TECN-নিয়ে কিছু কথা…

গ্রাড্যুয়েশন সম্পূর্ন করা বেশিরভাগ ছাত্রই তার ক্যাম্পাসকে ভালোবাসে। ছাত্রজীবনের শেষ ধাপ প্রত্যেকের মনেই একটা আবেগের জায়গা দখল করে নেয়। কিছু হাসি-কান্না, কিছু টক-মিষ্টি স্মৃতি এবং কিছু বিশেষ বিশেষ অনুভূতি এই আবেগকে উসকে দেয়। কিন্তু কখনো কখনো ক্যাম্পাসের অভিজ্ঞতা আবেগকেও ছাড়িয়ে যায়। আজ আমি সেই আবেগকে ছাপিয়ে যাওয়ার গল্প বলতে বসেছি…

টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, নোয়াখালী সংক্ষেপে TECN-এর প্রথম ব্যাচের ছাত্র আমি। কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রথম ব্যাচের ছাত্র হওয়া ভাগ্যের ব্যপার। কেউ চাইলেও এই ক্ষেত্রে আমাকে টেনে দ্বিতীয়তে নামিয়ে আনতে পারবে না।
TECN-এ পড়ার সুবাদে কিছু ঘটনার স্বাক্ষী হয়েছি…আমি হলফ করে বলতে পারি- বাংলাদেশের খুব কম ছাত্র সেরকম অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছে। TECN এর অনেক ছাত্র এখনো সেই গৌরবের কথাগুলো জানে না। কয়েক ধাপে আমি সেগুলো তুলে ধরতে চাই।
TECN-ই বাংলাদেশের একমাত্র ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, যেটি অনুমোদন পাওয়ার আগেই ছাত্র ভর্তি করে ফেলে। কর্তৃপক্ষ এতগুলো মেধাবী ছেলের জীবন নিয়ে জুয়া খেলেছিলো সেদিন। দেশের নামকরা সব ভার্সিটি থেকে ভর্তি ক্যান্সেল করে এসে অনেক ছেলে TECN-এ ভর্তি হয়, অথচ জানেও না যে- এই ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজটি এখনো প্রস্তাবিত! আমিও সেই দলে ছিলাম। চবি’র ক্যমিস্ট্রি থেকে ভর্তি বাতিল করে এখানে এসে ভর্তি হই। যখন জানলাম, এটা এখনো প্রস্তাবিত…তখন কিছু করার নেই। এভাবে অনিশ্চয়তা থেকে আমাদের যাত্রা শুরু। তারপর জন্ম থেকে জ্বলছি…
প্রস্তাবিত অবস্থায় কলেজের ক্লাস শুরু হলো। কলেজে এসে দেখি ক্যাম্পাসে আর্মি ক্যাম্প। তখন ফখরুদ্দীনের আমল। দেশে জরুরী অবস্থা। আমরা একদিন হটাত সাহস করে ক্লাস থেকে বেরিয়ে আসলাম। ক্যাম্পাসে অবস্থান নিলাম। প্রিন্সিপাল আমাদের বোঝানোর চেষ্টা করলেন অনেক। দেশের রাজনীতির অস্থিরতার কথা বললেন। আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আর্মি ক্যাম্প ক্যাম্পাসে থাকলে আমরা ক্লাসে যাবো না। খালেদা-হাসিনা তখন সাবজেলে অন্তরীন। ফখরুদ্দীন সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস কেউ করছে না। সারাদেশে আর্মির শাসন। আমাদের দাবীর মুখে ঠিকই তারা হার মেনেছিলো, সরিয়ে নিয়েছিলো আর্মি ক্যাম্প। সেই সময়ের ঘটনা পরম্পরায় যা বিরল।

সেদিন থেকে আমরা ফার্স্ট ব্যাচের ষাটজন তরুন উপলব্ধি করলাম, একতা থাকলে আমাদের পক্ষে এই অনিশ্চিত ভবিষ্যত নিয়েই অনেকদূর যাওয়া সম্ভব!
