিয়েছিলে। গ্রামের বাড়ির পাশের উত্তরের জায়গাটুকু বিক্রি করে দুটি গরু দিয়ে আমার আকিকা দিয়েছিলে। আর হাজার নাম থেকে বেছে মায়ের নামের সাথে মিল রেখে নাম দিয়েছিলে ‘অনীতা’। মাকে বলেছিলে, ‘দেখবে এই মেয়ে অনেক ভাগ্যবতী হবে।’ আমি যখন তোমার আঙুল ধরে স্কুলে যাওয়ার পথে আমার নামের অর্থ জিজ্ঞাসা করতাম, তখন তুমি বলতে ‘ভাগ্যবতী, উপযুক্ত, উদার’। যখন আরেকটু বড় হয়ে তোমাকে বলতাম ‘বাবা, এক নামের কি অনেক অর্থ হতে পারে?’ তখন বলতে ‘হতে পারে। এক নামের ভাল অর্থও থাকতে পারে আবার খারাপ অর্থও থাকতে পারে। তবে সবচেয়ে ভালগুণ বিবেচনা করেই নাম দেয়া উচিত’। আচ্ছা বাবা, অইদিন তোমার মাকে বলা কথাটি ভুল ছিল নাকি আমাকে এতবড় মিথ্যা বলেছিলে, সেটা বলতে পারো??

মায়ের কাছে আরো শুনেছি, তুমি নাকি খুব রাগী ছিলে, মানুষ যেটাকে বলে ‘বদমেজাজি’। বড়, মেজো আর ছোট ভাইয়াও নাকি তোমার অনেক মার খেয়েছে। সেই তুমিই কিনা আমার জন্মের পর থেকে পুরো বদলে গিয়েছিলে। বাসায় এসেই আমাকে কোলে নিয়ে আদর করতে। মা যদি কখনো রেগে আমাকে ধমক দিত, তুমিই উলটো মাকে ধমক দিতে আর আমাকে কোলে নিয়ে খাইয়ে দিতে। বাবা, সেই তুমিই কিভাবে পারলে আমাদের ছেড়ে এভাবে চলে যেতে??

আমার মনে আছে বাবা। ক্লাস ফোরে যখন আমি প্রথম সবগুলা রোজা রাখতে শুরু করি, প্রতিটি ইফতারির আগে তাড়াহুড়ো করে ঘেমে তুমি অফিস থেকে ফিরতে। সেই ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত শরীর নিয়ে আমাকে কোলের উপর বসিয়ে রেখে ইফতারি খাইয়ে দিতে। আর আমিও কেমন নাছোড়বান্দা ছিলাম, তুমি না খাইয়ে দিলে ইফতারিই খেতাম না। বাবা কতবছর ধরে আমায় খাইয়ে দাও না, একটা বারের জন্যেও ইচ্ছে করে না যে মেয়েটি তোমার হাতের এক লোকমা খাওয়ার প্রতীক্ষায় কত রাত না খেয়ে পার করেছে।

তোমার মনে পড়ে একবার আমি বৃষ্টিতে ভিজতে গিয়ে কাঁদায় উলটে পড়ে যাই। তুমি আমাকে তুলতে এসে তুমিও কাঁদায় পড়ে যাও। তখন দুইজনে কত হেসেছিলাম। মা দাঁড়িয়ে বকার স্থলে হাসছিল। সেই মায়ের মলিন মুখে এখন আর হাসি দেখা যায় না বাবা। তুমি চলে যাওয়ার পর থেকে মায়ের শুধু নিথর দেহটুকুই আছে, প্রাণচাঞ্চল্য সবকিছু তোমায় গোসলের পানির সাথে ধুয়েমুছে চলে গিয়েছে।

বাবা আমার নামের অর্থ বলেছিলে ‘ভাগ্যবতী’। দেখো, এতই ভাগ্যবতী ছিলাম যে আমি যেই সংসারেই গিয়েছি সেই সংসারের ভাগ্যের চাকা উল্টোদিকে ঘোরা শুরু করে। নাহলে বলো, কেনোইবা, আমার বিয়ের পরদিনই শ্বশুর মারা যাবে, যার সম্পূর্ণ দায় বর্তাল কিনা আমার উপর।কটাক্ষ, লাঞ্ছনা, বিদ্রূপ, অপবাদ, আঘাতের সাথে তোমার আদর করে ডাকা ‘লক্ষী’র উপড়ই ‘অলক্ষী’র তকমা বসিয়ে দিয়েছিল।

