নীলখাম

প্রিয় নীলন্তী,

তোমার শেষ চিঠিটি পেয়েছি দুদিন হল। আগের দুটিসহ তিনটি চিঠির সকল প্রশ্নের উত্তর দিব বলেই দীর্ঘবিরতির পর আবার কলম ধরেছি। তিনটির একটিতেও কিন্তু তুমি কেমন আছ বললে না। অভিমান করে গাল ফুলিয়ে রেখেছ নাকি সত্যি ভীষণ রাগ করেছ এ সম্পর্কে আমি নিশ্চিত নই। তবে জানো,অভিমানে কিন্তু তোমাকে অসম্ভব সুন্দর দেখায়। সাথে যখন আড়চোখে তাঁকিয়ে দেখতে তোমার অভিমান ভাঙানোর জন্য কিছু করছি কিনা, তখন তোমাকে স্বর্গের অপ্সরীর চেয়ে কম ছলনাময়ী কখনো মনে হয়নি। ছলনাময়ী কেনো বলছি? তখন যে অল্পক্ষণের ছলনায় মনহরণ করে নিতে, সে মনকে আজো ফেরত পাইনি।

শেষরাতে তোমাকে নিয়ে একটা স্বপ্ন দেখেছি। শুনেছি শেষরাতের স্বপ্নগুলো নাকি সত্যি হয়। তবে আমি চাইনা এ স্বপ্নটা সত্যি হোক, কারণ এমন উদ্ভট স্বপ্ন সত্যি হলে তখন আনন্দের চেয়ে বেদনা চক্রবৃদ্ধিহারে বেড়ে যাবে। আজ আবার অফিস থেকে বাধ্যতামূলক ছুটি দিয়েছে। অহ! তোমাকে তো বলাই হয়নি। নতুন চাকরী। চারমাস হল । বস জোরপূর্বক ছুটি দিয়ে বললো, “ইয়ং ম্যান, নাউ টেক এ রেস্ট। এঞ্জয় ইউরসেল্ফ।” আমি তো প্রথমে ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলাম। এ চাকরীটিও গেলো বুঝি! কিছুক্ষণপর বুঝতে পারি, উনি আসলে ছুটি নেয়ার কথা বলছেন। একটানা এতদিন কাজ করেছি, একদিনও ছুটির কথা বলিনি তাই উনি ইচ্ছাকৃতভাবেই ছুটি দিলেন। দুদিনের ছুটি নিয়েছি। বস মানুষ হিসেবেও খুব ভাল। না, আমাকে ছুটি দিয়েছেন তাই বলছি না। খুব অমায়িক ব্যবহার। খুব দ্রুত মানুষকে আপন করে নিতে পারেন। আখিরাতের কথা বলেন। নিজে নামাজ পড়েন, অন্যদেরও নামজের তাগিদ দেন। আমাকেও পুরোদমে নামাজী বানিয়ে ফেলেছেন। বসের খুব কিউট দুটি ছেলে আছে। বয়স ৪-৫ হবে। এক বছরের ছোট-বড়। ফেসবুকে ছবি দেখেছি। আমার যদি এমন দুটি ছেলে হত, তাহলে আর কি দরকার এই জীবনে!

তুমি বারবার কৌতুহলী কন্ঠে জিজ্ঞাসা করেছ, এই নীলন্তী নামের তাৎপর্য কি?! সেই প্রথম দেখার দিনটি মনে আছে? তোমার সাথে দীর্ঘ কথোপকথনের পর ভার্সিটিতে প্রথম যেদিন দেখা করেছিলে সেদিন তোমার পড়নে ছিল বিভিন্ন কারুকাজকরা নীল রঙের একটি থ্রিপিস। চুলগুলোকে বাতাসে হালকা উড়ার স্বাধীনতা দিয়েছিলে। আমার দুর্বলতা, সেই নীল চোখজোড়া। মনে হয়েছে, সৃষ্টিকর্তা প্রকৃতির সব নীলরঙ দিয়ে নিখুঁত ভঙিমায় চোখজোড়া নীলাভ বর্ণে সাজিয়েছেন। দূরত্ব কমিয়ে পাশে বসে যখন হাসি দিলে। নীলাভ চোখ, খোলা চোখ, টোল পড়া গালের হাসি, নীল ভালবাসায় আমি হারিয়ে গেলাম। সেদিন মনে হয়েছিল নীল রঙের মেলা বসেছিল। তোমাকে দেখে সবকিছুতে নীলের ছড়াছড়ি দেখছিলাম। মনে হচ্ছিল, নীল ভালবাসার সমুদ্রে হারিয়ে ফেলেছি নিজেকেই।