[nextpage title=”অনুচ্ছেদ ২”]টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, নোয়াখালী তথা TECN ছিলো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত। আমাদের যখন পরীক্ষা ঘনিয়ে আসলো, চবি কর্তৃপক্ষ এক অদ্ভুত আবদার করে বসলো! বললো – আমাদেরকে পরীক্ষা দিতে হবে জোরারগঞ্জ টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে গিয়ে। দুই ঘন্টা জার্নি করে বেগমগঞ্জ থেকে জোরারগঞ্জ গিয়ে ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা দেওয়ার আবদার একটা গাজাখুরি সিদ্ধান্ত ছাড়া আর কিছুই না।
আমরা সাফসাফ জানিয়ে দিলাম- একবছর ইয়ার-লস করতে রাজি আছি। কিন্তু এক্সাম কমিটির অন্যায্য আবদার মেনে নেব না। আমরা দস্তখত জমা দিলাম। ড্রাফটিং-এর কাজগুলো আমাকেই করতে হতো। করতে করতে শিখেছি। চবি বরাবর স্মারক লিখলাম- প্রত্যেক ছাত্রের একবছর করে ষাটজন ছাত্রের ষাট বছর ধ্বংস করে দেন…TECN-কে ষাট বছর পিছিয়ে দেন, তবু এই কালো আইন আমরা মানবো না…
শেষপর্যন্ত চবি সিদ্ধান্ত পাল্টাতে বাধ্য হলো। পরীক্ষা বেগমগঞ্জেই হবে। আমরা এতদিন পড়াশোনা করতে পারিনি। আন্দোলন করেছি। এখন পড়া শুরু করতে যাব… হলো না। চবি আবার একটা অন্যায্য সিদ্ধান্ত নিলো। আবার নামতে হলো আন্দোলনে।
যেখানে চবি’তে বিভিন্ন অনুষদে ফরম ফিল-আপ ফি ছিলো ১,২০০-১,৮০০ টাকা, সেখানে আমাদের ফি ধরা হয়েছে ৬,৮০০ টাকা! আমরা বেশ কয়েকটি অনুষদের ফরম ফিল-আপ সংক্রান্ত কাগজ সংগ্রহ করে সাংবাদিকদের দেখালাম। তারাও সায় দিলেন যে আমাদের ফি-টা পাঁচ গুন বেশী হয়ে গেছে। আমরা মানববন্ধন, পোস্টারিং, মিছিল, সংবাদ সম্মেলন ইত্যাদি করলাম। আমাদের সাথে যৌথভাবে আন্দোলন করেছিলো জোরারগঞ্জ টেক্সটাইলের সহপাঠী বন্ধুরা।
এক্সাম কমিটি কিছুতেই ফি কমাবে না। আমরাও কিছুতেই ফরম ফিল-আপ করবো না। বিভিন্ন ভাবে আমাদেরকে লক্ষ্যচূত্য করার চেষ্টা করা হয়েছে তখন। দুই কলেজের মধ্যে তথ্যসন্ত্রাস করা হয়েছে। জোড়ারগঞ্জে বলা হয়েছে- বেগমগঞ্জের ছাত্ররা ফরম ফিল-আপ করে ফেলছে গোপনে। আবার বেগমগঞ্জে বলা হয়েছে- জোড়ারগঞ্জের ছাত্ররা ফরম ফিল-আপ করে ফেলছে গোপনে। বলা হয়েছে- যদি একজন ছেলেও ফরম ফিল-আপ করে, একজনেরই পরীক্ষা নেয়া হবে। বাকিদের একটা বছর নষ্ট হবে। আমরা দুই কলেজের ১২০ জন ছেলে তবু দৃঢ় ছিলাম।
ফরম ফিল-আপের তারিখ পার হয়ে গেলো। আমরা ধরেই নিয়েছি এক বছর নষ্ট হয়ে যাচ্ছে আমাদের। কিন্তু ব্যাচের কেউ এতটুকু হতাশ হলো না। বরং এক্সাম কমিটির অযৌক্তিক দাবীর সামনে মাথা নত না করার প্রত্যয়ে আমরা তৃপ্ত ছিলাম।
একেবারে শেষ মুহুর্তে, যখন ফরম ফিল-আপের সময় শেষ এবং পরীক্ষার নির্ধারিত সময় ‘নকিং এট দ্য ডোর এন্ড উইন্ডো’… চবি কিছুটা নমনীয় হলো। আমাদের দাবী মেনে নিলো। তবে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য সিন্ডিকেট মিটিং প্রয়োজন। তাই এবারের মত ৬,৮০০ টাকাতেই ফরম ফিল-আপ করতে অনুরোধ করা হলো। নতুনকরে সময় দেওয়া হলো। আমরা মেনে নিলাম।
পরীক্ষা আগের নির্ধারিত তারিখেই হবে। পড়া শুরু করতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম এখনো বই কিনি নাই! :p পরীক্ষা ততদিনে knocking বাদ দিয়ে দরজা ভেঙ্গে ঢুকেই পড়েছে। ‘এলাহী ভরসা’ বলে এক্সাম হলে চলে গেলাম…
[nextpage title=”অনুচ্ছেদ ৩”]
ততদিনে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ‘প্রস্তাবিত’ থেকে নথিভুক্ত হয়ে গেছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো- নতুন কলেজের জন্য একটা পয়সাও বরাদ্দ দেওয়া হয়নি!