বাবা তুমি ত আমাকে শুধু ‘উপযুক্ত’ বলেছিলে কিন্তু ‘উত্তম উপযুক্ত’ এর উদাহরণ আমার স্বামী তো সরাসরি নব্য বিবাহিতা এনেই দেখিয়েছিল। তোমার দেয়া নামের একটি অর্থের মর্যাদা রেখেছি। আমার সংসারটিকে ‘উদারহৃদয়’ এ তাদের ‘লক্ষী’র হাতে তুলে দিয়ে এসেছি বাবা। এমন ‘উদারতা’ কজনই বা দেখাতে পারে বল?

ছোটোসময়ে গল্পে বলতে, মানুষ মারা গেলে তাঁরা হয়ে আকাশে উঠে। আকাশের এতো তাঁরার মাঝে তুমি কোনটি বাবা?? তোমাকে কেনো খুঁজে পাই না বাবা??

ছোটোবেলায় ব্যথা পেয়ে কেঁদে দিলে তুমি এসে চোখের পানি মুছিয়ে দিতে। প্রতিরাতে অন্তর্দাহের বেদনায় পুড়ে যে কান্নায় আকাশ থেকে বৃষ্টি ঝড়ে, সে রোনাজারি কি তুমি শুনতে পারো না ?? একটিবারের জন্য নিচে নেমে তোমার আদরের মেয়েটির অশ্রুরোধ করতে পারো না বাবা??

বাবা, তোমার প্রতি আমার অভিযোগের অন্ত নেই। তোমার সাথে অপারে যেদিন দেখা হবে, সবগুলা অভিযোগ নিয়ে তোমার সামনে দাঁড়াবো আমি। পারবে তো আমার সব প্রশ্নের উত্তর দিতে?? উত্তর দিতে না পারলেও মেয়েটিকে একটাবার জড়িয়ে ধরতে পারবে না বাবা??

অনেক কথা বলতে চেয়েও বলতে পারিনি, তবে বাবা, অপারে তোমার আর একা থাকতে হবে না। আমিও আসছি, পার্থিব সকল মায়াজালের বাঁধন ছিঁড়ে।

ইতি,

তোমার ভাগ্যহীনা ভাগ্যবতী।

  • 3
    Shares

পাঠটিকে একটি রেটিং দিনঃ
খুব খারাপ, পাঠটিকে ১ রেটিং দিনখারাপ, পাঠটিকে ২ রেটিং দিনমোটামুটি, পাঠটিকে ৩ রেটিং দিনভাল, পাঠটিকে ৪ রেটিং দিনআসাধারন, পাঠটিকে ৫ রেটিং দিন (টি ভোট, গড়ে: এ ৫.০০)
Loading...

আমাদের উৎসাহিত করুনঃ




সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এই লেখাটি কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়



  • লেখক সম্পর্কেঃ সাকিব মাহমুদ সুহৃদ

    বুনন সম্পর্কিত তথ্যঃ 2017-10-07 12:32:16 তারিখ নিবন্ধিত হয়েছিলেন, এই পর্যন্ত প্রকাশিত লেখা সংখ্যা 10টি, মোট 7 পয়েন্ট সংগ্রহ করে 43 অবস্থানে আছেন।
    সংগঠন ও গোষ্ঠীঃ লেখক কোন সংগঠন বা গোষ্ঠী এর সদস্য নন

    আপনার ভাল লাগতে পারে

    avatar
      
    smilegrinwinkmrgreenneutraltwistedarrowshockunamusedcooleviloopsrazzrollcryeeklolmadsadexclamationquestionideahmmbegwhewchucklesillyenvyshutmouth
    1 আলোচনা
    1 আলোচনায় উত্তরগুলো
    2 অনুসরন করেছেন
     
    সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়া
    আলোচিত মতামত
    2 মতামত প্রদানকারী
    সাকিব মাহমুদ সুহৃদসায়মা হক সাম্প্রতিক মতামত প্রদানকারী
    সায়মা হক
    অতিথি
    সায়মা হক
    Offline

    কখন শেষ হল টের পাইনি sad

    You're currently offline