নামকরণের তাৎপর্য হয়ত বুঝেছ আর ভেঙে বলতে হবে না। মনহরিনী নামটির কথা একবার তুলেছ, কিন্তু তাৎপর্য অথবা ব্যাখ্যার বিষয়ে কিছু বলনি। এ নামটির মাহাত্ম্য যে টোল পড়া গালের হাসিতেই লুকায়িত, এর চেয়ে বেশী কি কিছু বলতে হবে! শেষে এসেছে অপ্সরা’র কথা। স্বর্গের পরী কখনো দেখিনি আমি। কিন্তু নীলের মাঝে হারিয়ে তোমাকে কল্পনার অপ্সরার চেয়ে কোনো অংশে কম মনে হয়নি। বরঞ্চ আরো বেশী মায়াবতী, শুভ্র লেগেছে। অবশ্য স্বর্গের পরীদের সাথে তোমার অন্যরকম মিলও দৃশ্যমান। স্বর্গের পরীরা যেমনি অল্পক্ষণের জন্য পৃথিবীতে উঁকি দিয়ে চলে যায়, আমার অপ্সরাও কিন্তু মাঝে মাঝে আমায় দেখা দিয়ে চলে যায়।

খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে জানতে চেয়েছিলে। আজ আবার খালা আসেনি। তুমি তো জানোই ছুটির দিনে আমার ঘুম একটু দেরীতেই ভাঙে। এখন আর সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে নাস্তা করতে ইচ্ছে করছেনা। কেক ছিল, সাথে ড্রিংকস। এই ড্রিঙ্ক আবার অই ড্রিঙ্ক না। কোল্ড ড্রিঙ্ক খেয়েছি। এছাড়া খাওয়াদাওয়ার অবস্থা খুবই ভাল।

তোমার প্রশ্নব্যাংকের উত্তর দিতে দিতে বিয়ের কথা জিজ্ঞাসা করতেই ভুলে গেছি। তোমার মামার আনা সেই ম্যাজিস্ট্রেট টেকো ভুঁড়িওয়ালা বুড়োর সাথে কি তোমার বিয়ে হয়ে গিয়েছে?? যদি বিয়ে করে ফেলে আমাকে দাওয়াত দেয়া ছাড়াই তবে কিন্তু আমি সত্যিই খুব খুব রাগ করবো। আর যদি এখনো বিয়ে না করে থাকো তবে বললো, বোকামো করো না! এমন পাত্র কিন্তু সবসময় আসে না, কালেভদ্রে একটা করে আসে!
ইশ! দেখো আমাকে কোনো মামা-চাচা কোনো মেয়ে এনে বলে না বিয়ে করে ফেলতে। বললে কবেই একদমে বিয়ে করে ফেলতাম।

তোমার পাকনী বোনটি কি এখনো চিঠি চুরি করে মা কে দেখিয়ে দেয়?! আবার এমন করলে দুই হাতে পাঁচটি করে বই দিয়ে এক পায়ে দাঁড়া করিয়ে রেখো, কমপক্ষে কেঁদে দেয়ার আগে পর্যন্ত।

অনেক কথা বলে ফেললাম। তোমার চিঠির অপেক্ষায় থাকব। নিজের প্রতি যত্ন নিও। ভাল থেকো। শেষে বলব, ‘ নীলন্তী। আমার সাদা-কালো ক্যানভাসকে নীলাভ বর্ণে রাঙিয়ে দেয়া একটি নাম।’

ইতি,
অর্ঘ্য


আমাদের উৎসাহিত করুনঃ




সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এই লেখাটি কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয় ।

লেখক সম্পর্কেঃ

বুনন সম্পর্কিত তথ্যঃ