নিয়ম অনুযায়ী উন্নয়ন বাজেট (DPP) অটোমেটিক পাশ হও্য়ার কথা। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছে। ‘একনেক’ পর্যন্ত যাওয়ার আগেই DPP ফাইল কোন এক অজানা কারনে ফিরে ফিরে আসছে।

কারনটা আমরা কয়েকজন জানতাম। সেটা নাইবা বলি। সম্মানিত পদের মানুষগুলো যে ভেতরে কতটা কুৎসিৎ হতে পারে… তা নিজের চোখে দেখেছি। তাদের জন্য শুধুই ঘৃণা আর ধিক্কার!
কলেজের অবস্থা করুণ। শিক্ষক নাই, হল নাই, লাইব্রেরীতে বই নাই, ল্যাবে সরঞ্জাম নাই, ক্লাস রুম নাই, অডিটরিয়াম নাই… চারদিকে শুধু নাই আর নাই! কলেজে তখন দুইটা ব্যাচ। ১২০ জন তরতাজা তরুন। আমরা ষাট জন নিয়েই বেশ কয়েকবার কাঁপিয়ে দিয়েছিলাম নোয়াখালী। এখন শক্তি দ্বিগুন হয়েছে।
সিদ্ধান্ত নিলাম এটাই উপযুক্ত সময়। এবার কলেজটা গড়তে হবে। আবার আন্দোলনে নামলাম। বাংলাদেশে এই প্রথম DPP পাশ করানোর জন্য ছাত্ররা আন্দোলনে নামলো। এধরনের ঘটনা এর আগে এদেশে ঘটেনি, এর পরেও আর ঘটেনি! সম্ভবত আর কোনদিন ঘটবেও না!
দীর্ঘ আড়াই বছর আন্দোলন করেছি আমরা। প্রথম দুই ব্যাচের ছেলেদের যে কতজনের কাছে ধর্ণা দিতে হয়েছে, কত অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে, কত ত্যাগ যে স্বীকার করতে হয়েছে… বিধাতাই স্বাক্ষী তার। কিরন সাহেব, বস্ত্রমন্ত্রী লতিফ সিদ্দীকি, বর্তমান স্পিকার শিরিন শারমিন-সহ অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তির কাছে অসংখ্যবার আমি নিজে গিয়েছি।
সবাই আশ্বাস দিয়েছেন। সহযোগিতা করেছেন। একজনের কথা না বললে অকৃতজ্ঞতা হয়ে যাবে। তিনি স্বেচ্ছাসেবক লীগের জব্বার ভাই। আমাদের সাথে এক কাপড়ে ঢাকায় চলে গিয়েছেন। দিনের পর দিন সচিবালয়ে মন্ত্রনালয়ে ঘুরেছেন। তাকে আসা যাওয়ার ভাড়াটা পর্যন্ত দিতে পারিনি।
অবশেষে একটা ইতিহাস রচনা হলো। একনেকের বৈঠকে ২৬ কোটি টাকার DPP পাশ হলো। বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনে আরেকটা মাইলফলক যুক্ত হলো। প্রথাগত ছাত্ররাজনীতি না করেও NTEC-এর ছেলেরা রাজনৈতিক সরকারের কাছ থেকে কলেজের উন্নয়ন বাজেট আদায় করে ছাড়লো!!
ছাত্ররা শিক্ষকের দাবীতে আন্দোলন করে, ক্লাসের দাবীতে আন্দোলন করে, পরীক্ষার দাবীতে আন্দোলন করে… কিন্তু একমাত্র আমরাই আন্দোলন করেছিলাম কলেজের উন্নয়ন প্রকল্প DPP পাশের দাবীতে। টিভির স্ক্রলে DPP পাশের নিউজটি দেখে আমরা অনেকে আবেগে কেঁদে ফেলেছিলাম। সেই অশ্রুবিন্দু আজীবন লেগে থাকবে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, নোয়াখালী-এর নেমপ্লেটে, এর প্রতিটি ইটের কানায় কানায়…[nextpage title=”অনুচ্ছেদ ৪”]
ছাত্রজীবন মানেই শুধু বইয়ের টেবিলে মুখ গুঁজে পরে থাকা নয়। ছাত্রদের কিছু সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও মানবিক দায়বদ্ধতা আছে। লেখাপড়ার পাশাপাশি নিজেদেরকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে এই দায় স্বীকার করাটা খুবই জরুরী।
সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক কাজে TECN-এর ছাত্ররা সবসময় অগ্রগন্য ছিলো। কলেজে একটা ব্লাড ব্যাংক গঠিত হয়েছিলো। রক্তের প্রয়োজনে কেউ TECN-এ এসে কখনোই খালি হাতে ফিরে যায়নি। শীতার্তদের মাঝে কম্বল বিতরন, বিভিন্ন দূর্যোগে ত্রাণ সেবা ইত্যাদি ছিলো নৈমিত্তিক ঘটনা। মানবিক সাহায্য সকল ছাত্রই কম বেশী করেছে।
এবার TECN-এর কিছু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক নিয়ে বলছি-
…..বৃহত্তর নোয়াখালীর সবচেয়ে প্রাচীন ও সবচেয়ে জনপ্রিয় দৈনিক পত্রিকা ‘জাতীয় নিশান’। এ পত্রিকার পাঠক ফোরামের আহবায়ক ছিলো TECN-এর ছাত্র!
…..দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার পাঠক ফোরামের নোয়াখালী জেলার আহবায়ক ছিলো TECN-এর ছাত্র! এছাড়াও প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, সাধারন সম্পাদক সহ জেলা কমিটির ১০ জন ছিলো TECN-এর ছাত্র। তারা সারা দেশের সেরা নতুন সংগঠনের পুরষ্কারও জিতে নেয় ২০০৭ সালে।
…..‘আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’ পরিষদের নোয়াখালী জেলার সাঃ সম্পাদক ছিলো TECN-এর।
…..নিয়মিত ভাবে দেয়ালিকা প্রকাশ, লিটলম্যাগ বের করা, সাহিত্য আড্ডা দেয়া ইত্যাদি সংস্কৃতি চর্চাকে করেছে সমৃদ্ধ।
কোন ছাত্রের নাম উল্লেখ করে লেখাটাকে দীর্ঘায়িত করলাম না। বলতে গেলে এরকম আরও কিছু অর্জনের কথা বলা যায়। তবে সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটিয়েছিলো TECN-এর সাধারন ছাত্ররা। সুন্দর ব্যবহার দিয়ে, আচরণ দিয়ে নোয়াখালীতে কলেজের এমন একটা ইমেজ তারা সৃষ্টি করেছিলো, কেউ যখন শুনতো যে অমুক ছেলেটা টেক্সটাইল কলেজের… ধরেই নিতো ছেলেটা ভদ্র, মার্জিত এবং মেধাবী।
ফলে নতুন ছাত্রদের আবাসন সমস্যার একটা সমাধান হয়ে গেলো। টেক্সটাইল শুনলে বাড়িওয়ালারা ব্যচেলর ভাড়া দিতে এতটুকু কুন্ঠা বোধ করতো না…এমনকি ঘরে বিবাহযোগ্যা সুন্দরী কন্যা থাকলেও নয়! :p[nextpage title=”অনুচ্ছেদ ৫”]ছাত্র আন্দোলন শুনতেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে ভয়ংকর এক দৃশ্য… গাড়ি ভাংচুর, পেট্রলবোমা, দাঙ্গা, মারপিট ইত্যাদি ইত্যাদি! আমি TECN এর ছাত্রদের আন্দোলন নিয়ে অনেক কথা বলেছি। কেমন ছিলো সে আন্দোলনের দৃশ্য- আর সব ছাত্র আন্দোলনের মত ভয়ংকর? নাকি অন্যরকম?
আমি সবসময় বলি- TECN-এর ছাত্রদের এমন কিছু ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা আছে, যা অন্য কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের নেই। যেগুলো নিয়ে আমরা গর্ব করি। আমাদের আন্দোলনগুলোও ছিলো একটু ব্যতিক্রম। গতানুগতিক আন্দোলনের মত আমরা শুধু ভাংচুর, পেট্রলবোমা, দাঙ্গা, মারপিট…এসবে বিশ্বাসী ছিলাম না।
আমরা পকেটের পয়সা দিয়ে আন্দোলন করতাম কারও ক্ষতি করার জন্য নয়। মাঠে যতটুকু দৃশ্যমান ঝাঁকুনি দেওয়া দরকার ছিলো… ততটুকুই দিয়েছি। একটুও বাড়াবাড়ি করিনি। সেরকম একটা দিনের ঘটনা বলছি…
টেক্সটাইলের প্রথম ব্যাচের ৪-৫ টা ছেলে। কলেজ গেইটের পাশ দিয়ে তারা যাচ্ছিলো। সেদিন ছিলো পঞ্চম শ্রেনীর বৃত্তি পরীক্ষা। তার নিজস্ব কোচিং সেন্টারের লিফলেট বিলি করছিলো। জালালুদ্দিন কলেজের পাশে তাদের চোখের সামনে ঘটে গেলো একটা মর্মান্তিক দূর্ঘটনা!
এক ভদ্রমহিলা তার মেয়েকে বৃত্তি পরীক্ষার হলে নিয়ে এসছিলেন। মেয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে, মা বাসার দিকে যাচ্ছিলেন। পেছন থেকে আসা একটা সুগন্ধা বাসের ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই প্রান হারান মহিলা। ছোট্ট মেয়েটা তখনো জানে না পরীক্ষার হল থেকে বের হলে কি বিভীষিকাময় দৃশ্য অপেক্ষা করছে তার জন্য!
টেক্সটাইলের ছেলেগুলো সাথে সাথে রাস্তা অবরোধ করলো। ATI থেকেও কয়েকটা ছাত্র যোগ দিলো। তারা অন্য সব গাড়ি ছেড়ে দিলো, যাতে সাধারন মানুষের অসুবিধা না হয়। শুধু সুগন্ধা বাস যতগুলো আসলো, থামিয়ে জড়ো করলো হ্যালিপ্যাড মাঠে। একে একে ১১টা সুগন্ধা বাস আটক হলো!
পুলিশ চলে আসলো। ছাত্রদের নিবৃত করার চেষ্টা করলো। ছাত্ররা অনড়। তারা দৃঢ় কন্ঠে বললো- আমরা একটা বাসেও আগুন দেব না, কাঁচ ভাঙ্গবো না। আমাদের কয়েকটা শর্ত মেনে নিন… আমরা চলে যাব। নয়তো এখানে শান্তিপূর্ন অবস্থান চলবে। পারলে লাঠিচার্জ করুন। আমরা মার খাবো। তবু দাবি আদায় না করে যাবো না।
দাবি গুলো ছিলো-
– দোষী ড্রাইভারের শাস্তি…
– টেক্সটাইলের সামনে স্পিড ব্রেকার…
– নিহতের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ… ইত্যাদি।
পুলিশরা অনেক ভয়ভীতি দেখালো। ছাত্রদের চেহারা ভিডিও করলো। মামলার হুমকি দিলো। ATI এবং TECN-এর প্রিন্সিপালদের ডেকে আনলো। প্রিন্সিপালগন পুলিশের কথামত আন্দোলনরত ছাত্রদের বহিষ্কারের হুমকি দিলেন। ATI-এর ছাত্ররা চলে গেলো। কিন্তু TECN-এর ছাত্ররা একটুও নড়লো না। হ্যালিপ্যাড মাঠে বাসের সংখ্যা বাড়তে থাকলো।
পুলিশ দেখলো- কি বিপদ! এদের কি অন্তরে ভয়ভীতি বলে কিছু নেই? ছাত্ররা গ্যাঞ্জাম করলে না হয় লাঠিচার্জ করে দৌড়ানো যেত। এভাবে চুপচাপ বসে থাকা সরল শান্ত ছেলেগুলোকে নিয়ে কি করবে??
অনেক নাটকে পর দাবীগুলো মেনে নিলেন এএসপি। ছাত্ররা ক্যাম্পাসে ফিরে গেলো। হ্যালিপ্যাডে জড়ো হওয়া সুগন্ধা বাসগুলোর ড্রাইভার-হেলপাররা বিস্মিত চোখে চেয়ে দেখলো- টেক্সটাইলের ছেলেগুলো তাদের বাসের চাবি ফিরিয়ে দিয়ে চলে যাচ্ছে! যেখানে ছোটখাটো দূর্ঘটনায় বাস ভাংচূর বা জ্বালিয়ে দেওয়া একটা নৈমিত্তিক ঘটনা… আগুন দেওয়াতো দূরের কথা, এতবড় একটা এক্সিডেন্টের পরও ছেলেগুলো একটা গ্লাস পর্যন্ত ভাঙ্গেনি!!
আমার বিশ্বাস- তাদের ড্রাইভারী জীবনে এত শান্তিপ্রিয় আন্দোলন তারা আর দেখেনি…[nextpage title=”অনুচ্ছেদ ৬”]
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অনেক চেহারা সামনে চলে আসছে… অনেক ঘটনা উকি দিচ্ছে মনে… অনেক দৃশ্যপট দুলে দুলে উঠছে হৃদয়ের মনিকোঠায়। কাউকে হাইলাইট করা এই লেখার উদ্দেশ্য ছিলো না। তাই কোন ছাত্রের নাম নেই নি। আসলে এই পথচলা ছিলো একটা মিছিলের মত। TECN-এর প্রত্যেকটা ছাত্রই সেই পদযাত্রায় ছিলো।
মনে পড়ছে- তন্তু দিবসে নষ্ট হয়ে যাওয়া বাসে কনকনে শীতের মধ্যে রাত কাটানো ছেলেগুলোর কথা… দুপুরে না খেয়ে সচিবালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ক্লান্ত, অভুক্ত ছেলেটার কথা… মিছিলে যাওয়ার সময় (গ্রেফতার হলে হাজতঘরে নামাজ পড়ার উদ্দেশ্যে) ব্যাগে করে জায়নামাজ নিয়ে যাওয়া ছেলেটার কথা… মনে পড়ছে হামলার স্বীকার এক সিনিয়র ভাইয়ের জন্য ক্লাস থেকে ছুটে আসা ছোট ভাইগুলোর কথা…
TECN-এর ইতিহাস বলতে গেলে আরও অনেকের নাম নিতে হয়। সেই প্রিন্সিপালের নাম নিতে হয়- যিনি এক হাতে আমাদের স্মারক, অন্য হাতে রিজাইন লেটার নিয়ে চবি’তে গিয়েছিলেন… হয় আমাদের দাবী আদায় করে আনবেন, নয়তো রিজাইন দিবেন বলে। কিরণ সাহেবের নাম নিতে হয়, শিরিন শারমিনের নাম নিতে হয়, লতিফ সিদ্দিকীর নাম নিতে হয়, এবং জাব্বার ভাইয়ের নাম নিতে হয়…
নাম নিতে হয় সেই সাংবাদিকদের- যারা চরম দুর্দিনে আমাদের সাপোর্ট দিয়ে গেছেন… আমাদেরকে মিডিয়ায় রিপ্রেজেন্ট করেছেন পজিটিভলি… সর্বদা সাড়া দিয়েছেন আমাদের ডাকে… সেই জাহিদ ভাই, মিজান ভাই, আজাদ ভাই, রুদ্র মাসুদ ভাইসহ সাংবাদিক ইউনিটির অন্যান্য সাংবাদিকদেরও নাম নিতে হয়।
অবশ্যই নাম নিতে হয় ডিপ্লোমার সেই ছাত্রদের, যাদের সাথে প্রতারণা করা হয়েছে। যাদেরকে আশ্বাস দেয়া হয়েছিলো- বিএসসি চালু হলে তাদের জন্য কোটা থাকবে। তারা আন্দোলন করেছিলো। বিএসসি যখন চালু হলো… সেই প্রতিজ্ঞার কথা বেমালুম ভুলে গেলো কর্তৃপক্ষ! এই ঘটনাগুলো আমাদের ভর্তির আগে ঘটেছে, তাই TECN-এর বিএসসির ছেলেরা তা জানেনা।
যেভাবেই হোক- আমি সেই সত্যগুলোও জানি। পরে ডিপ্লোমা-বিএসসি যে দ্বন্দ্ব হয়, সেটার পেছনে কার কার গুটিবাজি ছিলো… তাও আমরা কয়েকজন জানি। নোংরা আবর্জনা আর না ঘাটলাম। সম্মানিত পদে বসে থাকা সেই নষ্ট মানুষগুলোকে আমরা ক্ষমা করে দিয়েছি অনেক আগেই। কারণ ক্ষমা মহত্ত্বের লক্ষন।
আরও নাম নিতে হয় সেই সকল সম্মানিত শিক্ষকদের, যাদের মূল্যবান পরামর্শ আমাদের ঋদ্ধ করেছে… দেখিয়েছে সঠিক পথ… সেই পথ ধরে এতটুকু আসা…[nextpage title=”অনুচ্ছেদ ৭”]
প্রথম থেকেই TECN নিয়ে আমার একটা স্বপ্ন ছিলো। দুঃসাহসী একটা স্বপ্ন! স্বপ্নটা হলো… TECN-কে বাংলাদেশের এক নম্বর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পরিনত করা।
আমরা যখন বিভিন্ন বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো ভালো সাবজেক্টের ভর্তি ক্যান্সেল করে TECN-এ এসেছি, এসে জেনেছি- এটা এখনো প্রস্তাবিত… এখানে এটা নেই সেটা নেই… জেনেছি- আমাদের কলেজ হতদরিদ্র… আমরা হীনমন্যতায় ভুগি নি। বরং ভালোবেসেছি। দিন বদলের চেষ্টা করেছি।
হ্যাঁ, আমরা একটু একটু করে পেরেছি। অনেক কিছু বদলে গেছে। এখন নোয়াখালীতে গেলে এই পরিবর্তনগুলো আমরা ঝাপসা চোখে দেখি। স্মৃতিকাতর হয়ে যাই। আবেগে কেঁপে কেঁপে উঠি।
আমি বারবার বলেছি- আমাদেরকে এমন কিছু অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, যা বাংলাদেশের আর কোন ছাত্রের বরাতে জোটেনি। আমরা আমাদের দুর্গম লক্ষ্যকেও সম্ভব করেছিলাম। এখন সেই অসম্ভব স্বপ্নটাকে বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ আমাদের সামনে। এবারও আমরা সফল হবো, ইনশাল্লাহ!
এই কঠিন স্বপ্নটা বাস্তবায়নের রোডম্যাপ আমাদের জানা আছে। কারন আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে আমরা টিকে থাকার কৌশল শিখেছি। এখন শুধু মাঠে নামার বাকি। একটা শক্তিশালী ALUMNI ASSOCIATION গড়ে তুলে এবং তার মাধ্যমে সকলকে সমন্বিত করে আমরা সেই দুঃসাহসি স্বপ্নটাকে জয় করবো।
সেই দিন বেশি দূরে নয়… যেদিন ছেলে-মেয়েরা বুয়েট, বুটেক্স এবং মেডিকেল থেকে ভর্তি ক্যান্সেল করে TECN-এ এসে ভর্তি হবে! যেদিন অভিভাবকদের স্বপ্প থাকবে- তাদের একমাত্র সন্তানটি যেন বড় হয়ে TECN-এ চান্স পায়, পৃথীবির শ্রেষ্ঠ বস্ত্র প্রকৌশলী হয়…
(সমাপ্ত)


আমাদের উৎসাহিত করুনঃ




সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এই লেখাটি কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয় ।

লেখক সম্পর্কেঃ

বুনন সম্পর্কিত তথ্যঃ